ভূমিকা: প্রকৃতির পরম বন্ধু হিসেবে পরিচিত ভেষজ উদ্ভিদগুলোর মধ্যে বাসক অন্যতম। প্রাচীনকাল থেকেই আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। চিরসবুজ এই গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদটি শুধু তার ঔষধি গুণের জন্যই নয়, বরং তার স্বতন্ত্র শারীরিক কাঠামোর জন্যও উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত। আজ আমরা বাসক গাছের বিস্তারিত বৈশিষ্ট্য ও জীবনচক্র সম্পর্কে জানবো।
বিবরণ:
বাসক সাধারণত একটি ঘন এবং অধিক শাখান্বিত চিরসবুজ গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। এটি ক্ষুপজাতীয় হলেও উচ্চতায় প্রায় ৫ থেকে ৬ ফুট (কখনও ২.৬ মিটার পর্যন্ত) হতে পারে। এর পাতাগুলো বেশ বড় ও আকর্ষণীয়, যা সাধারণত ৮-১৬ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ২-৪ সেন্টিমিটার চওড়া হয়। উপবৃত্তাকার বা বি-বল্লমাকার এই পাতাগুলোর অগ্রভাগ বেশ সূক্ষ্ম এবং এর গঠন অর্ধচর্মবৎ। পাতার উপরিভাগ অতি সূক্ষ্ম রোমে আবৃত থাকে, যা একে একটি মসৃণ রূপ দান করে। বাসকের ফুলের গঠন বেশ বৈচিত্র্যময়। এর পুষ্প মঞ্জরী ৩-৫ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ঘন কাক্ষিক পত্রময় হয়ে থাকে। ফুলের রঙ সাধারণত ধবধবে সাদা, তবে কখনো কখনো এতে ক্ষীণ নীলাভ-সাদা আভা লক্ষ্য করা যায়। এর দলমণ্ডল বা পাপড়ির অংশটি দুই-ওষ্ঠবিশিষ্ট এবং নিচের মধ্য খন্ডটিতে রক্তবর্ণের রেখা ও খাঁজ দেখা যায়, যা ফুলটিকে অনন্য সৌন্দর্য দেয়।
প্রজননতন্ত্রের দিকে তাত্ত্বিকভাবে তাকালে দেখা যায়, এতে দুইটি অসমান পুংকেশর থাকে। বড়টি ২.৫ সেমি এবং ছোটটি ২.৩ সেমি লম্বা হয়। এর গর্ভদণ্ডটি সূত্রাকার এবং নিম্নাংশ রোমশ প্রকৃতির। বাসকের ফল একটি মুষলাকৃতি ক্যাপসিউল, যা প্রায় ৫.৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। ফলের নিচের অংশ সংকুচিত হয়ে একটি লম্বা শক্ত দণ্ডে পরিণত হয়। প্রতিটি ফলে সাধারণত ২ থেকে ৪টি বীজ থাকে। বীজগুলো অর্ধগোলাকার, কিছুটা চাপা এবং অমসৃণ ধরনের হয়ে থাকে। বাসক গাছে ঋতুভেদে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে সাদা ফুলে ভরে ওঠে এই গাছ। তবে বৈজ্ঞানিক তথ্যমতে, এই উদ্ভিদে প্রধানত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ফুল ও ফল ধারণের প্রক্রিয়া চলে। প্রাকৃতিকভাবে বংশবিস্তারের মাধ্যমে এটি তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে[২] ক্রোমোসোম সংখ্যা: ২n = ৩৪।
চাষ পদ্ধতি ও আবাসস্থল:
বাসক গাছকে সাধারণত আলাদা করে চাষ করার প্রয়োজন পড়ে না। এটি আমাদের গ্রামীণ জনপদে বসতবাড়ির আশেপাশে, পরিত্যক্ত বাগানের কোণে কিংবা ফসলি জমির বেড়ার ধারে অত্যন্ত অনাদরে বেড়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে একে আগাছার মতোই দেখা যায়, তবে এর ভেষজ গুণের কারণে মানুষ একে সযত্নে আগলে রাখে। স্যাঁতসেঁতে নয় এমন উঁচু ভূমি এবং যেখানে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পৌঁছায়, এমন স্থানে বাসক সবচেয়ে ভালো জন্মায়। বাসকের বংশবিস্তার প্রক্রিয়া অত্যন্ত সহজ এবং সাশ্রয়ী। এই উদ্ভিদটি মূলত কর্তিত কাণ্ড (Stem Cutting) বা কাটিংয়ের মাধ্যমে সহজেই বংশবৃদ্ধি করতে পারে।
- সুবিধা: বীজের চেয়ে কাটিং পদ্ধতিতে চারা দ্রুত বড় হয় এবং এর সাফল্যের হারও অনেক বেশি। বেড়া হিসেবে ব্যবহারের জন্য সারিবদ্ধভাবে এর ডাল রোপণ করলে তা কয়েক মাসের মধ্যেই ঘন ঝোপালো রূপ নেয়।
- পদ্ধতি: পরিপক্ক গাছের ডাল কেটে নরম বা আধা-নরম মাটিতে পুঁতে দিলেই কয়েক দিনের মধ্যে নতুন কুঁড়ি বের হতে শুরু করে।
বিস্তৃতি:
বাসক মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি অতি পরিচিত এবং ব্যাপকভাবে বিস্তৃত উদ্ভিদ। ভৌগোলিকভাবে এর অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম এবং মালয়েশিয়া জুড়ে প্রাকৃতিকভাবেই এই উদ্ভিদটি জন্মায়। বিশেষ করে ভারতের প্রায় সব প্রদেশে এবং সব ধরনের জলবায়ুতেই বাসক অত্যন্ত সহজলভ্য। বাংলাদেশে এটি কেবল একটি গাছ নয়, বরং গ্রামীণ জনপদের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি বাংলাদেশের সমগ্র এলাকায় অত্যন্ত পরিচিত এবং সাধারণ একটি উদ্ভিদ হিসেবে বিস্তৃত। দেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—সর্বত্রই বাড়ির আঙিনায় কিংবা রাস্তার ধারে ঝোপালো এই চিরসবুজ গাছটি দেখা যায়, যা আমাদের জীববৈচিত্র্য ও ভেষজ ঐতিহ্যের এক শক্তিশালী প্রতীক।
বাসকের ব্যবহার ও গুরুত্ব:
শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন জটিলতা, বিশেষ করে ব্রঙ্কিয়াল সমস্যা এবং বক্ষব্যাধিতে ব্যবহৃত বিশ্ববিখ্যাত ঔষধ ‘ভাসাকা’-র প্রধান উৎস হলো বাসকের তাজা ও শুকনো পাতার নির্যাস। এছাড়া সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা থেকে শুরু করে ডায়রিয়া, আমাশয় এবং জটিল গ্ল্যানডুলার টিউমারের চিকিৎসায় এই উদ্ভিদের কার্যকর ব্যবহার দেখা যায়। ঘরের মাছি দূর করার জন্য এটি একটি চমৎকার প্রাকৃতিক সমাধান; বাসক পাতার নির্যাসের সাথে ৪:১ অনুপাতে চিনির মিশ্রণ ব্যবহার করে খুব সহজেই ঘরকে মাছিমুক্ত রাখা সম্ভব।
বাসকের ঔষধি গুণ কেবল আধুনিক বিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, বিশেষ করে গারো আদিবাসীদের চিকিৎসা পদ্ধতিতে এটি এক অপরিহার্য উপাদান। গারো জনগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে সর্দি, কাশি, প্রচণ্ড ঠান্ডা এবং শ্বাসকষ্ট নিরাময়ে বাসক পাতার ক্বাথ (Decoction) ব্যবহার করে আসছে। শুধু তাই নয়, তাদের লোকজ চিকিৎসায় যক্ষ্মা, কুষ্ঠরোগ, অর্শ (Piles) এবং বিভিন্ন ধরনের পেটের পীড়া সারাতেও বাসক পাতার ক্বাথ অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে ব্যবহৃত হয়।[১]
প্রথমেই বলে রাখি বাসক, নিম প্রভৃতি কয়েকটি ভেষজকে কাঁচা ব্যবহার করতেই বলা হয়েছে; তবে হাওয়ায় শুকিয়ে নিলে একই গুণ পাওয়া যায়।
১. অম্লপিত্ত রোগে: অতিরিক্ত অ্যাসিডিটি বা অম্লপিত্ত বর্তমানে একটি সাধারণ সমস্যা, যা দীর্ঘস্থায়ী হলে স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। প্রচলিত ভেষজ চিকিৎসায়, অম্লপিত্তের সমস্যা ব্যবস্থাপনায় বাসক গাছের ছাল একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
- ব্যবহার পদ্ধতি: ঐতিহ্যগত পদ্ধতি অনুসারে, বাসকের ছাল পানিতে ফুটিয়ে ক্বাথ তৈরি করা হয় এবং এটি নিয়মিত সেবনে অ্যাসিডিটি ও পেটের গ্যাসজনিত সমস্যায় আরাম পাওয়া যেতে পারে।
- সতর্কতা: যেকোনো ভেষজ প্রতিকার বা ক্বাথ সেবনের আগে, বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার ক্ষেত্রে, একজন পেশাদার ভেষজ চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। এটি অন্য কোনো চিকিৎসার সাথে প্রতিক্রিয়া ঘটাতে পারে বা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে উপযুক্ত নাও হতে পারে।
২. ক্রিমিতে: অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বা দূষিত পানির কারণে পেটে কৃমির উপদ্রব একটি সাধারণ সমস্যা। কৃমি দমনে রাসায়নিক ঔষধের বিকল্প হিসেবে বাসক গাছের ছালের ক্বাথ অত্যন্ত কার্যকরী একটি প্রাকৃতিক সমাধান। প্রাচীন আয়ুর্বেদ ও লোকজ চিকিৎসায় এর ব্যবহার যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।
- সেবন পদ্ধতি ও কার্যকারিতা: আগে উল্লেখিত অম্লপিত্ত রোগের ক্বাথ তৈরির পদ্ধতি অনুসরণ করেই বাসক ছালের রস বা ক্বাথ তৈরি করতে হয়। বয়স এবং শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় এই ক্বাথ সেবন করলে পেটের ক্ষতিকর কৃমি মরে যায় এবং পরিপাকতন্ত্র পরিষ্কার হয়। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে মাত্রা নির্ধারণে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
৩. রক্তশ্রুতিতে: শরীরের বিভিন্ন অংশ দিয়ে অস্বাভাবিক রক্তপাত বা রক্তপিত্তজনিত সমস্যা সমাধানে বাসক একটি অনন্য ভেষজ হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণে এর কার্যকারিতা প্রাচীন কাল থেকেই স্বীকৃত।
- প্রস্তুত ও সেবন প্রণালী:
রক্তস্রাব বন্ধ করতে সাধারণত ১০ থেকে ১১ গ্রাম পরিমাণ বাসক গাছের টাটকা ছাল এবং পাতা একত্রে নিয়ে পর্যাপ্ত পানিতে সিদ্ধ করতে হয়। ক্বাথটি ঘন হয়ে এলে তাতে সামান্য চিনি বা মিছরির সিরাপ মিশিয়ে পান করলে দ্রুত উপকার পাওয়া যায়। এই মিশ্রণটি শরীরের রক্ত সংবহনতন্ত্রকে শান্ত করতে এবং রক্তক্ষরণ কমাতে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
৪. শ্বাসরোগ: শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানি রোগের চিকিৎসায় বাসক একটি ধন্বন্তরি ভেষজ হিসেবে পরিচিত। রোগটি নতুন হোক বা দীর্ঘদিনের পুরনো—বাসক পাতার ক্বাথ নিয়মমতো সেবন করলে শ্বাসের উপদ্রব দ্রুত প্রশমিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শ্বাসকষ্টের রোগীদের শরীরে একই সাথে একজিমা বা চর্মরোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র মতে, রক্তদূষণ বা ‘রক্তদৃষ্টি’র প্রভাবে এই দুটি সমস্যা অনেক সময় একই সাথে দেখা দেয়। বাসক পাতার ক্বাথ নিয়মিত সেবনে শরীরের অভ্যন্তরীণ রক্ত পরিষ্কার হয়, ফলে শ্বাসকষ্ট কমার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট চর্মরোগ বা একজিমার তীব্রতাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
৫. হাঁপের টানে: তীব্র শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানির টান (Asthma Attack) উপশম করতে বাসক পাতার ব্যবহার অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। যখন রোগী প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টে ভোগেন, তখন তাৎক্ষণিক স্বস্তির জন্য বাসক পাতার ধোঁয়া গ্রহণ করার একটি প্রাচীন পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে।
- ব্যবহার পদ্ধতি: বাসকের শুকনো পাতা ব্যবহার করে চুরুট বা বিড়ির মতো তৈরি করে সেটি জ্বালিয়ে তার ধোঁয়া টানলে ফুসফুসের শ্বাসনালী দ্রুত প্রসারিত হয়। অনেকে এটি কলকেতে সেজেও ধূমপান করেন। বাসকের এই ধোঁয়া শ্বাসনালীর জমাট বাঁধা কফ শিথিল করতে এবং হাঁপানির তীব্র টান কমাতে সাহায্য করে। এটি একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পদ্ধতি যা প্রাচীনকাল থেকেই গ্রামীণ চিকিৎসায় অত্যন্ত কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত।
৬. শরীরের দুর্গন্ধ দূর করতে: শরীরের নির্দিষ্ট কিছু স্থানে ঘাম জমে দুর্গন্ধ হওয়া অনেকের জন্যই একটি বিব্রতকর সমস্যা। বিশেষ করে বগল বা শরীরের ভাজে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ফলে এই তীব্র দুর্গন্ধ তৈরি হয়। বাজারচলতি কেমিক্যালযুক্ত ডিওডোরেন্ট বা বডি স্প্রে সাময়িকভাবে গন্ধ ঢাকলেও তা স্থায়ী সমাধান দেয় না এবং অনেক সময় ত্বকের ক্ষতি করে। এই সমস্যার এক চমৎকার প্রাকৃতিক সমাধান হলো বাসক পাতার রস।
- ব্যবহারের সহজ পদ্ধতি: যাদের গায়ের বিশেষ কোনো স্থানে ঘামে তীব্র দুর্গন্ধ হওয়ার প্রবণতা আছে, তারা গোসলের অন্তত ২০-৩০ মিনিট আগে টাটকা বাসক পাতার রস সেই নির্দিষ্ট স্থানে ভালো করে লাগিয়ে নিন। বাসক পাতার রসে থাকা প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী জীবাণু ধ্বংস করতে সাহায্য করে। নিয়মিত কয়েকদিন এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই শরীরের স্বাভাবিক সতেজতা ফিরে আসে এবং ঘামের অস্বস্তিকর গন্ধ হওয়া চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
৭. গায়ের রং ফর্সা করতে: উজ্জ্বল ও লাবণ্যময় ত্বক পেতে আমরা কত না রাসায়নিক প্রসাধন ব্যবহার করি। কিন্তু প্রকৃতির ভাণ্ডারে থাকা বাসক পাতা আপনার শ্যামবর্ণ ত্বকেও এনে দিতে পারে এক নতুন দ্যুতি। প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী, ত্বকের হারানো উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনতে বাসক পাতা এক জাদুকরী ভূমিকা পালন করে।
- ব্যবহার পদ্ধতি: গায়ের রঙ উজ্জ্বল ও ফর্সা করতে প্রথমে বাসক পাতার টাটকা রস সংগ্রহ করুন। এরপর সেই রসের সাথে খুব সামান্য পরিমাণ (দুই-এক টিপ) শঙ্খ ভষ্ম ভালোভাবে মিশিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করুন। প্রতিদিন গোসলের অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে এই প্রাকৃতিক মিশ্রণটি পুরো শরীরে বা আক্রান্ত স্থানে ভালোভাবে প্রলেপ দিন। নিয়মিত ব্যবহারে এটি ত্বকের কালচে ভাব দূর করে এবং শ্যামবর্ণ ত্বকে এক ধরনের সতেজ ও উজ্জ্বল ভাব ফুটিয়ে তোলে। এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক হওয়ায় ত্বকের কোনো ক্ষতি হওয়ার ভয় থাকে না।
৮. বসন্তের সংক্রমণে: বসন্ত রোগের (যেমন—স্মলপক্স বা চিকেনপক্স) প্রাদুর্ভাব যখন কোনো এলাকায় মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সংক্রমণ থেকে বাঁচতে বাসক পাতা এক অনন্য প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্র মতে, বাসক পাতার এমন এক বিশেষ ‘দ্রব্যশক্তি’ রয়েছে যা কেবল রোগের উপসর্গই কমায় না, বরং শরীরে রোগের সংক্রমণ ঘটার মূল কারণগুলোকেও প্রতিহত করে।
- প্রতিরোধমূলক ব্যবহারের নিয়ম: বসন্তের হাত থেকে সুরক্ষা পেতে হলে প্রথমে বাসক পাতা ভালোভাবে সিদ্ধ করে তার জল বা নির্যাস তৈরি করে নিতে হয়। এই নির্যাসটি প্রতিদিনের পানীয় জলের সঙ্গে সামান্য পরিমাণে মিশিয়ে নিয়মিত পান করলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এটি শরীরকে ভেতর থেকে জীবাণুমুক্ত রাখতে সাহায্য করে, ফলে ওই এলাকায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লেও আক্রান্ত হওয়ার ভয় অনেকটা কমে যায়। যারা প্রাকৃতিকভাবে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে চান, তাদের জন্য এটি একটি অতি প্রাচীন ও বিশ্বস্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
৯. জীবাণু নাশক: রাসায়নিক জীবাণুনাশক আবিষ্কারের বহু আগে থেকেই আমাদের পূর্বপুরুষেরা পানি বিশুদ্ধ করার জন্য প্রকৃতির ওপর নির্ভর করতেন। বাসক পাতা কেবল একটি ওষুধি গাছই নয়, এটি পানির ক্ষতিকারক ব্যাক্টেরিয়া ও জীবাণু ধ্বংস করার এক শক্তিশালী মাধ্যম।
- ব্যবহার পদ্ধতি: ১. পানির জীবাণুমুক্তকরণ: এক কলস পানিতে ৩ থেকে ৪টি টাটকা বাসক পাতা কুচি করে কেটে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখলে সেই পানি সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত ও পানযোগ্য হয়। এটি জরুরি সময়ে বা রাসায়নিক ফিল্টার না থাকলে পানি পানের এক দারুণ ঘরোয়া পদ্ধতি।
২. জলাশয় পরিষ্কারে: সেকালে পুকুর বা ডোবার পানি থেকে ক্ষতিকর পোকামাকড় ও জীবাণু দূর করতে প্রচুর পরিমাণে বাসক পাতা পানিতে ফেলা হতো। এটি পানির প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং জলজ পরিবেশকে স্বাস্থ্যকর রাখতে সাহায্য করে।
রাসায়নিক গঠন:
বাসক পাতার বিস্ময়কর নিরাময় ক্ষমতা কোনো অলৌকিক বিষয় নয়, বরং এর ভেতরে থাকা নির্দিষ্ট কিছু জৈব রাসায়নিক উপাদানের সম্মিলিত ফল। গবেষণায় দেখা গেছে, এই উদ্ভিদে মূলত তিনটি প্রধান সক্রিয় উপাদান বিদ্যমান যা সরাসরি আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময় প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়:
১. ভ্যাসিসিন (Vasicine):
এটি বাসকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ্যালকালয়েড। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটি একটি শক্তিশালী ‘ব্রঙ্কোডাইলেটর’ হিসেবে স্বীকৃত। এর প্রধান কাজ হলো শ্বাসনালীর পথ প্রশস্ত করা এবং জমে থাকা কফ তরল করে বের করে দেওয়া। মূলত এই উপাদানের উপস্থিতির কারণেই হাঁপানি বা ব্রঙ্কাইটিসের রোগীদের ক্ষেত্রে বাসক এত দ্রুত কাজ করে।
২. ১-পেগানিন (1-peganine):
এটি ভ্যাসিসিনের একটি বিশেষ রূপান্তর। এই উপাদানটি মূলত শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রদাহ কমাতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity) শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। রক্ত পরিষ্কার রাখতে এবং সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ১-পেগানিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৩. সামান্য পরিমাণ উদায়ী তেল (Small amount of essential oil):
বাসক পাতায় খুব সামান্য পরিমাণে উদ্বায়ী বা এসেনশিয়াল অয়েল থাকে। এই তেলের রয়েছে শক্তিশালী অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টি-সেপটিক গুণ। মূলত এই তেলের উপস্থিতির কারণেই বাসক পাতা ভেজানো পানি জীবাণুমুক্ত হয় এবং ঘরোয়া পরিবেশে মাছি বা ক্ষতিকর পতঙ্গ তাড়াতে এটি কার্যকর প্রভাব ফেলে।
এই প্রাকৃতিক রাসায়নিক উপাদানগুলোর সঠিক অনুপাতই বাসককে যক্ষ্মা, হাঁপানি এবং বিবিধ চর্মরোগের মহৌষধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। [২]
সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।
অন্যান্য তথ্য:
বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষে (আগস্ট ২০১০) বাসক প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র সংকেটর কারণ নেই এবং এটি বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় আশংকা মুক্ত (lc)। এটি বাংলাদেশে সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি এবং শীঘ্র সংরক্ষণের পদক্ষেপ নিষ্প্রয়োজন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: সাদা ফুলের বাসিক ছাড়াও অপেক্ষাকৃত নবীন বনৌষধির নিঘণ্ট গ্রন্থে তাম্রপুষ্পী বাসকের উল্লেখ দেখা যায়; এর ফুলগুলি হলুদভাব রক্তবর্ণ; এটির বোটানিকাল নাম Phlogacanthus thyrsiformis Nees. এদের ফ্যামিলি একান্থাসি।
তথ্যসূত্র:
১. মমতাজ বেগম, (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ৬ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ৩৮। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
২. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা, ১৩৭।
বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিপিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Vinayaraj
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।