রেউচিনি গাছের নানাবিধ ভেষজ গুণাগুণ

রেউচিনি হিমালয় অঞ্চলের কাশ্মীর থেকে নেপাল পর্যন্ত ৭-১২ হাজার ফুট উঁচুতে এবং তাতার, খোতান, সিকিম, সিমলা, কাংগড়া, চীন, তিব্বত প্রভৃতি দেশে জন্মে।

রেউচিনি-এর পরিচিতি

গাছ ৪/৫ ফুট লম্বা, শক্ত, দেখতে অনেকটা এদেশের মানকচু গাছের মত। লম্বা ডাঁটার সঙ্গে যুক্ত হৃৎপিণ্ডাকৃতি পাতা, গোড়ার দিকের পাতা অপেক্ষাকৃত বেশ বড়, নিচের দিকটা রোমশ। গাঢ় বেগুনী রঙের ছোট ছোট ফুল হয়। ফুলের বিন্যাস অনেকটা টক পালং-এর ফুলের মত। ফলও বেগুনী রঙের হয়। গাছের কাঁচা ডাঁটা চিরে শুকিয়ে বিনুনির মত পাকানো অবস্থায় ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের বাজারে বিক্রি করার জন্য নিয়ে আসে।

অন্যান্য নাম

ভেষজটির সংস্কৃত নাম- পীতমূলা, অপর্ণী; বাংলায নাম- রেউচিনি, হিন্দিতে- রেবন্দচীনী, রেউচিনি প্রভৃতি বিভিন্ন নামে পরিচিত। এর বোটানিক্যাল নাম Rheum australe, Rheum emodi Wall., ফ্যামিলী-Polygonaceae. সমগ্র বিশ্বে এই গণের প্রজাতির সংখ্যা ২০টি। এদের মধ্যে ভারতে হিমালয় প্রদেশে পটি পাওয়া যায়। জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে এর ফুল ও ফল হয়। ঔষধার্থে ব্যবহার্য অংশ—– কন্দমূল।

রেউচিনি-এর ঔষধ হিসাবে প্রয়োগ

এটির কাজ প্রধানতঃ রসবহ ও রক্তবহ স্রোতে। এর মূল লঘু, তিক্ত, কটু, রুক্ষ, তীক্ষ্ণ, উষ্ণবীর্য, দীপন, মূত্রজনক, আর্তবজনক, গ্রাহী, যকৃত আজক, কফনিঃসারক, বিরেচক, কফপিত্তহর, বলকারক, লালাপ্রসেকজনক। অজীর্ণ, অতিসার, অগ্নিমান্দ্য, অরুচি, মলবদ্ধতা ও শীতপিত্ত রোগে ব্যবহার্য। দুষ্টক্ষতে চূর্ণ লাগালে উপকার হয়।

এটি অল্প মাত্রায় (১০০-৫০০ মি. গ্রা.) তিক্ত, দীপন ও গ্রাহী। ১-২ গ্রামের মতো একটু বেশি মাত্রায় সেবনে এর ক্রিয়া বৃহদন্ত্রের উপর পরিলক্ষিত হয়, ফলে ৬-৮ ঘণ্টার ৫ণ্য দাপ্ত হয়ে যায়। মৃদু বিরেচক রূপে তথা অজীর্ণ হতে উৎপন্ন অতিসারে এর প্রয়োগ হিতকর। জীর্ণ বিবন্ধ অবস্থায় এর প্রয়োগ সমীচীন নয়।

১. অগ্নিমান্দ্যে: ক্ষিদে ভাল হয় না, পেটে বায়ু জমে, খাওয়ায় অনিচ্ছা থাকে, দাস্তটা পরিষ্কার হয় না, এ ধরনের অবস্থা যে ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে চলছে, সেক্ষেত্রে রেউচিনি চুর্ণ ২৫০ মিলিগ্রাম মাত্রায় সকালে ও বিকালে দিনে ২বার করে কিছুদিন খেলে অসুবিধেটা চলে যাবে।

আরো পড়ুন:  শেয়ালকাঁটা গুল্মের বারোটি ভেষজ গুণাগুণ ও প্রযোগ

২. ক্রিমিতে: তা সে গোল ক্রিমি, সুতা ক্রিমি বা ফিতা ক্রিমি, যে ক্রিমিই হোক, রাতে শোবার আগে ১ গ্রাম রেউচিনি চূর্ণ গরম জলসহ খেতে হবে। নিয়মিতভাবে ৮/১০ দিন পর দাস্তটা পুনরায় পরীক্ষা করিয়ে নিয়ে তারপর এটি ব্যবহার করার দরকার আছে কিনা তা ঠিক করতে হবে ।

৩. কোষ্ঠবদ্ধতায়: যাঁদের কোষ্ঠকাঠিন্য আছে অথবা ২/৩ দিন অন্তর দাস্ত হয়, মাঝে মাঝে পেটে ব্যথা হয়, তাঁরা যদি রাত্রে শোয়ার সময় রেউচিনি চূর্ণ ১-২ গ্রাম মাত্রায় (প্রয়োজনমত) গরম জলসহ খান, তাহলে দাস্ত পরিষ্কার হবে। তবে এটি মাঝে মাঝে কিছুদিন খেলে কোষ্ঠকাঠিন্যের অসুবিধাগুলি দূর হয়।

৪. জীর্ণ প্রবাহিকায়: দীর্ঘদিন ধরে আমাশায় যাঁরা ভুগছেন, তাঁরা যদি রেউচিনি চূর্ণ ৫০০ মিলিগ্রাম মাত্রায় প্রত্যহ সকালে ও বিকালে ২ বার করে মাসখানিক খান, তাহলে দীর্ঘদিনের কষ্টের হাত থেকে রেহাই পেতে পারেন। তবে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে একটু সাবধানতা অবলম্বন করতেই হবে।

৫. অর্শে: নিয়মিতভাবে প্রত্যহ ভোরে রেউচিনি চূর্ণ ১ গ্রাম মাত্রায় গরম জলসহ খেলে ১৫/১৬ দিন পরে দেখা যাবে যে, অর্শের দপদপানি, রক্ত পড়া, জ্বালা চলে গেছে।

৬. শীতপিত্তে: এ রোগে মাঝে মাঝে হাত-পা বা সর্বাঙ্গ চুলকোয় এবং চাকা চাকা হয়ে। ফুলে ওঠে। এ ক্ষেত্রে রেউচিনি চুর্ণ ৫০০ মিলিগ্রাম মাত্রায় সকালে ও বিকালে দিনে ২ বার। জলসহ ২/৩ দিন খেলে উপসর্গগুলো নষ্ট হয়। তবে রোগের মূল কারণ বর্জন না করলে রোগ সারার সম্ভবনা কম।

৭. শিশুদের জ্বর ও কাসিতে: রেউচিনি চূর্ণ ৫০-১০০ মিলিগ্রাম (বয়সানুপাতে কমবেশী) মাত্রায় দিনে ৩/৪ বার মধুসহ খেতে দিতে হবে। জ্বর কমে গেলেও কাসির জন্য আরও কয়েকদিন এটি ব্যবহার করা দরকা।

CHEMICAL COMPOSITION

Rheum emodi Wall

Leaves & stem contain: Oxalic acid 0.65-0.81%. Fresh roots contain: hetrodianthrones (sennidin C, reidin B and reidin C). Leaves and flowers contain: Rutin 0.32%. Drug contains: moisture 6.1%, cathartic acid 3.5%, chrysophanic acid 0.4%, sennoside A, sennoside B, essential oil 0.05%, a number of anthraquinone derivatives based on emodin, emodin-3-monomethyl ether (physcione), Chrysophanol, aloe-emodin and rhein, astringent principle (glucogallin), tannin and catechin, cinnamic and rheinolic acids, volatile oil, starch and calcium oxalate. Root contains: Terpenic alcohol, methyl-n-heptyl ketone, eugenol.

আরো পড়ুন:  ঢেঁড়স খাওয়ার নানাবিধ ভেষজ গুণাগুণ ও উপকারিতা

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ৯, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ ১৪০৫, পৃষ্ঠা, ৮৭-৯০।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Vinayaraj

Leave a Comment

error: Content is protected !!