মাদলা বা ঘোড়াকরঞ্জ-এ আছে ভেষজ গুণাগুণ

মাদলা বা ঘোড়াকরঞ্জ গাছের ছাল অতিসার, আমাশা, শ্বাস, জীর্ণ ফুসফুস নলিকাপ্রদাহ প্রভৃতিতে ব্যবহার্য। ছাল ও পাতা বলকর, প্রসবান্তিক দুর্বলতানাশক। গাছের আঠা চুর্ণ অল্প মাত্রায় ব্যবহার করলে আমাশা (প্রবাহিকা) ও ফুসফুসনলিকা প্রদাহে (ব্রঙ্কাইটিসে) সুফল পাওয়া যায়। এটি প্রধানভাবে কাজ করে রসবহ স্রোতে।

মাদলা বা ঘোড়াকরঞ্জ-এর পরিচিতি

বৃহদাকৃতি গাছ। ৬০-৮০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতে দেখা যায়। কাণ্ড বেশ মোটা হয়, ত্বক কর্কশ, ধূসর রঙের, দেখতে প্রায় শ্যোনাক বা সোনাছালের মতো। এজন্য অনেকে এই গাছটি অরলু বলে উল্লেখ করেছেন, অরলু শ্যোনাকের আর এক নাম, কিন্তু দ্রব্য বিচারে দেখা। গেছে, এটি অরলু বা শ্যোনাক নয়। গাছের কাঠ হরিদ্রাভ শ্বেত, বেশি দিনের হলে। ধূসর-সাদা বর্ণের হয়ে যায়। কাঠ খুব একটা শক্তও হয় না। সেজন্য এর কাঠ হালকা সাজ-সরঞ্জাম তৈরীর কাজে এবং প্যাকিং বাক্স প্রস্তুতের জন্য ব্যবহৃত হয়। ১-২ ফুট লম্বা পত্রদণ্ডের উভয়দিকে ৮-১৪ জোড়া অল্প রোমশ ছোট-বড় পাতা থাকে, তবে সাধারণতঃ ৪-৬ ইঞ্চি লম্বা, কিনারা অসমানভাবে কাটা কাটা। গাছের ছাল সৌগন্ধযুক্ত।

ঘোড়করঞ্জের গাছ ভারতের বিভিন্নস্থানে, বিশেষতঃ বিহার, মধ্যপ্রদেশ, দাক্ষিণাত্য, গুজরাট, উত্তর প্রদেশ, বিশাখাপত্তনম, ছোটনাগপুর, গঞ্জামের জঙ্গল প্রভৃতি স্থানে অধিক পরিমাণে পাওয়া যায়। এটি বহিরাগত গাছ নয়। সেরকম কোন নজিরও পাওয়া যায়নি। এ গাছটি বর্তমানে রাস্তার ধারে যেখানে-সেখানে লাগানো হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন রাস্তার ধারে এ গাছটি লক্ষ্যে পড়ে।

এটিকে সংস্কৃতে মাদলা, হিন্দী ও মারাঠীতে মহারুক, মহারুখ, লিম্বাডো বলে। পালামু অঞ্চলে একে ঘোড়করম এবং বিহার ও উত্তর প্রদেশে ঘোড়করঞ্জ বলা হয়। বাংলায় এ গাছটির তেমন কোন নাম নাই, তাই ঘোড়করঞ্জ নাম; বোটানিক্যাল নাম Ailanthus excelsa Roxb., পরিবার Simarubaceae. ঔষধার্থে ব্যবহার্য অংশ—পাতা, ছাল ও আঠা ।

মাদলা বা ঘোড়াকরঞ্জ-এর প্রয়োগ

১. অতিসারে: সাধারণভাবে পাতলা দাস্ত হওয়াকে অতিসার বলে। অতিসারের প্রথম অবস্থায় অর্থাৎ প্রথম ৩/৪ দিন ঘোড়করঞ্জের ছাল ভিজানো জল খেতে হবে। ১০/১২ গ্রাম কাঁচা ছাল একটু থেঁতো করে ২ কাপ ঠাণ্ডা জলে ভেজাতে হবে। ৫/৬ ঘণ্টা পরে খাওয়া আরম্ভ করা যেতে পারে। ঐ ২ কাপ জল সারা দিনে ও রাতে ৪/৫ বারে খেতে হবে। এভাবে ৩-৪ দিন খাওয়ার পর প্রাথমিক অবস্থার একটু উন্নতি ঘটবে এবং তারপর থেকে গাছের ছাল চূর্ণ ২ গ্রাম মাত্রায় দিনে ৩ বার করে ঠাণ্ডা জলসহ খেতে হবে আরো কয়েকদিন। অসুবিধে দূর হয়ে গেলে আর খাওয়ার প্রয়োজন নাই। প্রথমাবস্থায় অবস্থা অনুসারে সুপাচ্য জলীয় অথবা শক্ত পথ্যের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সেজন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সমীচীন। পরের অবস্থায় স্বাভাবিক আহার্য গ্রহণ করতে পারবে।

আরো পড়ুন:  দুরালভা লতা-র নানাবিধ উপকারিতা ও প্রযোগ

২. প্রবাহিকায় (আমাশায়): কুন্থন সহ আমসংযুক্ত মল বারে বারে হতে থাকে, সেইসঙ্গে থাকে পেটব্যথা, খাওয়ায় অরুচি, বায়ু জমা প্রভৃতি। এক্ষেত্রে ঘোড়করঞ্জের ছালের মিহি চূর্ণ ২ গ্রাম মাত্রায় দিনে ৩ বার করে খেতে হবে। কয়েকদিন খেলে কমে যাবে, তবে তারপরও কয়েকদিন খাওয়া। প্রয়োজন; নতুবা খুব সত্বর পুনরাক্রমণ হতে দেখা যায়।

৩. গ্রহণীতে: এটি অজীর্ণ ও অতিসার রোগের অতি পুরাতন অবস্থা। এ রোগ হঠাৎ যেতেও চায় না। সেজন্য ঔষধ ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে সুপথ্যেরও ব্যবস্থা রাখতে হবে। এক্ষেত্রে ঘোড়করঞ্জ ছালের চূর্ণ ২ গ্রাম মাত্রায় দিনে ৩ বার করে খেতে হবে। ১০/১৫ দিন খেলে উল্লেখযোগ্য ফল পাওয়া যায়। তবে নিয়মিতভাবে মাস তিনেক খেলে এ রোগের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়। তিন মাস ব্যবহারে অনেক রোগীই সুস্থ হয়েছেন এবং দীর্ঘদিন ভালও আছেন। তবে যাঁরা রোগ সারার ঠিক পরেই খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে কোন রকম বিধি-নিষেধ মানতে পারেননি, তাঁরা পুনরায় এর কবলে পড়েছেন।

৪. প্রসবান্তিক দুর্বলতায়: প্রসবের পর প্রসূতির তো স্বাভাবিক দুর্বলতা থাকে, কিন্তু বহু ক্ষেত্রে অত্যধিক হয়ে থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় ঐ সময় প্রসূতির পেটের অবস্থাও সুবিধের থাকে না। ওদিকে শিশু মাকে চোষণ করছে। আবার এমনটাও দেখা যায় যে, প্রসবের ৮/১০ দিন পর থেকেই হেঁসেলে ঢুকেছে, সংসারের সমস্ত কাজকর্ম করছে, কিন্তু সেইরকম ঔষধ ও পথ্যের কোন সংস্থান নেই।

এ অবস্থায় ঘোড়করঞ্জের শুকনা ছাল ৫/৬ গ্রাম একটু থেঁতো করে রাত্রে ১ কাপ গরম জলে ভিজিয়ে রাখতে হবে, পরদিন সকালে ওটিকে ছেকে সকালের দিকে আধ কাপ ও বিকালের দিকে আধ কাপ খেতে হবে। লাগাতার কিছুদিন ব্যবহার করলে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসে।

CHEMICAL COMPOSITION

Ailanthus excelsa Roxb. See Leaves contain: crude protein 16.3%, fibre 21.9%, calcium 1.5%, phosphorus 0.2%, carotenoides 1.18%, ailantic acid, B-sitosterol and vitaxin. Bark c ontains: ailantic acid, glaucarubin, 2, 6dimethoxybenzoquinone, excelsin, ß-sitosterol, malanthin, triacontane and hexatriacontane. Root bark contains: quassinoids (ailanthione, glaucarubinone, glaucarubol-15-isovalerate, 13, 18-dehydroglaucarubol-15-isovalerate), alkaloids (canthin-6-one, 1-methoxycanthin-6-one, 5-methoxycanthin6-one and 8-hydroxycanthin-6-one). Seeds contain: ailantholide, ailanthone, chaparrinone, a compound m,p. 155-56°..

আরো পড়ুন:  দেশি গোবুরা এশিয়ার ভেষজ গুণসম্পন্ন বর্ষজীবী বীরুৎ

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ৯, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ ১৪০৫, পৃষ্ঠা, ১৬১-১৬৩।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Forestowlet

Leave a Comment

error: Content is protected !!