ঘোড়ানিম বা মহানিম-এর নানাবিধ গুণের বিবরণ

ঘোড়ানিম বা মহানিম (Melia azedarach) প্রধানভাবে কাজ করে রসবহ ও রক্তবহ স্রোতে। ঔষধার্থে ব্যবহার্য অংশ পত্র, ত্বক, মূল, পুষ্প, ফল ও বীজের তৈল।

১. শ্লেষ্ম-জনিত বুকের ব্যথায়: বুকে শ্লেষ্মা জমে গিয়ে যে ব্যথার সৃষ্টি হয়েছে, সে ক্ষেত্রে ঘোড়ানিম বা মহানিম-এর পাতার রস ৩০ ফোঁটা সিকি কাপ ঈষদুষ্ণ জলের সঙ্গে মিশিয়ে ৪/৫ ঘণ্টা অন্তর দিনে ৩/৪ বার খেলে ওই বসে যাওয়া শ্লেষ্মা তরল হয়ে নেমে যায়, কারও কারও আবার বমি হয়ে যায়। তবে এ বমিতে বিশেষ কষ্ট হয় না। একদিনে সরল না হলে ২/৩ দিন খাওয়াতে হয়। তবে এভাবে খেলে গর্ভিণী, শিশু এবং বৃদ্ধদের সমস্যা হবে।

২. অনার্তবে: মেয়েদের প্রথম রজোদর্শন সকলের ক্ষেত্রে একই বয়সে হয় না, কারও বা অপেক্ষাকৃত অল্প বয়সে হয়, আবার কারও বা একটু দেরীতে হয়। আবার স্বাভাবিক নিয়মে ৪০/৪৫ বৎসরের পর একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। অনেকের মাসিক হতে হতে মাঝে মাঝে ২/১ মাস বন্ধ হয়ে যায়, হলেও ঋতুস্রাব ভালভাবে হয় না, অথচ গর্ভাবস্থাও নয়; রক্তহীনতা, সাধারণ স্বাস্থ্যহানি, অন্যান্য রোগ প্রভৃতিও নেই, হেসে-খেলে জীবন কাটে, এটি সাধারণত বেশি বয়সের কুমারীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, আবার ২/১টি ছেলেমেয়ে হওয়ার পর যাঁরা জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য অস্ত্রোপচার করিয়েছেন অথবা নিয়মিত ঔষধ সেবন করছেন অথচ বয়সটা খুবই কম বা মাঝারি ধরনের (২৫-৩৫ এর মধ্যে), অন্য কোন রোগও শরীরে নেই, তাঁদের কেউ কেউ এর শিকার হয়ে থাকেন। এই যে ক্ষেত্র, এ ক্ষেত্রে সিকি কাপ হালকা গরম জলের সঙ্গে ৩০ ফোটা মহানিমের পাতার রস মিশিয়ে দিনে ৩ বার করে ৫/৭ দিন খেলে ঋতুস্রাব হয়ে যায়। তবে মাসিক ঋতুস্রাবের সম্ভাব্য সময়ের ৫/৭ দিন বা ৩/৪ দিন পূর্ব থেকে খাওয়া আরম্ভ করলে ভাল হয়।

মেয়ের বয়স হয়েছে অথচ ঋতুদর্শন হচ্ছে না, এটিও অনার্তব, এ ধরনের ক্ষেত্রের পেছনে থাকে নানা প্রকার কারণ, সেগুলি দূর হলে ঋতুবিকাশ হবে, তবে এই অবস্থায় মহানিমের পাতার রস কাজ করবে কিনা, সেটা পরীক্ষা করে দেখা হয়নি।

আরো পড়ুন:  কালকেয়া বা কেলেওকড়া উদ্ভিদের সাতটি ভেষজ গুণাগুণ

৩. গণ্ডমালায় (Scrofula): গলার বাইরে কানের নীচে কণ্ঠা ঘেঁষে ছোট ছোট গ্রন্থি বা গ্লাণ্ড দেখতে অনেকটা বোঁদের মতো, কিছুদিন বাদে সেগুলি পেকে যায়, না পাকলেও যন্ত্রণা, পাকলে যন্ত্রণা তো হয়ই, তাছাড়া সেগুলির ঘা শুকোতেই চায় না। এমন অবস্থা হলে মহানিমের পাতার রস ৩০ ফোঁটা করে দিনে ৪/৫ বার সিকি কাপ জল সহ কয়েক দিন খেলে আস্তে আস্তে ওটা সেরে যাবে।

৪. কেঁচো ক্রিমিতে: এ কৃমিগুলো গোল কেঁচোর মতো, লম্বায় ৫/৭ ইঞ্চি তো হয়ই, কোন কোনটা তার থেকে বড়ও হয়। এর জন্য প্রায় পেটে যন্ত্রণা হয়, দিন দিন রোগা হতে থাকে, আর ফ্যাকাসে চেহারা হয়ে যায়। এখন মুশকিল হলো যে, বমিই হোক আর দাস্তই হোক, সব সময় যে ক্রিমি বেরুবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। সেইজন্য ঘোড়ানিম বা মহানিম-এর ছাল চূর্ণ ৫০০ মিলিগ্রাম মাত্রায় প্রত্যহ ৩ বার ঈষদুষ্ণ জল সহ সপ্তাহখানিক খেলে ওই গোল ক্রিমির উপদ্রব কমে যাবে, ক্ষুধাও হবে এবং পেটের অস্বস্তিও থাকবে না।

৫. গ্রহণী রোগে: দীর্ঘদিন অজীর্ণ ও অতিসারে ভোগার ফলে এটির সৃষ্টি হয়। দোষ ভেদে নানা প্রকার লক্ষণ হলেও সাধারণত দেখা যায়—আমসংযুক্ত শক্ত বা পাতলা মল, কোন কোন ক্ষেত্রে আমাশা থাকে না, সেখানে পাতলা পায়খানা হলদেটে হয়, খাওয়ার প্রবৃত্তি থাকে না বললেই চলে, যখন-তখন পেটফাঁপা, সর্বদা পেট নিয়ে একটা অস্বস্তি। এক্ষেত্রে মহানিমের পাতার রস ৩০ ফোঁটা সিকি কাপ জলের সঙ্গে মিশিয়ে সকালে একবার এবং ঐভাবে বৈকালে একবার সপ্তাহ দুই তিন খেলে অনেকটা উপশম পাওয়া যাবে। তারপরও আরও কিছুদিন এটি ব্যবহার করতে হবে। সেইসঙ্গে পথ্যাপথ্য বিচারটা না মানলে চলবে না। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে পথ্যের ব্যবস্থা ও ঔষধ সেবনের সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। এ রোগটি বড্ড কষ্টদায়ক, একদিনে যেমন আসে না, তেমনি হুট করে চলেও যায় না। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই চলতে হবে।

আরো পড়ুন:  কদবেল বা কৎ বেল গাছ ও ফলের দশটি ভেষজ ব্যবহার ও প্রয়োগ

৬. উদর শূলে: যে পেটব্যথার কারণ ক্রিমি বা গ্রহণীজনিত, এ যোগটি তাতে তো কাজ করবেই, তাছাড়া যেখানে বদহজমের জন্য পেটব্যথা হচ্ছে, পেটে বায়ু জমেছে, সে ক্ষেত্রে মহানিমের পাতার রস ৩০ ফোঁটা সিকি কাপ হালকা গরম জলে মিশিয়ে, সেইসঙ্গে আন্দাজ আধগ্রাম শুঠ চুর্ণ গুলে খেতে হবে। একবার খাওয়ার পর ঘণ্টা দুই অপেক্ষা করে আর একবার এভাবে খেতে হবে। প্রয়োজন হলে আর একবার, নইলে ঐ দু’বারেই কাজ হবে। তারপরে কয়েকদিন সকালে কিছু খাওয়ার পর একবার এবং বৈকালে একবার করে খেলে ভাল হয়।

৭. গৃধ্রসীতে: এটির ইংরেজী নামটাই বর্তমানে চলতি নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে— সায়াটিকা। কোমর থেকে গোড়ালি পর্যন্ত পায়ের পেছনের দিক দিয়ে যে। নাড়ীটি গেছে, সেটিকে সায়াটিক নার্ভ বলে আর সেই নার্ভে যন্ত্রণা হলেই সায়াটিকা। অসহ্য যন্ত্রণা, পায়ের পেশী শক্ত হওয়া, পেশীর মধ্যে চিবুনোর মতো যন্ত্রণা কখনো বাড়ে, কখনো বা কমে, মাটিতে পা ফেললে গোড়ালিতে অসাড়তা বা ঝিনঝিন ভাব হয়। এক্ষেত্রে মহানিমের মূলের ছাল চূর্ণ ১ গ্রাম মাত্রায় দিনে ২ বার গরম জলসহ খাওয়াতে হবে। সেইসঙ্গে যন্ত্রণানাশক কোন একটি বাতের তেল দিনে ২ বার মালিশ করতে হবে এবং গরমজলের সেঁক দিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে তেলটি নির্বাচন করাই শ্রেয়। পূর্ণ বিশ্রাম প্রয়োজন। মধুমেহজনিত গৃধ্রসী হতে পারে, সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত অসুবিধা হিসেবে সাধারণতঃ দেখা যায় অত্যধিক ক্ষুধা, পিপাসা ও প্রস্রাব। তখন রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করে সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করতে হবে। মধুমেহ জনিত হলে মধুমেহের চিকিৎসার সঙ্গে সঙ্গে এ যোগটিও চলবে। তখন পথ্যের ব্যবস্থাও পালটে যাবে, শর্করা জাতীয় দ্রব্য খাওয়া নিষিদ্ধ তো হবেই। তবে এ সমস্যাটি পুরুষেরই বেশি হয়।

৮. উকুন নাশে: মহানিমের ফুল বেটে মাথায় হালকা করে লাগিয়ে ঘণ্টাখানিক রেখে তারপর ধুয়ে ফেলতে হবে। এভাবে একদিন ছাড়া একদিন ২/৩ দিন করলেই উকুন মরে যাবে। তবে বাড়িতে আর কারুর থাকলে কয়েকদিনের মধ্যে উকুনের বংশ বিস্তার হবেই। সেজন্য বাড়ি যার যার উকুন আছে, সবাই একইসঙ্গে ব্যবহার করলে ভাল হয়।

আরো পড়ুন:  বন ধনে বা বন ধুনিয়া বাংলাদেশের সর্বত্রে জন্মানো ভেষজ বিরুৎ

৯. শুষ্ক চুলকানিতে: পাতা বা ফুল যে কোন একটি বেটে কয়েকদিন প্রলেপের মতো করে লাগালে চুলকানি নষ্ট হয়ে যায়।

CHEMICAL COMPOSITION

Melia azedarache Leaves contain: carotenoid, meliatin and an alkaloid. Pericarp contains: bakayanin, neutral substance (neo-bakayanin and bakayanic acid). Fruit contains: an alkaloid, azaridine (also called margosine), a sterol, tannins, glucose and starch. Seeds contain: drying oil 40%, unsapon matter 1.26%, saturated fatty acids 11.4% (palmitic and stearic) and unsaturated fatty acids 88.6% (oleic and linoleic), unsaponifiable matter (phytosterol and aromatic hydrocarbons). Bark contains: alkaloids (azaridine and paraisine) and active substances mp. 154o. Heart wood contains: a crystalline lactone (bakalactone), a liquid with a terpenic odour, a resinous material and tannins.

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ৯, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ ১৪০৫, পৃষ্ঠা, ১৫০-১৫৪।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Dinesh Valke

Leave a Comment

error: Content is protected !!