ডেউয়া বা বর্তা ফল: এর অসামান্য পুষ্টিগুণ, ফিতাকৃমিনাশক বাকল ও ওষুধি ব্যবহার

পরিচিতি: ডেউয়া তুঁত পরিবারের আরেকটি অত্যন্ত সুপরিচিত এবং ঐতিহ্যবাহী বন্য ফলদ বৃক্ষ ডেউয়া / ডেউয়া (বৈজ্ঞানিক নাম: Artocarpus lacucha) গাছের অত্যন্ত নিখুঁত এবং গভীর উদ্ভিদতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। এর বৈজ্ঞানিক পরিমাপ ও জটিল প্রজনন অঙ্গের (যেমন সহবাসী পুষ্পমঞ্জরী, সিনকার্প ফল এবং বীজের সংখ্যাগত হিসাব) বিবরণ অত্যন্ত তথ্যবহুল।

স্তর (Rank)বৈজ্ঞানিক নাম (Scientific Name)বাংলা নাম / পরিচয়
জগৎ / রাজ্যPlantaeউদ্ভিদ জগৎ
বিভাগAngiospermsসপুষ্পক উদ্ভিদ
অবিন্যাসিতEudicotsপ্রকৃত দ্বি-বীজপত্রী (বানান সংশোধনকৃত)
অবিন্যাসিতRosidsরোজিডস
বর্গRosalesরোজালেস
পরিবারMoraceaeমোরাসি (তুঁত বা কাঁঠাল গোত্রীয়)
গণArtocarpusআর্টোকারপাস (কাঁঠাল ও ডেউয়া গণ)
প্রজাতিA. lacuchaআর্টোকারপাস লকুচা

বিবরণ:

গাছের গঠন, কাণ্ড ও তরুক্ষীর: ডেউয়া মূলত একটি মাঝারি থেকে বৃহদাকার, ঘন ও ছড়ানো চূড়াবিশিষ্ট বৃক্ষ। অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশে এই গাছটি উচ্চতায় প্রায় ১০ থেকে ২০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর কচি বিটপ বা কচি ডালপালাগুলো অত্যন্ত রোমশ প্রকৃতির হয়। গাছটির প্রধান গুঁড়ি বা কাণ্ডটি বেশ সরল, সোজা ও নলাকার হয়ে থাকে এবং এর বাকল বা ছাল অমসৃণ, গাঢ় বাদামি বা ধূসর বর্ণের দেখায়। কাঁঠাল গাছের মতোই, এই গাছেরও যেকোনো অঙ্গ ভেঙে গেলে দুধের মতো ঘন সাদা কষ বা তরুক্ষীর নির্গত হয়।

পাতার বিন্যাস ও বৈশিষ্ট্য: ডেউয়া গাছের পাতাগুলো সরল, কাণ্ডে একান্তর (Alternate) বিন্যাসে সজ্জিত এবং বোঁটাযুক্ত হয়। এর পত্রবৃন্ত লম্বায় ১.০ থেকে ২.৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এক একটি পত্র ফলক আকারে বেশ বড়—লম্বায় ১২-২৫ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থে ৬-১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। পাতা স্পর্শে চার্মবৎ (Coriaceous) বা চামড়ার মতো শক্ত মনে হয়। পাতার নিম্নপ্রান্ত তির্যক গোলাকার বা হৃৎপিণ্ডাকার (Cordate) প্রকৃতির হয়। পাতার উপরিভাগ মসৃণবৎ হলেও এর নিচের পৃষ্ঠ বা নিম্নপৃষ্ঠটি স্পষ্ট রোমশ থাকে। পাতার কিনারা সম্পূর্ণ মসৃণ (অখণ্ড) এবং এর আগা বা শীর্ষভাগ বেশ সূঁচালো হয়ে থাকে।

পুষ্পমঞ্জরী ও পরাগায়ন স্বভাব: এই বৃক্ষটি একটি সহবাসী (Monoecious) উদ্ভিদ, অর্থাৎ এর পুং এবং স্ত্রী শিরমঞ্জরী একই উদ্ভিদে আলাদা আলাদা ভাবে জন্মায়।

  • পুং পুষ্পমঞ্জরী: পুরুষ পুষ্পধার বা মঞ্জরীটি প্রায় অবৃন্তক (বোঁটাহীন) হয়, যা আকারে ৩ সেন্টিমিটার পর্যন্ত ব্যাসবিশিষ্ট এবং রোমশ প্রকৃতির হয়ে থাকে।
  • স্ত্রী পুষ্পমঞ্জরী: স্ত্রী পুষ্পধারটি স্পষ্ট বোঁটাযুক্ত বা বৃন্তক হয়। এটি আকারে প্রায় ১০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত ব্যাসবিশিষ্ট হয়, যা অনিয়মিতভাবে খণ্ডিত এবং মখমলের মতো কোমল বা মখমলীয় টেক্সচারের হয়ে থাকে।

ফলের আকৃতি ও ভক্ষণযোগ্য অংশ: এই উদ্ভিদের ফলটি মূলত একটি যৌগিক বা সিনকার্প (Syncarp) জাতীয় ফল, যা শুধুমাত্র স্ত্রী ফুল থেকে রূপান্তরিত হয়ে তৈরি হয়।

  • ফলের বাহ্যিক গঠন: ডেউয়া ফল দেখতে অনেকটা কাঁঠালের মতো হলেও, এটি আকারে বেশ ছোট এবং গোলাকার হয়, যার ব্যাসার্ধ সাধারণত ৫-১০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। ফলের উপরিভাগ অসমান, খসখসে এবং একাধিক ভাঁজযুক্ত (অনিয়মিত দর) হয়। কাঁচা অবস্থায় ফলটি সম্পূর্ণ সবুজ থাকে।
  • পরিপক্ব ফলের বৈশিষ্ট্য: সাধারণত জুলাই-আগস্ট মাসে পরিপক্ব ফল হলদে-সবুজ থেকে কমলা-লালচে বর্ণের হয়। পাকা ফল অত্যন্ত নরম এবং সরস (রসালো) প্রকৃতির হয়ে থাকে। পাকা ফলের বাইরের খোসা বা আবরণটি বেশ পাতলা হয় এবং এর ভেতরের মাংসল অংশটি ফ্যাকাশে হলুদ বা কমলা-লালচে বর্ণের এবং অত্যন্ত নরম, মাংসল ও ভক্ষণীয় (খাওয়ার উপযোগী) হয়।

বীজের গঠন ও সংরক্ষণ ক্ষমতা: ফলের ভেতরের হলুদ বা কমলা রঙের প্রতিটি কোয়ার (কোষ) সাথে একটি করে বীজ যুক্ত থাকে। এর বীজগুলো সাদা এবং দীর্ঘায়িত আকৃতির হয়। ফলের হলুদ পাল্প বা শাঁসের মধ্যে থাকা বীজগুলো ছোট, গোলাকার ও সাদাটে বর্ণের দেখায়। পরিমাপগত দিক থেকে প্রতি কেজিতে বীজের সংখ্যা প্রায় ৫০০-৭০০টি পর্যন্ত হতে পারে। এই বীজগুলোর জীবনক্ষমতা (Viability) খুব বেশি দীর্ঘ হয় না; সাধারণ স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এই বীজগুলো ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়।

ফুল ও ফল ধারণের মৌসুম: বাংলাদেশে ডেউয়া গাছে সাধারণত এপ্রিল-মে মাসে গুচ্ছাকারে ক্রিম-হলুদ বর্ণের ফুল ফোটে এবং এর সার্বিক ফুল ও ফল ধারণের মূল সময়কাল হলো এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত। পরবর্তী সময়ে জুলাই ও আগস্ট মাসে ফলগুলো পুরোপুরি পেকে খাওয়ার উপযোগী হয়।

ভৌগোলিক বিস্তৃতি:

অনুকূল পরিবেশ ও বনাঞ্চলের প্রকৃতি: ডেউয়া গাছটি মূলত ক্রান্তীয় আর্দ্র বনের আবহাওয়ায় সবচেয়ে ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। এটি প্রধানত প্রাকৃতিক আর্দ্র পত্রঝরা (Moist Deciduous) এবং চিরহরিৎ অরণ্যে (Evergreen Forests) প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়। বনের আর্দ্র জলবায়ু, পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো-ছায়া এবং উর্বর মাটি এই সুস্বাদু বন্য ফলদ বৃক্ষটির দীর্ঘস্থায়ী বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত সহায়ক।

বৈশ্বিক ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা: এই বৃক্ষ প্রজাতিটি আন্তর্জাতিকভাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্রান্তীয় অঞ্চলে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। এটি প্রাকৃতিকভাবে মূলত বাংলাদেশ, ভারত, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা, চীন, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় পাওয়া যায়। এর চমৎকার খাদ্যমান ও ওষুধি গুণের কারণে এশিয়ার বাইরেও বিশ্বের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অন্যান্য অঞ্চলে প্রজাতিটি প্রবর্তিত (Introduced) হয়েছে এবং নিয়মিত চাষাবাদ বা আবাদ করা হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট, বিস্তৃতি ও প্রাপ্তিস্থান: আমাদের বাংলাদেশে এটি একটি অত্যন্ত পরিচিত এবং ঐতিহ্যবাহী দেশীয় বন্য ফলদ বৃক্ষ। ভৌগোলিক প্রাপ্যতা অনুযায়ী, বর্তা বা ডেউয়া মূলত কাঁঠাল পরিবারভুক্ত দেশিয় গাছ হিসেবে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহের প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে বুনো পরিবেশে জন্মাতে দেখা যায়। এই বুনো বা প্রাকৃতিক পরিবেশের পাশাপাশি, এটি এ দেশের গ্রামীণ জনপদেও সমানভাবে সমাদৃত। এ বন্য বনাঞ্চল ছাড়াও দেশব্যাপী গ্রাম-গঞ্জে বিক্ষিপ্তভাবে কম-বেশি লাগানো বর্তা গাছ রয়েছে যা গ্রামীণ মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটায়।

প্রজনন ও বংশবিস্তার:

প্রাকৃতিক প্রজনন পদ্ধতি: প্রকৃতিতে ডেউয়া গাছের বংশবৃদ্ধি অত্যন্ত স্বাভাবিক নিয়মে সম্পন্ন হয়। বন্য ও গ্রামীণ পরিবেশে সাধারণত বনাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে পরিপক্ব বীজ থেকে বর্তার চারা জন্মায় ও বংশ বিস্তার হয়. পাকা ফল যখন মাটিতে পড়ে বা বন্যপ্রাণীদের মাধ্যমে বীজ ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা থেকে প্রাকৃতিকভাবেই নতুন নতুন চারা গজিয়ে ওঠে।

নার্সারি পদ্ধতিতে বীজ সংগ্রহ ও বপন: বাণিজ্যিক বা পরিকল্পিত বনায়নের জন্য নার্সারিতে বৈজ্ঞানিক উপায়ে এর চারা উৎপাদন করা সম্ভব। এর চারা তৈরির সুনির্দিষ্ট ধাপগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • বীজ নিষ্কাশন পদ্ধতি: নার্সারিতে চারা তৈরির জন্য সাধারণত জুলাই-আগস্ট মাসে সংগৃহীত পাকা ফল পানিতে ভিজিয়ে হাত দিয়ে কচলিয়ে বীজগুলো বের করা হয়. এরপর বীজগুলো ভালোভাবে ধুয়ে ছায়ায় শুকিয়ে নিতে হয়।
  • সরাসরি পলিব্যাগে বপন: এই বীজগুলোর জীবনক্ষমতা খুব কম হওয়ায় বেশিদিন ফেলে রাখা যায় না। তাই ফল খাওয়ার পর সংগৃহীত বীজ কয়েক দিনের মধ্যেই সরাসরি পলিব্যাগে বপন করতে হয়।

অঙ্কুরোদগমের হার ও সময়কাল:
ডেউয়া বীজের চারা গজানোর একটি সুনির্দিষ্ট সময় ও বৈজ্ঞানিক অনুপাত রয়েছে:

  • অঙ্কুরোদগমের হার: ডেউয়া বা বর্তা বীজের বীজ গজানো বা অঙ্কুরোদগমের হার শতকরা ৫০-৬০ ভাগ হয়ে থাকে. অর্থাৎ, রোপণকৃত বীজের অর্ধেক বা অর্ধেকের সামান্য বেশি থেকে সফলভাবে চারা পাওয়া সম্ভব।
  • চারা গজানোর সময়: পলিব্যাগে বা বীজতলায় বীজ রোপণের পর তা থেকে সফলভাবে চারা গজাতে ১৮-২০ দিন সময় লাগে।

জেনেটিক বা সাইটোলজিক্যাল তথ্য: কোষতাত্ত্বিক ও উদ্ভিদতাত্ত্বিক গবেষণাগারের তথ্য অনুযায়ী, মোরাসি পরিবারের অন্তর্গত এই ডেউয়া বা বর্তা প্রজাতির সুনির্দিষ্ট ক্রোমোসোম সংখ্যা হলো ২n = ৫৬।

গুরুত্ব ও ব্যবহার:

১. কাষ্ঠল ও বাণিজ্যিক উপযোগিতা: ডেউয়া গাছের কাঠ অত্যন্ত মজবুত হওয়ায় গ্রামীণ ও ঐতিহ্যগত অবকাঠামো নির্মাণে এর বড় ভূমিকা রয়েছে:

  • টেকসই সার কাঠ: ডেউয়া গাছের কাঠ সাধারণত হলুদাভ বাদামি বর্ণের, মধ্যম ভারী এবং অত্যন্ত টেকসই হয়ে থাকে। এই কাঠ গ্রামীণ এলাকায় স্থায়ী ঘর-বাড়ি এবং বিভিন্ন সামাজিক অবকাঠামো নির্মাণে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
  • নৌকা ও ডিঙ্গি নির্মাণ: এই গাছের কাণ্ডটি বেশ দীর্ঘ ও সোজা নলাকার হওয়ায় এর লম্বা নলাকার গুঁড়ি খুঁড়িয়ে আস্ত নৌকা বা ঐতিহ্যবাহী ডিঙ্গি বানানো হয়, যা গ্রামীণ জলপথে যাতায়াতের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

২. খাদ্যমান ও পুষ্টির জোগান:

  • ভক্ষণযোগ্য ফল: ডেউয়ার পাকা ফলের হলুদ পাল্প বা শাঁস সম্পূর্ণ ভক্ষণীয় এবং স্বাদে এটি চমৎকার হালকা টক-মিষ্টি প্রকৃতির হয়ে থাকে। গ্রামাঞ্চলে পাকা ফল কাঁচা খাওয়ার পাশাপাশি সামান্য লবণ-মরিচ মাখিয়ে খেতে বেশ পছন্দ করা হয়। ওষুধি দিক থেকে ডেউয়া ফল প্রাকৃতিকভাবে ক্ষুধা ও শক্তিবর্ধক হিসেবে কাজ করে।
  • বীজ ও বাকলের লোকজ আহার: ফলের কোয়ার ভেতরে থাকা বর্তার বীজ আগুনে ভেজে বা পুড়িয়ে খাওয়া যায়, যা বেশ সুস্বাদু। এছাড়া গ্রামীণ ঐতিহ্যে অনেকে পানের সাথে সুপারি ছাড়াও এর গাছের বাকল চিবিয়ে খেয়ে থাকেন।
  • প্রাকৃতিক রঞ্জক (রঙ): বিখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানী দাশ এবং আলমের ২০০৫ সালের গবেষণামতে, এই গাছের শিকড় থেকে এক প্রকার স্থায়ী হলুদ রং নিষ্কাশন করা হয়, যা বিভিন্ন লোকজ শিল্পে রঞ্জক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

৩. কান্ডের বাকলের রাসায়নিক উপাদান: ডেউয়া গাছের কাণ্ডের বাকলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সক্রিয় বায়ো-কেমিক্যাল বা রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি বিজ্ঞানীদের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। এর কাণ্ডের বাকলে স্টিলবিন (Stilbene), ক্রিস্টালাইন (Crystalline), ট্রাইটারপিন্স (Triterpines), লুপিউল (Lupeol), লুপিউল অ্যাসিটেট, বিটা-অ্যামাইরিন অ্যাসিটেট এবং সাইক্লোয়ার্টেনল (Cycloartenol) ও তদ্বীয় নানা জটিল প্রাকৃতিক যৌগ বর্তমান থাকে।

৪. ঐতিহ্যগত ভেষজ ওষুধি কার্যকারিতা: আয়ুর্বেদ ও লোকজ চিকিৎসায় ডেউয়া ফল ও এর বাকলের ক্বাথ বিভিন্ন রোগ উপশমে ব্যবহৃত হয়:

  • ফিতাকৃমি ধ্বংস করতে: এই গাছের কাণ্ডের বাকল অত্যন্ত শক্তিশালী ফিতাকৃমিনাশক (Anti-tapeworm) হিসেবে কাজ করে। পেটের কৃমির উপশমে এর বাকলের রস প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
  • ত্বক ও ব্রণের যত্ন: ডেউয়া গাছের বাকলের ক্বাথ (Decoction) মুখের ব্রণের সমস্যা দূর করতে, শীতকালীন ত্বক ফাটা এবং যেকোনো চামড়ার ক্ষত বা ঘা নিরাময়ে বাহ্যিকভাবে ব্যবহৃত হয়।
  • শ্লেষ্মা ও কামোদ্দীপক গুণ: আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রমতে, এর সুস্বাদু ফলটি শরীরে কফ বর্ধক (Expectorant), প্রাকৃতিকভাবে কাম উদ্দীপক (Aphrodisiac) এবং ক্ষুধা বর্ধক হিসেবে কাজ করে।

ক্ষত নিরাময়ে ছালের অনন্য ব্যবহার: ডেউয়া কেবল একটি ফলদ গাছই নয়, এটি অত্যন্ত কার্যকরী একটি ভেষজ গাছও বটে। লোকজ ও প্রথাগত প্রাথমিক চিকিৎসায় এর বাকল বা ছালের চমৎকার ব্যবহার রয়েছে। শরীরের কোথাও কেটে গেলে বা চামড়ায় কোনো আঘাত লাগলে, এই গাছের ছাল বা বাকল শুকিয়ে গুঁড়ো করে যেকোনো ক্ষতে লাগালে সেই ক্ষত দ্রুত শুকিয়ে যায়। এর অ্যান্টি-সেপটিক ও দ্রুত রক্ত বন্ধ করার প্রাকৃতিক ক্ষমতা ক্ষতস্থানকে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।

ফলের আয়ুর্বেদিক কার্যকারিতা: আয়ুর্বেদ ও ইউনানি শাস্ত্রমতে, ডেউয়ার পাকা ফলের শাঁসে বেশ কিছু বিশেষ ওষুধি উপাদান থাকে। এর ফল প্রাকৃতিকভাবে কফ বর্ধক (Expectorant), কাম উদ্দীপক (Aphrodisiac) এবং ক্ষুধা বর্ধক হিসেবে কাজ করে। যারা মুখের রুচিহীনতা বা হজমজনিত সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য এই ফলটি অত্যন্ত উপকারী ভূমিকা পালন করে।

⚠️ জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা (Disclaimer): যদিও ক্লিনিকাল ও লোকজ চিকিৎসায় ডেউয়া গাছের বাকলে ফিতাকৃমিনাশক উপাদান ও ত্বকের ক্ষত নিরাময়ের নানাবিধ গুণের কথা প্রমাণিত হয়েছে, তবুও পেটের গুরুতর ফিতাকৃমির সংক্রমণ কিংবা ক্রনিক ব্রণের সমস্যায় কোনো ভেষজ ঘরোয়া টোটকার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা অনুচিত। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ সেবনের ক্ষেত্রে সর্বদা একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের (Registered Physician) পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।

অন্যান্য তথ্য:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৯ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) ডেউয়া প্রজাতিটি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং এটি প্রকৃতিতে সুদৃঢ় অবস্থানে থাকায় দেশে সম্পূর্ণ আশঙ্কামুক্ত (Least Concern) হিসেবে বিবেচিত। তবে এর জেনেটিক বৈচিত্র্য রক্ষা এবং বনায়ন ধরে রাখার জন্য ইতিমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংরক্ষণ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে; যার অংশ হিসেবে ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের ৫৫ নম্বর সেকশনে বর্তার কিছু গাছ সম্পূর্ণ সংরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে এবং বেসরকারি সংস্থা আরণ্যক ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের যৌথ সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চারা রোপণের মাধ্যমে এই দেশীয় প্রজাতির বংশধারা একাডেমিক ও বুনো পরিবেশে সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও টিকা:

১. মৃত্যুঞ্জয় রায়; বাংলার বিচিত্র ফল, দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০০৭, পৃষ্ঠা ২৪৩-২৪৪।

২. এম এ হাসান, (আগস্ট ২০০৯)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”।  আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ ৯ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ১৯৮-১৯৯। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

২. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৪ মার্চ ২০১৮ তারিখে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ১৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!