ফলসা গাছের দশটি ভেষজ গুণাগুণ ও উপকারিতা

এই গণের প্রায় ৬০টি প্রজাতি উষ্ণ-প্রধান অঞ্চলসমূহে পাওয়া গেলেও তন্মধ্যে ভারতেই অন্ততঃ ৩৬টি প্রজাতি পাওয়া যায়। মধ্যমাকারের ঝোপঝাড় বৃক্ষ, এই প্রজাতিটি ২০/২৫ ফুট পর্যন্তও উচু হতে দেখা যায়। সারা ভারতে এটির চাষ হলেও সমুদ্রতীরবতী অঞ্চলসমূহে এদের বৃদ্ধি বেশী।

পাতাগুলি কাকডুমরের (Ficus hispida) পাতার মত, খসখসে, ডিম্বাকৃতি; বিপরীতভাবে বিন্যস্ত, পাতার কিনারা সামান্য দাঁতযুক্ত; এগুলি লম্বায় ৪। ৫ ইঞ্চি এবং চওড়ায় ৩৪ ইঞ্চি হয়, জায়গাবিশেষে এর পাতা আরও বড় হতে দেখা যায়। ফল ছোট, হলদে ও অল্প লোমযুক্ত। ফল মটরাকৃতি, গোলাকার, ধূসরবর্ণ, পাকলে নীলাভ-কালচে রঙের হয়। শীতের শেষাশেষি ফুল ও বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে ফল পাকে। গাছের ছাল লম্বা আঁশযুক্ত ও ধূসরবর্ণ।

সংস্কৃতে ও বাংলায় ফলসা; হিন্দী ভাষাভাষী অঞ্চল বিশেষে ফালসা, সুকরি প্রভৃতি বলে। এটির বােটানিক্যাল নাম Grewia asiatica Linn, ফ্যামিলি Tiliaceae.

ফলসা গাছের ভেষজ ব্যবহার

এটা রসবহ স্রোতে কাজ করে। ঔষধার্থে ব্যবহৃত হয়— গাছের ও মূলের ছাল, পাতা, ফুল ও ফল।

১. নতুন সর্দিতে: শরীরে ভারবোধ, কামড়ানি, মাথাটাও ভার, সর্দিও তেমন বেরুচ্ছে না, অথচ জ্বরভাব, সেক্ষেত্রে ৫/৭ গ্রাম কাঁচা ফলসা জল দিয়ে বেটে নিংড়ে রস বের করে সকালের দিকে ২ চা-চামচ ও বৈকালের দিকে ২ চা-চামচ ক’রে জলসহ ২ দিন খেতে হবে। এর দ্বারা ঐ অসুবিধেটা চ’লে যাবে।।

২. গাঁটে (গ্রন্থিতে) ব্যথা: এই ব্যথা বাতগ্রস্ত হয়ে দেখা যে দিয়েছে তা নয়, এটা হয়েছে নতুন সর্দি হয়েছিলো তাকে উপেক্ষা করে। এক্ষেত্রে কাঁচা ফলসা ফল ৫। ৭ গ্রাম জল দিয়ে বেটে, ছে’কে ওটা গরম করে সকালের দিকে ২ চা-চামচ ও বৈকালের দিকে ২ চা-চামচ জলসহ খেতে হবে।

৩. শোথ: পেটের দোষ নেই, আমাশায় নেই, হদযন্ত্রের ক্রিয়া যে সম্যকরূপে হচ্ছে না, তাও নয়, তবও বৈকালের দিকে পা দুটো অল্প অল্প ফলছে এবং প্রস্রাবটাও কমে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে পাকা ফলসা (ফলের) অল্প জল দিয়ে চটকে, ছেকে সেই রস ২ চা-চামচ, তাতে ৭। ৮ চা-চামচ জল মিশিয়ে প্রত্যহ ৩ বার করে খেতে হবে। এর দ্বারা ঐ পায়ের শোথ ২। ৩ দিনে চলে যাবে; এটা কিন্তু রসবহ স্রোতবিকারেই উদ্ভূত হয়ে থাকে।

আরো পড়ুন:  ছাগলের বড়ি এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ

৪. মেহ রোগে: একে উষ্ণপ্রধান দেশ, যার জন্য শরীর রুক্ষ, তার উপর স্নেহ পদার্থ বেশী খাওয়ার অভ্যেস, এদের এক ধরনের মেহ রোগ হয় যাতে আসে উত্তেজনা, তারপরে ধাতুক্ষরণ। এইসব উপসর্গ দেখা দিলে মনে হয় মেহ রোগ হয়েছে। এক্ষেত্রে পাকা ফলসা (ফলের) রস অল্প জলে চটকে অথবা বিনা জলে রস করে প্রত্যহ ২। ৩ চা-চামচ করে খেলে ঐ অসুবিধেটা চলে যাবে।

৫. গ্রন্থিতে গাঁটে: গাঁটে ব্যথা ও ফুলা, তবে গভীর ব্যথা বিশেষ থাকে না। এটা আসার মুখ্য কারণ থাকে প্রস্রাব কম হওয়া। এক্ষেত্রে ফলসা রস ৭। ৮ চা-চামচ অল্প জল মিশিয়ে খেতে হবে। এর দ্বারা ঐ মত্রকৃচ্ছটা চলে যাবে এবং ব্যথাও কমে যাবে।

৬. হৃদরোগ: এটি রসবহ স্রোতবিকারেও দেখা দেয়। এদের দেহটা একটু ভারী হয় এবং অল্প শ্রমে কাতর হয়ে পড়েন, কোন উদ্বেগজনক কাজ ও সংবাদ শুনলেই তাঁর হাটফেল হওয়ার উপক্রম। এরা যদি ২৩ চা-চামচ করে পাকা ফলসার রস খেতে পারেন, ২। ৩ দিনের মধ্যেই বিশেষ উপকার উপলব্ধি করতে পারবেন।

৭. অজীর্ণ রোগে: এটি বদহজমজনিত যে অজীর্ণ তা নয়, এটা এসেছে পিত্তধাতুর ক্ষয় থেকে, এ রোগ দেখা দেয় শরৎকালে এবং গ্রীষ্মকালে। এই অজীর্ণ পিত্তনাশক। ঔষধে কাজ হয় না, তবে পিত্ত যাতে বিকৃত না হয় সেটাও দেখতে হবে। এক্ষেত্রে পাকা পাকা ফলসা ফলের রস ৩/৪ চা-চামচ অল্প চিনি মিশিয়ে খেতে পারেন; রস করার অসুবিধে থাকলে পাকা ফলসা চিবিয়ে খেয়ে ছিবড়েটা ফেলে দেবেন।

৮. ঊর্ধ্বগত রক্তপিত্তে: এক্ষেত্রে পাকা ফলসা ফলের রস ২। ৩ চা-চামচ প্রত্যহ খাওয়া, এর সঙ্গে একটু, চিনিও দিতে পারেন, নইলে ১০ গ্রাম করে প্রত্যহ চিবিয়ে খেয়ে ছিবড়ে ফেলে দেবেন। যেদিন খেতে আরম্ভ করা যাবে, সেইদিন থেকে রক্ত ওঠা বন্ধ হয়ে যাবে।

আরো পড়ুন:  বন ধনে বা বন ধুনিয়া বাংলাদেশের সর্বত্রে জন্মানো ভেষজ বিরুৎ

৯. পিত্তজ্বরে: এই জ্বরে শরীরে অসম্ভব তাপ হয়, তার সঙ্গে বমনও থাকে, পিপাসা, গায়ে জ্বলা, ভুলও বকতে থাকে, প্রস্রাব হলেও বেশী হবে না। এক্ষেত্রে ফলসা ফলের রস ২/১ চা-চামচ ক’রে ২ ঘণ্টা অন্তর খাওয়ালে সমস্ত উপসর্গগলি ২-১ দিনের মধ্যেই উপশম হবে।

বাহ্য ব্যবহার

১০. ফোড়ায়: যেসব ফোড়া বেশ চাকা হয়ে উঠেছে অথচ পাকতে চায় না। এক্ষেত্রে ফলসার পাতা বেটে অল্প গরম করে ঐ ফোড়ার উপর প্রলেপ দিলে ফোড়া পেকে ফেটে যাবে।

CHEMICAL COMPOSITION

Grewia asiatica

Analysis of leaves :- Crude protein 10.1%; fat 6.8%; crude fibre 14:1%; nitrogen free extract 54:8%; carbohydrates 68.9%; ash_14.2%; calcium 4.18%; phosphorus 0.25% and tannin. Bark contains : Cellulose 72%.

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ৫, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ ১৪০৩, পৃষ্ঠা, ১৮-২০।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Dinesh Valke

Leave a Comment

error: Content is protected !!