শিয়াল বুকা: চিরহরিৎ অরণ্যের এক অনন্য বন্য ফল ও এর বৈজ্ঞানিক পরিচয়

ভূমিকা: শিয়াল বুকা (বৈজ্ঞানিক নাম: Antidesma acuminatum) হচ্ছে এশিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশের উদ্ভিদ। ফল হিসাবে খাওয়া যায়।

স্তর (Rank)বৈজ্ঞানিক নাম (Scientific Name)বাংলা নাম / পরিচয়
জগৎ / রাজ্যPlantaeউদ্ভিদ জগৎ
বিভাগTracheophytesভাস্কুলার উদ্ভিদ (নালিকাযুক্ত)
অবিন্যাসিতAngiospermsসপুষ্পক উদ্ভিদ
অবিন্যাসিতEudicotsপ্রকৃত দ্বি-বীজপত্রী
বর্গMalpighialesমালপিগিয়ালেস
পরিবারPhyllanthaceaeফাই্ল্যান্থেসি (আমলকী গোত্রীয়)
গণAntidesmaঅ্যান্টিডেজমা
প্রজাতিA. acuminatumঅ্যান্টিডেজমা অ্যাকুমিনাটাম

শিয়াল বুকা-এর বর্ণনা:

গাছের গঠন ও পাতার বৈশিষ্ট্য:
এই উদ্ভিদটি মূলত একটি বৃহৎ গুল্ম বা ছোট আকারের বৃক্ষ। অনুকূল পরিবেশে এই গাছটি উচ্চতায় প্রায় ১০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর শাখা-প্রশাখাগুলো প্রজাতিভেদে রোমশ (ছোট চুলে আবৃত) কিংবা সম্পূর্ণ রোমশবিহীন বা মসৃণ হতে পারে। গাছের পাতাগুলোর গঠন ও বিন্যাস বেশ চমৎকার। পাতাগুলো কাণ্ডে দ্বিসারী (Distichous) বিন্যাসে সজ্জিত থাকে। এক একটি পাতার দৈর্ঘ্য সাধারণত ১০ থেকে ২৩ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থ ৪ থেকে ১০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। পাতাগুলোর আকৃতি দীর্ঘায়িত ভল্লাকার (Oblong-lanceolate) বা উপবৃত্তাকার-দীর্ঘায়িত (Elliptic-oblong) হয়ে থাকে। পাতার অগ্রভাগ বা শীর্ষ বেশ লম্বাটে (দীর্ঘাগ্র) এবং এর মূলীয় বা গোড়ার অংশটি কীলকাকার, স্থূলাগ্র ও অসম (Asymmetrical) প্রকৃতির হয়। পাতাগুলো অখণ্ড বা মসৃণ কিনারাবিশিষ্ট এবং এর মধ্যশিরা বরাবর স্বল্পরোমশ অংশ থাকে। পাতার প্রতিপার্শ্বে ৮ থেকে ১১টি করে পার্শ্বীয় শিরা থাকে। এর বোঁটা বা বৃন্ত বেশ খাটো প্রকৃতির হয়। পাতার গোড়ায় থাকা উপপত্রটি রৈখিক ও রেশমি (Silky) টেক্সচারের হয়ে থাকে, যা আকারে ৪ থেকে ৯ মিলিমিটার লম্বা, ভল্লাকার, রোমশ এবং স্থায়ী (Persistent) প্রকৃতির হয়।

পুষ্পবিন্যাস ও ফুলের গঠন:

এই উদ্ভিদের ফুল ফোটার বিন্যাস ও পুরুষ ও স্ত্রী ফুলের গঠনগত বিন্যাস বেশ সূক্ষ্ম ও জটিল। এর বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

  • মঞ্জরী ও পুংপুষ্প (Male Flower): এর রেসিম (Raceme) মঞ্জরীটি বেশ সরু হয়, যা ২ থেকে ৪টি শাখাযুক্ত এবং আকারে ৪ থেকে ১১ সেন্টিমিটার লম্বা হতে পারে। এই অক্ষটি প্রজাতিভেদে রোমশ কিংবা সম্পূর্ণ রোমশবিহীন হয়। এর পুরুষ ফুলগুলো প্যানিকেল (Panicle) মঞ্জরীতে বিন্যস্ত থাকে, যার মঞ্জরীদণ্ডটি অণুরোমশ (ছোট চুলে আবৃত) প্রকৃতির। পুরুষ ফুলের বোঁটা বা বৃন্ত বেশ খাটো—মাত্র ১.২ মিলিমিটার লম্বা হয়। এর বৃতিটি ৩ থেকে ৪টি খণ্ডে খণ্ডিত এবং সম্পূর্ণ রোমশবিহীন বা মসৃণ থাকে। পুরুষ ফুলে সাধারণত ৩ থেকে ৪টি পুংকেশর উপস্থিত থাকে।
  • স্ত্রীপুষ্প (Female Flower): স্ত্রী ফুলের মঞ্জরীটি একটি বৃহদাকার রেসিম গুচ্ছ নিয়ে গঠিত হয়। স্ত্রী ফুলগুলোর বোঁটা বা বৃন্ত ১.০ থেকে ১.৬ মিলিমিটার লম্বা এবং এর বৃতিটি অণুরোমশ প্রকৃতির হয়ে থাকে। এর গর্ভাশয়টি আকারে ২.০ থেকে ২.৪ মিলিমিটার লম্বা হয় এবং এর গর্ভমুণ্ডটি শীর্ষদেশে (শীর্ষীয়) অবস্থান করে।

ফলের আকৃতি ও গঠন:
এই উদ্ভিদের ফলগুলো আকারে বেশ ক্ষুদ্র—প্রায় ৪ থেকে ৫ মিলিমিটার লম্বা হয়ে থাকে। ফলটির আকৃতি উপবৃত্তাকার ও দীর্ঘাগ্র প্রকৃতির হয় এবং এগুলো গর্ভদণ্ড বা ফলের অক্ষের চারপাশে খুব ঘনভাবে সন্নিবিষ্ট বা লেগে থাকে। ফলগুলো কাঁচা অবস্থায় সবুজ থাকলেও, পাকা অবস্থায় চমৎকার লাল রঙ ধারণ করে এবং পরবর্তীতে তা কালচে বর্ণে রূপান্তরিত হয়।

আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:

অনুকূল পরিবেশ ও অরণ্যের প্রকৃতি:
এই বন্য গুল্ম বা ছোট বৃক্ষ প্রজাতিটি মূলত আর্দ্র ও চিরসবুজ বনের আবহাওয়ায় সবচেয়ে ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। এটি প্রধানত আমাদের দেশের চিরহরিৎ অরণ্যে (Evergreen Forests) প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়। বনের ঘন ছায়াঘেরা পরিবেশ, উর্বর মাটি এবং প্রাকৃতিক আর্দ্রতা এই উদ্ভিদের স্বাভাবিক ও দীর্ঘস্থায়ী বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত সহায়ক।

ফুল ও ফল ধারণের মৌসুম:
এই উদ্ভিদের একটি সুনির্দিষ্ট ঋতুচক্র বা প্রজনন কাল রয়েছে। গাছটিতে সাধারণত মে থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত ফুল ও ফল ধারণ প্রক্রিয়া চলে। এই নির্দিষ্ট সময়ে গাছে সরু রেসিম ও প্যানিকেল মঞ্জরীতে ফুল ফোটে এবং পরবর্তী সময়ে তা পরিপক্ব হয়ে উজ্জ্বল লাল থেকে কালচে রঙের ছোট ছোট উপবৃত্তাকার ফলে রূপান্তরিত হয়।

বংশবিস্তার ও চারা উৎপাদন:
প্রকৃতিতে এই উদ্ভিদের প্রজনন প্রক্রিয়া খুবই সহজ ও স্বাভাবিক উপায়ে সম্পন্ন হয়। এই প্রজাতিটির বংশবিস্তার মূলত পরিপক্ব বীজ দ্বারা প্রাকৃতিকভাবে হয়ে থাকে। পাকা ফল থেকে বীজ যখন বনের মাটিতে বা অনুকূল জলবায়ুর সংস্পর্শে আসে, তখন তা থেকে প্রাকৃতিকভাবেই নতুন নতুন চারা গজিয়ে ওঠে।

বিস্তৃতি:

বৈশ্বিক ভৌগোলিক অবস্থান:
এই বন্য গুল্ম বা ছোট বৃক্ষ প্রজাতিটি আন্তর্জাতিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার নির্দিষ্ট কিছু বিশেষ জলবায়ু অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে বিস্তৃত। এটি প্রধানত ভুটান ও শ্রীলংকার পাহাড়ি এবং চিরহরিৎ বনাঞ্চলজুড়ে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে। এসব দেশের আর্দ্র আবহাওয়া এবং বনের ছায়াঘেরা পরিবেশ এই উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত অনুকূল।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও সুনির্দিষ্ট অঞ্চল:
আমাদের বাংলাদেশে এই উদ্ভিদটি সব অঞ্চলে সচরাচর দেখা যায় না, বরং এটি নির্দিষ্ট কিছু বনাঞ্চল এবং ঝোপঝাড়ে সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও উদ্ভিদতাত্ত্বিক রেকর্ড অনুযায়ী, এই প্রজাতিটি প্রধানত দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বনাঞ্চল সমৃদ্ধ সিলেট জেলা এবং মধ্যাঞ্চলের শালবন বেষ্টিত টাঙ্গাইল জেলায় জন্মে। এই দুই জেলার মাটির গঠন ও পরিবেশ এই বন্য প্রজাতিটির টিকে থাকার প্রধান আশ্রয়স্থল।

অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব:

আহার্য ফল হিসেবে ব্যবহার:
এই গুল্ম বা ছোট বৃক্ষটির অন্যতম প্রধান ব্যবহারিক দিক হলো এর ফল। এর পরিপক্ব ফল সম্পূর্ণ আহার্য অর্থাৎ মানুষের খাদ্য হিসেবে গ্রহণের উপযোগী। পাকা অবস্থায় চমৎকার লাল এবং পরবর্তীতে কালচে বর্ণ ধারণ করা এই ফলগুলো বন্য ও পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। বনের সৌন্দর্য রক্ষার পাশাপাশি এটি স্থানীয় বন্যপ্রাণী ও পাখপাখালির অন্যতম প্রধান খাদ্য উৎস হিসেবে ভূমিকা পালন করে।

শিয়াল বুকা-এর অন্যান্য তথ্য:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের  ৭ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) শিয়াল বুকা প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে শিয়াল বুকা সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।

আরো পড়ুন:

তথ্যসূত্র ও টিকা:

১. বুশরা খান (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ৭ম, পৃষ্ঠা ৩৯৪-৩৯৫। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

২. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২৫ মার্চ ২০২১ তারিখে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!