রক্তকাঞ্চন এশিয়ার সুন্দর, মিষ্টি গন্ধযুক্ত ও ভেষজ গুণে ভরা ফুল গাছ

ভূমিকা: রক্তকাঞ্চন (বৈজ্ঞানিক নাম: Phanera variegata, ইংরেজি: orchid tree, camel’s foot tree, kachnar and mountain-ebony) ফেবাসিস পরিবারের,  সানেরা গণের একটি এক প্রকারের বৃক্ষ। দেবকাঞ্চনের চেয়ে এই গাছের আকার ছোট। এটি ভারতীয় প্রজাতি।[১]

বর্ণনা:

রক্তকাঞ্চন  মাঝারি আকৃতির পর্ণমোচী বৃক্ষ। এর দেহকান্ড খাটো, বাকল মসৃণ, অনুদৈর্ঘ্য ফাটলযুক্ত তরুণ কান্ড কোমল রোমশ। পাতা সরল, একান্তর, সবৃন্তক, বৃন্ত ২.০-৩.৮ সেমি। লম্বা, ফলক ৪.৫-১৫.০ সেমি লম্বা, দৈর্ঘ্য প্রস্থ সমান বা প্রস্থ অপেক্ষা বড়, মধ্যভাগ কাটা, শীর্ষ থেকে নিচের দিকে খন্ড স্থূলা, মূলীয় অংশ অতিশয় হৃদপিন্ডাকৃতি, অর্ধচর্মবৎ, বিশেষ করে অঙ্কীয় পৃষ্ঠের শিরাসমূহ তরুণ অস্থায় ধূসর চকচকে ও রোমশ পুষ্পবিন্যাস রেসিম। পুষ্পবিন্যাস শীর্ষীয় বা অক্ষীয় স্বল্প পুষ্প বিশিষ্ট রেসিম।

ফুল আকারে বড়, সুন্দর, সুগন্ধী হয়। বেগুনি লাল, ফ্যাকাশে লাল বা সাদা বর্ণের হয়ে থাকে। পত্রহীন অবস্থায় প্রস্ফুটন দৃষ্টিনন্দন, পূর্ণ বিকাশের সময় প্রায় ৭.৫ সেমি আড়াআড়ি। ফুলের বৃন্ত খাটো বা অনুপস্থিত, মঞ্জরী পত্রিকা ক্ষুদ্র, হাইপ্যানাথিয়াম সরু, ১.২-২.৫ সেমি। বৃতি চমসাকৃতি, ধূসর ঘন ক্ষুদ্র কোমল রোমাবৃত। নালি বেলনাকার, ২.০-২.৭ সেমি লম্বা, সরু, শীর্ষভাগ ৫ টি দন্ত যুক্ত। ফুলের পাপড়ি ৫ টি, মুক্ত, ৪-৬ সেমি লম্বা, বি-ডিম্বাকার বা বি-ভল্লাকার, দলবৃন্ত লম্বা ও প্রশস্ত, সবগুলি সাদা বা ৪ টি ধূসর বেগুনি লাল এবং ৫ম টি কালচে এবং গাঢ় বেগুনি, লাল শিরা যুক্ত।

পুংকেশর ৫ম টি উর্বর, বন্ধ্যা পুংকেশর অনুপস্থিত। গর্ভাশয় রোমশ, দন্ড ১.০-১.৭ সেমি লম্বা, গর্ভমুন্ড ক্ষুদ্রাকৃতি, মুন্ডাকার। ফল পড, দৈর্ঘ্য ১৫ থেকে ২৫ ও প্রস্থ ১.২ সেমি, দীর্ঘায়ত, চ্যাপ্টা, রোম বিহীন, সামান্য বক্র, খাটো, শক্ত দন্ডযুক্ত, বিদারী, ১০-১৫ বীজী। [২]

ক্রোমোসোম সংখ্যা :

2n = ২৮ [৩]

রক্তকাঞ্চনের বংশ বিস্তার ও চাষাবাদ:

রৌদ্র উজ্জ্বল, শুষ্ক ভূখন্ড এবং পাহাড়ী বা অরণ্যাঞ্চলে জন্মে। আমাদের দেশে প্রজাতির সংখ্যা ৭টি। তিনটি ছোট গাছ আর চারটি গুল্ম। সুক্ষ্ম লোমযুক্ত শুঁটি আছে। শুঁটির ভেতরে বীজ থাকে ১০ থেকে ১৫টি।  ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে ফুল ফোটে। বর্ষাকালে ফল ধরে। [৪]

বিস্ততি:

ভুটান, চীন, ভারত, মায়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান এবং শ্রীলংকা। উষ্ণমন্ডলীয় অঞ্চলে ব্যাপক চাষাবাদ হয়। বাংলাদেশের সর্বত্র পাওয়া যায়।

রক্তকাঞ্চনের অর্থনৈতিক ব্যবহার ও ভেষজ গুণ:  

গ্রীষ্মে ফুল ফুটলে এটিকে অন্যতম একটি অতিবাহারি বৃক্ষ মনে হয় । রাসায়নিক দ্রব্য, খাদ্য, পানীয়, গবাদি পশুর খাদ্য, ভেষজ ওষুধ এবং কাঠের জন্য এটি খুব গুরুত্বপুর্ণ (Kumar and Sane, 2003)। বাকল চর্মরোগ, উদরাময়, আমাশয়, অর্শ ও ক্ষত রোগ নিরাময়ে ব্যবহার করা হয় (Sachan et al., 1992)। বাকল ও মূল উভয়ই পরিপাক সংক্রান্ত বিভিন্ন । জটিল সমস্যায় উপকারী। রং, ট্যানিন ও আঁশের জন্যও বাকল গুরুত্বপূর্ণ (Benthall, 1933)। কাঠ দালান কোঠা এবং কৃষি কাজের যন্ত্রপাতি তৈরিতে উপযোগী।

এছাড়াও ভারতের কনকান দ্বীপে এই গাছের টাটকা রসের সাথে Strobilanthus citrata এর ফুলের রস মিশ্রিত করে কাশি উপশমে ব্যবহার করা হয়। ভারতে বাকলের রস আদার সাথে একত্র করে অভ্যন্তরীণ ভাবে । গন্ডমালারোগ প্রতিরোধে ব্যবহার করা হয় (Caius, 1989)। ভারতে এর পাতা ও ফুলের মুকুল সবজিরূপে খাওয়া হয় (Benthall, 1933)। কান্ডের বাকল রংয়ের কাজে ব্যবহার করা হয় (Sachan et al., 1992) পাতা। গবাদিপশুর উত্তম খাবার (Ali, 1973)।

অন্যান্য তথ্য:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৭ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) রক্তকাঞ্চন  প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে রক্তকাঞ্চন  সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই। [২]

তথ্যসূত্র:

১. দ্বিজেন শর্মা লেখক; বাংলা একাডেমী ; ফুলগুলি যেন কথা; মে ১৯৮৮; পৃষ্ঠা- ৮৬, আইএসবিএন ৯৮৪-০৭-৪৪১২-৭

২. বি এম রিজিয়া খাতুন (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ৬ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ১০০-১০১। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

৩. Kumar, V. and Subramaniam,, B. 1986 Chromosome Atlas of Flowering Plants of the Indian Subcontinent. Vol.1. Dicotyledons Botanical Survey of India, Calcutta. 464 pp.   

৪. শেখ সাদী লেখক; দিব্য প্রকাশ ; উদ্ভিদকোষ; ফেব্রুয়ারি ২০০৮; পৃষ্ঠা ৩৩৩-৩৩৪, আইএসবিএন ৯৮৪-৪৮৩-৩১৯.

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিপিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Alejandro Bayer Tamayo

আরো পড়ুন:  ঝুমকা লতা গ্রীষ্মাঞ্চলের ভেষজ গুণে ভরা ও শোভাবর্ধক বিরুৎ

Leave a Comment

error: Content is protected !!