কুন্দরো গাছের ছয়টি ভেষজ গুণাগুণের বিবরণ

চিরসবুজ বৃক্ষ। ১০০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতেও দেখা যায়। এটি দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে অধিক জন্মে। বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে লাগানো হচ্ছে। ছাল কর্কশ, সাদাটে ধূসর। পাতা বড়, হৃদয়াকৃতি, ৪-১০ ইঞ্চি লম্বা এবং ৩/৪ ইঞ্চি চওড়া। ফুল ছোট, সাদা। ফল হালকা বাদামী, মাংসল। এর মধ্যে একটি বীজ থাকে। বীজের মধ্যে চর্বিজাতীয় পদার্থ আছে। এই গাছের আঠা থেকে যে ধুনা পাওয়া যায়, তা উৎকৃষ্ট জাতের। এই আঠা থেকে একপ্রকার তৈল পাওয়া যায়। বীজ থেকে কোকমের মতো গাঢ় চর্বিজাতীয় তেল উৎপন্ন হয়, দেখতে হলুদাভা এবং সুগন্ধযুক্ত।

কুন্দরো-এর অন্যান্য নাম:

এটির সংস্কৃত নাম অজকর্ণ এবং বাংলায় চুস, কুন্দরো ও হিন্দীতে সফেদ ডামর, কহরুবা প্রভৃতি নামে খ্যাত। বোটানিক্যাল নাম Vateria indica Linn., এর আর একটি প্রজাতি আছে, সেটির নাম v. macrocarpa Gupta, এটি আকারে ছোট, তবে প্রায় সমগুণসম্পন্ন। ফ্যামিলী– Dipterocarpaceae. ঔষধার্থে ব্যবহার্য অংশ ধুনা (আঠা), ফল থেকে প্রস্তুত চর্বিজাতীয় তৈল।

গাছের অংশ বিশেষ:

আঠা (Resin): বলকর, বায়ুনাশক ও কফনিঃসারক। মুখের নানা প্রকার রোগ, জীর্ণ ফুসফুস নলিকা প্রদাহ, অর্শ, অতিসার, বাত, ক্ষয়জ গ্রন্থি, ব্রণ প্রভৃতিতে ব্যবহার্য। মোম ও কোকম বাটারের সঙ্গে মিশিয়ে যে মলম প্রস্তুত হয়, তা দুষ্টব্রণে হিতকর। এটি পুলটিস ও মলম প্রস্তুতের কাজে লাগে। এছাড়া এই আঠা বার্ণিশের জন্য ব্যবহৃত হয়।

তৈল: জীবাণুনাশ করার ক্ষমতা আছে। (তৈলাক্ত আঠা Oleo resin থেকে পাতন পদ্ধতিতে এই তৈল প্রস্তুত করা হয়ে থাকে।)।

ছাল: কটু ও alexipharmic গুণসম্পন্ন।

পাতা: পাতার রস পোড়া ঘায়ে লাগানো হয় ও রক্তগত অন্যান্য রোগে ব্যবহার্য। এই রস খাওয়ালে বমি বন্ধ করে।

ফল: এ থেকে প্রস্তুত চর্বিযুক্ত তৈল বাতের ব্যথায়, আমবাতে মালিশ করলে উপকার হয়।

কুন্দরো-এর ভেষজ গুণাগুণ

১. জীর্ণ অতিসারে: পাতলা দাস্ত দীর্ঘদিন ধরে হচ্ছে, পর পর যেন গা-সওয়া হয়ে গেছে, কখনো কখনো মলের সঙ্গে একটু-আধটু আমও দেখা দেয়, সেইসঙ্গে পেটফাঁপা, ভুটভাট, অরুচি তো থাকেই; অথচ দাস্ত পরীক্ষায় কোন ক্রিমি প্রভৃতির সন্ধানও পাওয়া যায় না, এই যে ক্ষেত্র, এ ক্ষেত্রে ধুনোর মিহি চূর্ণ ২৫০ মিলিগ্রাম মাত্রায় দিনে ৩ বার করে মাসখানিক খেতে হবে। পথ্যের দিকটা একটু বিশেষভাবে লক্ষ রাখতে হবে। সহজপাচ্য খাদ্য খাওয়া উচিত, উষ্ণ ও গুরুপাক দ্রব্য, তেল-ঘি যুক্ত খাবার, অতিরিক্ত শাকসবজি, ঘরের বাইরের খাবার প্রভৃতি না খাওয়াই ভাল।

আরো পড়ুন:  কুকুরমুতা বা তাম্রচূড়া-এর গুণাগুণ ও উপকারিতার বর্ণনা

২. গ্রহণীতে: এটি একবার এলে আর ছাড়তে চায় না, যেন চিরকালের সাথী হয়ে থাকতে চায়। পেটে বায়ুজমা, ভুটভাট, অরুচি তো থাকেই, তাছাড়া কখনো দাস্ত পাতলা কখনো শক্ত, কখনো বা ২/১ দিন হলো না, তারপর ২/১ দিন পাতলা দাস্ত হতে থাকলো। এ অবস্থায় ২৫০ মিলিগ্রাম মাত্রায় ধুনা চূর্ণ দিনে ৩ বার করে মাস দুই খেলে এর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে। তবে খাদ্যাখাদ্য বিচার করে চলতেই হবে।

৩. রক্ত আমাশায়: এটি দেখা দিলে কালবিলম্ব না করে চিকিৎসা আরম্ভ করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ২৫০ মিলিগ্রাম কুন্দরো বা ধুনো চূর্ণ দিনে ৩ বার করে কয়েকদিন খেতে হবে। প্রথমটা সামলে নেবার পর দিনে ২ বার করে আরও কয়েকদিন ব্যবহার করলে ভাল হয়।

৪. বাতের ব্যাথায় বা আমবাতে: ফল থেকে প্রস্তুত চর্বিজাতীয় তেল মালিশ করলে আরাম পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে ব্যথার উপশম হয়।

৫. ফোড়ায়: অল্প গরম করা ঘিয়ের সঙ্গে ধুনোর মিহিচূর্ণ সামান্য পরিমাণে মিশিয়ে ফোড়ার মুখটা বাদ দিয়ে চারদিকটাতে লাগাতে হবে। ২ বা ১ দিনের মধ্যে ওটা পেকে যাবে এবং ঐভাবে আরও কয়েকদিন ব্যবহার করলে সমস্ত পুঁজ বেরিয়ে গিয়ে ঘা শুকিয়ে যাবে।

৬. মূত্রকৃচ্ছে: তা সে যে কোন রোগের জন্যই হোক বা ঠাণ্ডা-গরমের জন্যই হোক— এসব ক্ষেত্রে কুন্দরো বা ধুনোর মিহিচূর্ণ ২৫০ মিলিগ্রাম মাত্রায় দিনে ২/৩ বার করে খেতে হবে। অন্য রোগ থাকলে তার চিকিৎসাও এইসঙ্গে চলতে থাকবে।

CHEMICAL COMPOSITION

Vateria indica Linn Fruit contains:- resin (triterpenes and sesquiterpenes); essential oil 76% and fat. Seeds contain:- fatty acids (myristic 1%, palmitic 13%, stearic 45%, arachidic 4.6%, oleic 47%, linoleic 2.3%, linolenic .5%, saturated and mono-oleodisaturated acid 26%), fats (glyceride ester) and unsaponifiable matter 2.5%, Expeller cake contains:- crude protein 6.7%; crude fibre 6.7%; ether extract 11.6%, N-free extract 69%; ash 5%; calcium 0.3%; phosphorous 0.13% and digestable protein 2.2%. Fruit-shell contains:- tannins 25% Bark contains:– glucoside (bergenin) and phenolic constituents (dl-epicatechin, (-)–fisetinidol, (-)-epiafzelechin, 2, 4, 6-trihydroxy chalcone and 2, 3, 4, 4-tetrahydroxystilbene) Vateria macrocarpa Gupta. Fruit contains:- resin and fatty oils.

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

আরো পড়ুন:  লতা ডুমুর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জন্মানো লতা

তথ্যসূত্র:

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১০, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, চতুর্থ মুদ্রণ ১৪০৭, পৃষ্ঠা, ১৪৪-১৪৭।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি flowersofindia.net থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Prashant Awale

Leave a Comment

error: Content is protected !!