আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > প্রাণ > উদ্ভিদ > গুল্ম > ছোলার তৈরি খাবার ও ছোলার কুড়িটি ঔষধি গুণাগুণ

ছোলার তৈরি খাবার ও ছোলার কুড়িটি ঔষধি গুণাগুণ

ছোলা (বৈজ্ঞানিক নাম: Cicer arietinum) লেগুমিনোসি বা কলাই পরিবারের বর্ষজীবী গাছ, ছোট ক্ষুপ জাতীয় ওষধি। বহু ক্ষুদ্র অথচ নরম শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট, পত্র পক্ষাকার ও সোজা ১ থেকে ১২ ইঞ্চি লম্বা দাঁতযুক্ত, পুষ্পদণ্ড ৭ ইঞ্চি, শুটি ছোট ও বেটে, লম্বা ১ ইঞ্চি, প্রত্যেক শুটিতে সাধারণত একটি বীজ থাকে। কখনও কখনও দুটিও দেখা যায়, মার্চ মাসে ফল ও জুন মাসে ফল হয়।[১] ছোলা সাধারণত বাজারে দু ধরনের দেখতে পাওয়া যায় কালো রঙের দেশী ছোলা ও সাদা রঙের বড় বড় কাবুলি ছোলা।[২]

ছোলার বহু গুণ:

ছোলায় আছে বাজীকরণের গুণ। আযুর্বেদ মতে, ছোলা লঘু, উষ্ণবীর্য বা শরীর গরম করে- কড়া, বল ও বায়ুবর্ধক। শ্বাস, কাশি, কফ ও রক্তপিত্ত উপশম করে। প্রতিদিন সকালে ভিজে ছোলার জল বা অঙ্কুরিত ছোলা আদা নুন দিয়ে খেলে পিত্তের বিকায়, পিত্তের জন্যে যে জ্বর হয় সেই জ্বর, সারে। শুকনো ছোলা ভাজা রুক্ষ, বায়ুর প্রকোপ করে, কফ ও শৈত্য নাশ করে[২]

কাঁচা সবুজ ছোলা ভাজা গুরুপাক ও শরীরের বল বৃদ্ধি করে। ছোলা ভাজার শুকনো ছাল ছাড়িয়ে ছোলার ডাল তৈরি করা হয়। ছোলার ডাল পিষে বেসন তৈরি করা হয়। বেসন দিয়ে কত বিবিধ রকমের নোনতা খাবার, তেলে ভাজা বেগুনি থেকে আরম্ভ করে ডালমোট বা চানাচুরের কাঠি ভাজা পর্যন্ত তৈরি করা হয় সে তো সকলেরই জানা। মিষ্টিও তৈরি হয় নানা রকম- পেস্তা বাদাম এলাচ গুঁড়ো ইত্যাদি মিশিয়ে ঘিয়ে ভাজা ও চিনি মেশানো বেসন দিয়ে তৈরি করা হয় না। বেসন দিয়ে তৈরি করা হয় বোঁদে, মিহিদানা, মতিচুরের লাড়ু।[২]

ছোলা খেলে কফ ও পিত্তের অসুখে উপকার হয়। ছোলার আছে জ্বরনাশ করবার ক্ষমতা। জলে ভেজানো অঙ্কুরিত ছোলায় আছে ভিটামিন বি। কচি ছোলার শাকে আছে ভিটামিন বি ও সি। ছোলায় আছে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন। এতে আছে চুনের তত্ত্ব- যা মানুষের শক্তি বাড়িয়ে দেয় এবং শরীরের গঠন মজবুত করে। যাঁরা পুষ্টিকর পদার্থ খেতে পারেন না তারা অপেক্ষাকৃত সস্তা ছোলা খেলে শরীরের পুষ্টি অর্জন করতে পারবেন।

আরও বলা হয় ছোলা শীতল, রুক্ষ, হালকা, কষায়, মলরোধক ও বায়ুকারক। পিত্ত, রক্তবিকার কফ ও জ্বরে আরোগ্য করে। শুকনো খোলায় ভাজা ছোলা গরম, রুচিকর, শুক্রবর্ধক এবং শরীরের তেজ বৃদ্ধি করে। বসন্তকালে ছোলা খেলে কফের কষ্ট দূর হয়। কাঁচা সবুজ ছোলা কোমল, রুচি বৃদ্ধি করে, শীতল, কষায়, বায়ুকারক, মলরোধ করে, বীর্য হ্রাস করে, হালকা, কফ ও পিত্ত দূর করে।

আরো পড়ুন:  চাকুন্দার ঔষধি গুণাগুণ

রান্না করা ছোলার ডাল বেশি খেলে পেটের গোলমাল হয়। অবাঙালিরা যে বেসনের বড়ি খান তা রুচি বৃদ্ধি করে, মলরোধ করে, শরীরে বল দেয় আর পুষ্টিকর। ছোলার শাক অল্প, কষায়, অন্ত্রসংকোচক, দাঁত ও মাড়ির ফোলা কমিয়ে দেয়।

রোগ প্রতিকারে ছোলা:

১. রক্তপিত্তে: এর ভয়ঙ্কর রূপ দেখা দিলেও শুধু ছোলার (খোসা সহ সিদ্ধ) যুষ বার বার প্রয়োগ করলে সেটা উপশমিত হয়। পরিমাণ হলো ছোলা ২৫ গ্রাম পূর্বদিন রাত্রে ভিজিয়ে রেখে পরদিন তাকে অন্তত ৩ থেকে ৪ কাপ জলে সিদ্ধ করতে হবে; ওগুলি বেশ সিদ্ধ হয়ে ফেটে গেলে সেটা ছেকে, সেই জলটা সমস্তদিনে ৩/৪ বারে খেতে হবে।

২. দাহ রোগে: ছোলা ভিজানো জল খাওয়া অভ্যেস করলে সেটা সেরে যাবে।

৩. মেহ রোগে: প্রস্রাব করার সময় জ্বালা করে; অথবা পূজের মতো স্রাব হয়, এবং তার সঙ্গে জ্বালাও থাকে, তারা নিত্য ছোলা ভিজানো জল খাবেন, অথবা ছোলা সিদ্ধ করে তার যুষও খেতে পারেন। এর দ্বারা উপশম হবে, (অবশ্য শ্লেষ্মার বিকার থাকলে নয়)।

৪. গায়ের রং: পেটের দোষে যাঁদের গায়ের রং নষ্ট হয়ে গিয়েছে, তাঁরা ছোলা ভিজানো জল অথবা ছোলা সিদ্ধ যুষ খেয়ে দেখুন। ত্বক শুষ্ক থাকলে বেসনের সঙ্গে টক দই মিশিয়ে মালিশ করুন- চামড়া চকচক করবে। বেসনে ঘি মিশিয়ে শরীরে মালিশ করলে শরীর গৌরবর্ণ হয়। চেহারা তেজস্বী হয়। মুখে বেসনের মালিশ করলে মুখের কালো ছোপ দূর হয়ে গিয়ে ত্বক নরম ও কোমল হয়।

৫. জ্বর হলে:  সিদ্ধ ছোলার ডালের উপরকার পাতলা জল বিশেষ উপকারী। যদি অগ্নিমান্দ্যের জন্য অতিসার (পেটের দোষ) না থাকে।

৬. কৃশতায়: যাঁদের শরীর শিশুকাল থেকেই কৃশ, তাঁরা রোজ বাসি জলে ১০ থেকে ১২ গ্রাম ছোলা ভিজিয়ে অন্ততঃ ২৪ ঘণ্টা রেখে, ওটা ছেকে সেই জলটা সকালের দিকে খাবেন, এর দ্বারা কৃশতা কমে যাবে।

৭. বলহানি হতে থাকলে: যাঁদের শরীরের বল আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে, তাঁরা ছোলার ছাতু অল্প অল্প করে খাওয়ার অভ্যাস করুন।

আবার অন্য কোনো ওষুধ না পাওয়া গেলে এক মুঠো শুকনো ছোলা ভাজা খেয়ে এক গ্লাস গরম জল পান করলেও নির্বলতা অর্থাৎ পুরুষদের ধাতুক্ষীণতা দূর হয়।

আরো পড়ুন:  মটরশুঁটি হচ্ছে কলাই বা ডাল জাতীয় খাদ্যশস্য

৮. মাড়ী ফুলোয়: যাঁদের দাঁতের গোড়া মাঝে মাঝে ফুলে যায়, তাঁরা ছোলা সিদ্ধ যুষ দিয়ে কুলকুচি করে দেখবেন, ওটা কমে যাবে, তবে কারণটা যদি উর্ধ্ব শ্লেষ্মাজনিত হয় তা হলে তাঁর উচিত বাসক পাতার রস ৪ থেকে ৫ চামচ একটু গরম করে প্রত্যহ সকালে খাওয়া।

৯. শ্বাস: রোগের প্রথমাবস্থায় সকাল বা সন্ধ্যার দিকে একটু বুকে চাপ বোধ হতে থাকে, সেক্ষেত্রে খোসা সমেত ছোলা অন্ততঃ ১০ গ্রাম সিদ্ধ করে সেই জল অনন্তঃ এক কাপ করে খাওয়ার অভ্যাস করুন।

১০. ব্রণ ও মেসতা: ছোলা ভিজিয়ে তাকে বেটে সেটা মুখে মেখে দেখুন, ওটা কমে যাবে।

১১. অজীর্ণ রোগে: প্রায়ই চোঁরা ঢেকুর ওঠে, দাঁত ভালো পরিষ্কার হয় না, মাঝে মাঝে বুকও জ্বালা করে, তারা ৪ থেকে ৫ গ্রাম ছোলা শাক ভাল করে বেটে, আধ গ্রাম আন্দাজ বিট লবণ মিশিয়ে খেতে দিয়ে থাকেন বিহার অঞ্চলের গ্রাম্য বৈদ্যরা।

১২. শূল ব্যথায়:  অজীর্ণ রোগের সঙ্গে যদি শূল ব্যথাও থাকে, তা হলেও শাক বাটা ও বিট লবণ মিশিয়ে খেলেও কাজ হবে। আবার গরম গরম ছোলা ভাজা খেলে অর্শ থেকে রক্তস্রাব বন্ধ হয়। গুড়ের গরম রসে শুকনো ছোলা ভাজার খোসা মিশিয়ে বাঁধলে মচকানির ব্যথা উপশম হয়।

১৩. কফ ও কাশিতে: রাতে শুতে যাওয়ার আগে শুকনো ছোলা ভাজা খেলে পরে এক গ্লাস দুধ খেলে শ্বাসনালিকায় জমে থাকা কফ একত্রিত হয়ে সকালবেলা বেরিয়ে যায়। রাতে শুতে যাওয়ার আগে একটু ছোলা ভাজা খেয়ে জল খেলে কাশি অনেক সময় কমে। গরম গরম ছোলা ভাজা শুকলে সর্দি সেরে যায়।

ছোলার দানা, আলোকচিত্র: Biswarup Ganguly, CC-BY-3.0

১৪. গলা বসায়: শুতে যাওয়ার আগে ছোলা ভাজা খেলে এবং তারপরে গরম জল খেলে গলা বসে যাওয়া সেরে গিয়ে গলার আওয়াজ পরিষ্কার হয়। ছোলার সঙ্গে গুড় মিশিয়ে খেলে গলার স্বর সুরেলা হয়।

১৫. কৃমিজনিত পেটব্যথায়: বেশি মিষ্টি খেলে অন্ত্রে ছোট ছোট কৃমি জন্মায় আর ভীষণ পেট ব্যথা করে, পেট কামড়ায়। এই রোগে যাঁরা ভুগছেন তাঁরা যদি এক মুঠো ছোলা ভিনিগারে ভিজিয়ে রেখে সকালবেলা খালি পেটে খেয়ে নেন তাহলে কৃমি মরে যাবে আর পেট ব্যথাও কমবে।

১৬. চুলকানি ফুসকুড়িতে এছাড়া ছোলার বেসন জলে গুলে শরীরে মালিশ করে তারপর স্নান করলে ঘামের দুর্গন্ধ দূর হয়। ত্বক পরিষ্কার হয়, চুলকুনি সারে। বেসন জলে গুলে মেখে ধুয়ে ফেললে মাথার চুলকুনি ও ফুস্কুড়ি সেরে যাবে।

আরো পড়ুন:  মুগ ডাল সহজ, সস্তা ও পুষ্টিকর খাদ্যশস্য

১৭. অন্ডকোষের স্ফীতি: বেসনে জলে গুলে মধু মিশিয়ে লাগালে পুরুষদের অন্ডকোষের স্ফীতি বা ফুলে ওঠা কমে।

১৮. ভিটামিন সাবান: ছোলা বা মটর ডালের বেসন জলে গুলে সাবানের মত গায়ে মাখার রেওয়াজ ছিল; এর দ্বারা ত্বকের লাবণ্য রক্ষা পায় আর গায়ের ময়লাও কাটে; এখনও বহু প্রদেশে কোনো কোনো প্রাচীন বাসিন্দা যাঁরা, তাঁদের মধ্যে প্রচলিত।

১৯. পেটের সমস্যায়: বয়স হয়েছে, সকালে দাস্ত অপরিষ্কারে অস্বস্তি, পেটে বায়ু, রাত্রে যেটাই খাওয়া যাক না কেন, কোনোটাতেই এসব অসুবিধে যায় না, সেক্ষেত্রে ছোলার বেসন গুলে ওমলেটের মতো তৈরী করে রাত্রির খেতে হবে, তবে মুখরোচক ও গুনোৎকর্ষ করার জন্য দুটো যোয়ান ও পরিমাণ মতো একটু বিট লবণ মিশিয়ে ওটা তৈরী করতে হবে; কিন্তু তরকারী বেশী খাবেন না।

ছোলার অপকারিতা:

ছোলা খাওয়ার কিছু অপকারিতাও আছে। ছোলা কুষ্ঠের প্রকোপ ও পাথুরি রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি করে। যাঁরা এই সব অসুখে ভুগছেন তাঁদের ছোলা না খাওয়াই ভাল। বেশি ছোলা খেলে পেটে বায়ু হয়। ছোলা রুক্ষ, মলাবরোধ করে। সেইজন্যে আহারে ছোলার পরিমাণ যাতে বেশি না হয়ে যায় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

হাকিমি বা ইউনানি মতে ছোলা খুব বেশি কামোত্তেজক ও পুষ্টিকরও বটে। ঘোড়া বা অশ্বের মধ্যে কামশক্তির খুব আধিক্য। ধাতুক্ষীণতা দূর করে শুক্র বৃদ্ধি করে যে ওষুধ তাকে বাজীকরণ বলা হয়। ছোলায় আছে উত্তম বাজীকরণের গুণ। সব দিক দিয়ে বিচার করে দেখা যাচ্ছে ছোলার গুণের পাল্লাটাই যেন বেশি। দোষ গুণ যাই হোক সত্যি ছোলার ডালের তুলনা নেই।

ছোলার রাসায়নিক গঠন:

(a) Acids viz., oxalic acid, malic acid, acetic acid and other acids.

(b) Amino acids viz., arginine, tyrosine, lycine, cystine, typtophane

(c) Carotenoids.

(d) Oil soluble vitamin viz., vitamins A, D and E.

(e) Other constituents viz, lecithin, phytin, saponin, biochanin A, biochanin B and biochanin C.

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা,২৩৫-২৩৭।

২. সাধনা মুখোপাধ্যায়: সুস্থ থাকতে খাওয়া দাওয়ায় শাকসবজি মশলাপাতি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, নতুন সংস্করণ ২০০৯-২০১০, পৃষ্ঠা, ৬৭-৬৮।

Dolon Prova
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত প্রথম কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page