হলুদের ২২টি ভেষজ গুণাগুণ, উপকারিতা ও ব্যবহার পদ্ধতি

হলুদের বোটানিক্যাল নাম Curcuma longa Linn, একে বর্তমানে Curcuma domestica Valeton বলাও হয়, ফ্যামিলি zingiberaceae. প্রাচীনকাল থেকেই ঘরোয়া ওষুধ হিসেবে হলুদ বা হরিদ্রা ব্যবহার করা হয়ে আসছে। প্রতিদিনের ডাল-তরকারি-ছেঁচকি-শাকে হলুদ রং আনতে রান্নায় হলুদ ব্যবহার করা হয়। হলুদ দিলে শুধু রং নয় খাবারের স্বাদও একটু বাড়ে।

হলুদ কফ, বাত, পিত্ত (ত্রিদোষ), রক্তদাষ, কুষ্ঠ, ব্রণ, ত্বকের রোগ, শোথ, পাণ্ড, কৃমি, প্রমেহ, অরুচি ও বিষদোষ উপশম করে। উদর  বা পেটের রোগ  উদরী রোগ বা পেটে জল ভরা নিবারণ করে। নিম্নে হলুদের ২২টি উপকারিতা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

ঔষধি ব্যবহার:

১. খাদ্যে: নিত্য আহার্য ব্যঞ্জনের রং করার উদ্দেশ্যেই প্রধানত এটার যে ব্যবহার হয়েছে তা নয়; নিত্য সেবনের ব্যবস্থাও দেওয়া আছে শারীরিক প্রয়োজনে।।

২. উদ্ধর্তনে: পুর্বে শিশুদের মাঝে মাঝে ‘তেল হলুদ’ মাখিয়ে স্নান করানো হতো, এমন কি আমাদের গৃহপালিত পশুপক্ষীও বাদ যেতো না; ওদের মাখানোর উদ্দেশ্য কোনো রকম ব্যাকটিরিয়াল ইনফেকশন (Bacterial infection) যেনো না হয়, সাধারণতঃ যার দ্বারা চুলকণা, খোস, (পাচড়া) প্রভৃতি হয়ে থাকে। তা ছাড়া এর দ্বারা আরও একটি উদ্দেশ্য সাধিত হতো দেহের রংয়ের ঔজ্জ্বল্য বাড়ানো (বৃদ্ধি করা)।

এই জন্যই হলুদ আর একটি নাম “বর্ণ বিধায়িনী”; কিন্তু সে রীতি বর্তমানে উঠে যাচ্ছে, সেটা বেশি লক্ষ্য পড়ে বাংলায়। এখনো অনেকে ঝরা বয়সেও মসুর ডাল ও কাঁচা হলুদ বেটে দুধের সর মিশিয়ে মুখে হাতে মেখে থাকেন, মুখের লালিত্য কিছুটা বজায় রাখার প্রয়াসও বলা যায়।[১]

গায়ে হলুদ মেখে স্নান করলে শরীরে লাবণ্য ফুটে ওঠে সেইজন্যে বিয়ের আগে গায়ে হলুদের প্রথা- সেইজন্যেই হলুদের আর একটি নাম বরবণিনী।[২]

৩. প্রমেহ এবং ডায়াবেটিসে: এই প্রস্রাবের জ্বালার সঙ্গে পুজের মতো লালা ঝরলে, কাঁচা হলুদের রস ১ চামচ একটু মধু বা চিনি মিশিয়ে খেতে হয়। এমন কি এর দ্বারা অন্যান্য প্রকার মেহ রোগের উপশম হয়।[১]

হলুদের গাঁঠ পিষে, ঘিয়ে ভেজে, চিনি মিশিয়ে কিছুদিন রোজ নিয়মিত খেলে বা হলুদ পিষে আমলকির সঙ্গে খেলে প্রমেহ বা যৌনব্যাধি উপশম হয়।

এছাড়াও জণ্ডিস ও বহুমূত্র রোগে বা ডায়বেটিস সারাতে হলুদ বিশেষ উপকারী। হলুদের গাঁঠ পিষে, ঘিয়ে ভেজে, চিনি মিশিয়ে কিছুদিন রোজ নিয়মিত খেলে মধুমেহ বা ডায়বেটিস সারে।[২]

আরো পড়ুন:  শুঁঠ বা শুকনা আদায় আছে নানাবিধ উপকারিতা

৪. ক্রিমি: কাঁচা হলুদের রস ১৫ থেকে ২০ ফোঁটা (অবশ্য বয়স হিসেবে সামান্য লবণ মিশিয়ে সকালে খালি পেটে ব্যবহার করতে দিয়ে থাকেন গ্রামাঞ্চলের বৈদ্যগণ। এই জন্যই হলুদের একনাম কৃমিনাশকারী। কাঁচা হলুদ বাটা ও গুড় মিশিয়ে খাওয়ালে বাচ্চাদের কৃমি রোগ সেরে যাবে।

৫. যকৃৎ দোষ: পাণ্ডু রোগে ফ্যাকাসে রং আসছে বুঝলে হলুদের রস ৫ থেকে ১০ ফোঁটার মধ্যে  আরম্ভ করে (বয়স হিসেবে) এক চামচ পর্যন্ত (চা চামচ) একটু, চিনি বা মধু মিশিয়ে খাওয়ার ব্যবস্থা দিয়ে থাকেন প্রাচীন বৈদ্যগণ। আবার একটু হলুদ গুড়া তার দুগুণ পরিমাণ দইয়ে মিশিয়ে খেলে পিলের রোগ, জণ্ডিস, যকৃৎ বিকার বা লিভার খারাপ হওয়া উপশম হয়।

৬. তোতলানিতে (Stammering): ছোটবেলায় যাদের কথা আটকে যায় অর্থাৎ স্বাভাবিকভাবে দ্রুত কথা বলার অভ্যাসে, সে ক্ষেত্রে হলুদকে গুড়া করে (কাঁচা হলুদ শুকিয়ে গুঁড়ো করা চাই); এটা নিতে হবে ২ থেকে ৩ গ্রাম, সেটাকে ১ চা-চামচ আন্দাজ গাওয়া ঘিয়ে একটু ভেজে সেটাকে ২ থেকে ৩ বার অল্প অল্প করে চেটে খেতে হয়, এর দ্বারা তোতলামি কমে যায়; এসব খানদানী কবিরাজ গোষ্ঠীর ব্যবহারিক যোগ ।

৭. ফাইলেরিয়ায়: এই রোগটির আয়ুর্বেদিক নাম শ্লীপদ এক্ষেত্রে কাঁচা হলুদের রসে (১ চামচ আন্দাজ) অল্প গুড় ও ১ চামচ আন্দাজ গোমূত্র মিশিয়ে খেতে বলেছেন আমাদের প্রাচীন প্রামাণ্য গ্রন্থকার চক্রপাণি দত্ত। আমবাতেও তাঁর এই ব্যবস্থা।

৮. জ্বর ও হামজ্বরে: গরম দুধে হলুদ ও গোলমরিচ মিশিয়ে খেলে ঠাণ্ডা লাগার জন্যে যে জ্বর আসে তা কমে।[২]

কাঁচা হলুদকে শুকিয়ে গুড়ো করে সঙ্গে উচ্ছেপাতার রস ও অল্প মধু মিশিয়ে খাওয়ালে হামজ্বর সেরে যায়।[১]

৯. এলার্জিতে: খাদ্য বিশেষে অনেকের দেহ চাকা চাকা হয়ে ফুলে ওঠে, চুলকোয়, লাল হয় সেক্ষেত্রে নিমপাতার গুড়া ১ ভাগ, কাঁচা হলুদ শুকিয়ে গুড়া করে সেটা ২ ভাগ এবং শুষ্ক আমলকীর গুড়া ৩ ভাগ একসঙ্গে মিশিয়ে সেটা থেকে ১ গ্রাম (১৫ গ্রেণ) মাত্রায় সকালে খালি পেটে বেশ কিছু দিন খেতে হয়। ক্রিয়া আছে, প্রতিক্রিয়া নেই।

১০. পিপাসায়: পাঁচ/সাত গ্রাম কাঁচা হলুদ থেতো করে দেড় কাপ আন্দাজ জলে ৫ থেকে ১০ মিনিট সিদ্ধ করে ছেঁকে নিয়ে সেই জলে অল্প চিনি মিশিয়ে এক চামচ করে মাঝে মাঝে খেলে শ্লেমাজনিত পিপাসা চলে যায়।

আরো পড়ুন:  দারুচিনি বা দারচিনি খাওয়ার নানা ভেষজ উপকারিতা

১১. হাঁপানিতে: হলুদ গুড়া , আখের (ইক্ষ) গুঁড় আর খাঁটি সরষের তেল একসঙ্গে মিশিয়ে চাটলে একটু, উপশম হয়।

১২. চোখ উঠলে: হলুদ থেতো জলে চোখটা ধুলে আর ঐ রসে ছোপানো ন্যাকড়ায় চোখ মুছে ফেলতে হবে। এর দ্বারা চোখের লালও কাটে আর সারেও তাড়াতাড়ি।

১৩. জোঁক ধরলে: জোঁকের মুখে হলুদ বাটা বা হলুদ গুড়া দিলে জোঁকও ছাড়ে রক্তও বন্ধ হয়।

১৪. বিষাক্ত ক্ষত: বিশেষ করে কার্বাঙ্কল জাতীয় (অয়ুর্বেদিক ভাষায় ‘ব্লমিক স্ফোটক’) ফোড়ায় কাঁচা হলুদ বাটা অল্প গরম করে দিনে রাত্রে কয়েকবার লাগালে কয়েক দিনেই দূষিত পূজ পড়া বন্ধ হয়ে যায়।

১৫. মচকানো ব্যথায়: কোনো জায়গায় মচকে গেলে বা আঘাত লাগলে চুন, হলুদ ও নুন (লবণ) মিশিয়ে গরম করে লাগালে ব্যথা ও ফুলা দুই-ই কমে যায়। [১][২]

১৬. ফোড়ায়: পোড়া হলুদের ছাই জলে গুলে সেটা লাগালে ওটা পাকে ও ফেটে যায়। আবার গুড়া লাগালে শীঘ্র শুকিয়ে যায়।

১৭. স্বর ভঙ্গে:  কোনো সাধারণ কারণে গলা ধরে বা স্বর রুদ্ধ হয়ে গেলে ২ গ্রাম আন্দাজ হলুদের গুড়ের সরবৎ (চিনি মিশিয়ে) একটু গরম করে খেলে চমৎকার উপকার হয়।

আবার, গরম দুধে এক চিমটি হলুদ দিয়ে রাত্তিরে পান করলে স্বরভঙ্গ হলে উপকার পাওয়া যায় এবং গলা বসে যাওয়া বা বসে যাওয়া গলার আওয়াজ ঠিক হয়।

১৮. সর্দি ও শ্লেম্মাজনিত সমস্যা দূর করতে: হলুদ আগুনে পুড়িয়ে সেই ধোঁয়া নাকে শুকলে সর্দি শ্লেম্মা বেরিয়ে যায়। হলুদ দুধে সেদ্ধ করে বেটে চিনি মিশিয়ে খেলে সর্দি সারে। হলুদ আর দই গরম করে তাতে একটু নুন ও গুড় মিশিয়ে খাওয়ালে বাচ্চাদের সর্দি, কফ ও নানারকম অসুখ সারে।

হলুদের একটা টুকরো সেঁকে মুখে রাখলে সর্দি, কফ আর কাশিতে উপকার হয়। ভয়ঙ্কর কাশি সারে। খুব বেশি কাশির ঝোঁক হলে এক বাটি ঈষৎ উষ্ণ জলে এক চিমটি হলুদ মিশিয়ে ধীরে ধীরে পান করলে কাশির উপশম হয়।[২] 

১৯. ঋতুকালীন রোগ সারাতে: বসন্তকালে অর্থাৎ মাঘ, ফাগুন ও চৈত্র মাসে হলুদের রস মধুসহ সেবন করলে কলেরা, বসন্ত, জলবসন্ত, পেটের অসুখ হওয়ার আশঙ্কা কমে।

তেঁতুল পাতা আর হলুদ একসঙ্গে পিষে খেলে তা বসন্ত রোগের প্রতিষেধক বলে মনে করা হয়।  হলুদ আর খয়ের মিহি করে পিষে বসন্তের ঘায়ে লাগালে আরাম পাওয়া যায়।

আরো পড়ুন:  তেজপাতা ভেষজ গুণসম্পন্ন মশলাজাতীয় চিরহরিৎ বৃক্ষ

২০. পিত্ত সারাতে: গরুর দুধের পাতা দইয়ের টাটকা ঘোলে একটু হলুদ মিশিয়ে সকাল, সন্ধ্যা খেলে এক সপ্তাহের মধ্যে পিলের রোগ সেরে যায় বলা হয়ে থাকে।

২১. অন্যান্য সমস্যা সারাতে: হলুদ খেলে শরীরের ভেতরের সব পোকা নষ্ট হয় । হলুদ সংক্রামক রোগের জীবাণু নষ্ট করে। কলেরা ও বসন্ত রোগে উপকারী। কাঁচা হলুদ ও তেতুল পাতার রস ঠাণ্ডা জলে মিশিয়ে খেলে বসন্ত রোগ সারে। হাকিমি মতে প্রমেহ রোগে কাঁচা হলুদ খেলে উপকার পাওয়া যায়।  

সরষের তেলের সঙ্গে হলুদ মিশিয়ে প্রলেপ দিলে গরল সারে। নাকের ভেতরের ক্ষতে সারাতে হলুদের গুঁড়া মহৌষধ হিসেবে ব্যবহার হয়। হলুদ আর পুরানো গুড় মিশিয়ে খেলে পাথরির সমস্যা লাঘব হয়। হলুদে চিনি জল মিশিয়ে খাওয়ালে মুর্চ্ছা সারে।

২২. অভ্যন্তরীণ রোগ সারাতে: লিভারের দুর্বলতা, কোষ্ঠবদ্ধতা, রক্তাল্পতা, হজম শক্তির দুর্বলতা, পুরোনো কাশি, পুরনো ঘুসঘুসে জ্বরে মধুসহ হলুদ খেলে বিশেষ উপকার পাওয়া যায়।

রাসায়নিক গঠন:

(a) Colouring matter viz, curcumin. (b) Alkaloid viz., zingiberine. (c) Antiseptic oil containing p-toyimethyl carbinol, ketonic and alcoholic constituents.

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্রচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা, ৯১-৯২।

২ সাধনা মুখোপাধ্যায়: সুস্থ থাকতে খাওয়া দাওয়ায় শাকসবজি মশলাপাতি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, নতুন সংস্করণ ২০০৯-২০১০, পৃষ্ঠা, ১৮৭-১৮৯। 

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিপিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Vaikoovery

Leave a Comment

error: Content is protected !!