জিকা, জিগা বা জিওল গাছের আটটি উপকারিতার বর্ণনা

জিকা গাছের শাখাপ্রশাখা বিশিষ্ট মাঝারি গাছ। ছাল মোটা, ধূসর বর্ণ ও মসৃণ। শীতকালে গাছের পাতা ঝরে পড়ে যায়। পাতা ৬-৮ ইঞ্চি লম্বা, দেখতে অনেকটা দেশী আমড়া (Spondias mangifera) পাতার ন্যায় এবং এর পত্রবিন্ন্যাসও ঐ ধরনের। বসন্তে দেশী আমড়ার মতো এর ডালে মকুল হয় ও পরে থোকা থোকা ছোট আঙ্গুরের মত ফল হয়। সাধারণতঃ ভারতের উষ্ণপ্রধান অঞ্চলে হয়ে থাকে। হিমালয়ের সানুদেশেও এই গাছ জন্মে, বাংলা এবং তৎসন্নিহিত অঞ্চলে এই গাছটিকে লোকে বেড়ার ধারে খুটি হিসেবে লাগিয়ে থাকে। ব্যবহার্য অংশ—-ছাল, আঠা ও পাতা।

জিকা গাছের অন্যান্য নাম:

এর সংস্কৃত নাম-জিঙ্গিনী বা জিবল, বাংলার প্রচলিত নাম জিকা, জিওল ও হিন্দীতে জিঙ্গন নামে পরিচিত। বর্তমানে এর বোটানিক্যাল নাম Lannea grandis Dennst. পরিবার Anacardiaceae, কিন্তু পূর্বের বোটানিক্যাল নাম ছিল Odina woodier Roxb.[১]

রোগ নিরাময়ে জিওলা-এর ব্যবহার:

১. বিষক্রিয়া নষ্ট করতে: জিওল গাছের নতুন পাতার রস ১১০ মি. লি দিয়ে ৫০ গ্রাম পাকা তেঁতুল উভয়কে ভালভাবে মেখে বিচি পরিস্কার করে পাতলা কাপড়ে ছেঁকে খেতে হয়। এতে বিষের প্রতিক্রিয়ায় জ্ঞান হারিয়ে ফেললে খুব দ্রুত জ্ঞান ফিরে আসে।

২. ক্ষত সারাতে: এই সমস্যা থেকে আরোগ্যে পেতে শুকনা জিওল বা জিকা গাছের ছালে গুঁড়া ৫ গ্রাম, নিম তেল ১৫-২০ মি. লি. মি-এর সাথে মিশিয়ে ক্ষত স্থানে প্রয়োগ করলে ঘা দ্রুত ভালো হয়ে যাবে।

৩. রক্ত আমাশায় সারাতে: এই সমস্যা হলে জিওল গাছের ছাল ৪ গ্রাম বেটে সেটা আধ কাপ ছাগলের দুধের সাথে মিশিয়ে খেলে আমাশায় ভালো করে দুর্বল শরীরে সবলতা ফিরে আনে। যদি পিত্তপ্রধান আমাশয় হয়েছে, অর্থাৎ বিকৃত পিত্তের ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে, আর অমনি সমস্ত শরীরে দাহ, শোষ, পিপাসা হবে, তখন ইচ্ছে হবে, বেশ নুন ঝাল টক মেশানো খাই; যদি কেউ খান, তবে দেখা যায় মলের সঙ্গে রক্ত নির্গত হচ্ছে এবং দমকে দমকে দাস্ত হচ্ছে, ওই সময় জিওল ছাল ১০ গ্রাম (কাঁচা) সিদ্ধ করে (জল ৪/৫ কাপ শেষ এক কাপ) ঠাণ্ডা হলে, ছে’কে সমস্ত দিনে ২/৩ বারে ঐ ক্বাথটা খেতে হবে। এটাতে ওই রক্ত আমাশা সেরে যাবে।

আরো পড়ুন:  পাশা ঢেকিয়া বাংলাদেশের সর্বত্রে জন্মানো ভেষজ প্রজাতি

৪. আঘাতজনিত যন্ত্রণা কমাতে: শরীরের কোনো অঙ্গে আঘাত লেগে ফুলে যন্ত্রণা হলে জিওল গাছের পাতা সামন্য পানি দিয়ে বেটে ফুলে যাওয়া জায়গায় প্রলেপ দিলে ফোলা কমে যাবে এবং যন্ত্রণার উপশম হয়।

৫. দাঁতে যন্ত্রণা সারাতে: এই সমস্যা হলে জিওল গাছের শুকনা ছালকে ছোট টুকরা করে কেটে সারারাত পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। ছাল নিতে হবে ৪০ গ্রাম এবং পানি থাকবে ১৫০ মিলিলিটার। সকালে সে পানি মাটির পাত্র অথবা স্টিলের যেকোন পাত্রে সিদ্ধ করতে হবে। পানি ফুটে ৫০ মিলিলিটার পরিমাণ হলে সেটা সামান্য গরম অবস্থায় যাতে মুখে দিলে সহ্য হয় এমন উষ্ণ অবস্থায় কুলি করতে হবে। সারা দিনের অন্তর তিন বার কুলি করা দরকার।

৬. স্তনের দুধ বাড়াতে: মহিলাদের স্তনের দুধ বাড়াতে হলে জিওল গাছের আঠা শরীরের পক্ষে খুব বলকারক। তাছাড়া স্তনের দুধ বাড়ানোর পক্ষেও সহায়ক। প্রসবের পর স্তন্যদাত্রীদের বুকের দুধ কমে গেলে তিন থেকে চার গ্রাম আঠা ঠাণ্ডা পানির সাথে কয়েকদিন খেলে বুকের দুধ অবশ্যই বাড়বে।

৭. বাতের ব্যথা কমাতে: বাত রোগের জন্য এর ছাল একটি মহৌষধ। এ গাছের ছাল তিন থেকে চার গ্রাম বেটে এক চামচ মধুর সাথে রোজ সকালে একবার করে খেলে উপকার হয়। তবে নিয়মিত বেশ কিছুদিন খাওয়া দরকার।

৮. কুষ্ঠ: কুষ্ঠরোগীদের জন্যও এ গাছের ছালের গুঁড়া মারগোসা তেলের সাথে মিশিয়ে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত জায়গায় প্রলেপ দিলে সুফল পাওয়া যায়।

৯. অতিসারে: এটা যদি বাত অর্থাৎ বায়ুজনিত হয় সেই ক্ষেত্রেই কার্যকরী। দাস্তের বেগ এলে আর দাঁড়ানো যায় না, পায়খানায় গেলে ছ্যাকড়া ছ্যাকড়া ফেনা ফেনা লালচে রঙের মল নির্গত হবে ও মলদ্বারে ব্যথা থাকবে এবং তার সঙ্গে কিছু, বায়ও নিঃসত হবে, এক্ষেত্রে জিওল আঠা, যে আঠা স্বচ্ছ প্রায় গঁদের মত দেখতে, সেই আঠা ১ গ্রাম ঠাণ্ডা জলে গুলে খেতে হবে। একদিনেই এটায় উল্লেখযোগ্য উপকার পাওয়া যাবে।

আরো পড়ুন:  সাদা তুঁত গাছের নানাবিধ ভেষজ প্রয়োগের বিবরণ

১০. হৃদরোগে: অবশ্য এটা বাতপিত্তপ্রধান হওয়া চাই। এই রোগের প্রকৃতিটা এমনি যে, বার বার পিপাসা, আবার সামান্য শ্রমেই ঘাম, বুকের স্পন্দনটা অসময়ে দেখা দেবে, জল খেলেই আরাম, অথচ প্রস্রাবটা ততটা হবে না, এই অবস্থা ঘটলে জিওলের ছাল (কাঁচা) ১০ গ্রাম একটু থেতো করে ৪ কাপ জলে সিদ্ধ করে এক কাপ থাকতে নামিয়ে, ছে’কে সকালে ও বিকালে ২/৩ বারে অল্প অল্প করে ওই জলটা খেলে কয়েকদিনের মধ্যেই ওই অসুবিধেটা চলে যাবে।

১১. আফিং-এর নেশা কাটাতে: এটা যদি কাটানোর দরকার হয় তখন একটু, তেতুল, জলের সঙ্গে জিওল পাতার রস ২ চা-চামচ মিশিয়ে খাওয়ালে নেশাটা কেটে যাবে।

১২. ফোঁড়ার যন্ত্রণায়: যে ফোঁড়া সবে উঠছে, অসম্ভব যন্ত্রণা হচ্ছে, সেক্ষেত্রে জিওলের আঠা জিওল ছালের রসে বেটে নিয়ে গরম করে ফোঁড়ার চারিদিকে প্রলেপ দিতে হবে। এর দ্বারা ব্যথা, টনটনানি কমে যাবে এবং পেকেও যাবে শীগগির; শুধু তাই নয়, ফেটে যাওয়াতেও সাহায্য করবে।[১][২]

CHEMICAL COMPOSITION

Lannea grandis (Dennst.) Engl. Analysis of wood :- Cellulose 53.37%; lignin 24.11%; pentosans 15.11%; Ash 1.6%. Analysis of barks :- Phlobatanin 8%. Analysis of gum :- Carbohydrates viz., l-arabinose and d-galactose. Jeolic acid (monobasic) as calcium, magnesium and potassium salt. Aldobionic acid viz., galactose-galacturonic acid.[১]

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ৪, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা, ৭৪-৭৫।

২. মাওলানা জাকির হোসাইন আজাদী: ‘গাছ-গাছড়ায় হাজার গুণ ও লতাপাতায় রোগ মুক্তি’, সত্যকথা প্রকাশ, বাংলাবাজার, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ২০০৯, পৃষ্ঠা, ১৭১-১৭২।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Rison Thumboor

1 thought on “জিকা, জিগা বা জিওল গাছের আটটি উপকারিতার বর্ণনা”

Leave a Comment

error: Content is protected !!