আশশেওড়া বা মটকিলা গাছের আটটি ভেষজ ব্যবহার

এটি শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট গুল্মজাতীয় ছোট উদ্ভিদ। পাতার আকার দেখতে অনেকটা ছোট কালোজাম (Syzygium cumini) পাতার ন্যায়, তবে অল্প পাতলা, এদের বর্ণ গাঢ় সবুজ এবং ওপরের দিক মসৃণ। কচি কাণ্ডের পত্রবন্ত মূল থেকে গুচ্ছাকারে সাদা রংয়ের ছোট ছোট ফুল হয়, এর ফুলগলি দেখতে অনেকটা বড় কড়াইশটির মত কিন্তু ওপরটা কমলালেবুর মত চ্যাপ্টা। কাঁচা অবস্থায় সবুজ এবং পাকলে ঈষুৎ পাটল বর্ণের হয়ে থাকে। সাধারণতঃ নভেম্বর মাসে ফুল ও মার্চ মাসে ফল হয়।

এটি ভারতের সর্বত্র অল্পবিস্তর জন্মে, তবে বিশেষভাবে আসাম, সিকিম ও বাংলার সর্বত্র জন্মাতে দেখা যায়। এর সংস্কৃত নাম আস্যশাখোট, বাংলা নাম আসশেওড়া ও হিন্দীতে বননি, পোতালী নামে পরিচিত। বোটানিক্যাল নাম Glycosmis pentaphylla corr. ও ফ্যামিলি Rutaceae. ঔষধার্থ ব্যবহার্য অংশ— পাতা, কচি কাণ্ড ও মূল।

আশশেওড়া বা মটকিলা-এর উপকারিতা:

১. অজীর্ন রোগে: যাঁরা প্রায়ই অজীর্ণে ভোগেন এবং পায়খানার বেগ এলে আর থামাতে পারেন না, বিশেষ করে ভোরের দিকেই, যাকে আয়ুর্বেদের পরিভাষায় বলা হয় রসশেষ অজীর্ণ। এ রোগে দীর্ঘদিন আক্রান্ত হয়ে থাকলে তাঁরা আশশেওড়া বা মটকিলা-র মূলের ছাল চূর্ণ ২৫০ মিলিগ্রাম মাত্রায় সকালে ও বৈকালে প্রত্যহ দু’বার জলসহ খেতে পারেন; এটা কয়েকদিন ব্যবহার করলে উল্লেখযোগ্য উপকার পাবেন এবং উপসর্গগুলি কমে যাবে। অথবা কাঁচা মূলের ছাল বেটে ছোট ছোট বড়ি করে শুকিয়ে রাখলেও চলবে, তবে শুকিয়ে যাওয়ার পরও যেন ২ রতি থাকা চাই।

২. কফের দোষে: এটা শিশু-বৃদ্ধ দু’বয়সের লােকের হতে পারে। শিশুর হওয়ার কারণ ভাল হজম হয় না, তার ওপর জোর করে করে খাওয়ানো—তার তো দৈহিক পরিশ্রমের ক্ষেত্রই নেই; সেক্ষেত্রে দেহের অগ্নিবল (ধাতুগত অনি) ক’মে গিয়ে অল্প একটু ঠাণ্ডা লাগলেই সর্দি লেগে যায়, পরে সেটা বুকে যায় ব’সে, তখন হাঁপের মত টান হ’তে থাকে।

আরো পড়ুন:  শিয়ালমুত্রা বা ডানকোনী গুল্মের ১৮টি ভেষজ গুণ

আবার বৃদ্ধের ক্ষেত্রেও তাই, দৈহিক পরিশ্রমের অভাব; এদিকে আহারে এটি নেই, সেক্ষেত্রে ওই একই অবস্থা—একেই বার্ধক্যজনিত অগ্নিবল কমে গিয়েছে, তার ওপর শ্রমহীন থেকে বসে খাওয়া, সেইহেতু সর্দি কাসির দোষ। এক্ষেত্রে আশশেওড়া মূল চূর্ণ শিশুকে খাওয়ানো হয়তো সম্ভব হবে না, তাই সম্ভব হলে কাঁচামলের ছাল থেতো করে ২ ফোঁটা রস ও ১ চামচ অল্প গরম জল মিশিয়ে খেতে দিতে হবে। আর বৃদ্ধের ক্ষেত্রে মূলের ছাল চূর্ণ ২৫০ মিলিগ্রাম মাত্রায় দু’বেলা খেতে হবে।

৩. পুরাতন জ্বরে: ঘুসঘুসে জ্বর হয়। আয়ুর্বেদের মতে এটি রক্তধাতু বিকৃত হ’লে হয়। অর্থাৎ বিকৃত বায়ু, পিত্ত (রক্তগত চাপ যেটি) জনিত জ্বরে, এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। এর উপসর্গ হয়, বৈকালে মাথা ধরে, আর শরীরটা (গা-টা) বেশ গরম হয়, সারা গায়ে ছোট ছট চুলকণাও হয়, ঢাকা জায়গায় তার প্রকোপ বেশী।

এক্ষেত্রে মূলের ছালের রস খেতে পারলে ভাল হয়; অন্ততঃ ২০/২৫ ফোঁটা, না হয়। মূলের ছাল চূর্ণ ২৫০ মিলিগ্রাম মাত্রায় দু’বেলা জলসহ খেতে হবে। এর দ্বারা জ্বরের শান্তি হবে। বালকের হ’লে ১০০ মিলিগ্রাম। অবশ্য উপরিলিখিত মাত্রা পূর্ণ বয়স্কের ক্ষেত্রে। মাত্রাটা বয়সানুপাতেই ঠিক করতে হবে। তবে জলের পরিবর্তে দুধসহ খেলে মন্দ হয় না।

৪. ক্রিমির অপসারণে: যাঁদের মল কোনদিন নরম, কোনদিন শক্ত অথবা প্রথমটা গাঁট গাঁট, পরে বেশ থোকো থোকো, এদেরই মলে থাকে আম; আমযুক্ত না থাকলে তাদের মলে ঝুরো কৃমি হয় না—এই ধরনের দাস্ত যাঁদের হতে থাকে, তাঁরা এই গাছের কাঁচা ছাল ৩ গ্রাম মাত্রায় (কচি হলে ভাল হয়) মিহি করে বেটে সেইটা জলসহ খেতে হবে অথবা থেতো করে রস ১০ ফোঁটা দিলেও হয়। এর মাত্রা বয়সানুপাতে ঠিক করতে হবে। এখানে পুর্ণমাত্রা লেখা হলো। তবে এখানে আর একটা কথা জানা থাকা ভালো—২। ৩ দিন খাওয়ার পর উপদ্রব না কমলে একটু মাত্রা বাড়িয়ে দিতে হয়। এক্ষেত্রে আশশেওড়া বা মটকিলা-র কচিপাতার রস ১৫। ২০ ফোঁটা এবং ২। ৩ চা-চামচ জল মিশিয়ে গ্রাম-বাংলায় বহু জায়গায় ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

আরো পড়ুন:  বন অতসি বা ঝুনঝুনা বাংলাদেশের সর্বত্রে জন্মানো ভেষজ বিরুৎ

বাহ্য প্রয়োগ:

৫. চুলকানিতে: তেল-হলুদ মাখার মত মাখতে হবে। সরষের তেল ১০০ গ্রাম কড়ায় চড়িয়ে নিম্ফেন হলে মূলের ছাল ২৫ গ্রাম মিহি করে বেটে নিতে হবে এবং ওই তেলে ভেজে নিয়ে ওর সিটেগুলোকে ছেকে ফেলার দরকার নেই, অবশ্য এমন করে ভাজতে হবে যেন ওগুলি পড়ে না যায়। ওই সিটে মেশানো তেল গায়ে প্রত্যহ একবার করে মাখতে হবে। এটা মাখলে ৩-৪ দিনের মধ্যে চুলকনার উপশম হবে।

৬. গাত্রদাহে: এ দাহটা মানসিক নয়, যেখানে শরীরে দাহ থাকবে সেখানেই কাজ হবে। প্রায়ই গা জ্বালা করে, বিশেষ করে শরৎ, বর্ষায় তাঁরা এই আসশেওড়ার গাছের গোড়াটা (একটু মোটা হওয়া চাই) চন্দনের মত ঘষে সেই ঘষাটা গায়ে মাখতে পারেন। ২।৩ ঘণ্টা রাখার পর স্নান করে নিলেও চলে। এটা মাখলে গায়ে কোন দাহ হবে না।

৭. বয়োব্রণে: ওই কাঠ-ঘষা মুখে মাখলে ব্রণ কমে যায়।

৮. বগলের ঘামে ও গন্ধ হ’লে: বগলে, কুঁচকিতে বিশ্রী ঘাম হ’লে এবং দাগ হলে এই কাঠের মিহি গুঁড়া জলে মিশিয়ে বগলে ও কুচকিতে মাখতে হবে। এর দ্বারা ঘাম ও গন্ধ দুই-ই কমে যাবে।

CHEMICAL COMPOSITION

Glycosmis pentaphylla (Retz) correa.

The mature leaves and root back contains :— furoquinoline bases (kokusaginine, y-fagarine and skimmianine); alkaloids (arborine, arborinine, glycosine, glycosamine, glycosminine, glycosmicine, glycorine and glyborine); triterpenes (arborinols A, B and myricyl alcohol); sterols (B-sitosterol and stigmesterol); sugars 2.1%; a phlobaphene and tannin.

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ৫, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ ১৪০৩, পৃষ্ঠা, ৬৫-৬৭।

Leave a Comment

error: Content is protected !!