আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > প্রাণ > উদ্ভিদ > বৃক্ষ > বাবলা ফেবাসি পরিবারের ভ্যাসেলিয়া গণের কাঁটাযুক্ত লাল ফুলের দ্রুত বর্ধনশীল বৃক্ষ

বাবলা ফেবাসি পরিবারের ভ্যাসেলিয়া গণের কাঁটাযুক্ত লাল ফুলের দ্রুত বর্ধনশীল বৃক্ষ

বাবলা

ভূমিকা:  বাবলা (বৈজ্ঞানিক নাম: Vachellia nilotica ইংরেজি: Indian Gum Arabic Tree, Prickly Acacia, The Babul Tree) হচ্ছে ফেবাসি পরিবারের ভ্যাসেলিয়া গণের কাঁটাযুক্ত লাল ফুলবিশিষ্ট দ্রুত বর্ধনশীল বৃক্ষ।

বৈজ্ঞানিক নাম: Vachellia nilotica সমনাম: Acacia arabica (Lam.) Willd. Acacia nilotica (L.) Willd. ex Delile Acacia scorpioides (L.) W.Wight Mimosa arabica Lam. Mimosa nilotica L. Mimosa scorpioides L. ইংরেজি নাম: Black Babool, Egyptian Mimosa, Egyptian Thorn, Gambia Pods, Indian Gum Arabic Tree, Prickly Acacia, The Babul Tree. স্থানীয় নাম: বাবলা।

জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস জগৎ/রাজ্য: Plantae; বিভাগ: Angiosperms; অবিন্যাসিত: Edicots; অবিন্যাসিত: Rosids; বর্গ: Fabales; পরিবার: Fabaceae; গণ:Vachellia; প্রজাতি: Vachellia nilotica.

বাবলা গাছের বিবরণ:

বাবলা গাছ দ্রুত বর্ধনশীল বৃক্ষ। এদের উচ্চতা প্রায় ২০ মিটার পর্যন্ত হয়। গাছের বাকল গাঢ় বাদামী বর্ণের, ও শাখা-প্রশাখা ধূসরাভ কালো। এদের প্রস্থচ্ছেদে মূলত বৃত্তাকার তবে কচি অবস্থায় ধূসরাভ বোমাবৃত ও পরিণত হলে মসৃণ হয়। উপপত্রীয় কাঁটা জোড়ায় জোড়ায় অবস্থান করে থাকে। কাঁটার আকার ২ থেকে ৬ সেমি লম্বা, সরু, সোজা ও সাদা রঙের। বাবলা গাছ অল্প বয়েসী অবস্থায় সাধারণত কাঁটাযুক্ত ও বয়স্ক বৃক্ষ কাঁটা বিহীন।

পাতা পক্ষল যৌগিক, পত্রাক্ষ ২-১০ সেমি লম্বা। ধূসরাভ রোমশ, পত্রবৃন্ত ১ থেকে ২ সেমি লম্বা হয়। পত্রবৃন্তের সামনের অংশ নিকটে বৃত্তাকার, অবৃন্তক, অবতল এবং আড়াআড়িভাবে ২ মিমি পর্যন্ত একটি উপবৃদ্ধি বিদ্যমান। পক্ষ ৩-১২ জোড়া ও লম্বা ১-৫ সেমি। প্রায়শই দূরবর্তী পক্ষদ্বয়ের সংযোগস্থলে উপবৃদ্ধি বর্তমান থাকে। পত্রক ১০-৩০ জোড়া ও দৈর্ঘ্য ২-৬ ও প্রস্ত ১-২ মিমি। পাতা রৈখিকদীর্ঘায়ত, নিম্নপ্রান্ত অসম, শীর্ষ গোলাকার থেকে স্থুলাগ্র, কাগজের মতো, মসৃণ ও শুষ্ক অবস্থায় কালচে বা বাদামী অথবা ধূসরাভ রঙের। প্রধানশিরা মোটামুটি মাঝ বরাবর, নিচের দিক সুস্পষ্ট।

পুষ্পমঞ্জরী কাক্ষিক মঞ্জরীদন্ডক শিরমঞ্জরী, মঞ্জরীদন্ড একক অথবা ২-৬টি একসাথে গুচ্ছবদ্ধ। ফুলের আকার ১-৩ সেমি লম্বা, ঘনভাবে ধূসরাভ রোমাবৃত। পুষ্প উজ্জ্বল হলুদ, সুগন্ধি, অবৃন্তক। বৃতি ঘন্টাকার এবং দৈর্ঘ্য ১-২ ও প্রস্থ ০.৮-১.৫ মিমি। বৃতি অনেকটাই মসৃণ, দন্তক ত্রিকোণাকার থেকে ডিম্বাকার, ০.৫-০৮ মিমি লম্বা। দলমন্ডল ২.৫ থেকে ৩.৫ মিমি লম্বা। দলমন্ডল প্রায়শই অণুরোমশ, খন্ডকগুলো দীর্ঘায়ত থেকে ডিম্বাকার, আকার ২-৩ x ১০-১.৫ মিমি। পুংকেশর অসংখ্য, পুংদন্ড ৪.৫ থেকে ৫.৫ মিমি লম্বা। গর্ভাশয় ১ মিমি লম্বা হয়, প্রস্থচ্ছেদে বৃত্তাকার, বৃন্তক, গর্ভদন্ড ৫.৫-৬.৫ মিমি লম্বা।

আরো পড়ুন:  তোড়া চন্দ্রমল্লিকা টবে বা বাগানের শোভাবর্ধনকারী বিরুৎ

বাবলার ফল পড আকৃতির। দৈর্ঘ্য ১০ থেকে ২২ সেমি ও প্রস্থ ১.২ থেকে ২.০ সেমি। ফলের আবরণ ও আকার নাপিতের মতো। ফল চেপ্টা ও সোজা থেকে কিছুটা বক্র। এরা কচি অবস্থায় সরস, বীজের মধ্যবর্তী অংশ গভীরভাবে অবনমিত। দেখতে ঠিক একটি গলার হারের মতো। বাবলার বীজের উপরে ফোসকাময়, শীর্ষ বীকযুক্ত, ঘন ধূসর রোমদ্বারা পশমী আবরণীময়। দেখতে চকচকে, ধূসরাভ সবুজ, শুষ্ক অবস্থায় কালো বর্ণ ধারণ করে। বীজের গোড়ার দিকটা সরু হয়ে একটি বৃন্তে পরিণত হয়। বীজের আকার ২ সেমি পর্যন্ত লম্বা। ফলের প্রতিটি পডে ৮-১৩টি বীজ থাকে। বীজ চেপ্টা ৫ x ৪ মিমি (প্রায়) ও কালো।

বাবলা গাছের চাষাবাদ ও বংশবিস্তার:

বাবলা গাছ বিভিন্ন ধরনের স্থলে পাওয়া যায়। বিশেষ করে গুল্ম অরণ্য, পরিত্যক্ত জমি, উন্মুক্ত বনভূমি, পত্রঝরা অরণ্য অথবা ক্ষারীয় মৃত্তিকা, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত জন্মে। বাবলা গাছের বংশ বিস্তার হয় বীজের মাধ্যমে। মে থেকে এপ্রিল মাস এই গাছ বীজ থেকে চারার জন্ম দেয়।

বিস্তৃতি: ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান, মিশর, সৌদি আরব, গ্রীষ্ম প্রধান আফ্রিকা এবং ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ায় আবাদী। বাংলাদেশের শুষ্ক প্রধান উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে ইহা সহজেই চোখে পড়ে।

অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব: বহুমুখী ব্যবহারের জন্য বৃক্ষটি গুরুত্বপূর্ণ। বাকল  গাছের ফল ট্যানিন এর উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কাঠ শক্ত, মজবুত এবং স্থায়ী।  উইপোকা প্রতিরোধী, কৃষিকাজের যন্ত্রপাতি, যন্ত্রপাতির হাতল, গরুর গড়ি, নৌকা এবং নৌকার দাঁড়, ঘরের খুঁটি বা কড়িকাঠ এমনকি রেল লাইনের স্লিপার তৈরির উপযোগী। ইহার ফল থেকে নিষ্কাষিত আঠা গঁদের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

বাবলা গাছের ভেষজ গুণ:

জনশ্রুতি আছে ইহার গঁদ মেলিটাস ডায়াবেটিস এর জন্য খুবই উপকারী (Caius, 1989)। ইহার বাকল ক্ষুদ্রান্ত্রের জন্য একটি শক্তিশালী কোষ্ঠবদ্ধতাকারী, জীবাণু প্রতিরোধক, কৃমিনাশক এবং কাশি, ব্রংকাইটিস, ডায়রিয়া, আমাশয়, পিত্তাধিক্যজনিত অসুস্থতা, পাইলস্, শ্বেতপ্রদর ও মূত্রাশয়ের অসুখ প্রভৃতি নিরাময়ে ব্যবহৃত হয় (Chakrabarty and Gangopadhyay, 1996). বাংলাদেশে বাবলার ফল গাভীর দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধিকারক হিসেবে গ্রামের বাজারে বিক্রি হয়।

আরো পড়ুন:  ভিক্টোরিয়া হচ্ছে নিমফাসি পরিবারের সপুষ্পক জলজ উদ্ভিদের গণ

আরো পড়ুন: বাবলা গাছের চৌদ্দটি ভেষজ গুণাগুণ

সৌদি আরবে ইহার কচিপাতা এবং বাকল আগুনে পুড়িয়ে ছাইয়ে পরিণত করে ঐ ভস্ম ক্ষতস্থানের উপরে প্রত্যহ ছিটিয়ে দেওয়া হয়। ইহার শাখা-প্রশাখা পুড়িয়ে প্রাপ্ত কয়লা চূর্ণও ব্যবহৃত হয়। গায়ানাতে ইহার রেজিন সমৃদ্ধ গঁদ গলা ও বক্ষ ব্যধিতে ব্যবহৃত হয়। ইহার ফল আমাশয় ও চক্ষুফোলায় নিদানতত্ব দেওয়া হয়। ভারতের কনকান দ্বীপে ইহার গঁদ মসলা ও বাটার ওয়েলের সাথে ভেজে শক্তি বর্ধক মিষ্টি তৈরি করা হয়, ইহা প্রসূতি মায়ের দৈহিক বল বর্ধক হিসেবেও ব্যবহৃত হয় (Caius, 1985). কেনিয়ায় ইহার রসালো ফল কাঁচা অবস্থায় ছাগল ও গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে এবং ভারতের হিশর জেলায় ইহার পাতা ছাগল ও ভেড়ার খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় (Skerman, 1977).

অন্যান্য তথ্য: বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের  ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০)  বাবলা  প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে বাবলা  সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে অঞ্চল ভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার পাশাপাশি অধিক বনায়নের সুপারিশ করা।[১] 

তথ্যসূত্র:

১. বি এম রিজিয়া খাতুন (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ৯ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ১৫১-১৫৩। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

Dolon Prova
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত প্রথম কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page