আর্জরা বাংলাদেশ ভারতের অরণ্য অঞ্চলে জন্মানো বিপন্ন গুল্ম

আর্জরা

বৈজ্ঞানিক নাম: Phyllanthus roxburghi Muell. সমনাম: Phyllanthus tetrandrus Roxb. (1832), Reidia tetrandra (Roxb.) Das (1940).  স্থানীয় নাম: আর্জুরা, আর্জরা।

আর্জরা হলো বাংলাদেশ ও ভারতের বনাঞ্চলে পাওয়া যাওয়া একটি বিপন্ন প্রজাতির গুল্ম। এর ডালপালা বেশ সরু ও গোলাকার, যার গায়ে মরচে রঙের ছোট ছোট রোম দেখা যায়। এই উদ্ভিদের পাতাগুলো একান্তভাবে সাজানো এবং এর উপপত্রগুলো দ্রুত ঝরে পড়ে।

পাতার গঠন বেশ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ—এটি দেখতে অনেকটা তুরপুন বা ভল্লাকারের মতো, যার দৈর্ঘ্য ৪-৮ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থ ২-৪ সেন্টিমিটার। পাতার অগ্রভাগ বেশ সূক্ষ্ম এবং গোড়ার দিকটা গোলাকার বা কিছুটা কাটা থাকে। পাতার উপরের দিকটা মসৃণ ও গাঢ় সবুজ হলেও নিচের দিকটা অনেকটা ফ্যাকাশে রঙের। এছাড়া পাতায় ৭-১০ জোড়া সরু শিরা দেখা যায়। এই গুল্মের অন্যতম সৌন্দর্য হলো এর লাল ফুল, যা পাতার কক্ষে ঘন গুচ্ছাকারে অথবা শাখার একদম মাথায় ফুটে থাকে।

আর্জরা গুল্মের পুংপুষ্প ও স্ত্রীপুষ্পের গঠন বেশ চমৎকার। এর পুংপুষ্পের বৃন্ত প্রায় ৫ মিলিমিটার লম্বা এবং চুলের মতো সূক্ষ্ম বা কৈশিক হয়ে থাকে। এর বৃত্যংশগুলো অনেকটা পাখির পালকের মতো সূক্ষ্মভাবে খণ্ডিত এবং চাকতিগ্রন্থিগুলো দুই ভাগে বিভক্ত ও দেখতে বৃক্কাকার (কিডনি আকৃতির)।

অন্যদিকে, এর স্ত্রীপুষ্পগুলো সরু শাখার একদম প্রান্তে জন্মায়। এগুলোও বৃন্তযুক্ত এবং কৈশিক প্রকৃতির। স্ত্রীপুষ্পের বৃত্যংশগুলো দপ্তরের মতো বিন্যস্ত এবং এর চাকতিগ্রন্থিগুলো পুংগ্রন্থির তুলনায় আকারে কিছুটা দীর্ঘ হয়। উদ্ভিদের গর্ভাশয়টি বেশ মসৃণ।

এই গুল্মের ফল দেখতে অনেকটা ক্যাপসিউলের মতো, যার ব্যাস প্রায় ৬ মিলিমিটার। ফলগুলো কিছুটা চাপা ও তিন খণ্ডে বিভক্ত থাকে এবং এর বাইরের আবরণ (কক্কি) বেশ পাতলা। ফলের ভেতরে থাকা বীজগুলো আকৃতিতে ত্রিকোণাকার হয়ে থাকে।

চাষাবাদ ও বংশবিস্তার

আর্জরা সাধারণত বনের কিনারায় বা অরণ্যের ধারে জন্মাতে দেখা যায়। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে এর সৌন্দর্য পূর্ণতা পায়—সাধারণত মার্চ থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত এই উদ্ভিদে ফুল ও ফল দেখা যায়। এই গুল্মের বংশবিস্তার মূলত এর বীজের মাধ্যমে ঘটে, যা থেকে নতুন চারা জন্মায়।

বিস্তৃতি: ভারত। বাংলাদেশের সিলেট জেলায় সীমাবদ্ধ (Alam, 1988)।

অন্যান্য তথ্য

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৭ম খণ্ড (আগস্ট ২০১০) অনুযায়ী, আবাসন ধ্বংসের কারণে আর্জরা প্রজাতিটি বর্তমানে চরম হুমকির মুখে এবং বাংলাদেশে এটি বিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশে এই উদ্ভিদটি সংরক্ষণে এখন পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রজাতিটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে এর প্রাকৃতিকভাবে টিকে থাকা স্থানগুলো খুঁজে বের করা জরুরি। একইসঙ্গে এর প্রাকৃতিক আবাসস্থলগুলো চিহ্নিত করে যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

 তথ্যসূত্র

১. রহমান, এম অলিউর (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”  আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ৭ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ৪৭৯-৪৮০। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

Leave a Comment

error: Content is protected !!