আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > প্রাণ > উদ্ভিদ > বৃক্ষ > খয়ের দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক ও ভেষজ গুণে ভরা বৃক্ষ

খয়ের দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক ও ভেষজ গুণে ভরা বৃক্ষ

খয়ের
বৃক্ষ

খয়ের

বৈজ্ঞানিক নাম: Acacia catechu (L. f.) Willd., Sp. Pl. 4: 1079 (1906). সমনাম: Mimosa catechu L. f. (1781), Mimosa catechuoides Roxb. (1832). ইংরেজি নাম: Cutch Tree, Black Cutch, Red Catechu, Black Catechu. স্থানীয় নাম: খয়ের, খয়ের বাবুল, কাথা।

ভূমিকা:  খয়ের (বৈজ্ঞানিক নাম: Acacia catechu) বাংলাদেশে পরিচিত নাম। বাণিজ্যিকভাবে এর চাহিদা অনেক। রং শিল্পের জন্য এর যেমন গুরুত্ব আছে তেমনি এতে নানা ভেষজ গুণাগুণ আছে।

খয়ের গাছের বর্ণনা:

মাঝারি ধরণের উঁচু, পত্রঝরা বৃক্ষ, ১৫-১৮ মিটার উঁচু, বাকল লালচে-বাদামী, অমসৃণ, ধূসর থেকে ছাই বর্ণের, ফাটলবিশিষ্ট, লম্বা ফালি আকারে উঠে যায়, শাখা-প্রশাখা বাদামী বা উজ্জ্বল বেগুনী, কন্টকিত, সরু, মসৃণ বা কোমল ও খর্বাকার রোমাবৃত, উপপত্রীয় কন্টক জোড়বদ্ধ, কিছুটা নিম্নমুখী বক্র, আংটা সদৃশ।

আরো পড়ুন: খয়ের গাছ-এর নানাবিধ ভেষজ প্রয়োগ ও গুণাগুণ

পাতা দ্বিপক্ষল, প্রতিমুখ এবং নিম্নপ্রান্তে পুত্রবৃন্তের দুই পাশে ২টি কন্টক বর্তমান, পত্রাক্ষ ২.৬-১৪.০ সেমি লম্বা, রোমশ, প্রায়ই বিক্ষিপ্ত কন্টক দ্বারা কন্টকিত, নিম্নপ্রান্তের নিকটে একটি সুস্পষ্ট উপবৃদ্ধি এবং নিচের পক্ষ জোড়ার মাঝখানে ২-৫ টি উপবৃদ্ধি বিদ্যমান, পক্ষ ৪-২৪ জোড়া, কখনও হ্রাস পেয়ে মাত্র ২ জোড়ায় পরিণত হয়, ৩.০-৪.৫ সেমি লম্বা, পত্রক ২০-৫০ জোড়া, ১.৩-১০.০ x ০.৫-১৫ মিমি, মসৃণ বা রোমশ, প্রতিমুখ, রৈখিক দীর্ঘায়ত, শীর্ষ স্থূলাগ্র থেকে প্রায় তীক্ষ এবং নিম্নপ্রান্ত তির্যক, শুষ্ক অবস্থায় সবুজ থেকে কালচে-বাদামী, শিরাগুলো অস্পষ্ট।

পুস্পমঞ্জরী কাক্ষিক, বেলনাকার মঞ্জরী এবং ৫-১২ সেমি লম্বা। পুষ্প ননীবৎ সাদা, অবৃন্তক। বৃতি পেয়ালাকারঘন্টাকার, ১.০-১.৫ x ১.২-১.৫ মিমি, দন্তক ত্রিকোণাকার বা ব-দ্বীপাকার, ০.৫ মিমি (প্রায়) লম্বা। দলমন্ডল ২.৫-৩.২ মিমি লম্বা, খন্ডক দীর্ঘায়ত থেকে রৈখিক-ভল্লাকার, ১.৫ মিমি পর্যন্ত লম্বা। পুংকেশর অসংখ্য, পুংদন্ড ৪.৫-৫.০ মিমি। লম্বা, দলমন্ডল থেকে বের হয়ে থাকে। গর্ভাশয় দীর্ঘায়ত-উপবৃত্তাকার, ০.৮-১.২ মিমি লম্বা, বৃন্তক, গর্ভদন্ড ৪-৫ মিমি লম্বা।

আরো পড়ুন:  আগর বা অগুরু গাছের ভেষজ গুণাগুণ ও বিবিধ ব্যবহার

ফল পড, ৫-১২ x ১.৫-১.৬ সেমি, চেপ্টা, কালো। চকোলেট বর্ণ-বাদামী থেকে লালচে বাদামী অথবা শুষ্ক অবস্থায় কালচে, মসৃণ, চকচকে, কিনারা তরঙ্গিত, পাতলা আবরণবিশিষ্ট, শীর্ষ বী বিশিষ্ট, নিম্নপ্রান্ত বৃন্ত অভিমুখে সরু। বীজ প্রতি পডে ৩-১০টি, চেপ্টা, বর্তুলাকার বা ডিম্বাকার, আড়াআড়িভাবে ৪-৫ মিমি। শুষ্ক মৌসুমে বৃক্ষটি পত্রশুন্য হয়ে পড়ে।

ক্রোমোসোম সংখ্যা: 2n = ২৬ (Atchison, 1948).

চাষাবাদ ও বংশ বিস্তার:

সব ধরনের মাটিতেই জন্মে কিন্তু পলিমাটিতে ভাল জন্মে, পরিত্যক্ত জায়গা, রাস্তার ধার, ক্ষেতের আইল, এমনকি রেল পথের পাশে, শুষ্ক পাহাড়ী ঢালেও ভাল জন্মে, বালুময় নদীর পাড়ে Dalbergia siss০০-র সাথে জন্মে। ফুল ও ফল ধারণ মার্চ-ডিসেম্বর। বংশ বিস্তার হয় সরাসরি বীজ বপনের মাধ্যমে, বৃক্ষটি মোটামুটি ভালো কপিস জন্মায় এবং মাথা ছেঁটে দিলে ভাল সাড়া দেয়।

খয়ের গাছের বিস্তৃতি:

উপ হিমালয়ান ট্র্যাক বরাবর পাঞ্জাব থেকে সিকিম, শ্রীলংকা, পাকিস্তান থেকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, মায়ানমার এবং চীন (দক্ষিণাংশ) সহ। বাংলাদেশে ইহা উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে বিস্তৃত বিশেষ করে রাজশাহী এবং পাবনায়, সচরাচর বাড়ির আঙিনায় এবং রেল পথের পার্শ্বে জন্মে।

অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব:

সার কাঠ গাঢ় লালচে বাদামী বর্ণের এবং ভারী। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পণ্য খয়ের ইহার সার কাঠ থেকে তৈরি করা হয়। ইহার কাঠ খুঁটি হিসেবে, টেকি তৈরিতে, ইক্ষু মাড়াই যন্ত্রের কাঠের বীম, বল্লমের হাতল, লাঙল, নৌকা, চিরুনি, আসবাবপত্র, গরুর গাড়ির চাকা, যন্ত্রপাতি, তরবারির। হাতল এবং জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হয় । ইহার সার কাঠ হতে এক প্রকার উন্নত মানের কয়লা তৈরি করা যায় (Das and Alam, 2001)।

ভেষজ গুণাবলীর মধ্যে ইহা। কোষ্ঠবদ্ধতাকারী, কৃমি নাশক, আমাশয় প্রতিষেধক, জ্বরে তাপমাত্রা নামিয়ে আনতে এবং চুলকানি, গলার ঘা, ব্রংকাইটিস, বদহজম, আলসার, অগ্নিদগ্ধে, ধবল রোগে, ফোলা স্থানে, কুষ্ঠ রোগ এবং শ্বেত প্রদর রোগ নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ইহার বাকল চামড়া শিল্পেও ব্যবহৃত হয়।

আরো পড়ুন:  তেঁতুল গাছের পাতা, ফল, বীজের বারোটি ঔষধি ব্যবহার

জাতিতাত্বিক ব্যবহার: টাটকা পাতা গো-খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রাজশাহী জেলার চারঘাট অঞ্চলের অনেক কুটীর শিল্পে ইহার সার কাঠের ফালি সিদ্ধ করে বাণিজ্যিকভাবে খয়ের উৎপন্ন করা হয় (Khatun, 1987)।

অন্যান্য তথ্য: বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের  ৯ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) খয়ের প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে খয়ের সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির স্ব-স্থানে সংরক্ষণের পাশাপাশি ব্যাপক পরিসরে বনায়নের আওতায় আনতে হবে বিশেষ করে উপকুলীয় এলাকায় আশ্রয় প্রদেয় বৃক্ষে হিসেবে।

তথ্যসূত্র:

১. বি এম রিজিয়া খাতুন (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ৯ম, পৃষ্ঠা ১৪৬-১৪৭। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: J.M.Garg

Dolon Prova
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত প্রথম কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page