তামাক-এর বহুবিধ ভেষজ গুণাগুণ ও প্রয়োগ

গুল্ম জাতীয় গাছ। শীতের পরে ফুল ও ফল হয়। মূলকাণ্ডের অগ্রভাগে পুষ্পগুচ্ছ হয়, পাতা বৃহৎ ও লম্বা, অকারে অনেকটা কদম (Anthocephalus indicus) পাতার মতো, গায়ে সক্ষম কোমল রোমাবৃত। ফলের গঠন অনেকটা কলকের মত কিন্তু মুখের অংশটি ৫ ভাগে বিভক্ত ও গোলাপী বর্ণের। বীজকোষে ছোট ছোট কালো বর্ণের অনেকগুলি বীজ থাকে, আকারে এরা পোস্তদানার মত, কোন কোন অঞ্চলে তার থেকেও ছোট হয়। সমগ্র ভারত, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সর্বত্রই এর অল্পবিস্তর চাষ হচ্ছে।

এর সংস্কৃত নাম তাম্রকট, বাংলা নাম তামাক ও হিন্দীতে তামাকু নামে পরিচিত। বোটানিক্যাল নাম Nicotiana tabacum Linn, ও পরিবারের নাম Solanaceae.

ব্যবহার্য অংশ:

পাতা কাঁচা ও শুকনো উভয়ই, কাণ্ড ও বীজ ব্যবহার হয়। তবে ব্যবহারের সময় কিছু জিনিস খেয়াল রাখতে হবে (ক) এক বৎসরের বেশী পুরানো তামাক কিছুটা হীনগুণ হয়। (খ) ঔষধার্থে প্রয়োগের দুই-তিন দিন পূর্বে তাকে ভাল করে ধুয়ে, রৌদ্রে শুকিয়ে নিতে হবে এবং সেইটাই ব্যবহার করতে হবে।

তামাক গাছ-এর উপকারিতা:

১. ক্রিমির উপদ্রবে: (এটা বালক বা শিশুদের ক্ষেত্রে ব্যবহার না করাই ভাল) ধোয়া তামাক পাতাকে গুড়া করে নিয়ে, তা থেকে ১২৫ মিলিগ্রাম মাত্রায় সকালের দিকে কিছু, খাওয়ার পর অল্প গরম জলসহ খেতে হবে। তামাকে তৈরী কোন জিনিসের নেশা করা অভ্যাস যাঁদের নেই (যেমন সিগারেট, দোক্তাপাতা, বিড়ি, জর্দা, খৈনি প্রভৃতি) তাঁরা ১০০ মিলিগ্রাম মাত্রার বেশী খাবেন না, আর যাঁরা এসবে অভ্যস্ত, তাঁরা ওই মাত্রায় সকালে বিকালে অল্প গরম জলসহ দু’বার খেতে পারেন। এর দ্বারা ক্রিমির উপদ্রব কমে যাবে, অধিকন্তু ২-৩ দিনের মধ্যে ক্রিমি মরে মলের সঙ্গে বেরিয়ে যাবে।

২. এলার্জিতে: একে আগন্তুক শোথও বলা যেতে পারে। যদিও শোথ মানে এলার্জি নয়, কিন্তু এক ধরনের এলার্জি হয়, তাতে সারা শরীর চিড়বিড় করে এবং দেহের উপরাংশে মশা কামড়ানোর মতো ফলে ওঠে এবং চুলকোতে থাকে। ওই সময় তিন ঘণ্টা অন্তর ৫০ মিলিগ্রাম মাত্রায় (আধ টিপ নস্যির মত) ঈষদুষ্ণ জলসহ দু’বার বা তিন বার খেতে হবে; এর দ্বারা ওটা সেরে যাবে।

আরো পড়ুন:  মহাশতাবরী বা সফেদমুসলি এশিয়ায় জন্মানো উপকারী উদ্ভিদ

৩. অগ্নিমান্দ্য (শ্লেষ্মপ্রধান অগ্নিমান্দ্য): তামাকপাতা চূর্ণ ৭৫ মিলিগ্রাম মাত্রায় ঈষদুষ্ণ জলসহ প্রত্যহ সকালের দিকে একবার এবং বৈকালের দিকে একবার খেতে হবে। এর দ্বারা দুই-চার দিনের মধ্যে অগ্নিবল ফিরে আসবে, তার ফলে অগ্নিমান্দ্য আর থাকবে না।

৪. শ্বাস রোগে: যে শ্বাস আমাশা সঞ্জাত শ্লেষ্মপ্রাধান্যে আত্মপ্রকাশ করে, সেখানেই এটি ব্যবহার্য। তামাকপাতা চূর্ণ ৭৫ মিলিগ্রাম মাত্রায় (১ গ্রেণের একটু বেশি) ৩ ঘণ্টা অন্তর ঈষদুষ্ণ জলসহ প্রত্যহ। একবার বা দু’বার খেতে হবে। এর দ্বারা শ্বাসকষ্টের একট লাঘব হবে।

৫. বাতের কষ্টে: তামাকপাতা চূর্ণ ১০০ মিলিগ্রাম মাত্রায় ঈষদুষ্ণ জলসহ দিনে-রাতে ২ বা ৩ বার করে খেতে হবে; এর দ্বারা ওই ধরনের বাতের কষ্টের লাঘব হবে।

বাহ্য ব্যবহার

৬. চোখে ঝাপসা দেখায়: এমন সমস্যা হলে ধুয়ে শুকিয়ে রাখা তামাক পাতার ২-৩টি টুকরো চায়ের পাতার মত ২-৩ চা-চামচ জলে অন্ততঃ ৩-৪ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে, তারপর সেই জল ছেকে নিয়ে চোখে ফোঁটা দিতে হবে। দু-চার দিন দিলেই ওই অসুবিধেটা চলে যাবে। তবে এই ক্ষেত্রে লোকপ্রচলিত একটি মুষ্টিযোগ আছে, সেটা গ্রামাঞ্চলে এখনও প্রচলিত। সেটা হলো, প্রত্যহ সকালে “হুঁকোর জলে চোখ ধোওয়া”। তবে রোজই এ হুঁকোর জল বদলাতে হয়।

তবে আর একটা কথা জানিয়ে রাখি, হকোর জল দু-চার দিন বদলানো না হলে, সে জল চোখে দিলে চোখ ভয়ঙ্কর জ্বালা করে। তবে আমার মনে হয়, তামাক পাতা জলে ভিজিয়ে চোখে দেওয়ার থেকে হুঁকোর জল চোখে দেওয়া আরও বেশী বিজ্ঞানসম্মত।

৭. উকুন হলে: এ একটা উপদ্রব, এটা মাথায়, গায়ে ও অন্যান্য স্থানে হ’য়ে থাকে ও স্থানগুলি অপরিষ্কার রাখলে ওখানের ময়লা থেকেই উকুনের উৎপত্তি হয়; তারপর অন্য লোকের শরীর থেকে আর একজনের শরীরে এসে বাসা বাঁধে। ওইসব পোকা তাড়াতে তামাক পাতা ২-৩ গ্রাম সিকি কাপ জলে ৪-৫ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে, ওটাকে ছেকে নিয়ে সেই জল মাথায় দিতে হবে। একদিন অন্তর কয়েকদিন দিলে উকুন মরে যায়।

আরো পড়ুন:  কাংঘূ মান দক্ষিণ এশিয়ার ভেষজ প্রজাতি

৮. বিষাক্ত পোকার বিষে: যেকোন প্রকার বিষাক্ত পোকার কামড়ের জ্বালায় অথবা বিছে, বোলতা, ভীমরুলের হলের জ্বালায় তামাক পাতা বেট অল্প গরম করে ওখানে প্রলেপ দিতে হবে। কিছু সময়ের মধ্যেই জ্বালা-যন্ত্রণার উপশম হবে।

৯. পচা ঘায়ের (ক্ষতের) রক্ত বন্ধ করতে: তামাক পাতা পুড়িয়ে ছাই করে নিতে হবে, একটু তেল বা ঘি গরম করে তার সঙ্গে ওই ছাই মিশিয়ে ঘায়ে লাগাতে হবে। এর দ্বারা ক্ষত থেকে রক্ত পড়াটা বন্ধ হবে এবং কোন পোকারও জন্ম হবে না।

CHEMICAL COMPOSITION

Nicotiana tabacum Linn.

Tobacco contains :- moisture 10.15%; carbohydrates 25.50%; alkaloids; proteins; organic acids 20%; polyphenols; carotenoids; enzymes; resins and minerals. Carbohydrates :— reducing sugar, sucrose; starch, pectins; cellulose; lignin; pentose; dextrin; maltose; stachyose; raffinose; rhamnose; ribose; inositol and sarbitol. Alkaloids : – nicotine, nicotimine; nicoteine; analcasine and nornicotin. Proteins :- auxin; alanine; y-aminobutyric acid; asparagine; aspertic acid; glutamine; lysine; serine; proline; phenyl alamine; tyrosine and tryptophan. Caratenoids :- B-carotene; neo-B-carotene; lutein and neoxanthin.

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ৪, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা, ১১৫-১১৬।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি tropical.theferns.info থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Magnus Manske

Leave a Comment

error: Content is protected !!