পুষ্কর মূল গুল্মের সাতটি ভেষজ গুণাগুণ

উত্তর ও পশ্চিম হিমালয় অঞ্চলের ৫-১৪ হাজার ফুট এবং কাশ্মীরের ৭-৯ হাজার ফুট উচু পর্যন্ত স্থানে পুষ্কর মূলের গাছ জন্মে। এই গণের ২০টি প্রজাতি ভারতে বর্তমান। তন্মধ্যে এটি একটি ক্ষুপ জাতীয় ছোটগাছ, দৃঢ়, ৫ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। পাতা চামড়ার মতো উপরের অংশ খসখসে, নীচের অংশ রোমশ এবং কিনারা দাঁতযুক্ত। গাছের নীচের দিকের পাতা ৮-১৮ ইঞ্চি লম্বা, চওড়া ৫-৮ ইঞ্চি। গাছের উপরের দিকের পাতা এবং ঐ পাতার গোড়ায় গোড়ায় এবং গাছের ডগায় ফুল আসে। পীতবর্ণের গুচ্ছাকার ফুল। ফল ছোট, রক্তাভ ও রোমশ মূলে ওরিস রুট ও কপূরের গন্ধের মত অল্প সৌরভ থাকে।

একে সংস্কৃত ও বাংলায় পুষ্কর মূল, হিন্দীতে পোহকরমূল, পুষ্কর মূল বলে; এটির বোটানিক্যাল নাম— Inula racemosa Hook. f.,ফ্যামিলী— Compositae. ঔষধার্থে ব্যবহার্য অংশ: মূল।

পুষ্কর মূল-এর প্রয়োগ:

এর মূল গবাদি পশুর পক্ষে উৎকৃষ্ট বলকর ও পেটের রোগনাশক। মূল সামান্য তেল ও বলকর, ঘর্মস্রাবকারক, প্রস্রাবকারক, কফনিঃসারক, গভাশয় সংকোচক, ঋতুস্রাবকারক, বেদনাহর ও ব্রণনিবারক। এটি শ্বাস, কাস, শোথ, ফুসফুসাবরণ শোথ, জ্বর, আমবাত, মস্তিষ্কদৌর্বল্য, অগ্নিমান্দ্য প্রভৃতিতে ব্যবহৃত হয়। মূল গোমূত্রে ঘষে দাদ ও চুলকণায় লাগালে ভাল কাজ হয়।

মূলের তৈল: মূল থেকে যে তৈল পাওয়া যায়, তাতে Alantolactone নামক যে বস্তুটি থাকে, সেটি স্যান্টোনিনের চেয়েও অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন ক্রিমিনাশক। এটি জীবাণুনাশক, কফনিঃসারক ও প্রস্রাবকারক। বীজ: তিক্ত ও কামোদ্দীপক।

১. শ্বাস রোগে (হাঁপানিতে): বিভিন্ন কারণে হাঁপানি হয় এবং তার লক্ষণের পার্থক্য থাকে। তবে সাধারণ সামান্য শ্লেষ্মা থেকেই যায়, সামান্যতেই হাঁপ, বুকে একটা চাপ বোধ থাকে। আমাশয় দোষে হাঁপানি হলে এবং তাতে অজীর্ণনাশক ঔষধ ব্যবহার করলে কোন কোন ক্ষেত্রে হাঁপের টানও বেড়ে যায়, অবশ্য সবক্ষেত্রে যে হয়, তা নয়। আবার যাঁদের পেটে বেশি চর্বি এবং তা যদি তাঁদের বংশগত হয়ে থাকে, তাহলে এ রোগ তাঁদের অনেকেরই হয় এবং তার উপসর্গ হচ্ছে— একটু নড়াচড়ায় শ্বাস-প্রশ্বাস বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে ৫০০ মিলিগ্রাম পুষ্কর মূল চূর্ণ, অল্প গরম জলসহ খেলে ২/৪ মিনিটের মধ্যেই হাঁপের টানের তীব্রতা চলে যাবে। সমস্ত দিনে-রাতে এটা ২/৩ বারও খাওয়া যায়।

আরো পড়ুন:  মুক্তাঝুরি বিরুৎ-এর গুরুত্ব ও দশটি ভেষজ গুণাগুণ

২. অরুচিতে: এ রোগ আমাশয় রোগের স্থিতাবস্থা থেকে বেশি হয়। তাছাড়া যকৃতের পিত্তনিঃসরণ অনিয়মিত অথাৎ কম-বেশি মাত্রায় নিঃসৃত হতে থাকলেও অরুচি আসে। এই দুটি ক্ষেত্রেই পুষ্কর মূল চুর্ণ ৫০০ মিলিগ্রাম একটু চিনিসহ শরবত করে খেলে অরুচি কমে যায়, তবে বেটে নিয়ে শরবত করে খাওয়াও চলে। এটা ২/৪ দিন খেলেই অসুবিধেটা চলে যাবে।

৩. পাণ্ডুরোগে (রক্তহীনতায়): পিত্ত বিকারই এর কারণ। এ রোগে রক্তধাতুর ক্রম-পরিণতিতে ব্যাঘাত ঘটে, যার জন্য পরিপাক করার ক্ষমতা কমে যায়, অজীর্ণ আসে, সর্বদা বমির ভাব। এক্ষেত্রে পুষ্কর মূল চূর্ণ ৫০০ মিলিগ্রাম অল্প পরিমাণ গরম দুধ সহ দু’বার করে প্রত্যহ খেলে এ অসুবিধেটা চলে যাবে।

৪. কামলা রোগে (জণ্ডিসে): বিকৃত পিত্ত সমস্ত শরীরে সঞ্চারিত হয়ে গায়ের চামড়ার রং হলদে হয়, প্রস্রাব হলদে হতে থাকে, চোখ ও জিভের নিচেটাও হলদে হয়ে যায়, বমনেচ্ছা বা বমন উপস্থিত হয়। এক্ষেত্রে পুষ্কর মূল চুর্ণ ৫০০ মিলিগ্রাম আধ কাপ আখের রসে মিশিয়ে প্রত্যহ সকালে একবার এবং বিকালে একবার করে খেলে ৫/৭ দিনের পর থেকে উপকার পরিলক্ষিত হতে থাকে। সুস্থতালাভ না করা পর্যন্ত পূর্ণ বিশ্রামের প্রয়োজন। সুপক্ক ও সুপাচ্য খাদ্য গ্রহণ করা উচিত।

৫. হিক্কায়: প্রচলিত কথায় বলা হয় হেঁচকী রোগ। এটি ক্ষুদ্ররোগ হলেও কষ্টদায়ক এবং কখনো কখনো দমবন্ধ করার মতো অবস্থা দেখা দেয়। এ সময় পুষ্কর মূল চূর্ণ ৫০০-১০০০ মিলিগ্রাম মত নিয়ে তাতে মধু মিশিয়ে রাখতে হবে এবং অল্প অল্প করে চেটে চেটে ৩/৪ বারে খেতে হবে। কতটা সময় অন্তর অন্তর ব্যবহার করা উচিত, সেটা নির্ভর করবে রোগের প্রবলতার ও চিকিৎসকের নির্দেশের উপর।

হিক্কা বা হেঁচকি কিছুতেই বন্ধ করা যাচ্ছে না এমনটা মনে হলে, সে ক্ষেত্রে পটোলের বা পলতার পাতা ২টি, ওই পলতার ডাঁটা ৪/৫ ইঞ্চি, ধনে আধ চামচ ও মৌরী আধ চামচ একসঙ্গে নিয়ে একটু খেতে করে এক কাপ গরম জলে ভিজিয়ে রাখতে হবে। ঘণ্টা দুই বাদে ঐ থেকে হেঁকে ২ চা-চামচ নিয়ে সেইসঙ্গে দুধ (গরম করা দুধ ঠাণ্ডা হলে) ২ চা-চামচ একসঙ্গে মিলিয়ে খেতে দিতে হবে। কিছুক্ষণ বাদে বাদে কয়েকবার দিলে ২/৩ ঘণ্টার মধ্যে হিক্কা বন্ধ হয়ে যাবে। এটা বহু ক্ষেত্রেই পরীক্ষিত। তবে অনেক প্রাচীন চিকিৎসক এর সঙ্গে এক মুঠো মুড়িও ভিজতে দিয়ে থাকেন।

আরো পড়ুন:  রাখালচিতা উষ্ণমন্ডলীয় অঞ্চলে জন্মানো ভেষজ গুল্ম

৬. অগ্নিমান্দ্য: এটি যদি ক্রিমি বা কেঁচো ক্রিমি, রক্তহীনতা, কামলা প্রভৃতি রোগের জন্য দেখা যায়, তাহলে এটির চূর্ণ ৫০০ মিলিগ্রাম মাত্রায় দিনে ২ বার জল সহ ব্যবহার করলে ১০/১৫ দিনের মধ্যে ভাল উপকার পাওয়া যায়। আর যেক্ষেত্রে যকৃতের গোলমালে এটি আসে, সেক্ষেত্রেও পুষ্কর মূল ভাল কাজ করে।

৭. দাদে: পুষ্কর মূল গোমূত্রে ঘষে দিনে এক বা দুই বার দাদে লাগালে মাসখানিকের মধ্যে ওটা নষ্ট হয়ে যায়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে কাজ করে না।

CHEMICAL COMPOSITION

Inula racemosa Hook. f. Root contains: inulin 10.0% and an essential oil 1.3% (alantolactone). Seeds contain: bitter principles.

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ৯, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ ১৪০৫, পৃষ্ঠা, ১৩৯-১৪০।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি flowersofindia.net থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Gurcharan Singh

Leave a Comment

error: Content is protected !!