আমড়া গাছ, ছাল, পাতা, ফলের ১২টি ঔষধি ব্যবহার

এনাকার্ডিয়াসি পরিবারের স্পনডিয়াস গণের ফলগাছসমূহকে সাধারণত আমড়া বলা হয়। বাংলাদেশে তিন প্রজাতির এবং ভারতে চার প্রজাতির আমড়া গাছ জন্মায়। আমড়া গাছ বলতে যেটিকে দেশি আমড়া বলা হয় সেটি ভেষজগুণে অনন্য। বাংলাদেশে প্রাপ্ত তিন প্রজাতির আমড়া হচ্ছে দেশি আমড়া (বোটানিকাল নাম: Spondias pinnata (L. f.) Kurz),  বিলাতি আমড়া ও লাল আমড়া

আম্র=আ+অতীত অর্থাৎ আম্ররসের ঈষৎ অনুসরণ করে (অমরকোষ টীকা)। এই চরকীয় সম্প্রদায় এই ফলটির আর একটি নাম রেখেছেন ‘কপীতন’। কপীনাং ইং লক্ষ্মীং তনোতি অর্থাৎ কপিকুলের লক্ষ্মী বৃদ্ধি করে; নিকটে আমড়া গাছ পেলে কপিগৃহিণী অর্থাৎ বানরী ছুটে যায় শিশুপ্রসবের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ অতুর ঘর করতে, এর পাতা বানরের খুব প্রিয় খাদ্য কিংবা পথ্য; তাঁর এই ভূমিকা দেখে এই ভেষজটির উপরিউক্ত নামটি রেখেছেন।

আমড়া গাছ ২৫ থেকে ৩০ ফুট পর্যন্ত উচু হতে দেখা যায়। একটি ডাঁটায় সমান্তরালভাবে কয়েক জোড়া পাতা ও ডাঁটার আগায় ১টি পাতা থাকে। অগ্রহায়ণের শেষ থেকেই পাতা ঝরতে শুরু করে, তারপর মাঘ-ফাল্গুনে গাছে মুকুল হয়, তারপর ফল; কচি অবস্থায় ফলের বীজ নরম থাকে, পরে পুষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আঁটি শক্ত হয়ে যায়। বাংলাদেশের প্রায় সব স্থানে এটি পাওয়া যায়, অনেকে বেড়ার ধারে এটাকে লাগিয়ে রাখেন। কার্তিক-অগ্রহায়ণেই ফল পেকে যায়, পাকা আমড়ার একটি চমৎকার গন্ধ আছে। উড়িষ্যায় অঞ্চল বিশেষে আমজ নামে প্রচলিত। নিম্নে আমড়া বা দেশি আমড়ার বিস্তারিত ভেষজ ব্যবহার উল্লেখ করা হলো

বিলিতী আমড়া বলে যেটা আমাদের কাছে পরিচিত, সেটার বৈজ্ঞানিক নাম- Spondias dulcis willd.,  তবে দেশী আমড়ার থেকে মিষ্টি। আর এটি বহিরাগত, আমাদের দেশে বাগানে লাগানো হচ্ছে সত্যি, কিন্তু এটির মাতৃভূমি ফিজি আইল্যান্ড, তাই আমরা তাকে বলি ‘বিলিতী’, যেহেতু এটা বহিরাগত, তাই।

ব্যবহার

১. রেত স্খলনে: যেই ভাবা, অমনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও শুক্র নির্গত হয়, সে ইন্দ্রিয়ের উত্তেজনার অপেক্ষা রাখে না; সেক্ষেত্রে আমড়া গাছের মূলের অথবা ভূমি সান্নিধ্যের ছাল ভালো করে ধুয়ে থেঁতো করে এক চা চামচ আন্দাজ রস একটু চিনি মিশিয়ে সপ্তাহখানেক খেলে ঐ ঝরাটা আর থাকবে না।

আরো পড়ুন:  আতা নোনা বা আতা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের ফলদ গাছ

২.খসখসে শরীর: চামড়ায় ক্রান্তির অভাবে যেনও টিকটিকির চামড়ার মতো, পা ফাটে গায়ে হাত দিলে মনে হয় বালির দেয়ালে হাত লাগানো; সাবান দিলেও তার শরীরের কোনো পরিবর্তন হয় না। এটা ভিটামিনের অভাব। এই ক্ষেত্রে আমড়ার ছাল থেঁতো করে সেই রস এক চা চামচ করে কিছুদিন খেতে হয়। এর দ্বারা ঐ দোষটা নিরসন হয়ে ত্বকের কান্তি ফিরে আসে।

৩. পিত্ত বমি: এই পিত্ত বমিটা শরৎকালে অর্থাৎ ভাদ্র বা আশ্বিনে প্রায় হতে দেখা যায়; এক্ষেত্রে আমড়ার ছাল শুকিয়ে নিলে ভালো হয়, ৫ গ্রাম এক কাপ গরম জল ভিজিয়ে রেখে ঘণ্টা দুই বাদে ছেঁকে নিয়ে, অল্প অল্প করে ঐ জলটা ৩ থেকে ৪ বারে খেলে ঐ পিত্ত বমি বন্ধ হয়ে যায়।

৪. অগ্নিমান্দ্যে: আমরা তো জানি আমের আমসত্ত্ব হয়, কিন্তু বৈদ্যদের ঝুলিতে আমড়া সত্ত্বও আছে। বেশ সুপক্ক আমড়া, যেগুলি একটু সাদাটে এবং হলুদ রংয়ের, সেগুলি অল্প মিষ্টিরস হলেও সুস্বাদু হয়। আবার অল্প তিক্ত কষায় স্বাদের টোকো আমড়াও দেখা যায় এগুলি দেখতে সবুজ, এটি নয় কিন্তু। ঐ উপরিউক্ত আমড়াকে রস করে, যেমন আমসত্ত্ব করে সেই পদ্ধতিতে শুকিয়ে রাখতে হয়, এ থেকে ৩ থেকে ৪ গ্রাম নিয়ে ১ কাপ জলে ভিজিয়ে সেই জলটা অল্প অল্প করে আহারের অব্যবহিত পূর্বে এবং পরে খেতে হবে। তবে এটা কিন্তু খেয়াল রাখতে হয়, যেখানে অমলরস ক্ষরণের অভাবেই অগ্নিমান্দ্য হয়, সেখানেই এটা কার্যকরী।

৫. দাহ রোগে: স্নান করলেও গায়ের জ্বালা কমে না, মনে হয় যেন সবসময় গায়ে লঙ্কা বা মরিচ ঘষে দিয়েছে, সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে এটা বিদগ্ধ পিত্ত চর্মগত হয়েছে; এক্ষেত্রে স্নানের এক ঘণ্টা পূর্বে আমড়ার ছাল থেঁতো করে তা ৭ থেকে ৮ চা চামচ রস নিয়ে ১ কাপ জলে মিশিয়ে সেই জল দিয়ে শরীরটা মুছে দিতে হবে। আর এক ঘণ্টা বাদে তেল মেখে স্নান করে ফেলতে হবে, তেল হিসেবে তিলের তেল ভালো। এই রকম ১ দিন বাদ ১ দিন ৩ থেকে ৪ দিন মাখলে ঐ দাহটা আর থাকবে না।

আরো পড়ুন:  আতা বা নোনা আতা ঔষধি গুণেভরা বাংলাদেশের পরিচিত ফল

৬. অজীর্ণ ও দাহে: আমতা সামতা মল নির্গত হয়, রংটা সাদাটে, এর সঙ্গে পিত্তের সংযোগ যে নেই তা নয়, হাত পায়ে একটু জ্বালা থাকে, আবার বিকালের দিকে একটু চোখ জ্বালাও করে, মুখে বিস্বাদ, কিছু খেতে ভাল লাগে না; এক্ষেত্রে ৪ থেকে ৫ গ্রাম আমড়াসত্ত্ব, নইলে পাকা পাওয়া গেলে একটা আমড়ার শাঁস এক কাপ জলে মিশিয়ে একটু চিনি দিয়ে খেতে হবে। এর দ্বারা উপরিউক্ত অসুবিধাগুলি চলে যায়। এটা ৩ থেকে ৪ দিন খেলেই ফল পাবেন।

৭. অরুচিতে: যমের অরুচি বলে একটা কথা আছে; এ কথার অর্থ কিন্তু যমেরও ভক্ষ্য নয়; মানুষের ক্ষেত্রে কিন্তু ঠিক তারই উল্টো। যে কোনো স্বাদের জিনিসই হোক না কেন, সে কোনোটাই খেতে চায় না, অথচ ক্ষিধেয় পেট জ্বলে যায়। এক্ষেত্রে আমড়া গাছের মাঝের অংশের ছালের রস ১ চা চামচ আধা কাপ জলে মিশিয়ে এক টিপ লবণ ও মিষ্টি দিয়ে সরবতের মতো করে খেলে ঐ অরুচিটা সেরে যাবে।

৮. গ্রহণী রোগ: যে দাস্ত দিনে ২ থেকে ৩ বার হয়, অথচ রাত্রে কিছুই নয় অথবা দুই বারেই আধ মালসা বেরিয়ে গেল কিংবা ৩ থেকে ৪ দিন একটু একটু হচ্ছে, একদিন দেখা গেল অস্বাভাবিক পরিমাণে মল নির্গত হলো, এই রকম দাস্ত হওয়ার ধরন, সেই ক্ষেত্রে আমড়া গাছের আঠা যা আমড়া গাছে গাঁদের মতো আঠা বেরোয় ৩ থেকে ৪ গ্রাম জলে ভিজিয়ে রেখে একটু চিনি দিয়ে খেতে হয়, কিন্তু দু’বেলাই এটা খেতে হবে। এর দ্বারা ৪ থেকে ৫ দিনের মধ্যে স্বাভাবিক দাস্ত হবে।

৯. আমরক্তে: অজীর্ণ চলছে অর্থাৎ ভালো হজম হচ্ছে না অথচ বেশ চর্বচষ্য করে গুরুভোজন করে চলেছেন তার পরিণতিতে এলো আমাশা, তারপর একদিন বাদেই দেখা গেল রক্ত পড়ছে, এক্ষেত্রে আমড়ার আঠা ৩ থেকে ৪ গ্রাম আধা কাপ জলে ভিজিয়ে রেখে তার সঙ্গে আমড়া গাছের ছালের রস এক চা চামচ মিশিয়ে একটু চিনি দিয়ে খেলে ২ দিনের মধ্যেই ঐ রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যাবে এবং আমাশাও সেরে যাবে।

আরো পড়ুন:  বেল গাছের পাতা, মূলের তেরোটি উপকারিতা ও ভেষজ গুণাগুণ

১০. শুক্র গাঢ় করা: লোকে কথায় বলে ‘আমড়ার আঁটি চুষবে?’ জলের মতো শুক্র পাতলা হয়ে গেলে, অল্প চিত্তচাঞ্চল্যেই ক্ষরণ হয় এ সমস্যা সমাধানে, একটি পাকা আঁটির জলের মধ্যে ফাঁকে ফাঁকে যে নরম শাঁসটা থাকে সেটি কিন্তু কষাধর্মী, সেটা চেপে অথবা অল্প থেঁতো করে, নিংড়ে নিয়ে, অল্প জল মিশিয়ে খেতে হবে। যদি মনে হয় সব সময়ে তো আঁটি পাওয়া যাবে না তখন এটা সময়ে সংগ্রহ করে রাখতে হবে, পরে ওটা জলে ভিজিয়ে থেঁতো করে ঐ রসটা খেলেই চলবে।

১১. হাজায়: জল ঘেটেও হয়, আবার শুকনো হাজাও হয় এক্ষেত্রে পাকা আমড়ার শাঁস ঐ হাজায় লাগিয়ে রাতে শুয়ে থাকলে পরের দিন কিছুটা উপশম হবেই, তবে জল ঘাঁটা বন্ধ করা যখন যাবে না, তখন হাজা কি আর একেবারে সারবে ?

১২. রুচি ফিরাতে: আমড়ার কষায়াম্ল স্বাদের মুকুলের টকের আর জুড়ি নেই।

গ্রামীণ একটা শ্লেষের আছে ‘গায়ে নেই ছাল চামড়া, দুধ দিয়ে খায় পাকা আমড়া’। সত্যিই দুধ ও চিনি দিয়ে পাকা আমড়া খুবই উপকার।

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ  

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য, চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ২, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা, ১২২-১২৪।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিপিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Dinesh Valke

Leave a Comment

error: Content is protected !!