ডেউয়া গাছ-এর পাঁচটি ভেষজ গুণাগুণ ও বিবিধ ব্যবহার

প্রচলিত নাম ডেউয়া গাছ হলেও এ নামের বিস্তর ব্যতিক্রম স্থানে স্থানে ধরা পড়ে। কোথাও এটি ডাহু, ঢেয়ু, ডেফল, ডেহুয়া বা ডেলোমাদার। সংস্কৃতে লকুচ; হিন্দিতে লকুচ: ইংরেজিতে: Monkey jack. বৈজ্ঞানিক নাম: Artocarpus lakoocha Buch. Ham (সমনাম: A. lackoocha Roxb) গোত্র মোর‍্যাসী।

ডেউয়া গাছ-এর বিবরণ:

বৃহৎ পাতাঝরা বৃক্ষ ২০ মিটারের মতো উঁচু হতে পারে। ডেউয়া গাছ-এর গুড়ি বড়, সোজা এবং মাথার দিকে পল্লব ছড়ানো। বাকল ধূসর, খসখসে। ছোট ছোট গোলাকৃতি টুকরা ছাল ওঠে, যার ভিতর দিক লালচে। সমগ্র গাছেই শ্বেতকষ আছে। পাতা বড়, ১২ থেকে ২৪ সেমি লম্বা ৮-১৪ সেমি চওড়া। খসখসে দেখতে, কতকটা কাকডুমুরের (Ficus hispida) পাতার মতো, কিন্তু আকারে বড়, উপবৃত্তাকৃতি, আয়তাকৃতি বা ডিম্বাকৃতি। গোড়া চওড়া, কীলকাকৃতি, পক্ষবৎ উপখণ্ডিত। স্ত্রী ও পুরুষ ভেদে ফুল দুই প্রকারের; পুরুষ মুণ্ড উপবৃত্তাকৃতি, পুষ্পপুট ২ (অথকাত) মুণ্ডখণ্ড, মঞ্জরিপত্র দৃঢ় বৃন্তযুক্ত; স্ত্রীপুষ্পমুণ্ড গর্ভদণ্ড পেলটেট মঞ্জরিপত্রের মধ্য দিয়ে উদাত নিচু প্যাপিলার মধ্য দিয়ে। বের হয়। সিনকার্প ৬-১২ সেমি লম্বা। প্রায় গোলাকৃতি, হালকা খণ্ডিত, হলুদ, শুকালে খয়েরি, পৃষ্ঠদেশ অনিয়মিত প্যাপিলেট, রোমশ, অসংখ্য স্থায়ী বৃতিযুক্ত; ফল মাংসল, কাঁঠালের কোয়ার মতো ছোট কোয়াবিশিষ্ট যার মধ্যে বীজও থাকে। স্বাদে মধুরাম্ল। সাধারণত চৈত্রে ফুল এবং আষাঢ় মাসের দিকে ফল পাকতে শুরু করে।

ডেউয়া গাছ-এর প্রাচীন শাস্ত্রে:

চরক সংহিতার সূত্রস্থানের ২৬ অধ্যায়ে লকুচ বা ডেলোমাদার বা ডেউয়াকে মধু এবং দুধ এবং অপর একস্থানে মাষকলায়ের সুপ, গুড় ও ঘিয়ের সঙ্গে মিশিয়ে খেতে নিষেধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে ওগুলো সংযোগ বিরুদ্ধ। অর্থাৎ সে সময়ও গভীর পর্যবেক্ষণ করে ডেউয়া কিসের সঙ্গে খেলে ক্ষতি হতে পারে তাও নির্দেশনা হিসেবে এসেছে যেমন আমরা বলি মাংস ও দুধ একসঙ্গে খেতে নেই, খুব গুরুপাক।

সুশ্রুত সংহিতার সূত্রস্থানের ৪৬ অধ্যায়ে ১৫৪ শ্লোকে বলা হয়েছে এটি ত্রিদোষ (বায়ু-পিত্ত-কফ)-জনক, বিষ্টম্ভকারক এবং শুক্রনাশক। চক্রপাণি দত্ত বলেছেন ডেউয়া তিক্তকষায় রস, উষ্ণবীর্য, লঘুপাক, কফদোষনাশক, দাহকর এবং মলসংগ্রাহী। এটা অপক্ক বা কাঁচা লকুচ বা ডেউয়া সম্বন্ধে। কিন্তু ভাবপ্রকাশকার বলেছেন কাঁচা লকুচই উষ্ণবীর্য এবং পাকা হলে সেটা গুরুপাক। সুপক্ক হলে মধুর অম্নরসযুক্ত; তখন সেটা বায়ু ও পিত্তদোষ দূর করে। তাই পরিষ্কার বোঝা গেল যে ডেউয়া আহার্য এবং ভেষজ হিসাবে উপযোগী।

আরো পড়ুন:  দেশি সাগু পাম বা চাউ গোটা বাংলাদেশর ভেষজ প্রজাতি

ব্যবহার্য অংশ: ডেউয়া একটি ভেষজ গাছও বটে এর ছাল গুঁড়ো করে যে কোনো ক্ষতে লাগালে ক্ষত শুকিয়ে যায়। ফল কফ বর্ধক, কাম উদ্দীপক ও ক্ষুধা বর্ধক।

ডেউয়া গাছ-এর ভেষজ গুণাগুণ:

১. পেট পরিষ্কার করতে: পরিষ্কার হচ্ছে না, তখন কাঁচা ফল ৮ থেকে ১০ গ্রাম থেতো করে এক কাপ গরম জলে মিশিয়ে সেটা ছেকে ঐ জলটা খেলে দাস্ত পরিষ্কার হবে। এটা হয় রাতের দিকে নইলে সকালে খেতে হবে।

২. শরীরের চর্বি কমাতে: খাওয়া-দাওয়ায় খুবই হিসেব করে চলেও শরীরে মেদ বেড়ে যাচ্ছে, এদিকে ক্ষিধের কমতি নেই, সে আবার যখন-তখন; এক্ষেত্রে কাঁচা ডেউয়া ফলের রস এক/দেড় চা-চামচ এক কাপ ঠাণ্ডা জলে মিশিয়ে কয়েকটা দিন খেতে হবে, এর দ্বারা ওই অস্বাভাবিক মেদ কমে যাবে। মেদ কমাতে গেলে, আলু, চিনি বা যেকোন মিষ্টদ্রব্য খাওয়া বন্ধ করতে হবে, অবশ্য মধু, একটু-আধটু, খাওয়া যেতে পারে।

বারোমাস তো কাঁচা ফল পাওয়া যাবে না, সেক্ষেত্রে কাঁচা ফল থেতো করে শুকিয়ে সেটাকে গুড়া করে তিন গ্রাম মাত্রায় প্রত্যহ ঠাণ্ডা জলসহ খেতে হবে।

৩. শুক্রাণু বাড়াতে: এটাতে দেখা যায় হয়তো দাম্পত্য সুখের অপ্রতুলতা নেই, অথচ সন্তানাদি হচ্ছে না, এদিকে দেখা যায় স্ত্রীরও সন্তান না হওয়ার মত কোন দোষ খুজেও পাওয়া যাচ্ছে না; সেখানে বুঝতে হবে, শুক্রে যত সংখ্যক কীট জন্মালে বা দীর্ঘ সময় বেচে থাকলে সন্তান হয় সেটা নিশ্চয়ই নেই। এইটাই যে কারণ সেটা বর্তমানযুগে পরীক্ষা করে নেওয়ার তো আর অসুবিধে নেই, সুতরাং সেটা স্থির নিশ্চয় হ’লে এই পাকা ডেউয়া ফলের রস এক/দেড় চা-চামচ একটু চিনি মিশিয়ে অন্ততঃ মাসখানেক খেতে হবে। এটির ব্যবহারে শুক্রে কীটের আধিক্যও ঘটবে এবং দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা হ’লেই সন্তান হওয়ার পথ সুগম হবে।

৪. ত্বকের সমস্যা দূর করতে: ছালের গুঁড়া ও ক্বাথ গায়ের চামড়ার রুক্ষতায় বাহ্য প্রয়োগ করা হয়।

আরো পড়ুন:  বেল এশিয়ার সুপরিচিত ও জনপ্রিয় ঔষধিগুণ সম্পন্ন ফল

৫. ব্রণ ও ফোঁড়া সারাতে: মুখের ব্রণ ফোঁড়া থেকে দূষিত পুঁজ বের করার জন্য ছালের পুলটিশ উপকারী।

৬. অরুচি রোগে: টক, ঝাল, মিষ্টি যেটাই হোক না, কোন স্বাদের জিনিস মুখে দিতে ইচ্ছে হয় না, অথচ পেটে প্রচুর ক্ষিধে। এ রোগটার উৎপত্তি বেশীরভাগ ক্ষেত্রে পেটে আম এবং সেটা পিত্তসংযুক্ত আম কেবলমাত্র এক্ষেত্রে পাকা ডেউয়া ফলের রস ২/৩ চা-চামচ এবং তার সঙ্গে একটু লবণগোল মরিচের গুঁড়া মিশিয়ে দুপুর বেলার খাওয়ার পর্বে খেতে হবে, অবশ্য এটা ২-৪ দিন খেতে হবে; এর দ্বারা ওই অরুচিটা চলে যাবে।

৭. পেটে বায়ু: খুবই সাবধানে খাওয়া-দাওয়া করেও পেটের বায়ু যাচ্ছে না; এক্ষেত্রে আম দোষই তার কারণ প্রধানভাবেই হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে পাকা ডেউয়ার রস এক/দেড় চা-চামচ আধ কাপ বা এক কাপ জলে মিশিয়ে অল্প চিনিসহ সরবত করে প্রত্যহ একবার করে খেতে হবে। এর দ্বারা অধো হ’য়ে বায়ুর নিঃসরণ হতে থাকবে এবং পেট হালকা হয়ে যাবে।

৮. পাতলা দাস্তে: মলটা তরল হচ্ছে অথচ আমযুক্ত নয়, সেই রকম ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার্য। এইটার কারণ ঘটেছে কোন গুরুপাক দ্রব্য খাওয়াতে অথবা ভাল হজম হয়নি, তার ওপর আবার খাওয়া হয়েছে; এক্ষেত্রে এই ফলের বীজের গুঁড়া মিহি করে আধগ্রাম মাত্রায় ৩। ৪ ঘণ্টা বাদ দু’বার খেতে হবে।

৯. দুষিত ঘায়ে: যেকোন কারণে দুষিত ঘা বা ক্ষত হোক না কেন, এই গাছের ছাল চূর্ণ (মিহি) ওই ঘায়ের উপর ছড়িয়ে দিলে কয়েকদিনের মধ্যে ওই ঘা শুকিয়ে যাবে।

CHEMICAL COMPOSITION

Artocarpus heterophyllus

1. Wood yields colouring matter morin and cyanomaclurin. 2 Bark contains—(a) tannin, (b) crystalline steroketone, 3. Artostenone isolated from the latex.

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

আরো পড়ুন:  খয়ের দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক ও ভেষজ গুণে ভরা বৃক্ষ

তথ্যসূত্রঃ

১. ড. সামসুদ্দিন আহমদ: ওষুধি উদ্ভিদ (পরিচিতি, উপযোগিতা ও ব্যবহার),  দিব্যপ্রকাশ, বাংলাবাজার, ঢাকা, জানুয়ারি ২০১২, পৃষ্ঠা, ১৬৬-১৬৭।

২. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ৫, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ ১৪০৩, পৃষ্ঠা, ২০৭-২০৮।

Leave a Comment

error: Content is protected !!