বকুল লতা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ লতা

বকুল লতা

বৈজ্ঞানিক নাম: Embelia ribes Burm.f., Fl. Ind. 62, t. 23 (1768). সমনাম: Embelia glandulifera Wight (1848), Ribesiodes ribes (Burm. f.) O. Kuntze (1891). ইংরেজি নাম: Bidang. Embelia. স্থানীয় নাম: বকুল লতা, জাওদাইন, বিরঙ্গ, ভাইবিরঙ্গ.
জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Plantae, বিভাগ: Angiosperms. অবিন্যাসিত: Edicots. অবিন্যাসিত: Asterids. বর্গ: Ericales. পরিবার: Primulaceae. গণ: Embelia প্রজাতি: Embelia ribes.

ভূমিকা: বকুল লতা (বৈজ্ঞানিক নাম: Embelia ribes) ইম্বেলিয়া গণের প্রিমিলেসিয়া পরিবারের গুল্ম। এই প্রজাতিটি আবাদি নয়, পতিত বা পাহাড়ি জায়গায় অযত্নে জন্মে। এটি অনেক ভেষজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

বকুল লতা-এর বর্ণনা:

বকুল লতা গুল্ম বিশেষ। এটি বৃহদাকার আরোহী বা হামাগুড়ি দিয়ে জন্মায়। এটি ১২ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এদের কান্ডে আঁচিলযুক্ত ও কন্টকময় হয়। শাখাগুলো অনেক লম্বা, কচি শাখার বাকল দেখতে ধূসরাভ সাদা বা চকচকে বর্ণের। বায়ুরন্ধবিশিষ্ট, বয়স্ক কান্ডের বাকল ধূসরভি বাদামী। পাতা ৪.৫-৯.০ x ২-৩ সেমি, উপবৃত্তাকার-ভল্লাকার, পাদদেশ তীক্ষ্ম বা কীলকাকার, শীর্ষ তীক্ষ্ম থেকে খর্ব স্থূলা, দীর্ঘা, অখন্ড এবং নিম্নদিকে বক্র প্রান্তিবিশিষ্ট, মসৃণ এবং চকচকে, পত্রবৃন্ত ১২ মিমি পর্যন্ত লম্বা, সরু, গ্রন্থিল প্রান্তবিশিষ্ট।

পুষ্পমঞ্জরী সচরাচর যৌগিক মঞ্জরীবৎ, যৌগিক মঞ্জরী প্রান্তীয় বা উপরের দিকের পাতার কাক্ষিক, বহু পুষ্পবিশিষ্ট, মঞ্জরীদন্ড ১২ সেমি (প্রায়) লম্বা, ধূসরাভ রোমাবৃত, মঞ্জরীপত্র ক্ষুদ্র, দৃঢ় রোমাবৃত, আশুপাতী। পুষ্প ক্ষুদ্র, ২ মিমি (প্রায়) লম্বা, খর্বাকার ও দূরাপসারী পুষ্পবৃন্তে , ৫-গুণিতক, সবুজাভ বা সাদা, পুষ্পবৃন্ত ১.০-১.৫ মিমি লম্বা। বৃতি পাদদেশে প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত যুক্ত, খন্ডক ৫টি, ডিম্বাকার, ১ মিমি (প্রায়) লম্বা, অর্ধচর্মবৎ, সিলিয়াযুক্ত। দলমন্ডলের খন্ডক ৫টি, মুক্ত, উপবৃত্তাকার বা দীর্ঘায়ত, ২ মিমি (প্রায়) লম্বা, বীক্ বিক্ষিপ্তভাবে অণুরোমশ।

পুংকেশর ৫টি, পুং পুষ্পে পাপড়ির মাঝখানে যুক্ত, স্ত্রী পুষ্পে নিচের দিকে, পাপড়ি থেকে খর্বাকার, পুংদন্ডগুলো সরু, ০.৫ মিমি (প্রায়) লম্বা, পরাগধানী নিরেট ডিম্বাকার বা দীর্ঘায়ত, পৃষ্ঠদেশ গ্রন্থিল আঁচিলবিশিষ্ট। গর্ভাশয় নিরেট ডিম্বাকার, ১ মিমি (প্রায়) লম্বা, উত্থিত শিরাবিশিষ্ট, গর্ভদন্ড খাটো, গর্ভমুণ্ড মুণ্ডাকার। ফল বেরী অথবা ডুপ, প্রায় গোলকাকার, ৪ মিমি (প্রায়) ব্যাসবিশিষ্ট, স্থায়ী গর্ভদন্ড ও গর্ভমুণ্ডের। মুকুটবিশিষ্ট, নীলাভ কালো, মসৃণ, কুঞ্চিত।

আরো পড়ুন:  চোরকাঁটা বা প্রেমকাঁটা গ্রীষ্ম প্রধান দেশে জন্মানো বিরুৎ

আবাসস্থল ও চাষাবাদ:

অরণ্যের স্যাঁতসেঁতে স্থান এবং পাহাড়ের নিচু স্থানে জন্মে। বকুল লতার ফুল ও ফল ধরে মার্চ থেকে জুলাই মাসের মধ্যে। বীজ থেকে এর বংশ বিস্তার হয়।

বিস্তৃতি:

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, শ্রীলংকা, ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, উত্তর দিকে চীনের দক্ষিণাংশ এবং ইন্দোনেশিয়া (জাভা, বোর্নিও এবং সুমাত্রা) এবং সিঙ্গাপুর। বাংলাদেশে ইহা সিলেট জেলা থেকে রিপোর্ট করা হয়েছে (Alam, 1988).

বকুল লতা-এর ভেষজ গুণাগুণ:

প্রজাতিটিতে উচ্চমানের ভেষজ গুণাবলী বিদ্যমান। পাইরিয়া (দাঁতের রোগ) এবং ক্ষুদ্রান্ত্রের পুঁজ নির্গতকারী টিউমার, দাঁত, মুখ এবং গলার অসুখ এবং ঠোঁটের ক্যান্সার নিরাময়ে ইহার ফল ব্যবহৃত হয়। ফলের নির্যাস ব্যাকটেরিয়া প্রতিষেধক, হাইপোগ্নিকোমিক এবং বন্ধ্যাত্ব সৃষ্টিকারী গুণাবলী প্রদর্শন করে। নির্যাস বিশেষ করে এম্বেলিন, ফিতাকৃমি নাশক কার্যাবলী প্রদর্শন করে এবং মানুষের পরজীবী আক্রমণে বিরুদ্ধে কার্যকরী। ইহার ফলেও জৈবক্রিয়া নিয়ন্ত্রণকারী, বলবর্ধক, পাকস্থলীর বায়ুনাশক এবং কৃমিনাশক গুণাবলী বিদ্যমান, এবং ব্রংকাইটিস, জণ্ডিস, মাইগ্রেন, অজীর্ণত, পেট ফাপা এবং চর্মরোগ নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়।

শিকড় চুর্ণ অ্যাসিনো ইদুরের শরীরের ওজনের প্রতি কিলোগ্রামের জন্য একমাত্র ঔষধ হিসেবে ১০০ মিলিগ্রাম শতকরা একশতভাগ বন্ধ্যাত্ব গটিয়ে থাকে। শিকড় ফুটিয়ে বের করা ক্বাথ এবং পানিতে দ্রবীভূত করে নির্গত কাথ ইনফ্লুয়েঞ্জা, কাশি এবং ডায়রিয়ায় কার্যকরী ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইহার বীজে এ্যান্টিবায়োটিক, যক্ষা প্রতিরোধী গুণাবলী, জৈবক্রিয়া নিয়ন্ত্রণকারী, বলবর্ধক এবং কৃমিনাশক গুণাবলী বিদ্যমান। শরীরের প্রতি কিলোগ্রাম ওজনের ক্ষেত্রে একমাত্রা ঔষধ হিসেবে শিকড়ের ইথানলে নির্যাসে ২০০ গ্রাম বন্ধ্যাত্ব ঘটিয়ে থাকে, ইহা স্পার্মীসিডাল (spermicidal) এবং মূত্রবর্ধক (Ghani, 2003). টাটকা বাকল চূর্ণ সেঁক তাড়াতে এবং মাছের বিষ হিসেবে ব্যবহৃত হয় (de Padua et al., 1999).

জাতিতাত্বিক ব্যবহার:

কচি পাতা, বিটপ এবং কচি ফল সবজি হিসেবে রান্না করে অথবা চাটনি হিসেবে খাওয়া হয়ে থাকে। ইহার পাকা টক-মিষ্টি ফল একটি সুস্বাদু খাবার। বিশেষ করে শিশুদের কাছে অতি প্রিয় (de Padua et al.. 1999).

আরো পড়ুন:  বড় দুধিয়া-এর সাতটি ভেষজ গুণাগুণ

অন্যান্য তথ্য:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের  ৯ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) বকুল লতা প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, বন ধ্বংসের কারণে এই প্রজাতির সংখ্যা কমে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশে এটি সংকটাপন্ন হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে বকুল লতা সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটি স্ব-স্থানের বাইরে সংরক্ষণ করতে হবে।

তথ্যসূত্র ও টীকা:

১. এ বি এম রবিউল ইসলাম ও এ বি এম এনায়েত হোসেন (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ৯ম, পৃষ্ঠা ২৬৯-২৭১। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি flowersofindia.net থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Siddarth Machado

2 thoughts on “বকুল লতা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ লতা”

Leave a Comment

error: Content is protected !!