নাগলিঙ্গম ত্রিনিদাদ ও ক্রান্তীয় আমেরিকারসহ উষ্ণমণ্ডলীয়র আলংকারিক ফুল গাছ

ভূমিকা: নাগলিঙ্গম ( বৈজ্ঞানিক নাম: Couroupita guianensis, ইংরেজি নাম: Cannoball Tree) হচ্ছে লেসিথিডাসি পরিবারের কুরুপিটা  গণের একটি সপুষ্পক বৃক্ষ। এটি বড় আকারের পত্রমোচী বৃক্ষ। এর দীর্ঘ প্রশস্ত পাতা গ্রীষ্ম ঝরে পরে ও বড় ফুল আকারের। ফুল ও ফলের জন্য অনেকের প্রিয় ফুলের তালিকায় নাগলিঙ্গমের নাম আছে। এটিকে বাংলাদেশে আলংকারিক উদ্ভিদ হিসেবে বাগানে, পার্কে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাষাবাদ করা হয়। এই গণে প্রজাতির সংখ্যা ২০টি। আদিবাস এলাকা আমাজান ও ভেনেজুয়েলা।[১]

বৈজ্ঞানিক নাম: Couroupita guianensis Aubl. Pl. Gui. 2: 708, t. 282 (1775). ইংরেজি নাম : Cannoball Tree. স্থানীয় নাম: নাগলিঙ্গম। জীববৈজ্ঞানিকশ্রেণীবিন্যাসজগৎ/রাজ্য: Plantae বিভাগ: Angiosperms অবিন্যাসিত: Edicots অবিন্যাসিত: Asterids  বর্গ: Ericales   পরিবার: Lecythidaceae  গণ: Couroupita প্রজাতি:Couroupita guianensis.

বর্ণনা:

শিবলিঙ্গম বা নাগলিঙ্গম নামকরণের মূলে রয়েছে এর ফুলের গড়ন। ফুলের ছয়টি পাপড়ি, সাপের ফণার মত আকৃতিতে মাঝখানের একটি শিবলিঙ্গ আকৃতির গর্ভকে ঘিরে রাখে। ভারতে ধর্মীয় আচারের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে এটা সরাসরি শিবলিঙ্গম নাম ধারণ করেছে যা বাংলাদেশে নাগলিঙ্গম।

নাগলিঙ্গম বৃহদাকৃতির, দ্রুত বর্ধনশীল বৃক্ষ কিন্তু কাঠ অপেক্ষাকৃত নরম। গাছের পাতা সরল, একান্তর, খর্বাকার বৃন্তবিশিষ্ট, পত্রফলক আয়তাকার-বল্লমাকার, স্থূল বল্লমাকার, বিডিম্বাকার বা উপবৃত্তাকার। পাতার দৈর্ঘ্য ১০-১৬ এবং প্রস্থ ৪-৬ সেমি, অখন্ড, তীক্ষা। পুষ্প কান্ডজ এবং পার্শ্বীয় ঝুলন্ত রেসিমে। পুষ্প অপেক্ষাকৃত বৃহৎ, আড়াআড়িভাবে ৮-১৫ সেমি, উভলিঙ্গ, হলুদ এবং লালাভ, সুগন্ধিময়।

বৃতি ৮ বা ৬-খন্ডিত, নিম্নাংশ যুক্ত হয়ে মোচাকার একটি গঠন সৃষ্টি করে। দলমণ্ডল ৬টি পাপড়ি নিয়ে গঠিত, সচরাচর একটি চাকতির উপরে জন্মায়, সরস, ৩-৫ × ২-৩ সেমি, আয়তাকার-ডিম্বাকার। অ্যান্ড্রোগাইনোফোর চমসাকার, ননীবর্ণের, পুংকেশর অনেক, ২ সারিতে সজ্জিত, বড়গুলো হুড গঠন করে । গর্ভমুণ্ডীয় চাকতি তারকাকার, গর্ভাশয় ৫-৭ প্রকোষ্ঠী, প্রতি প্রকোষ্ঠে ডিম্বক কয়েকটি। ফল ক্রিকেট বল থেকে বড়, বর্তুলাকার, ১৫-২০ সেমি ব্যাসবিশিষ্ট, কাষ্ঠল, অবিদারী। বীজ পাল্পে নিহিত।[২]

ক্রোমোসোম সংখ্যা:

2n = ৩৬ (Fedorov, 1969)।

বংশ বিস্তার ও চাষাবাদ:

সমভূমিতে এই গাছ জন্মে। সারাবছর গাছে ফুল ফোটে। অন্য গাছে সচরাচর যেমন ফুল আসে শাখা ডালের প্রান্ত থেকে, কিন্তু এক্ষেত্রে নাগলিঙ্গম একটু আলাদা। নাগলিঙ্গমের গোড়া থেকে শীর্ষ পর্যন্ত মোটা কাণ্ড থেকে হয় বাহারি রঙের ফুল। গাছের ফুল হয় গোলাপি-লাল, সরাসরি কাণ্ড থেকে, যেমনটি হতে দেখা যায় চাল-মুগরা গাছে। এই ফুল থেকে রাতের বেলা অদ্ভূত সুগন্ধ বের হয়। এদের ফল দেখতে যতই সুন্দর হোক না কেনো ফাটা ফলের ভেতর থেকে দুর্গন্ধ বেরোয়। বীজ থেকে বংশ বিস্তার হয়।  একটি গাছের বয়স ১০ বছর হলেই ফুল ধরতে শুরু করে।

বিস্তৃতি:

আদিনিবাস গায়ানা এবং অন্যত্র রোপন করা হয়েছে। বাংলাদেশে এই গাছ বাগানে লাগানো হয়। পুরনো জমিদার বাড়ির আঙিনায় সহজেই চোখে পড়ে। দক্ষিণ আফ্রিকার উষ্ণাঞ্চল থেকে ১৮৮১ সালে নাগলিঙ্গম প্রথম সিংহল অর্থাৎ শ্রীলংকাতে আসে। সেই গাছে ১৮৯৪ সালে প্রথম ফুল ফোটে। সরকারী ও বেসরকারী বাগানে শোভাবর্ধক বৃক্ষ হিসেবে রোপন করা হয়।[৩] বাংলাদেশে বলধা গার্ডেন, রমনা পার্ক, টংগী, বরিশালের বিএম কলেজ, ময়মনসিংহের মহিলা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ, গফরগাঁও সরকারি কলেজ, গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ সারাদেশে অনধিক ৫০টি গাছ রয়েছে। এই গাছ বাংলাদেশে বিপন্ন প্রজাতি, যদিও বহিরাগত।

ভেষজ ব্যবহার:

নাগলিঙ্গমের ফুল থেকে উৎকৃষ্ট মানের পারফিউম তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এই গাছের কাণ্ড পুরু হলেও ভেতরে তেমন সার হয় না, কাঠ হিসেবে আদৌ কাজের নয়, এর ফল-ফুল-পাতা বা শেকড় কতটা কাজের তা এখনো সৌখিন গবেষণাগারের পরীক্ষাধীন। আপাতত এর বাণিজ্যিক মূল্য না থাকলেও, ফুলের অদ্ভূত সৌন্দর্য এবং ঘ্রাণ এই গাছকে অনেক প্রাতিষ্ঠানিক বা জাতীয় বাগানে জায়গা দিয়েছে।

এই গাছটি প্রকৃতির দারুণ সহচর। অনেক পতঙ্গ ও পাখি এই ফুলের রেণু ও ফুল খেয়ে বাঁচে। গাছ যেহেতু অনেক বড় হয়, ফলে একটি বৃহৎ গাছ নানা প্রজাতির পাখি, পতঙ্গ, সরীসৃপ ও অনেক বুনো প্রাণীর আবাসস্থলও। অনেকে এ গাছকে পবিত্র বৃক্ষ মনে করেন। উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সব নতুন ও পুরনো নাগলিঙ্গম গাছের সুরক্ষা জরুরি। এর প্রাকৃতিক বিকাশও জরুরি। নগরের শোভা বাড়ানোর জন্য এ গাছ বেশি প্রয়োজন।

জাতিতাত্বিক ব্যবহার:

হিন্দু সম্প্রদায় ইহাকে একটি পবিত্র বৃক্ষ হিসেবে মানে। পতঙ্গ বিতারক হিসেবে এবং মধু সংগ্রহের সময় মৌমাছির কামড় থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ইহার বাকল চূর্ণ গায়ে মাখানো হয়। নিগ্রোরা ইহার ফলের পাল্প খেয়ে থাকে, সুরা তৈরিতেও ব্যবহৃত (Sinha, 1996)।

অন্যান্য তথ্য:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৯ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) নাগলিঙ্গম প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে নাগলিঙ্গম সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চারপাশে এবং বোটানিক্যাল গার্ডেনে রোপন প্রযোজন।[২]

তথ্যসূত্র:

১. শেখ সাদী, উদ্ভিদকোষ, দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০০৮, পৃষ্ঠা, ২৫৩, আইএসবিএন ৯৮৪-৪৮৩-৩১৯-১।

২. এম এ হাসান (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”  আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ১০ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ৩৭৩। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

৩. সুবিমলচন্দ্র দে, বিজ্ঞান ভিত্তিক পুষ্পচর্চা, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ জুলাই ২০০০, পৃষ্ঠা, ৪৪-৪৫, আইএসবিএন ৮১-৭০৭৯-২৭৫-৪।

আরো পড়ুন:  অপরাজিতা

Leave a Comment

error: Content is protected !!