দেশি গাব দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভেষজ ফলদ সপুষ্পক বৃক্ষ

দেশি গাব (বৈজ্ঞানিক নাম: Diospyros malabarica) গ্রাম-বাংলার এক ঐতিহ্যবাহী এবং অতি পরিচিত চিরসবুজ ফলদ বৃক্ষ। এবিনাসি (Ebenaceae) পরিবারের ডিয়োসপিরোস (Diospyros) গণের অন্তর্ভুক্ত এই সপুষ্পক উদ্ভিদটি মূলত একটি ছোট থেকে মাঝারি আকৃতির চিরহরিৎ গাছ। প্রাকৃতিকভাবে এটি আমাদের দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি স্থানীয় (Native) প্রজাতি। এর ভেষজ গুণাবলী, আঠালো ফলের বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং স্নিগ্ধ ছায়ার কারণে গ্রামীণ জনপদে এই গাছের গুরুত্ব অপরিসীম।

📋 দেশি গাবের বৈজ্ঞানিক পরিচিতি ও শ্রেণিবিন্যাস

একটি উদ্ভিদের সঠিক পরিচিতি ও গবেষণার জন্য এর উদ্ভিদবিজ্ঞান সংক্রান্ত নাম ও টেক্সোনমি জানা অত্যন্ত জরুরি। নিচে দেশি গাবের বৈজ্ঞানিক নাম, গুরুত্বপূর্ণ সমনাম এবং সম্পূর্ণ জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস (Scientific Classification) তুলে ধরা হলো:

🔹 সাধারণ ও স্থানীয় নামসমূহ

  • বাংলা নাম: গাব বা দেশি গাব।
  • আঞ্চলিক/স্থানীয় নাম: মাকুর কোন্দি, কালা-তেন্দু।
  • ইংরেজি নাম: Indian Persimmon, River Ebony, Malabar Ebony, Wild Mangosteen.

🔹 বৈজ্ঞানিক নাম ও সমনাম (Synonyms)

  • বৈজ্ঞানিক নাম: Diospyros malabarica (Desr.) Kostel., Allg. Med.-Pharm. Fl. 3: 1099 (1834).
  • সমনাম (Synonyms):
    • Diospyros embryopteris Pers. (1807)
    • Diospyros peregrina Guerke (1891)

🔹 জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস (Taxonomy)

শ্রেণীবিন্যাস স্তরবৈজ্ঞানিক নাম ও বাংলা অর্থ
জগৎ/রাজ্য (Kingdom)Plantae (উদ্ভিদ জগৎ)
শ্রেণী (Clade)Eudicots (দ্বিবীজপত্রী)
উপশ্রেণি (Clade)Asterids
বর্গ (Order)Ericales
পরিবার (Family)Ebenaceae (এবিনাসি পরিবার)
গণ (Genus)Diospyros
প্রজাতি (Species)D. malabarica

🌿 দেশি গাব গাছের শারীরিক গঠন ও বাকলের বৈশিষ্ট্য

দেশি গাব গাছ তার ডালপালার বিন্যাস এবং বিশেষ ধরণের বাকলের কারণে খুব সহজেই চেনা যায়। এর প্রধান শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • আকৃতি ও উচ্চতা: দেশি গাব একটি মাঝারি আকৃতির চিরসবুজ বৃক্ষ, যা প্রাকৃতিকভাবে প্রায় ১৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। এর গাছের শীর্ষদেশ বা মাথার অংশটি বেশ ঝোপাকৃতি বা ছড়ানো হয়।
  • দেহকাণ্ড ও বাকল: এর মূল দেহকাণ্ডটি বিভিন্ন গাঁট ও আঁচিলযুক্ত প্রকৃতির হয়ে থাকে। এর বাকল বা ছালের রঙ কালো-বাদামী এবং এর গায়ে অসংখ্য সাদা দাগ দেখা যায়। বাকল তুলে ফেললে ভেতরের অংশটি গাঢ় লাল ও আঁশালো দেখায়।
  • পাতার গঠন ও পরিমাপ: গাছের পাতাগুলো সরল ও একান্তর (Alternate) বিন্যাসে সাজানো থাকে। পাতা সাধারণত আকারে ১০-২০ সেমি লম্বা এবং ৩-৬ সেমি চওড়া হয়। পাতাগুলো সরু ও দীর্ঘায়ত আকৃতির, যার গোড়ার অংশ ভোঁতা বা গোলাকার থাকে। পাতার উভয় পিঠ সম্পূর্ণ রোমহীন (মসৃণ) এবং এর বোঁটা বা বৃন্ত ১.০ থেকে ১.৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয়।

🌸 দেশি গাব ফুলের অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্য ও পরাগায়ন

দেশি গাব গাছের ফুলগুলো একলিঙ্গ (অর্থাৎ পুংপুষ্প ও স্ত্রীপুষ্প আলাদা) এবং চতুরাংশক প্রকৃতির হয়। এই ফুলগুলো সাদাটে রঙের এবং বেশ সুগন্ধি যুক্ত হয়ে থাকে।

  • পুংপুষ্প (Male Flower): পুংপুষ্পগুলো খাটো ও মরিচা বর্ণের রোমযুক্ত মঞ্জরীদণ্ডে ২ থেকে ৭টি ফুল একসাথে গুচ্ছ আকারে থাকে। ফুলগুলোতে রেশমি সুতার মতো ২৪ থেকে ৬৪টি পুংকেশর থাকে।
  • স্ত্রীপুষ্প (Female Flower): স্ত্রীপুষ্পগুলো সাধারণত একক (একল) হিসেবে ফোটে, তবে কদাচিৎ একসাথে ৫টির মতো ফুল অর্ধ-বৃন্তক অবস্থায় দেখা যায়। এগুলো পুংপুষ্পের চেয়ে আকারে বড় এবং এর মঞ্জরীদণ্ডটি শক্ত রোমশ হয়।
  • গর্ভাশয় ও প্রকোষ্ঠ: এর গর্ভাশয় ডিম্বাকার এবং এতে ৮ থেকে ১২টি প্রকোষ্ঠ থাকে। ফুলে ৪টি গর্ভদণ্ড এবং ৮টি গর্ভমুণ্ড থাকে, পাশাপাশি ৪ থেকে ১২টি বন্ধ্যা পুংকেশরও দেখা যায়।

🍈 ফল, বীজ এবং ফুল-ফল ধারণের সময়

  • ফলের আকৃতি ও প্রকৃতি: দেশি গাবের ফল মূলত একটি গোলাকার ‘বেরি’ (Berry) জাতীয় ফল। এটি আড়াআড়িভাবে প্রায় ৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত চওড়া বা বড় হতে পারে।
  • পরিপক্ক ফল: কাঁচা অবস্থায় ফল সবুজ থাকলেও পরিপক্ক বা পাকা অবস্থায় এটি চমৎকার আকর্ষণীয় হলুদ রঙ ধারণ করে।
  • বীজ ও আঠা: প্রতিটি ফলের ভেতরে ৫ থেকে ৮টি চাপা আকৃতির বীজ থাকে। এই বীজগুলো ফলের ভেতরের অত্যন্ত আঠালো ও রসালো অংশে ডুবো অবস্থায় নিহিত থাকে।
  • মৌসুম বা সময়কাল: দেশি গাব গাছে ফুল ও ফল ধারণের মূল সময়কাল হলো প্রতি বছরের মে থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত।

🧬 দেশি গাবের ক্রোমোসোম সংখ্যা (Chromosome Number)

উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, দেশি গাব গাছের কোষে বংশগতির বাহক বা ক্রোমোসোম সংখ্যা সুনির্দিষ্ট থাকে। বিখ্যাত গবেষক কুমার এবং সুব্রামনিয়াম-এর (Kumar and Subramaniam, 1986) প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী এই উদ্ভিদের ডিপ্লয়েড (Diploid) কোষে ক্রোমোসোমের সংখ্যা হলো:

  • ক্রোমোসোম সংখ্যা (2n): ৩০ (2n = 30)[১]

🏡 দেশি গাবের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও উপযুক্ত পরিবেশ

দেশি গাব প্রাকৃতিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য আর্দ্র ও স্নিগ্ধ পরিবেশ সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে। এর উপযুক্ত আবাসের প্রধান দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • পছন্দসই পরিবেশ: দেশি গাব গাছ সাধারণত বিভিন্ন জলাশয়ের নিকটবর্তী স্যাঁতসেঁতে ও ছায়াযুক্ত স্থানে প্রাকৃতিকভাবে সবচেয়ে ভালো জন্মে।
  • অনুকূল স্থান: নদী, খাল-বিল, পুকুর পাড় কিংবা গ্রামীণ ঝোপঝাড়ের আর্দ্র ও ভেজা মাটি এই গাছের দ্রুত বৃদ্ধি এবং দীর্ঘকাল বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। ছায়াময় পরিবেশ হলেও এই গাছ অনায়াসে নিজের বৃদ্ধি বজায় রাখতে পারে।

🌍 দেশি গাবের ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও আবাসস্থল

দেশি গাব মূলত এশিয়ার ক্রান্তীয় বা ট্রপিক্যাল অঞ্চলের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সুপরিচিত বৃক্ষ। বিশ্বজুড়ে এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর ভৌগোলিক বিস্তৃতির বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:

  • আন্তর্জাতিক বিস্তৃতি: এই প্রজাতিটি প্রাকৃতিকভাবে সমগ্র দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। সাধারণত ভারত, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া—এই দেশগুলোর বনাঞ্চল ও গ্রামীণ পরিবেশে দেশি গাব গাছ প্রচুর পরিমাণে জন্মে থাকে।
  • বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: আমাদের দেশের মাটি ও আবহাওয়া এই গাছের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। গ্রামীণ জনপদে এর নান্দনিক সৌন্দর্য, ফল এবং স্নিগ্ধ ছায়ার কারণে বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলের গ্রামীণ বাড়ির আঙিনায় ও বাগানে শখ করে কিংবা ঐতিহ্য ধরে রাখতে দেশি গাব গাছের চাষাবাদ করা হয়।

🩺 দেশি গাবের ভেষজ ও ওষধি গুণাগুণ (Medicinal Benefits)

প্রথাগত এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে দেশি গাব গাছের প্রতিটি অংশ—বাকল, ফুল, ফল থেকে শুরু করে বীজ পর্যন্ত—অত্যন্ত উপকারী। এর প্রধান ভেষজ গুণগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • আমাশয় ও পেটের সমস্যায়: দেশি গাবের বাকল (ছাল) এবং অপরিপক্ক বা কাঁচা ফল প্রাকৃতিকভাবে সঙ্কোচক (Astringent) গুণসম্পন্ন। এটি আমাশয়, উদরাময় (ডায়রিয়া) এবং পৈত্তিক সমস্যা দূর করতে দারুণ কাজ করে। এর বীজও আমাশয় নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়।
  • গলার ঘা ও মুখের ক্ষত দূরীকরণে: গলার ঘা উপশমের জন্য কাঁচা গাব ভিজানো পানি দিয়ে কুলকুচি বা গারগল (Gargle) করা হয়। এছাড়া ফলের রস ক্ষত এবং আলসার নিরাময়ে সরাসরি ব্যবহার করা যায়।
  • শিশু ও শ্বাসকষ্টের চিকিৎসায়: শিশুদের হঠাৎ হিক্কা (Hiccup) বা হেঁচকি ওঠা রোগে গাব ফুল ও ফল উপকারী। এছাড়া এর শক্ত বৃতি ও ফলের মঞ্জরীদণ্ড ফুটিয়ে তৈরি ক্বাথ কাশি ও শ্বাসকষ্টের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
  • আধুনিক গবেষণার ফলাফল: গাবের কাণ্ডের বাকল থেকে প্রাপ্ত ইথানল নির্যাস ল্যাবরেটরিতে প্রোটোজোয়া ও ভাইরাস প্রতিরোধী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়াও এটি মূত্রবর্ধক (Diuretic), রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হ্রাসকারী (অ্যান্টি-ডায়াবেটিক) এবং ক্যানসার প্রতিরোধী উপাদান হিসেবে কাজ করে।

⚠️ গুগল পলিসি সতর্কবার্তা: চিকিৎসার উদ্দেশ্যে গাবের কোনো অংশ বা নির্যাস ব্যবহারের পূর্বে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।

📊 দেশি গাবের পুষ্টিগুণ (Nutritional Value per 100g)

দেশি গাবের পাকা ফল অত্যন্ত রসালো ও সুস্বাদু। এর প্রতি ১০০ গ্রাম টাটকা রসালো অংশে যেসকল পুষ্টি উপাদান রয়েছে তা নিচে দেওয়া হলো:

  • পানি: ৬৯.৬ গ্রাম
  • শর্করা (Carbohydrates): ২৬.৯ গ্রাম (নোট: আপনার দেওয়া ২৬৯ গ্রাম সম্ভবত টাইপো ছিল, যা পুষ্টিবিজ্ঞান অনুযায়ী ২৬.৯ গ্রাম হবে)
  • আমিষ (Protein): ১.৪ গ্রাম
  • আঁশ (Fiber): ১.৫ গ্রাম
  • খনিজ পদার্থ (Minerals): ০.৮ গ্রাম
  • চর্বি (Fat): ০.১ গ্রাম
  • ক্যালসিয়াম: ৫৮ মিলিগ্রাম
  • খাদ্য শক্তি (Energy): ১১৩ কিলোক্যালরি (kcal)

🪵 কাঁচা গাবের বাণিজ্যিক ব্যবহার ও কাঠের উপযোগিতা

  • ট্যানিনের প্রাচীন ব্যবহার: কাঁচা গাবে প্রচুর পরিমাণে ট্যানিন (Tannin) থাকে। এই কষ বা আঠা প্রাচীনকাল থেকে আমাদের দেশে মাছ ধরার জাল টেকসই ও নোনা পানি প্রতিরোধী করতে (জাল পাকা করা), চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে, বাঁশ ও কাঠের ঝুড়ি তৈরিতে এবং কাপড়ে স্থায়ী রঙ করার কাজে বহুল ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
  • কাঠের গুণগত মান: দেশি গাব গাছের কাঠ মাঝারি ধরণের শক্ত ও বেশ ভারী হয়। এই কাঠে খুব সুন্দর বার্নিশ বা পালিশ করা যায়। ফলে সাধারণ ঘরবাড়ির নির্মাণ কাজে এবং দেশি নৌকার মজবুত মাস্তুল তৈরিতে গাব কাঠ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

🏹 দেশি গাবের জাতিতাত্ত্বিক ও লোকজ চিকিৎসা ব্যবহার (Ethnobotany)

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশি বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মাঝে দেশি গাব গাছের ফল ঐতিহ্যগত ও প্রথাগত চিকিৎসায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নিচে এর সুনির্দিষ্ট কিছু লোকজ ব্যবহার তুলে ধরা হলো:

  • সাঁওতাল আদিবাসীদের চিকিৎসা (বৃক্কের পাথর উপশমে): বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সাঁওতাল আদিবাসী সম্প্রদায়ের মাঝে কিডনি বা বৃক্কের পাথর গলানোর জন্য দেশি গাবের এক বিশেষ ঘরোয়া ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। তারা দেশি গাবের অর্ধপাকা ফলের রসের সাথে লাইম ওয়াটার (চুনের পানি) এবং রাইস বিয়ার (হাঁড়িয়া) যথাক্রমে ১:১:২ অনুপাতে মিশ্রিত করে একটি বিশেষ ভেষজ মিশ্রণ তৈরি করে এবং তা নিরাময়ের উদ্দেশ্যে গ্রহণ করে থাকে।
  • লোধা আদিবাসীদের চিকিৎসা (উদরাময় রোগে): ভারতের মেদিনীপুর ও বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলে বসবাসকারী লোধা আদিবাসী সম্প্রদায় তীব্র ডায়রিয়া বা উদরাময় রোগের চিকিৎসায় দেশি গাব ব্যবহার করে। তারা কাঁচা গাব ফলের ক্বাথ বা রস তৈরি করে তার সাথে গোলমরিচ মিশ্রিত করে অত্যন্ত কার্যকরী এক ভেষজ ওষুধ হিসেবে সেবন করে থাকে।

সতর্কতা: উপরোক্ত তথ্যগুলো সম্পূর্ণই আদিবাসী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যগত ও লোকজ বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে সংকলিত। যেকোনো জটিল শারীরিক সমস্যায় বা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভেষজ উপাদান গ্রহণের পূর্বে অবশ্যই একজন নিবন্ধিত আধুনিক চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

🌱 দেশি গাবের বংশবিস্তার পদ্ধতি (Propagation)

দেশি গাব গাছের চারা তৈরি এবং বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সহজ ও প্রাকৃতিক। এর মূল বংশবিস্তার পদ্ধতি নিচে দেওয়া হলো:

  • বীজের মাধ্যমে বংশবিস্তার: দেশি গাব প্রধানত এর বীজের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে থাকে। পরিপক্ক বা পাকা ফল থেকে বীজ সংগ্রহ করে তা সরাসরি নার্সারির পলিব্যাগে বা বাগানের নির্দিষ্ট মাটিতে রোপণ করলে অনায়াসে নতুন চারা গজিয়ে ওঠে। এর প্রাকৃতিক আঠালো ও রসালো অংশে বীজ নিহিত থাকায় প্রাকৃতিকভাবেই এর অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা বেশ ভালো হয়।

🛡️ দেশি গাব গাছের সংরক্ষণ অবস্থা ও সরকারি মূল্যায়ন

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের অফিশিয়াল ডাটাবেজ অনুযায়ী, আমাদের দেশে দেশি গাব (Diospyros malabarica) উদ্ভিদের বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিচে তুলে ধরা হলো:

  • সংরক্ষণ অবস্থা (Conservation Status): ২০১০ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ’-এর ৭ম খণ্ডে দেশি গাব প্রজাতিটি সম্পর্কে অত্যন্ত ইতিবাচক ও স্বস্তিদায়ক তথ্য দেওয়া হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রাকৃতিকভাবে এই উদ্ভিদের বিলুপ্ত বা সংকটাপন্ন হওয়ার মতো কোনো কারণ নিকট ভবিষ্যতে দেখা যাওয়ার আশঙ্কা নেই। অর্থাৎ, বাংলাদেশে দেশি গাব গাছ সম্পূর্ণ আশঙ্কামুক্ত বা কম ঝুঁকিপূর্ণ (Least Concern – LC) হিসেবে অফিশিয়ালি বিবেচিত।
  • সহজলভ্যতা: আমাদের দেশের অবহাওয়া ও মাটির গুণের কারণে গ্রামীণ জনপদে এই গাছটি এখনো বেশ সহজলভ্য এবং প্রাকৃতিকভাবেই এর বিস্তার ঘটছে।
  • সংরক্ষণ পদক্ষেপ: যেহেতু এটি কোনো বিপন্ন বা হুমকিতে থাকা উদ্ভিদ নয়, তাই বাংলাদেশে প্রাকৃতিকভাবে দেশি গাব সংরক্ষণের জন্য আলাদাভাবে সরকারি বা বেসরকারি কোনো বিশেষ সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়নি।
  • ভবিষ্যৎ সুপারিশ: জ্ঞানকোষে এই প্রজাতির বর্তমান বিস্তৃতি ও সংখ্যা সন্তোষজনক বিবেচনা করে চূড়ান্ত প্রস্তাব করা হয়েছে যে, দেশি গাব উদ্ভিদের সুরক্ষার জন্য এই মুহূর্তে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো জরুরি বা কৃত্রিম সংরক্ষণ ব্যবস্থার আশু পদক্ষেপ গ্রহণ সম্পূর্ণ নিষ্প্রয়োজন।[২]

❓ দেশি গাব সম্পর্কিত সাধারণ কিছু প্রশ্নোত্তর (FAQs)

প্রশ্ন ১: দেশি গাবের বৈজ্ঞানিক নাম কী এবং এর আদি নিবাস কোথায়?
উত্তর: দেশি গাবের বৈজ্ঞানিক নাম হলো Diospyros malabarica এবং এটি এবিনাসি (Ebenaceae) পরিবারের একটি উদ্ভিদ। এই চিরসবুজ ফলদ বৃক্ষটির মূল আদি নিবাস বা উৎপত্তিস্থল হলো দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া।

প্রশ্ন ২: প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা দেশি গাবে কী কী পুষ্টি উপাদান থাকে?
উত্তর: প্রতি ১০০ গ্রাম টাটকা রসালো দেশি গাব থেকে ১১৩ কিলোক্যালরি (kcal) খাদ্যশক্তি পাওয়া যায়। এর পুষ্টি উপাদানগুলো হলো:

  • পানি: ৬৯.৬ গ্রাম
  • শর্করা: ২৬.৯ গ্রাম
  • আঁশ: ১.৫ গ্রাম
  • আমিষ: ১.৪ গ্রাম
  • খনিজ পদার্থ: ০.৮ গ্রাম
  • ক্যালসিয়াম: ৫৮ মিলিগ্রাম
  • চর্বি: ০.১ গ্রাম

প্রশ্ন ৩: ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পে ও লোকজ কাজে কাঁচা গাবের কষ বা আঠা কী কী উপায়ে ব্যবহৃত হয়?
উত্তর: কাঁচা গাবে প্রচুর পরিমাণে ট্যানিন (Tannin) থাকায় এর কষ বা আঠা প্রাচীনকাল থেকে মাছ ধরার জাল টেকসই ও নোনা পানি প্রতিরোধী করতে (জাল পাকা করা), চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে, বাঁশ ও কাঠের ঝুড়ি দীর্ঘস্থায়ী করতে এবং কাপড়ে পাকা রঙ করার কাজে ব্যবহার করা হয়।

প্রশ্ন ৪: কিডনির পাথর ও ডায়রিয়া নিরাময়ে সাঁওতাল ও লোধা আদিবাসীরা কীভাবে গাব ব্যবহার করে?
উত্তর: সাঁওতাল আদিবাসীরা বৃক্কের (কিডনি) পাথর গলানোর জন্য অর্ধপাকা গাবের রসের সাথে চুনের পানি ও রাইস বিয়ার ১:১:২ অনুপাতে মিশিয়ে সেবন করে। অন্যদিকে, লোধা আদিবাসীরা তীব্র ডায়রিয়া বা উদরাময় রোগের চিকিৎসায় কাঁচা গাব ফলের ক্বাথ গোলমরিচের সাথে মিশ্রিত করে ভেষজ ওষুধ হিসেবে গ্রহণ করে।

প্রশ্ন ৫: বাংলাদেশে দেশি গাব গাছের বর্তমান অফিশিয়াল সংরক্ষণ অবস্থা কী?
উত্তর: ‘বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ’ (২০১০)-এর অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী, দেশি গাব বাংলাদেশে সম্পূর্ণ আশঙ্কামুক্ত বা কম ঝুঁকিপূর্ণ (Least Concern – LC) হিসেবে বিবেচিত। দেশের গ্রামীণ জনপদে এটি অত্যন্ত সহজলভ্য হওয়ায় রাষ্ট্রীয়ভাবে এর জন্য কোনো জরুরি বা কৃত্রিম সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপের প্রয়োজন নেই।

আরো পড়ুন

📚 তথ্যসূত্র ও সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি (References)

১. Kumar, V. and Subramaniam, B. (1986).Chromosome Atlas of Flowering Plants of the Indian Subcontinent. Vol. 1: Dicotyledons. Calcutta: Botanical Survey of India. p. 464.
২. হাবীব, এম আহসান (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”। আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান (সম্পাদকেরা)। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষখণ্ড ৭ (১ম সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা: ৩৬৫-৩৬৬। আইএসবিএন: 984-30000-0286-0
৩. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৭ জুন ২০১৮ তারিখে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ০৪ জুন ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!