করঞ্জা ফেবাসি পরিবারের পঙ্গামিয়া গণের ঘন ডালপালা বিশিষ্ট চিরসবুজ বৃক্ষ

ভূমিকা:  করঞ্জা (বৈজ্ঞানিক নাম: Pongamia pinnata ইংরেজি: Indian Beach, Poongan Oil Plant) হচ্ছে ফেবাসি পরিবারের পঙ্গামিয়া গণের ঘন ডালপালা বিশিষ্ট চিরসবুজ বৃক্ষ। এই প্রজাতিটি দেখতে অনেকটা বট গাছের মতো।

বৈজ্ঞানিক নাম: Pongamia pinnata (L.) Pierre, For. Fl. Cochin.: 385 (1899). সমনাম: Cytisus pinnatus L. (1753), Pongamia glabra Vent. (1803). ইংরেজি নাম: Indian Beach, Poongan Oil Plant. স্থানীয় নাম: করঞ্জা, করচ, কামজ।

জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস জগৎ/রাজ্য: Plantae; বিভাগ: Angiosperms; অবিন্যাসিত: Edicots; অবিন্যাসিত: Rosids; বর্গ: Fabales; পরিবার: Fabaceae; গণ: Pongamia; প্রজাতি: Pongamia pinnata.

করচ বা করঞ্জা গাছের বর্ণনা:

করঞ্জা ছোট আকারের চিরহরিৎ বৃক্ষ। এই গাছের গুঁড়ি খর্বাকার এবং ছড়ানো চূড়া বিশিষ্ট। গাছের প্রতিটি অংশ মসৃণ বা কচি বীটপর রং রুপালী রোমাবৃত। করচের বাকল পাতলা, ধূসরাভ বাদামি বা সবুজাভ, সমতল, গুটিকাময় এবং ভেতরের বাকল হলুদাভ বা হালকা বাদামি, নরম; যদিও  গাছটি অপ্রীতিকর গন্ধ বিশিষ্ট।

গাছের পাতা একান্তর, অচূড় পক্ষল। পত্রক ৫ থেকে ৯টি, প্রতিমুখ, ডিম্বাকার-আয়তাকার বা উপবৃত্তাকার। পাতার দৈর্ঘ্য ৫-১০ সেমি ও প্রস্থ ২-৭ সেমি। তবে প্রান্তীয় পত্রকটি সর্ব বৃহৎ, চকচকে সবুজ রঙের, মসৃণ, খর্ব দীর্ঘাগ্র। পাতার পাদদেশ প্রায় কীলকাকার বা গোলাকার, উপপত্র খর্বাকার, উপপত্রিকা অনুপস্থিত।

ফুলের রং সাদা ও বেগুনি রঙের; শিথিল কাক্ষিক রেসিমে, মঞ্জরীপত্র খর্বাকার, আশুপাতী, মঞ্জরীপত্রিকা ক্ষুদ্র। বৃতি দেখতে ঘন্টার মতো, খাতাগ্র ও দন্তক অস্পষ্ট। দলমন্ডল অনেকখানি বের হয়ে থাকে। আদর্শ পাপড়ি প্রায় বর্তুলাকার, বৃন্তের উপরে বক্র ভজ বিদ্যমান, পক্ষ তির্যক আয়তাকার, উপরের দিকটা কিঞ্চিৎ যুক্ত।

ফুলের পুংকেশর ১০টি, একগুচ্ছীয়, ধ্বজকীয় পুংদন্ডগুলো নিচে এবং উপরে যুক্ত। এদের পরাগধানী সমাকৃতির। গর্ভাশয় প্রায় অবৃন্তক, ডিম্বক ২টি, গর্ভদন্ড ভেতরের দিকে বাঁকা, কন্টকিত, গর্ভমুণ্ড মুণ্ডাকার। ফল পড আকৃতির। ফলের দৈর্ঘ্য ৩.৫ থেকে ৫.০ ও ১.৮-৩.০ সেমি। চ্যাপ্টা আকারের ফল তির্যক আয়তাকার, ওষ্ঠবিশিষ্ট, কমবেশী চাপা, অবিদারী। রং বাদামি ও আবরণ খুব শক্ত। বীজ ১টি, বৃক্কাকার, সাদা।[১]

আরো পড়ুন:  গাঁদা গিলা পার্বত্যঞ্চলে জন্মানো উপকারী উদ্ভিদ

চাষাবাদ ও বংশ বিস্তার: করঞ্জা আবাসস্থল গ্রামের ঝোপ-ঝাড়, জলমগ্ন ভূমি এবং অরণ্য।  সমুদ্রের পাড় বা দ্বীপাঞ্চলের নালা বা ছোট নদীর পাশে, বিল বা হাওড়ে চির সবুজ গাছ হিসাবে দেখা যায়। করঞ্জা উপকূলীয় অঞ্চলে ও সুন্দরবনে বেশি জন্মে।[২] এর বংশ বিস্তার হয় বীজ দ্বারা। এছাড়া কর্তিত শাখার সাহায্যেও নতুন চারার জন্ম হয়। গাছে ফুল ও ফল ধারণ মার্চ থেকে জুলাই মাসের মধ্যে।

ক্রোমোসোম সংখ্যা: ২n = ২০, ২২ (Fedorov, 1969)।

বিস্তৃতি: ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, মায়ানমার, দক্ষিণ চীন, ফিজি, উত্তর অষ্ট্রেলিয়া, পলিনেশিয়া এবং মাস্কারেন দ্বীপপুঞ্জ। বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চলে এই গাছ পাওয়া যায়।

করঞ্জা অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব:

ছায়া ঘেরা বা বাগানে বা রাস্তার ধারে শোভাবর্ধনকারী গাছ হিসাবে করঞ্জা বা করচের গুরুত্ব অনেক। রেলষ্টেশনের প্লাটফর্ম, যাত্রী নিবাসের চারপাশে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ বজায় রাখে এই গাছ লাগিয়ে থাকে। এই গাছের ভেষজ গুণ থাকায় অনেকে বাড়ির বাগানে লাগায়। এর পাতা চর্মরোগ সারাতে বেশ উপকারী। এছাড়া পাতা থেকে সবুজসার তৈরি করা হয়। সাদা পিঁপড়ের আক্রমণ প্রতিহত করতে এর পাতা ব্যবহার করা হয়।[৩]  

করঞ্জা গাছ রাস্তার পাশের উদ্ভিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বীজ থেকে প্রাপ্ত কমলা বর্ণের তেল সাবান তৈরিতে, ভার্নিশ, কুপি জ্বালাতে এবং বাতের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। ইহার পাতা উৎকৃষ্ট সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শিকড়ের বাকলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ফ্লাভোনয়েডস্ বিদ্যমান। বীজে ক্রিষ্টালাইন জাতীয় পদার্থ কারামজিন, পোঙ্গামল, গ্ল্যাবরিন এবং পোঙ্গাপাইন fansania (Ghani, 2003)

করঞ্জার জাতিতাত্বিক ব্যবহার

বাতের যন্ত্রণা লাঘবে ইহার পাতার ক্বাথ দিয়ে অবগাহন করা হয়। বীজ হৃদযন্ত্রের বলকারক, রক্ত পরিশোধক, ফোলা লাঘবকারী, কর্ণশূল নিরাময়ক, মেরুদন্ডের ব্যাথা এবং বক্ষ জটিলতায় উপকারী। পরজীবী ঘটিত আলসার নিরাময়ে ইহার পাতা পট্টি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রক্তঝরা পাইলস নিরাময়ে ইহার টাটকা বাকল আভ্যন্তরীণভাবে ব্যবহৃত হয় (Kirtikar et al., 1935)।

আরো পড়ুন:  স্থলপদ্ম গাছ-এর নানাবিধ ভেষজ উপকারিতা

অন্যান্য তথ্য: বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৮ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০)  করঞ্জা  প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে করঞ্জা  সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে অঞ্চল ভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার পাশাপাশি অধিক বনায়নের সুপারিশ করা।[১] 

তথ্যসূত্র:

১. এ টি এম নাদেরুজ্জামান (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ৮ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ১৫৭-১৫৮। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

২. শেখ সাদী, উদ্ভিদকোষ, দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০০৮, পৃষ্ঠা, ৮৩, আইএসবিএন ৯৮৪-৪৮৩-৩১৯-১।

৩. বলাইলাল জানা, ক্যাকটাস ও ফুলচাষ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তকপর্ষৎ, দ্বিতীয় মুদ্রণ- জানুয়ারী ১৯৯৩, পৃষ্ঠা, ২০১।

Leave a Comment

error: Content is protected !!