সঞ্জীবনী বিরুৎ-এর ছয়টি ভেষজ উপকারিতা

সঞ্জীবনী বিরুৎ ( Selaginella involvens ) বায়ুবিকার, অপস্মার (মৃগী), সর্দি-কাসি, কৃশতা, অর্শ, রজোরোধ, গুদভ্রংশ (Prolapse of anus), ক্ষুদ্র মূত্রাশ্বরী, রক্তপিত্ত, ধাতুদৌর্বল্য, প্রসবাস্তিক দুর্বলতা, ক্ষয়জনিত অজীর্ণ ও অগ্নিমান্দ্য, গ্রহণী, শ্বেতপ্রদর, মূত্রকৃচ্ছ্র, ইন্দ্রিয়দৌর্বল্য এবং বার্ধক্যজনিত কিংবা রোগান্তিক দুর্বলতায় ব্যবহৃত হয়। এছাড়া এই ভেষজটি দীর্ঘায়ুলাভের সহায়ক।

সঞ্জীবনী বিরুৎ-এর ভেষজ ব্যবহার

১. দীর্ঘদিনের অজীর্ণ ও অগ্নিমান্দ্যে এবং গ্রহণী রোগে: ক্ষুধা অল্প হতে হতে একেবারে কিংবা আংশিক হতে চায় না, যা খাওয়া হয় তা সহজে হজম হয় না, এটা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে এবং মাঝে মাঝে পাতলা দাস্ত হলে এমন একটা সময় আসবে, যখন গ্রহণী রোগের সৃষ্টি হবে। তখন দাস্ত দু’দিন পাতলা তো দু’দিন শক্ত কিংবা গুটলে, আবার দুই বা তিন দিন পায়খানা হলোই না, সেইসঙ্গে অজীর্ণ, অরুচি, গা-বমি বমি ভাব, পেটফাঁপা, দুর্বলতা প্রভৃতি আসে।

এই রকম কিংবা এর কম অথবা বেশি অবস্থায় সঞ্জীবনী ব্যবহার করে উপকার পাবেন। যেক্ষেত্রে অত্যধিক ধাতুক্ষয় কিংবা যথেচ্ছ যৌনাচার করার ফলে ধীরে ধীরে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, সেক্ষেত্রেও এটির ব্যবহারে সুফল পাবেন। সঞ্জীবনী পাতা ৪ । ৫ গ্রাম জলে বেটে তাতে সামান্য চিনি এবং কাপখানিক জল মিশিয়ে সরবতের মত করে প্রত্যহ সকালে খালি পেটে একবার এবং বিকালের দিকে একবার খেতে হবে। এভাবে মাসখানিক ব্যবহারের পর কেবল সকালের দিকে একবার করে আরও মাসখানিক খাওয়া প্রয়োজন। এর দ্বারা উপরিউক্ত অসুবিধাগুলো তো যাবেই, সেইসঙ্গে শরীরের অন্যান্য ক্ষয় পূরণ হয়ে শক্তি বৃদ্ধি পাবে এবং মনে স্ফূর্তি আসবে।

২. অত্যধিক শুক্রক্ষয়ে: তা সে সাদায় হোক কিংবা কালোয়, বার বার ভোগের বাসনায় মত্ত হয়ে জীবনকে ভোগ করতে চাইলে অত্যধিক শুক্রক্ষয়ের ফলে দুর্বলতা, হজমে গোলমাল, চিত্ত-চাঞ্চল্য, ভ্রম প্রভৃতি যেমন আসাটা একান্তই স্বাভাবিক, তেমনি কামোত্তেজনা হ্রাস পেতে পেতে একদিন এমনই অবস্থা আসে, যেদিন আপনার সব থেকেও নিজেকে সর্বহারা বলে মনে করবেন। বয়সের তালে তালে এই অসুবিধেটা সংসারের নানা ক্ষেত্রে যে জটিলতার সৃষ্টি করবে।

আরো পড়ুন:  গোট বেগুন গুল্ম-এর দশটি ভেষজ গুণাগুণ ও প্রয়োগ

তাই এই অবস্থা সৃষ্টির পূর্বে সাবধানতা অবলম্বনের জন্য মাঝে মাঝে সঞ্জীবনী পাতার সরবত সকালের দিকে একবার ক’রে খেলে চরম অসুবিধায় পড়বেন না। আর যদি সেই ভয়ঙ্কর অসুবিধা এসেই যায়, তাহলে ঘাবড়ে গেলে বিপদ, সে অবস্থায় মাথা ঠাণ্ডা রেখে সঞ্জীবনী বিরুৎ-এর পাতার সরবত পূর্বোক্ত পদ্ধতিতে প্রস্তুত ক’রে দিনে ২ বার খেতে হবে। দু’দিন খাওয়ার পর তিন দিনের দিন পরীক্ষায় বসলে তখন কিন্তু বিপদের শেষ থাকবে না।

৩. রজোরোধে: যৌবনের প্রথমাবস্থায়, দু’একটি সন্তান হবার পর দীর্ঘদিনের বিরতিতে, যৌবনে অত্যধিক মেদ জমলে, চির-বিরতির পূর্বের কিছু সময়ে মেয়েদের মাসিক স্রাব মাঝে মাঝে বন্ধ হয়ে যায়, আবার হয়, হলেও তাতে শান্তি নেই, দেখা দিয়েই হাওয়া; এক্ষেত্রে সঞ্জীবনী পাতার সরবত একবার করে প্রতিদিন বিকালে মাস দুই তিন খেতে হবে, উপকার পাবেন। মেয়েদের মাসিক স্রাব দর্শনের পর কেবল গর্ভধারণ কালে এবং কারুর কারুর প্রসবের পর মাসখানিকের অধিক স্রাব বন্ধ থাকে। এছাড়া ৪৫। ৪৬ বছরের পর একেবারে রোধ হয়। তা ছাড়া বন্ধ হলে চিকিৎসা করানো দরকার।

৪. শ্বেতপ্রদরে: এই সমস্যা এক এক বয়সে এক এক কারণে হয়। অল্প বয়সে হলে সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সফল যৌনসঙ্গের দ্বারা চলে যায়। অত্যধিক ক্ষয়, পরিশ্রম, অপুষ্টি প্রভৃতি কারণেও সাদাস্রাব হতে পারে। আবার অত্যধিক সন্তানধারণ ও গর্ভপাতের ফলেও এটি দেখা দেয়। সর্বক্ষেত্রেই প্রথম থেকে সাবধানতা অবলম্বন করা কর্তব্য। প্রথম থেকেই সঞ্জীবনী বিরুৎ-এর পাতার সরবত কিছুদিন দু’বেলা খেলে উপকার পাবেন। এই সময় ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে হালকা ঔষধ খাওয়া দরকার।

৫. প্রসবান্তিক দুর্বলতায়: প্রসবের পর প্রত্যাহ একবার করে ৫। ৬ মাস সঞ্জীবনী পাতার সরবত বিকালের দিকে খেলে দুর্বলতা থাকবে না, হজম ভাল হবে, বুকের দুধেও ঘাটতি পড়বে না; শরীরটা যেমন ঝরঝরে ও তরতাজা হবে, মনে তেমনি স্ফূর্তির সঞ্চার হতে থাকবে।

আরো পড়ুন:  বড় দুধিয়া-এর সাতটি ভেষজ গুণাগুণ

৬. বার্ধক্যের বারাণসী: অকাল বার্ধক্যকে ঠেকিয়ে রাখতে এবং দীর্ঘজীবন ধরে সুঠাম দেহ বজায় রাখার ইচ্ছা হলে ও বার্ধক্যের জড়সড় ভাব কাটিয়ে উঠতে চাইলে সঞ্জীবনীর সরবত পান করুন, একবার কিংবা দু’বার।

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্র:

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, সপ্তম মুদ্রণ ১৪২৬, পৃষ্ঠা, ১৩৫-১৩৬।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Salicyna

Leave a Comment

error: Content is protected !!