রাই দানার নানাবিধ উপকারিতা ও ভেষজ গুণাগুণ

রাই থেকেই রায়তা নামে এসেছে। ডাল তরকারিতে ফোড়ন দেওয়ার জন্যে রাই তো লাগেই। রায়ত অবাঙালিদের প্রিয় খাবার। এটা টক দই ও রাই বাটা দিয়ে তৈরি। রাই দেওয়া হয় বলেই এই পদের নাম রায়তা। রাই থেকেই এই নামকরণ।

রাইয়ের উদ্ভিদ সাধারণত দু রকমের-শ্বেত রাই এবং কালো রাই। ভারতে প্রাচীনকাল থেকেই রান্নায় রাইয়ের ব্যবহার হয়ে আসছে। রাইদানা থেকে তেলও বের করা হয়। কবিরাজি মতে রাইয়ের তেল তীক্ষ্ণ, হালকা, মল নিষ্কাশন করে, উষ্ণ, বায়ু ও মাথার অসুখ সারিয়ে দেয়, কৃমি নাশ করে, দুষ্ট ব্রণ আরোগ্য করে।

রাইয়ের তেল অল্প মাত্রায় ব্যবহার করলে দীপন বা উদ্দীপিত করে, পাচন অর্থাৎ খাবার হজম করায়, উত্তেজক, ঘাম সৃষ্টি করে বা স্বেদল, কিন্তু অধিকমাত্রায় খেলে বমন করায় অতএব বেশি পরিমাণে খাওয়া উচিত নয়।

আরও বলা হয় রান্নায় রাইয়ের ব্যবহার করলে অন্ত্রের ওপর তার উত্তেজক প্রভাব পড়ে। এতে জঠরের রক্তস্রাব বেড় যায় এবং জঠরে যে মন্ত্রনক্রিয়া চলে তার ক্ষিপ্রতা বেড়ে যায় অথাৎ খাবার হজমের কাজটা দ্রুত হয়, সেইজন্যে তাড়িতাড়ি খিদে পেয়ে যায়।

রাইয়ের তেল বা দানা কফ ও পিত্ত হরণ করে, তীক্ষ্ণ, গরম, রক্তপিত্ত সৃষ্টি করে, কিছুটা রুক্ষ, খিদে বাড়িয়ে দেয় । চুলকুনি, কুষ্ঠ আর পেটের কৃমি নষ্ট করে দেয়। সাদা রাইয়ের চেয়ে কালো রাই আরও তীক্ষ্ণ।

হাকিমি বা ইউনানি মতে, অত্যধিক রাই জঠরের কৃমি বের করে দেয়, রক্তশুদ্ধ করে, সর্দি, অখিদে (অগ্নিমান্দ্য) আর বায়ু সম্বন্ধী রোগে উপশম করে।

রাইদানার তেল অত্যন্ত গরম সেই জন্যে অল্প পরিমাণে খাওয়া-দাওয়ায় ব্যবহার করা উচিত। হাকিমি মতে তো রাই বেশি পরিমাণে খেলে নেশার সৃষ্টি হয়।

সুস্থ থাকতে রাই-য়ের প্রয়োগ:

১. রুচি বাড়াতে:  রাইয়ের শাক উষ্ণ, পিত্তের প্রকোপ বাড়িয়ে দেয়, রুচিকর, বায়ু, কষ, কৃমি ও কণ্ঠরোগ নাশ করে। রাই-এর শাক খেলে সেই জন্যে কিছুটা উপকার পাওয়া যায় । কিন্তু যাদের পিত্তের ধাত গরমকালে তাঁদের পক্ষে রাইয়ের শাক খাওয়া ভাল নয়।

আরো পড়ুন:  মৌরি দানার ১০টি ভেষজ গুণ ও অন্যান্য ব্যবহার

২. সর্দি সারাতে:  রাইয়ের বীজ মধুর সঙ্গে পিষে খেলে সর্দি সারে। টাইফয়েডের জ্বরে যখন শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যায় তখন শরীর গরম করবার জন্যে রাইয়ের তেল মালিশ করা হয়। সর্দির জন্যে যদি গা ঠাণ্ডা হয়ে যায় তাহলে রাইয়ের প্রলেপ লাগালে সুফল পাওয়া যায়।

৩. কফ বের করতে: অল্প রাই, অল্প সৈন্ধব নুন আর অল্প চিনি এক সঙ্গে পিষে নিয়ে সকাল-সন্ধেবেলা খেলে কাশির সঙ্গে কফ যদি ঘন হয়ে গিয়ে থাকে পাতলা হয়ে গিয়ে সহজইে বেরিয়ে যায়।

৪. পেটের অসুখ সারাতে:  অল্প পরিমাণে রাইদানা বেটে জলে গুলে খেলে পেটের ব্যথা ও অজীর্ণতা সেরে যায়। অল্প রাই পোড়া একটু চিনি মিশিয়ে খেলে এবং খাবার পরে খানিকটা জল খেলে বদহজম আর পেট ব্যথা সেরে যায়।

৫. বিষক্রিয়া নষ্ট করতে:  অল্প রাইদানা ও নুন গরম জলে মিশিয়ে খেলে বমি হয়ে সব বিষ বেরিয়ে যায়।

৬. বমি বন্ধ করতে:  রাইদানা মিহি করে পিষে জলে ভিজিয়ে পেটের ওপর প্রলেপ লাগালে বমি বন্ধ হয়ে যায়।

৭. ফোলা কমাতে: রাই আর কালো ভুন একসঙ্গে পিষে প্রলেপ লাগালে ফুলে কমে যায়।

৮. বাতর উপশমে:  বাত ব্যাধিতে আড়ষ্ট অঙ্গের ওপর রাইয়ের পুলটিস তৈরি করে বাঁধলে উপকার পাওয়া যায়।

৯. পেটের বায়ু কমাতে:  রাইয়ের তেল মালিশ করলে বায়ু রোগে উপকার পাওয়া যায় ।

১০. ঘা সারাতে:  রাইদানা পিষে ঘি ও মধু মিশিয়ে প্রলেপ লাগালে ঘায়ের পোকা মরে যায়।

১১. ধবল বা শ্বেতী রোগ সারাতে:  পেষা রাইয়ের সাথে পুরোনো ঘি যা রাই-এর চেয়ে পরিমাণে আটগুণ বেশি নিয়ে; কিংবা জলে ধুয়ে নিয়ে গাওয়া ঘিয়ে মিশিয়ে প্রলেপ লাগালে ধবল বা শ্বেতী রোগ সেরে যাবে।

১২. আঞ্জনী সারাতে:  পেষা রাইকে একটু ঘিয়ে মিশিয়ে সাবধানে আঞ্জনীতে লাগালে। তবে খেয়াল রাখতে হবে চোখের ভেতরে যেন না ঢুকে যায়।

আরো পড়ুন:  কাঁচা মরিচ বা কাঁচা লঙ্কার খাওয়ার গুণাগুণ ও অপকারিতা

১৩. কানের রোগে:  সর্ষে বা তিল তেল আঁচে বসিয়ে দেওয়ার পর তেল খুব গরম হয়ে গেলে রাই আর রসুন মিহি করে পিষে মেশাতে হবে। তারপর একটু কপূর মিশিয়ে ঢেকে দিতে হবে। ঠাণ্ডা হলে ছেকে নিয়ে এই তেল ভরে রেখে প্রয়োজন মতো দু-চার ফোঁটা কানে দিলে কান পেকে যাওয়া, কানে পুঁজ হওয়ার সুফল পাওয়া যাবে।

প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখা যেতে পারে আমরা প্রতিদিন যে সর্ষে খাই সেই সর্ষে আর রাই কিন্তু একই জাতের শস্য হলেও দুটি আলাদা। এখানে ঔষধ প্রসঙ্গে রাই-এর গুণাগুণের কথাটি বলা হয়েছে সর্ষের নয়। রাই-এর বীজ ও সর্ষের বীজ দেখতে একরকম হলেও সর্ষের বীজের চেয়ে আকারে ছোট। রাইকে সংস্কৃতে বলা হয় রাজিকা। অনেকের মতে রাই-এর স্বাদ ঝাঁঝযুক্ত ও সামান্য অম্ল। সেই জন্যে অবাঙালিরা আচারে টক ও ঝাঁঝালো স্বাদ আনবার জন্যে রাই বাটা দিয়ে থাকেন। এঁচোড়ের আচারে এটি বেশি ব্যবহার করা হয়।

রাঁধুনি রুচি বৃদ্ধি করে:

রাঁধুনির ব্যবহার বেশি না হলেও বাঙালি বাড়িতে শুক্তো রান্না করতে হলে রাধুনি লাগবেই। রাঁধুনিকে হিন্দিতে বলা হয় চান্দেরি। রাঁধুনি সাধারণত ঝোলে ও শুক্তোর ফোড়ন হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অনেকে পাঁচমিশেলি তরকারি দিয়ে রান্না করা শুক্তোয়, বেগুন আলু বড়ি দিয়ে কলমিশাকের ঝোলে রাঁধুনি বেটেও দেন। একটা বিশেষ ধরনের ঘ্রাণ যা বাঙালি রসনায় সুখকর তার জন্যেই বাঙালি বাড়িতে রাঁধুনির কদর। নিরামিষ রান্না ছাড়া রাঁধুনির ব্যবহার হয় কি না জানা নেই।

রাঁধুনির অনেক ঔষধি গুণ আছে । রাঁধুনি উষ্ণবীর্য (গরম-কড়া), লঘু, তীক্ষ্ণ, রুক্ষ, রুচি বৃদ্ধি করে, আগ্নেয় (খিদে বাড়িয়ে দেয়), মলরোধ করে, বলবৃদ্ধি করে, শুক্রজনক, কৃমি, বমি, হিকা (হেঁচকি) নাশ করে। চোখের রোগে উপকারী।

তথ্যসূত্রঃ

১. সাধনা মুখোপাধ্যায়: সুস্থ থাকতে খাওয়া দাওয়ায় শাকসবজি মশলাপাতি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, নতুন সংস্করণ ২০০৯-২০১০, ২৩৬-২৩৮।

আরো পড়ুন:  এলাচ বা ছোট এলাচে আছে খাবারের স্বাদ বৃদ্ধিসহ নানা ভেষজ গুণ

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিপিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Dalgial

Leave a Comment

error: Content is protected !!