কৃষ্ণচূড়া এশিয়া অঞ্চলের এক উপকারি প্রকৃতিবান্ধব ও আলংকারিক দৃষ্টিনন্দন বৃক্ষ

ভূমিকা: কৃষ্ণচূড়া, গোলমোহর (বৈজ্ঞানিক নাম Delonix regia ইংরেজি: Flame Tree, Flamboyant, Royal Poinciana, Peacock Flower)।  এটি ফেবাসি পরিবারের ডেলোনিক্স  গণের লতানো বা অর্ধলতানো গুল্ম। ফেবাসি পরিবারভুক্ত কৃষ্ণচূড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্নিগ্ধতা বাড়ানোর জন্য লাগিয়ে থাকে। এই গাছে ফুল ফোটের মৌসুমে, সংখ্যা ও রঙের উজ্জ্বলতার জন্য  অপরূপ লাগে। এই গাছের ডালপালা খুব সহজে ভেঙ্গে যায়, তাই খোলা জায়গায় না লাগানোই ভালো।[১]   

বৈজ্ঞানিক নাম: Delonix regia Rafin., Fl. Tellur. 2: 92 (1836) সমনাম: Poinciana regia Boj. ex Hook. (1826). ইংরেজি নাম: Flame Tree, Flamboyant, Royal Poinciana, Peacock Flower. স্থানীয় নাম: কৃষ্ণচূড়া, গোলমোহর।

জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস জগৎ/রাজ্য: Plantae. বিভাগ: Angiosperms. অবিন্যাসিত: Edicots. অবিন্যাসিত: Asterids. বর্গ: Fabales.  পরিবার: Fabaceae. গণ: Delonix . প্রজাতি: Delonix regia.

বর্ণনা:

কৃষ্ণচূড়া আমাদের দেশে সুপরিচিত। বৈশাখের খরাদীর্ণ আকাশের নিচে প্রচণ্ড তাপ ও রুক্ষতায় ওর আশ্চর্য প্রস্ফুটনের তুলনা নেই। নিষ্পত্র শাখায় প্রথম মুকুল ধরার অল্পদিনের মধ্যেই সারা গাছ ফুলে ফুলে ভরে যায়। তখন তো ‘পুষ্পপাগল কৃষ্ণচূড়ার শাখা’। এত উজ্জ্বল রং, এত অক্লান্ত প্রস্ফুটন তরুরাজ্যে দুর্লভ। কৃষ্ণচূড়া ফুলের বর্ণ-বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। গাঢ়-লাল, লাল, কমলা, হলুদ, হালকা-হলুদ পর্যন্ত এক দীর্ঘ বর্ণালিতে বিস্তৃত এই পাপড়ির রং। প্রথম প্রস্ফুটনের উচ্ছ্বাস পরবর্তীকালে ক্রমে স্তিমিত হয়ে এলেও বর্ষার শেষেও কৃষ্ণচূড়া গাছ থেকে ফুলের রেশ শেষ হয় না। শুধু ফুল নয়, পাতার ঐশ্বর্যেও কৃষ্ণচূড়া অনন্য। এই পাতার কচি সবুজ রং এবং সূক্ষ্ম কারুকর্ম আকর্ষণীয়। নম্র, নমনীয় পাতাদের আন্দোলন দৃষ্টিশোভন। এই গাছে ছায়ায় নিবিড়তা নেই, তবু ওর লঘু আস্তরণই রৌদ্রশাসনে সক্ষম।

মধ্যম আকৃতির বৃক্ষ, সৌষ্ঠবপূর্ণ, পর্ণমোচী, ২০ মিটার পর্যন্ত উঁচু, ছাউনি বিস্তৃত, নিম্নাংশ প্রায়শ অধিমূল যুক্ত। পত্র দ্বিপক্ষল যৌগিক, প্রধান পত্রক অক্ষ ৫০-৬০ সেমি লম্বা, পক্ষ ১১-১৮ জোড়া, প্রায় ১০ সেমি লম্বা, পত্রক ১৫-৩০ জোড়া, দৈর্ঘ্য ৮-১০ ও প্রস্ত ৩-৪ মিমি, প্রায় অবৃন্তক, রৈখিক দীর্ঘায়ত, ঝিল্লিযুক্ত, শীর্ষ ভোঁতা বা গোলাকার, মূলীয় অংশ সামান্য তির্যক, রোম বিহীন, উপপত্র ২ মিমি লম্বা, ৪ থেকে ৫টি পক্ষল খন্ডযুক্ত, আশুপাতী।

পুষ্পবিন্যাস করিম্ব সদৃশ রেসিম, ছোট শাখার প্রান্তে জন্মে, বৃহৎ ও বিস্তৃত, রোম বিহীন, ১০-১৫ সেমি লম্বা, ৫ থেকে ১০টি পুষ্পপুট বিশিষ্ট। পুষ্প সদুৰ্শণ, বৃহৎ, আড়াআড়ি ৭-১২ সেমি, লাল। কমলা বা বাদামী ও সাদা চিত্রবিচিত্র, শুষ্ক অবস্থায় অস্থিময়, পুষ্প মুকুল ৩.৫ সেমি লম্বা, বিডিম্বাকার থেকে দীর্ঘায়ত, পুষ্পবৃন্ত ৫-৮ সেমি লম্বা।

বৃত্যংশ ৫টি ও সেগুলো মুক্ত অবস্থায় থাকে।  এদের দৈর্ঘ্য আড়াই থেকে সাড়ে তিন ও প্রস্থ ০.৭ থেকে ১.০ সেমি। বৃত্যংশ দীর্ঘায়ত, দীঘা, মসৃণ, বহিরাংশ হলদে সবুজ, অভ্যন্তর গাঢ় ও উজ্জ্বল লাল, প্রস্ফুটিত পুষ্পে পাশ্চাদমুখী বক্র।

পাপড়ি ৫টি, মুক্ত, দৈর্ঘ্য ৩ থেকে ৫ সেমি ও প্রস্থ ৪ থেকে সাড়ে ৪ সেমি, বর্তুলাকার, কমলা বা গাঢ় লাল, অসম, মূলীয় অংশে ২-৩ সেমি লম্বা, দলবৃন্ত, ধ্বজক গৌরবর্ণ লাল। রেখাযুক্ত, প্রায় ৪.৫ সেমি আড়াআড়ি, দলবৃন্ত ৩ সেমি লম্বা, অপর ৪টি পাপড়ি ডিম্বাকার, গোলাকার, প্রায় ৫.৫ সেমি লম্বা, দলবৃন্ত ২.৫ সেমি লম্বা।

পুংকেশর ১০টি, পুংদন্ড প্রায় ৫.৫ সেমি লম্বা, মসৃণ, গাঢ় লাল, মূলীয় অংশ সাদা, পরাগধানী প্রায় ৪ মিমি লম্বা, দ্বিখন্ডিত, পৃষ্ঠলগ্ন । গর্ভাশয় সবুজ, সামান্য মখমলীয়, গর্ভদন্ড রৈখিক, রোম বিহীন, প্রায় ৩ সেমি লম্বা, গর্ভমুন্ড অস্পষ্ট। ফল পড, অবৃন্তক, ৩০-৬০ x ৪-৫ সেমি, রৈখিক-দীর্ঘায়ত, চ্যাপ্টা, সামান্য বক্র, তীর্যক দীর্ঘা, দোলকী, কাষ্ঠল, শুষ্কাবস্থায় কালচে, বিদারী, কপাটিকা ২টি, বীজ প্রতি পড়ে ২০-৪০টি, ১.৫-২.৫ x ০.৪-০.৬ সেমি, দীর্ঘায়ত বা উপবৃত্তাকার, সামান্য চাপা।[২]

ক্রোমোসোম সংখ্যা :

2n = ২৪ (Atchison, 1951); 2n = ২৮ (Jacob, 1940).

কৃষ্ণচূড়া গাছের বংশ বিস্তার ও চাষাবাদ:

ফুটন্ত কৃষ্ণচূড়া গাছ, আলোকচিত্র: Nicolasroe

পানির সুনিষ্কাশিত ব্যবস্থা ও রৌদ্রোজ্জ্বল শুষ্ক জমি কৃষ্ণচূড়া গাছের জন্য উপযোগী। কৃষ্ণচুড়া শিমজাতীয় উদ্ভিদের গোত্রভুক্ত, তাই ফলের সঙ্গে চ্যাপ্টা শিমের সাদৃশ্য স্পষ্ট। অবশ্য ফলেরা আকারে শিমের চেয়ে বহুগুণ বড়। কৃষ্ণচূড়ার কচি ফলেরা সবুজ, তাই পাতার ভিড়ে সহজে দেখা যায় না। শীতের হাওয়ায় পাতা ঝরে গেলেই ফল চোখে পড়ে। পাকা ফল গাঢ়-ধূসর ও কাষ্ঠকঠিন। নিষ্পত্র কৃষ্ণচূড়ার শাখায় যখন ফল ছাড়া আর কিছুই থাকে না, তখন তাকে বড়ই শ্রীহীন দেখায়। অবশ্য এ দুর্দিন ক্ষণস্থায়ী। বসন্তে কৃষ্ণচূড়ার দিন ফেরে, একে একে ফিরে আসে পাতার সবুজ, প্রস্ফুটনের বহুবর্ণ দীপ্তি, নিঃশব্দে ঝরে পড়ে বিবর্ণ ফলেরা। কৃষ্ণচূড়া দৃষ্টিনন্দন শোভা আবার ফিরে পায়।

বিস্তৃতি:

আদিনিবাস মাদাগাস্কার । ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, মায়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা। বাংলাদেশের সর্বত্র জন্মে।

অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব: বাহারি ও ছায়াপ্রেমী উদ্ভিদরূপে উদ্যান, পার্ক পথিপার্শ্ব অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান এমনকী উন্মুক্ত প্রাঙ্গনে রোপণ করা হয়। গ্রীষ্মে এর চোখ ধাঁধানো পুষ্পের বাহার বেশ আঁকাল । অবশ্য এই বৃক্ষের নীচে তৃণ বা অনুরূপ উদ্ভিদ জন্মেনা।

কৃষ্ণচূড়া গাছের জাতিতাত্বিক ব্যবহার:

বাংলাদেশের কোনো কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এর পাতা ফুল দ্বারা পরিপার্শ্ব সুন্দর করে সাজানো হয়। কখনও শুকনো ডাল-পালা ও ফল। জ্বালানিরূপে ব্যবহার করা হয়।

অন্যান্য তথ্য:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৯ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) কৃষ্ণচূড়া প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে কৃষ্ণচূড়া সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।[২]  

সাহিত্য ও বাঙালি সংস্কৃতিতে:

কৃষ্ণচূড়া নিয়ে মাইকেল মধুসূদন দত্ত লিখেছেন,

বসুধা নিজ কুন্তলে পরেছিল কুতূহলে

এ উজ্জ্বল মণি

রাগে তারে গালি দিয়া লয়েছি

আমি কাড়িয়া

মোর কৃষ্ণচূড়া কেনে পরিবে ধরণী।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কৃষ্ণচূড়া নামে একে চিহ্নিত করা যায় কিনা তাতে সন্দেহের অবকাশ বর্তমান। কৃষ্ণচূড়ার মতোই একটি গুল্ম হচ্ছে ‘সিসালপিন পালচেরিমা’। সে একটি সম্পূর্ণ আলাদা জাতের গাছ। ডেলোনিক্সকে তাই অনেকে রক্তচূড়া বলার পক্ষপাতী। কেউ কেউ মনে করেন এই ফুলকে উনিশশ বায়ান্ন সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনাবলির আবেগাশ্রিত করার জন্য কৃষ্ণচূড়া নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। ধারণাটি সত্যায়নের জন্য কবি শামসুর রাহমানের কবিতার নিম্নোক্ত পক্তিমালা উদ্ধৃত হতে পারে:

আবার ফুটেছে দ্যাখো কৃষ্ণচূড়া থরে থরে শহরের পথে

কেমন নিবিড় হয়ে। কখনো মিছিলে কখনো-বা

একা হেঁটে যেতে যেতে মনে হয়—ফুল নয়, ওরা

শহীদের ঝলকিত রক্তের বুদ্বুদ, স্মৃতিগন্ধে ভরপুর।

একুশের কৃষ্ণচূড়া আমাদের চেতনারই রঙ।

আজ কৃষ্ণচূড়া নামটি প্রতিষ্ঠিত, এটি বদলানোর চেষ্টা থেকে বিরত থাকাই ভালো। সিসালপিনা পালচেরিমার অন্য নাম রাধাচূড়াই ওর জন্য নির্দিষ্ট থাক।

বৃদ্ধি অত্যন্ত দ্রুত বিধায় গ্রামাঞ্চলে জ্বালানি হিসেবে গাছটির নির্বাচন আদর্শ বটে। ওর কাছাকাছি এমন গাছ লাগানো দরকার যারা প্রস্ফুটনে ওদেরই সমকালীন এবং বর্ণে কিছুটা নমনীয় ও মধুর। কৃষ্ণচূড়ার প্রকট ঔজ্জ্বল্যকে সহনীয় ও শোভন করার পক্ষে এরূপ রোপণ খুবই জরুরি।

কৃষ্ণচূড়ার কাণ্ড ও শাখা-প্রশাখা তেমন শক্ত নয়। ঝড়ে এই গাছ সহজেই ভেঙে পড়ে। এদের নিচে ঘাস কিংবা অন্য কোনো গুলুজাতীয় গাছপালা জন্মানো কঠিন। রোপণকালে এসব ক্রটির প্রতি নজর রাখা প্রয়োজন। কোনো দারুমূল্য নেই, কাঠ হালকা এবং জ্বালানি হিসেবেই প্রধানত ব্যবহার্য।

কৃষ্ণচূড়া ঢাকার অন্যতম প্রধান বীথিতরু। পার্ক অ্যাভিনিউ, ময়মনসিংহ রোডে অঢেল কৃষ্ণচূড়া। শেরেবাংলা নগরে এখন একটি সুদৃশ্য বীথি আছে।

বীজ থেকে চারা জন্মানো সহজ। তিন-চার বছরেই গাছে ফুল ধরে। পথ ছাড়া বিস্তৃত অঙ্গন, বাড়ির সীমানা, লেকের পাড়েও রোপণ প্রশস্ত। অন্তত সিকি বিঘা চওড়া সবুজ তৃণাচ্ছন্ন দীর্ঘ এক ফালি জমির ওপর সারিবদ্ধভাবে কৃষ্ণচূড়া লাগানোই আদর্শ রোপণ। এতে এই গাছে চেরির সৌন্দর্য ফোটে।[৩]

তথ্যসূত্র:

১. ড. মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ ফুলের চাষ প্রথম সংস্করণ ২০০৩ ঢাকা, দিব্যপ্রকাশ, পৃষ্ঠা ১৩৫। আইএসবিএন 984-483-108-3

২. বি এম রিজিয়া খাতুন (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ৭ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ১৩০-১৩১। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

৩. দ্বিজেন শর্মা, শ্যামলী নিসর্গ, কথাপ্রকাশ, ঢাকা, চতুর্থ মুদ্রণ, জানুয়ারি ২০১৬ পৃষ্ঠা ১১৬-১১৮।

আরো পড়ুন:  কাকরনডা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশে জন্মানো ভেষজ গুল্ম

Leave a Comment

error: Content is protected !!