ভোলাটুকি গাছের নানাবিধ ভেষজ গুণাগুণ

একে সংস্কৃতে বলা হয় ভল্লাতক, অরুষ্কর (এছাড়া আরও ১৪টি নাম আছে), বাংলায় ভেলা, হিন্দীতে ভিলাবা, ভেলা প্রভৃতি বলা হয়ে থাকে। এর বোটানিক্যাল নাম Semecarpus anacardium Linn. f., পুর্বে এটির নাম ছিল Semecarpus latifolius, Pers., Anacardium latifolium, Lamk, Anacardium officinarum, Gaertn. প্রভৃতি ; ফ্যামিলী Anacardiaceae.

ভেলার রসে অল্প চুণ মেশালে যে কালি তৈরী হয়, তা দিয়ে ধোপারা কাপড়ে দাগ দেয়। এজন্য ইংরেজীতে এটিকে Dhobis’ nut বলা হয়। ঔষধার্থে ব্যবহার্য অংশ বীজ।

ভোলাটুকি-এর অন্যান্য ব্যবহার

এটি প্রধানভাবে কাজ করে রসবহ ও রক্তবহ স্রোতে।

১. ক্রিমিরোগে: যেসব ক্রিমির উপদ্রব কোন ঔষধেই কমানো যাচ্ছে না কিংবা কেঁচো ও ফিতে ক্রিমি পুঞ্জীভূত হয়ে আছে, সেক্ষেত্রে হরীতকী চূর্ণ ৯০ গ্রাম, তার সঙ্গে শোধিত ভেলা (ঘিয়ে ভাজা) ১০ গ্রাম একসঙ্গে কুটে চালনিতে ছেঁকে নিয়ে সেই চুর্ণ এক মাত্রায় সকালে খালি পেটে জল সহ খেতে হবে। তবে অনেকে গরম জলে খাওয়ার ব্যবস্থা দেন, কিন্তু বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে গরম দুধ বা জলের সঙ্গে ব্যবহারে শরীরে এলার্জি এসে যায়। সুতরাং দুধ গরম করে ঠাণ্ডা হলে সেই দুধ বা ঠাণ্ডা জল ব্যবহার করা উচিত।

২. অম্লরোগে: তেঁতুল চটা পোড়ানো ছাই ৯০ গ্রাম, আর শোধিত ঘিয়ে ভাজা। তেল ১০ গ্রাম একসঙ্গে চূর্ণ করে চালনিতে ঘেঁকে সেই চূর্ণ ৫০০ মিলিগ্রাম মাত্রায় সকালে খালি পেটে একবার, প্রয়োজন হলে বৈকালের দিকে একবার সিকি কাপ দুধ সহ খেতে হবে। এইটা কয়েক দিন খেলে পেটে বায়ু, বুক জ্বালা ও অম্বলের দোষ সেরে যায়।

৩. অসাড়ে মূত্রনিঃসরণ: এটা বেশি বয়সেই দেখা দেয়, এমনকি মূত্রের বেগ এলে থামানো যায় না। এক্ষেত্রে নিসিন্দা পাতার (Vitex nigundo) চুর্ণ ৪০ গ্রাম, তার সঙ্গে শোধিত ঘিয়ে ভাজা ভেলা ১০ গ্রাম একসঙ্গে মিশিয়ে চূর্ণ করে হেঁকে সেই চুর্ণ ৫০০ মিলিগ্রাম মাত্রায় প্রত্যহ সিকি কাপ দুধ সহ একবার করে খেতে হবে। তবে ৫/৭ দিন ব্যবহার করার পর এটা বন্ধ করে দিতে হবে এবং কিছুদিন বাদে আবার খেতে হবে।

আরো পড়ুন:  কুরচি গাছের ছাল, বীজের দশটি ঔষধি গুণাগুণ

৪. রক্তপ্রদরে: লোধ (Desmodium pulchellum) ৯০ গ্রাম, শোধিত ঘিয়ে ভাজা ভেলা ১০ একসঙ্গে চূর্ণ করে হেঁকে ঐ চূর্ণ ৫০০ মিলিগ্রাম মাত্রায় দুধ সহ প্রত্যহ একবার করে খেতে হয়। কিছুদিন খেলে ঐ অসুবিধাটা চলে যায়। তবে এর সঙ্গে পিণ্ড খেজুর (ইরাকী খেজুর) এ-বেলা দু’টো ও-বেলা দুটো করে খেলে আরও ভাল পাওয়া যায়।

৫. কুষ্ঠ ও বাতরক্তে: শোধিত ভেলা দিয়ে প্রস্তুত ঘি প্রত্যহ ৫ থেকে ২ চা-চামচ পত্তি নিয়ে একটু চিনি মিশিয়ে সিকি কাপ দুধের সঙ্গে খেতে হবে। এর দ্বারা বহু ক্ষেত্রে ভাল ফল পাওয়া যায়।

৬. গেঁটেবাতে: যাঁরা গাঁটে গাঁটে ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছেন, তাঁরা যদি উপরিউক্ত হরীতকী মিশ্রিত ভেলা চূর্ণ ৫০০ মিলিগ্রাম মাত্রায় সিকি কাপ দুধ সহ প্রত্যহ একবার অথবা দু’বার সেবন করেন, তবে ঐ গাঁটের ব্যথার হাত থেকে রেহাই পেতে পারেন।

ভোলাটুকি-এর অন্যান্য ব্যবহার:

ভেলার তৈল:  এর তেল বিষাক্ত। চুলকানিতে সূচের ডগায় লাগিয়ে ব্যবহার করতে হয়। একটি ভেলাকে প্রদীপের আলোতে গরম করলে তা থেকে যে তেল বেরুবে, সেই তেল এক পোয়া দুধের সঙ্গ মিশিয়ে খেলে সর্দিতে আরাম পাওয়া যায়; বালকদের খাওয়ালে সর্দি ও আল-জিহ্বা বৃদ্ধি কমে যায়। প্রস্রাবকারক, বাতনাশক ও কুষ্ঠগ্ন।

বীজের শাঁস বা মজ্জা: পুষ্টিকর, ক্রিমিনাশক ও অগ্নিদ্দীপক। গাছের ছালের আঠা-গ্রন্থিশোথ, মূত্রনালী প্রদাহ, কুষ্ঠের যন্ত্রণা ও স্নায়বিক দৌর্বল্যে ব্যবহার্য ।

গাছের ছাই: অন্য ঔষধের সঙ্গে মিশিয়ে সর্পবিষে ও কাঁকড়া বিছার হুল ফোটানোর যন্ত্রণায় ব্যবহার করা হয়।

ভোলাটুকি-এর বাহ্য বা আভ্যন্তরিক ব্যবহারে কোনরূপ গোলমাল দেখা দিলে শরীরের চামড়া লালবর্ণ হয়, কোন কোন অংশ চুলকোতে থাকে, অশান্তি বোধ হয়, তখনই এর প্রয়োগ বন্ধ করতে হয় এবং প্রয়োজনমত এলার্জি নাশক ঔষধাদি ব্যবহার করা উচিত। ভেলা ঠিকমত শোধিত না হলে, উপযুক্ত মাত্রায় এবং সঠিক নিয়মানুযায়ী ব্যবহৃত না হলে, এই বীজে কারো এলার্জি থাকলে এ ধরনের বিপর্যয় আসাটা স্বাভাবিক।

আরো পড়ুন:  গোয়ালিয়া লতা বাংলাদেশে পার্বত্য অঞ্চলের ভেষজ বিরুৎ

ইউনানি সম্প্রদায়ের চিকিৎসকগণ চর্মরোগ, কুষ্ঠরোগ ও স্নায়বিক রোগে ভোলাটুকি রস ব্যবহার করেন।

CHEMICAL COMPOSITION

Semecarpus ancardium Linn. f. Analysis of Kernel: Moisture 3.8%, protein 26.4%, fat 36.4%, fibre 1.4%, carbohydrates 28.4%, minerals 3.6%, unsaponin matter 0.8%, glycoside, trihydroxyflavone, vitamins (thiamine, riboflavin and nicotinic acid) and amino acids (lysine 4.1%, histidine 1.8%, tryptophan 1%, arginine 9.6%, leucine 7.3%, isoleucine 4.4%, methionine 1.5%, threonine 2.1%, Phenylalanine 3.5%, valine 4.7%), fatty acids (myristic 0.28%, palmitic 12.44%, stearic 7.9%, oleic 64.28%and linoleic 15.04%). Plant contains: anacardic acid, cardol, calechol, anacardol, bhilawanol, semicarpol, fixed oil, phenols and hydrocarbons.

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ৯, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ ১৪০৫, পৃষ্ঠা, ২৮-৩২।

Leave a Comment

error: Content is protected !!