তেঁতুল গাছের পাতা, ফল, বীজের বারোটি ঔষধি ব্যবহার

তেঁতুল ( বৈজ্ঞানিক নাম: Tamarindus indica, ইংরেজি নাম: Melanesian papeda) হচ্ছে ফিবাসি পরিবারের টামারিন্ডাস গণের একটি ফলদ উদ্ভিদ। টক জাতীয় এই ফলের গাছটির আদি নিবাস আফ্রিকা এবং গোটা দুনিয়ায় চাষ করা হয়। তেঁতুল বৃহৎ বৃক্ষ, ২৪ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। তেঁতুল গাছ সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন

তেঁতুল টকজাতীয় জনপ্রিয় ফল

বিভিন্ন রোগ প্রতিকারে তেঁতুল পাতার ব্যবহার:

১. নব্য প্রতিশারে: (কাঁচা সর্দি, হাঁচি, নাক দিয়ে কাঁচা জল পড়া) তেতুলের কাঁচা পাতাকে (৩ থেকে ৪ গ্রাম) সিদ্ধ করে তার ঠাণ্ডা জল খেলে উপশম হয়।

২. রক্তস্রাবী অর্শরোগ:  উপরিউক্ত মাত্রায় পাতা সিদ্ধ জলের সরবত করে খেলে কমে যায়। এছাড়া পুরানো তেতুল ভিজানো জল সেবনেও কাজ হয়।

৩. প্রস্রাবের জ্বালায় (পিত্তবিকার জনিত):  এক চা-চামচ আন্দাজ পাতার রসের সরবত খেলে উপশম হয়।

৪. বসন্ত:  ৩ গ্রাম তেতুল পাতার সমান হলুদ পাতা, তার না পেলে কাঁচা হলুদ একত্রে বেটে ছেঁকে নিয়ে সরবৎ করে খাওয়ালে ঐ গুটিগুলি শীঘ্র পেকে যায়।  

৫. আমাশয় (পুরাতন): ৪-৫ গ্রাম পাতা সিদ্ধ করে, চটকে, ছেকে সেই জলটিকে জিরে ফোড়নে সাঁতলে নিয়ে খেলে ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে বহুদিনের পুরানো এবং পেটে সঞ্চিত আম (Mucus) বেরিয়ে যায়; অবশ্য নতুন আমাশার ক্ষেত্রেও টোটকা চিকিৎসায় এটার ব্যবহার হয়ে থাকে।

৬. মচকানো ব্যথায়: এই পাতা বেটে অল্প সোরা (যেটায় বাজি তৈরী হয়) মিশিয়ে সহমত গরম করে লাগালে ব্যথা ও ফুলা ১ দিনে দুইই কমে যায়।

৭. পুরাতন ক্ষতে: যে ক্ষত কিছুতেই ভালো হচ্ছে না, সেক্ষেত্রে পাতা সিদ্ধ জলে ক্ষত স্থান ধুয়ে দিলে তাড়াতাড়ি আরোগ্য হয়।

৮. মুখের ঘা:  এর পাতা-সিদ্ধ জল মুখে খানিকক্ষণ রেখে ফেলে দিতে হয়। এইভাবে ৫ থেকে ১০ মিনিট করে ২ থেকে ৩ দিন ব্যবহার করলে উপশম হয়; অনেক ক্ষেত্রে সেরেও যায়, তবে আভ্যন্তরিক কোনো কারণে ক্ষত হলে সেখানে চিকিৎসার প্রয়োজন। মুখে ঘা ও ত্বকের প্রদাহ সারাতে সাহায্য করে।

৯. বাতের ব্যথা: পায়ে বা হাঁটতে ফুলা ও ব্যথার ক্ষেত্রে এই পাতা তালের তাড়িতে সিদ্ধ করে একসঙ্গে বেটে নিয়ে অল্প গরম করে প্রলেপ দিলে ব্যথা কমে যায়।

আরো পড়ুন:  পিয়াল বা চিরঞ্জী হচ্ছে বনাঞ্চলে জন্মানো ঔষধি উদ্ভিদ

১০. শীতপিত্তে (প্রচলিত নাম আমবাত) : শরীর চাকা চাকা হয়ে ফুলে ওঠে ও চুলকোয়, সেক্ষেত্রে তেতুলের শাঁস (কাঁচা হলে সিদ্ধ করে) জল দিয়ে অল্প পাতলা করে কোনো তামার পাত্রে ৫১০ মিনিট ঘষে নিয়ে তা শরীরে লাগালে ফলাে ও চুলকানি দুই-ই কমে যায়। এটা ওড়িশার গ্রামাঞ্চলে খুবই প্রচলিত; তবে এ রােগে দাত-পরিষ্কার থাকা বিশেষ প্রয়ােজন—তা না হলে রােগের মলে আঘাত করা হয় না।

তেঁতুল ফলের ব্যবহার

১. পেটের বায়ু, (উধর্ব বা অধঃ) স্তম্ভিত হয়ে যাঁরা কষ্ট পান, তাঁরা অল্প (৩।৪ গ্রাম আন্দাজ) পুরানো তেঁতুল ১ কাপ জলে ভিজিয়ে রেখে চটকে নিয়ে, ছেঁকে একটু, চিনি বা লবণ মিশিয়ে অথবা শুধু, ঐ জলটি রাত্রে শোয়ার পূর্বে খেলে ঐ অসুবিধে অনেকেরই থাকে না।

২. হাত-পা জ্বালার কষ্টে (শরৎ ও গ্রীষ্মকালে) তেতুল ভিজানো জল খেলে অনেকের কমে যায়। অবশ্য যাদের অম্লরোগ থাকে, তাদের ক্ষেত্রে এটির ব্যবহার সমীচীন।

৩. কিডনির দোষে হাত-পা বা মুখে একটু ফোলা ফোলা দেখায়, সেক্ষেত্রে একটু, পুরানো তেতুল ভিজানো জল খেলে উপশম হয়।

৪. বুকে সর্দি বসে খুব কষ্ট হচ্ছে, এক্ষেত্রেও খেলে সর্দি উঠে যায়। তবে এর সঙ্গে মাষকলাই ও পান সরিষার তৈলে ভেজে ঐ তৈল বুকে মালিশ করলে আরও সুবিধে হয়।

৫. সিদ্ধির নেশা কাটাতে তেতুলের সরবতের জুড়ি নেই। আমাশা হলে পুরানো তেতুলের সরবত খাওয়া এটা সুপ্রাচীন টোটকা হিসাবে চলে আসছে। তবে যারা অম্লপিত্ত রোগগ্রস্ত, তাঁরা এটাকে সহ্যমত ব্যবহার করবেন।

৬. লু লাগলে, কাঁচা তেতুল আগুনে ঝলসে তার মজ্জা (মাড়ি) দিয়ে সরবত করে খেলে এটাকে সামলে দেয়। যে সর্দিগর্মিতে হাত-পা অবশ হয়ে গেছে মনে হয়, সেক্ষেত্রে কাঁচা (পোড়া) তেতুলের বা পরানো তেতুলের সরবত ব্যবহারে ঐ অসুবিধেটা চলে যায়। এতে লবণ দেওয়ার দরকার নেই।

৭. তেঁতুল মেদ বা চর্বি কমানোয় বেশ বড় ভূমিকা রাখে। তবে তা দেহের কোষে নয়, রক্তে। এতে কোলস্টেরল ও ট্রাইগ্রাইসেরাইডের মাত্রা এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। তেঁতুলের সঙ্গে রসুনবাটা মেশানো যায়, তাহলে রক্তের চর্বি কমানোর কাজে ভালো ফল দেয়। তেঁতুল রক্তের কোলেস্টেরল কমায়। দেহে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে এবং হৃদরোগীদের জন্য খুব উপকারী।

আরো পড়ুন:  বিহিদানা গাছ দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় জন্মে

৮. তেঁতুল পরিপাকবর্ধন ও রুচিকারক। তেঁতুলের কচিপাতার মধ্যে রয়েছে যথেষ্ট পরিমাণে এমাইনো এসিড। দেখা যায়, পুরোনো তেঁতুলের কার্যকারিতা বেশি। যদি পেট ফাঁপার সমস্যা থাকে এবং বদহজম হয়, তাহলে পুরোনো তেঁতুল এক কাপ পানিতে ভিজিয়ে সামান্য লবণ, চিনি বা গুড় দিয়ে খেলে অসুবিধা দূর হয়। আবার হাত-পা জ্বালা করলেও এই শরবতে উপকার পাওয়া যায়। পেটে গ্যাস, হজম সমস্যা, হাত-পা জ্বালায় তেঁতুলের শরবত খুব উপকারী। এটি খিদে বাড়ায়। গর্ভাবস্থায় বমি বমি বমি ভাব দূর করে। মুখের লালা তৈরি হয়।

তেঁতুল গাছের পাতা, ছাল, ফলের শাঁস (কাঁচা ও পাকা), পাকা ফলের খোসা, বীজের খোসা—সবকিছুই ব্যবহার হয়ে থাকে। তেতুলের বীজও বিভিন্ন শিল্পে কাজে লাগে। পাকা ফলের শাঁস শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। তেঁতুলের পাতা বেটে মরিচ ও সামান্য লবণ দিয়ে বড়া তৈরি করে পান্তাভাতের সঙ্গে খেলে শরীরে এমাইনো এসিড পাওয়া যায়। তেঁতুল এমনই এক ভেষজ, যার সব অংশই কাজে লাগে। ভিটামিন সি-এর বড় উৎস।

তেঁতুল রক্ত পরিস্কার করে। বাত বা জয়েন্টগুলোতে ব্যথা কমায়। পুরনো তেঁতুল খেলে কাশি সারে। তেঁতুল পাতার ভেষজ চা ম্যালেরিয়া জ্বর কমানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। পাকা তেঁতুলে খনিজ পদার্থ অন্য যে কোনো ফলের চেয়ে অনেক বেশি। খাদ্যশক্তিও রয়েছে প্রচুর পরিমাণে। ক্যালসিয়ামের পরিমাণ সব ফলের চেয়ে ৫ থেকে ১৭ গুণ বেশি। আর আয়রনের পরিমাণ নারকেল ছাড়া সব ফলের চেয়ে ৫ থেকে ২০ গুণ বেশি। পাইলস্ চিকিত্সার জন্য ব্যবহার করা হয়। তেঁতুল ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সাহায্য করে। শিশুদের পেটের কৃমিনাশক।

ঔষধ হিসেবে বীজের ব্যবহার:

 ১. মাটির প্রতিমা রং করার জন্যে এই বীজ-সিদ্ধ ঘন জল বিশেষ উপযোগী। এ ভিন্ন দেশ-গাঁয়ে চপ, কাটলেট তৈরীতেও ডিম বা এরারটের পরিবর্তে ব্যবহার হয়।

২. বীজের খোসা: অর্শের যন্ত্রণায় বীজের খোসা পুটলি করে সেক দিলে উপশম হবে।

৩. ফলের খোসা: তেতুল ফলের শকনা খোসা পুড়িয়ে তার ছাই (১-২ গ্রাম আন্দাজ) অম্লশূল ব্যথায় জলসহ অনেকে খেয়ে থাকেন, উপকারও হয়। টোটকা বিধান এটা।

আরো পড়ুন:  মচকুন্দ গাছের ভেষজ গুণাগুণ ও উপকারিতা

৪. তেঁতুল চটা (গাছের স্বভাব-মৃত ছাল): এর পোড় ছাই ৩ গ্রাম আন্দাজ জলসহ খেলে বমি নিবারণ হয়।

তেতুল এমনই একটি ভেষজ গাছ, যার সব অংশই কোনো না কোনো কাজে লাগে; এর কাঠ কাঁচা থাকলেও জলে, শুধু তাই নয় তৈল পেষাইয়ের ঘানি গাছটি এই কাঠ ভিন্ন প্রস্তুত হয় না। কথায় বলে— এই গাছটির সবই খায়, ছাইও না তার ফেলা যায়।

তেঁতুলের রাসায়নিক গঠন: (a) Tartaric acid. (b) Malic acid. (c) Polysaccharide. (d) Oxalic acid,

প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা তেঁতুলের পুষ্টিমানঃ ক্যালরি ২৩৯, আমিষ বা প্রোটিন – ২.৮, শর্করা – ৬২.৫ গ্রাম, ফাইবার – ৫.১ গ্রাম, চর্বি – ০.৬ গ্রাম, ফসফরাস – ১১৩ মিলিগ্রাম, লৌহ – ২.৮২ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম – ৭৪ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি – ২ মিলিগ্রাম, মিনারেল বা খনিজ পদার্থ ২.৯ গ্রাম, ভিটামিন বি – ০.৩৪ মিলিগ্রাম, পটাসিয়াম – ৬২৮ মি: লি, ভিটামিন ই – ০.১ মিলিগ্রাম, ক্যারোটিন ৬০ মাইক্রোগ্রাম, সেলেনিয়াম – ১.৩ মিলিগ্রাম, সোডিয়াম – ২৮ মিলিগ্রাম, দস্তা – ০.১২ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম – ৯২ মিলিগ্রাম, এবং তামা – ০,৮৬ মিলিগ্রাম।

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা, ১৯৪-১৯৬।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Chinchyaam

Leave a Comment

error: Content is protected !!