মুচকুন্দচাঁপা দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সুগন্ধি শোভাবর্ধনকারী ও ঔষধি বৃক্ষ

ভূমিকা: মুসকান্দা (বৈজ্ঞানিক নামPterospermum acerifolium ইংরেজি: Oleander, Roseberry Spurge) মালভাসি পরিবারের,  স্টোরোস্পার্মাম গণের একটি এক প্রকারের ঘন পাতাবিশিষ্ট গুল্ম। চিরসবুজ এই বৃক্ষটি ভারতীয় প্রজাতি।

বৈজ্ঞানিক নাম: Pterospermum acerifolium (L.) Willd., Sp. Pl. 3: 729 (1800).  সমনাম: Pentapetes acerifolia L. (1753). ইংরেজি নাম : Mapple-leaved Bayur, Dinnerplate Tree. স্থানীয় নাম: মুসকান্দা, মুচাকুন্দা, কনক-চাঁপা। জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস জগৎ/রাজ্য: Plantae. বিভাগ: Angiosperms. অবিন্যাসিত: Edicots. বর্গ: Malvales. পরিবার: Malvaceae. গণ: Pterospermum প্রজাতির নাম: Pterospermum acerifolium

মুচকুন্দচাঁপা গাছের বর্ণনা:

মুচকুন্দচাঁপা বা মুচকুন্দ বিশাল আকারের গাছ। গাছের উচ্চতা ৫০-৬০ ফুট হয়ে থাকে। এদের পাতা গোলাকার। পাতার উপরিভাগ উজ্জ্বল সবুজ চকচকে আর মসৃণ। পেছনটা রুক্ষ ধূসর। উচ্চতার জন্য গাছে ফুল দেখা কঠিনই বটে। মুচকুন্দ চাঁপা আড়াল বেশি পছন্দ করে।  এ গাছের পাতা অনেক বড় হবার কারণে ইংরেজিতে এর একটি প্রচলিত নাম Dinner Plate Tree. পাতার দৈর্ঘ্য ১৮-৪০ সেমি ও প্রস্থ ১২-৩০ সেমি, হৃৎপিন্ডাকার গোড়াসহ ছত্রবদ্ধ, খন্ডিত অথবা যথেষ্ট ব্যবধানবিশিষ্ট দন্তকযুক্ত, উপরেরতল মসৃণ এবং গাঢ় সবুজ, নিচেরতল রুপালী অথবা ধূসর-ঘন কোমল ক্ষুদ্র রোমাবৃত, করতলাকারভাবে ৮-১০ শিরাযুক্ত, পত্রবৃন্তক ৫-১৫ সেমি লম্বা, গোলাপী। ওটাকে খাবারের থালা হিশেবে ঠিকই ব্যবহার করা যায়, যেমন আমরা কলা পাতার থালায় খেতাম এককালে; আবার এটি দিয়ে ঠোঙাও বানানো যায়।

ফুল একক অথবা ২-৩ পুষ্পবিশিষ্ট সাইমে বিন্যস্ত, পুষ্পবৃন্তিকা প্রায় ২ সেমি লম্বা। বৃত্যংশ ৫টি, রৈখিক-বল্লমাকার, ৩.৫৫ × ০.৪-০.৬ সেমি, খাটো নালির ভিতর গোড়ায় সংযুক্ত, স্থূলা, বাইরের দিক মরিচার ন্যায় বর্ণবিশিষ্ট লোমশ, পুরু, পশ্চাত্মখী বাঁকানো, পর্ণমোচী। পাপড়ি ৫টি, রৈখিক আয়তাকার অথবা বিডিম্বাকার, প্রায় ৬-১২ × ১ সেমি, পশ্চাৎমুখী বাঁকানো, স্থুলাগ্র।

ফুলের রঙ ফ্যাকাসে হলুদ। তবে গন্ধ মন মাতানো। ফুল ফুটলে বাতাসে গন্ধ ম ম করে ওঠে। কেমন মিষ্টি নেশা ধরা গন্ধ! শেষ বসন্ত বা চৈত্র মাসের ফুল। গাছে ফুল থাকে গ্রীষ্মকালজুড়ে। নামকরা ফুলগুলোর মধ্যে মুচকুন্দ অন্যতম। ফুল বাসি হলে ঝরে পড়ে। পুরো মুচকুন্দতলা বাসি ফুলে ছেয়ে যায়। এভাবেই মুচকুন্দ সংগ্রহ করতে হয়। এবার পকেটে, বইয়ের ভাঁজে, বালিশের তলায় যেখানেই রাখুন সুগন্ধ শেষ হবে না!

পুংকেশর ১৫টি, লম্বায় পাপড়ির সমান অথবা খাটো, বন্ধ্যা পুংকেশর ৫টি, পুংকেশর অপেক্ষা বৃহৎ। গর্ভপত্র ৫টি, গর্ভাশয় আয়তাকার, পঞ্চকোণী, ৫ প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট, ঘনভাবে মরিচার ন্যায় বর্ণবিশিষ্ট ঘন কোমল ক্ষুদ্র রোমাবৃত। ফল একটি ক্যাপসিউল, ৫-১০ সেমি লম্বা, ৫-কপাটিকাবিশিষ্ট, মরিচার ন্যায় বর্ণবিশিষ্ট বাদামী-মসৃণ। বীজ অসংখ্য, একটি পাতলা পক্ষসহ ডিম্বাকার, বাদামী, ঝিল্লিময়।

ক্রোমোসোম সংখ্যা:

2n = ৩৮ (Kumar and Subramaniam, 1986)

বংশ বিস্তার ও চাষাবাদ:

পাহাড়ী ঢালু। ফুল ও ফল ধারণ ৪ মার্চ-এপ্রিল।

বিস্তৃতি:

মুচকুন্দ দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় ভারত থেকে বার্মা পর্যন্ত জন্মায়। ভারত এবং মহাদেশীয় এশিয়া। মুচকুন্দ চাঁপার আদিবাড়ি হিমালয়ের পাদদেশ, মিয়ানমার, আসাম ও বাংলাদেশে ইহা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং সিলেট জেলার বনে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জন্মে। ঢাকার বলধা বাগানে দুটি মুচকুন্দ চাঁপা গাছ রয়েছে। শিশু একাডেমীতেও দুটি মুচকন্দ চাঁপার গাছ আছে। একটি মুচকুন্দ চাঁপার গাছ আছে গফরগাঁও সরকারি কলেজের পুকুরের উত্তরপাড়ে। ইহা আবার বাগান এবং প্রধান প্রবেশ পথের বৃক্ষ হিসেবে রাস্তার কিনারায় আবাদ করা হয়।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও ঔষধি গুণ:

উদ্ভিদটির পুষ্প সাধারণ বলবর্ধক হিসেবে এবং শ্বেতপ্রদর, বসন্ত রোগজনিত পুঁজ হওয়া, পাকস্থলীর ব্যথা, রক্ত রোগ, টিউমার, আলসার, কুষ্ঠব্যাধী এবং দাহ্যতা নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়। পাতার টমেন্টাম রক্তক্ষরণ রোধক হিসেবে ব্যবহৃত হয় (Ghani, 2003)।

মুচকুন্দচাঁপা গাছের জাতিতাত্বিক ব্যবহার:

ভারতের লোধা উপজাতীয় লোকেরা মাথার উকুন মারার জন্য শুকনো ফুলের চূর্ণ প্রয়োগ করে এবং মাথা ব্যথা নিরাময়ের জন্য তামাক হিসেবে নি:শ্বাস নেবার জন্য লোকদের উপদেশ প্রদান করে। তারা বিছানার ছাড়পোকা বিতাড়িত করার জন্য শুকনো পুষ্প বিছানার নীচে রেখে দেয়। মানদা উপজাতীয় লোকেরা মচকানো জনিত পায়ের ফোলা নিরাময়ের জন্য পুষ্পের লেই প্রয়োগ করে। সাঁওতাল উপজাতীয় লোকেরা কাল গোলমরিচের ক্বাথের (৩:২) সাথে কান্ড বাকলের লেই মিশিয়ে বাতজনিত স্ফীতি নিরাময়ের জন্য ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। ওরাউন উপজাতীয় লোকেরা সরিষার তৈলের (৩:১) সাথে পুষ্পের লেই তৈরী করে পক্স উদগমনে প্রয়োগ করে। লোধা এবং অন্যান্য উপজাতীয় গোষ্ঠী পক্সের যন্ত্রণা হতে মুক্তির জন্য শুকনো পুষ্পের লেই আগুনে রাখে (Pal and Jain, 1998).

সাহিত্যে মুসকান্দাচাঁপা:

শিল্পী এসএম সুলতানের প্রিয় ফুল ছিল মুচকুন্দ চাঁপা। সে জন্য তিনি সাতটি মুচকুন্দ চাঁপা সত্তরের দশকে যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজ ক্যাম্পাসে রোপণ করেছিলেন। বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়েরও প্রচণ্ড ভালোবাসা ছিল মুচকুন্দ চাঁপার প্রতি। যার প্রতিফলন রয়েছে তার জলসাঘর চলচ্চিত্রে। দালানের ছাদে আরাম কেদারায় বসে জমিদার বিশ্বম্ভর রায়রূপী ছবি বিশ্বাস। হুঁকোবরদার এসেছেন হুঁকো নিয়ে। তাদের নিম্নরূপ কথোপকথন:

বিশ্বম্ভর রায় : অনন্ত এটা কী মাসরে?

অনন্ত : ফাগুন মাস হুজুর।

বিশ্বম্ভর রায় : বসন্তকাল!

অনন্ত : আজ্ঞে হ্যাঁ হুজুর, মুচকুন্দ ফুটেছে, আপনার শরবতটা দেব হুজুর?

অন্যান্য তথ্য:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ১০মখণ্ডে (আগস্ট ২০১০)  মুসকান্দা প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে মুসকান্দা সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।  

তথ্যসূত্র:

১. এম আহসান হাবীব (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ১০ম (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ৩৪৭। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

২. Kumar, V. and Subramaniam,, B. 1986 Chromosome Atlas of Flowering Plants of the Indian Subcontinent. Vol.1. Dicotyledons Botanical Survey of India, Calcutta. 464 pp.   

আরো পড়ুন:  ম্যাগনোলিয়াসি হচ্ছে সপুষ্পক উদ্ভিদের একটি পরিবারের নাম

1 thought on “মুচকুন্দচাঁপা দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সুগন্ধি শোভাবর্ধনকারী ও ঔষধি বৃক্ষ”

  1. সাহিত্যে মুচকুন্দ এর ব্যাপারটা যেটা উল্লেখ করেছেন ওটা এসেছে তারাশঙ্করের জলসাঘর ছোটগল্প থেকে

    Reply

Leave a Comment

error: Content is protected !!