কুঁচ গাছ (Abrus precatorius): পরিচিতি, ঔষধি গুণাগুণ ও মারাত্মক বিষক্রিয়া

কুঁচ একটি অতি পরিচিত ওষুধি উদ্ভিদ হলেও সময়ের বিবর্তনে এটি এখন অনেকটা দুর্লভ হয়ে পড়েছে। বাংলা অভিধানে একে ‘গুঞ্জাফল’ বা ‘রতিফল’ হিসেবে অভিহিত করা হয়, যার মূল উৎস এর সংস্কৃত নাম ‘গুঞ্জা’। প্রাচীনকাল থেকে রতি বা ওজন পরিমাপের কাজে এর নিখুঁত বীজ ব্যবহৃত হতো বলেই একে ‘রতিফল’ বলা হয়, যা বেশ যুক্তিযুক্ত।

অন্যান্য নাম

লেগুমাইনোসী (Leguminosae) গোত্রের একটি মূল্যবান ওষুধি উদ্ভিদ হলো কুঁচ। এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Abrus precatorius Linn। একসময় গ্রামীণ রাস্তার পাশে কিংবা ঝোপঝাড়ে প্রাকৃতিকভাবেই প্রচুর কুঁচ গাছ জন্মাতে দেখা যেত। তবে নগরায়ণ ও অবহেলার কারণে বর্তমানে প্রকৃতিতে এটি বেশ বিরল হয়ে পড়েছে। ওষুধি গুণে অনন্য এই উদ্ভিদের পাতা, শিকড় এবং বীজ—প্রতিটি অংশই বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসায় ভেষজ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

বহুমুখী গুণের কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে ও ভাষায় এর নামের বৈচিত্র্য রয়েছে নজরকাড়া। কুঁচের প্রাচীন ও প্রচলিত বাংলা নামগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—চূড়ামণি, সৌম্যা, শিখী, কৃষ্ণলা, অরুণ, তাম্রিকা, শাঙ্গুষ্ঠা, শীতপাকী, উচ্চটা, কৃষ্ণচুড়িকা, রক্তা, রক্তিকা, কাম্ভোজী, ভিল্লিভূষণা, বন্যাসা ও মানচূড়া। অন্যদিকে, এর বিশেষ একটি প্রজাতি শ্বেতগুঞ্জা বা শ্বেতকুঁচের আলাদা কিছু নাম রয়েছে; যেমন—ভিরিন্টিকা, কাকাদনী, কাকপীল ও বক্তশল্যা।

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এই উদ্ভিদটি ভিন্ন ভিন্ন নামে সুপরিচিত। যেমন:

ইংরেজি: Indian liquorice root বা Crab’s eye

হিন্দি: রত্তী বা ঘুঘচী

গুজরাটি: চনৌঠী

তামিল: গুন্দুমানি

ফারসি: চশমে খমোশ[১]

বিবরণ

কুঁচ গাছের শারীরিক গঠন, ফুল ও বীজের বৈশিষ্ট্য

কুঁচ মূলত একটি পাক খানো, রোমশ ও আরোহী (লতানো) প্রকৃতির উদ্ভিদ। এর কচি শাখাগুলো দেখতে সুন্দর হালকা সবুজ বর্ণের হয়ে থাকে। এই গাছের জোয়াল সদৃশ ডাঁটার দুই পাশে বিপরীতমুখীভাবে ৫ থেকে ১৭টি ডিম্বাকৃতি বা আয়তাকৃতি পাতা (পত্রক) সাজানো থাকে।

কুঁচ গাছে সাধারণত ঘনবিন্যস্ত হালকা কালচে-লাল থেকে শুরু করে হলুদাভ রঙের ফুল ফুটতে দেখা যায়। ফুল শেষে গাছে চারকোণা শুটির মতো ফল ধরে।

কুঁচের বীজ ও সময়ের বৈচিত্র্য:
এই উদ্ভিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো এর বীজ। কুঁচের বীজ ডিম্বাকৃতি, অত্যন্ত মসৃণ ও চকচকে হয়ে থাকে। প্রকৃতির এক আশ্চর্য নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি বীজের ওজন ও আয়তন প্রায় সমান হয়। জাতভেদে বীজের রঙে দারুণ বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়:

  • লাল বীজ: মাথার দিকে কালো চিহ্ন থাকে।
  • কালো বীজ: মাথার দিকে সাদা চিহ্ন থাকে।
  • সাদা বীজ: মাথার দিকে কালো চিহ্ন থাকে।

ফুল ও ফল পাকার সময়:
সাধারণত আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাসের মধ্যে কুঁচ গাছে ফুল আসে। পরবর্তী সময়ে অগ্রহায়ণ থেকে মাঘ মাসের মধ্যে গাছ থেকে পরিপক্ক বীজ সংগ্রহ করা হয়।

বিস্তৃতি

কুঁচ গাছের উৎপত্তিস্থল ও ভৌগোলিক বিস্তার

কুঁচ মূলত ক্রান্তীয় বা গ্রীষ্মমন্ডলীয় (Tropical) অঞ্চলের একটি লতানো গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। গ্রামীণ প্রকৃতির ঝোপঝাড়, বনাঞ্চল এবং অবহেলিত পতিত জমিতে প্রাকৃতিকভাবেই এই গাছটি বেশি জন্মে থাকে। তীব্র পরিবেশগত প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার এক অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে এই আরোহী গুল্মটির।

কোথায় কোথায় কুঁচ গাছ পাওয়া যায়?
ভৌগোলিক বিস্তৃতির দিক থেকে কুঁচ গাছটি কেবল একটি নির্দিষ্ট এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নয়:

  • বাংলাদেশ: দেশের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই গ্রামীণ ঝোপঝাড়ে এই গাছের বিস্তৃতি লক্ষ্য করা যায়।
  • দক্ষিণ এশিয়া: ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড এবং মিয়ানমারসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে প্রাকৃতিকভাবেই এই উদ্ভিদটি ছড়িয়ে রয়েছে।

একসময় বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে অহরহ দেখা গেলেও, বর্তমানে বন উজাড় এবং ঝোপঝাড় কেটে ফেলার কারণে এই ওষুধি গাছটির অস্তিত্ব আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে।

গুণাগুণ

কুঁচ গাছের ঔষধি ব্যবহার ও স্বাস্থ্য উপকারিতা

কুঁচ গাছের পাতা, মূল (শিকড়) এবং বীজ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ভেষজ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নিচে এর প্রধান কিছু ঔষধি ব্যবহার তুলে ধরা হলো:

  • ত্বকের চিকিৎসায় ও ব্যথানাশকে পাতা: কুঁচের তাজা পাতার রস সরিষার তেলের সাথে মিশিয়ে শরীরে মাখলে ব্যথানাশক প্রলেপ হিসেবে কাজ করে। এছাড়া এর পাতা খিটখিটে মেজাজ, শ্বেতী ও খোস-পাঁচড়াসহ বিভিন্ন চর্মরোগে অত্যন্ত কার্যকর।
  • কাশির উপশম: অনেক ক্ষেত্রে কাশির চিকিৎসায় বিখ্যাত ওষুধি উপাদান যষ্টিমধুর বিকল্প হিসেবে কুঁচ পাতার ব্যবহার দেখা যায়।
  • মূল বা শিকড়ের ব্যবহার: এর মূল সাধারণত সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসায়, ঘাড়ের ক্ষত (গ্রীবার ক্ষত) এবং গিঁটে-বাতের তীব্র ব্যথা উপশমে প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
  • বীজের ক্বাথ ও চূর্ণ: কুঁচের বীজের ক্বাথ চর্মরোগ ও শরীরের কোনো অঙ্গের অনুভূতি বা বোধশক্তি লোপ পাওয়া রোধে সাহায্য করে। এছাড়া তীব্র মাথাব্যথা দূর করতে কুঁচ বীজের চূর্ণ নস্যি হিসেবে শোঁকার প্রচলিত রেওয়াজ রয়েছে।

কুঁচ গাছের মারাত্মক বিষক্রিয়া ও সতর্কতা

কুঁচ যেমন ঔষধি গুণে সমৃদ্ধ, তেমনি এটি অত্যন্ত বিষাক্ত। এর বীজে অ্যাবরিন-এ (Abrin-A) এবং অ্যাবরিন-বি (Abrin-B) নামক দুটি লেকটিন রয়েছে, যা মানুষের শরীরে রাইবোসোমের কার্যকারিতা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে।

  • তীব্র বিষক্রিয়া: কুঁচ বীজের বিষক্রিয়া এতটাই প্রবল যে, গ্রামাঞ্চলে এটি গবাদি পশু মারার বিষ হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। এর মূল ব্যাকটেরিয়া রোধক এবং রজঃস্রাব নির্গমনে সহায়ক হলেও, সঠিক পরিমাপ ছাড়া এর ভুল প্রয়োগ প্রাণঘাতী হতে পারে।
  • গর্ভপাত ও অন্যান্য প্রভাব: ঐতিহ্যগত চিকিৎসায় এর বীজ গর্ভপাতকারক, বমনোদ্রেককারী (বমি করানো) এবং রেচক হিসেবে কাজ করে। প্রাচীন পদ্ধতিতে গর্ভপাত ঘটানোর জন্য বীজের প্রলেপ নরম কাপড়ের মাধ্যমে শরীরে প্রয়োগ করা হতো। তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও নিষিদ্ধ। [২]

চিকিৎসা বিজ্ঞানে কুঁচের স্বীকৃতি: বাংলাদেশ জাতীয় আয়ুর্বেদিক ফর্মুলারি

কুঁচ গাছের ওষুধি গুরুত্ব ও কার্যকারিতা কেবল লোকজ চিকিৎসায় নয়, বরং সরকারিভাবেও স্বীকৃত। ‘বাংলাদেশ জাতীয় আয়ুর্বেদিক ফর্মুলারি ১৯৯২’ অনুযায়ী, কুঁচ লতাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিশেষ ওষুধের প্রধান উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ওষুধ দুটি হলো:

১. গুঞ্জা ভদ্ররস: এই বিশেষ আয়ুর্বেদিক ওষুধটি মূলত ‘উরুস্তম্ভ’ (ঊরুর পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া বা প্যারালাইসিস সদৃশ রোগ) প্রশমনে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
২. ত্রিবৃত্যাদি মহাগদ: এই ওষুধটি যেকোনো ধরনের সর্পবিষ (সাপের বিষ) কিংবা স্থাবর বিষ (উদ্ভিদ বা খনিজ উৎস থেকে তৈরি বিষ) নিরাময়ে প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

সরকারি এই ফর্মুলারিতে কুঁচের সুনির্দিষ্ট ব্যবহার প্রমাণ করে যে, সঠিক মাত্রায় ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে ব্যবহার করলে এই বিষাক্ত উদ্ভিদটিও মানবদেহের জন্য জীবনদায়ী ওষুধ হয়ে উঠতে পারে।

কুঁচের প্রকারভেদ, আয়ুর্বেদিক গুণ ও একক ব্যবহার

আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী, কুঁচ বা গুঞ্জা লতা মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে। এই উভয় প্রকার কুঁচই তিতা স্বাদযুক্ত (তিক্তরস) এবং শরীরের জন্য উষ্ণতাবর্ধক (উষ্ণবীর্য সম্পন্ন)। তবে গুণগত মান এবং কার্যকারিতার দিক থেকে শ্বেত গুঞ্জা বা শ্বেত কুঁচকে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট বলে গণ্য করা হয়।

কুঁচ গাছের বিভিন্ন অংশের গুণাগুণ ও ব্যবহার ভিন্ন ভিন্ন:

  • বীজ: এটি মূলত বমনকারক (বমি করানোর উপাদান) হিসেবে কাজ করে।
  • শিকড়: এটি পেটের ব্যথা বা শূলনাশক হিসেবে কার্যকর, তবে এতে কিছুটা বিষাক্ত উপাদান রয়েছে।
  • পাতা: লোকজ বিশ্বাস এবং প্রাচীন তান্ত্রিক মতে, এর পাতা বশীকরণের কাজে ব্যবহৃত হতো।

নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক সমস্যা দূর করতে কুঁচের একক ব্যবহারে অত্যন্ত কার্যকরী ও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া গেছে; যেমন—

১. চুল পড়া রোধ ও চুল পাকা কমাতে: কুঁচ বীজের তেল মাথায় ব্যবহার করলে চুল পড়া বন্ধ হয় এবং অকালে চুল পাকা দূর হতে সাহায্য করে।
২. খোস-পাঁচড়া ও চর্মরোগে: কুঁচের পাতা বেটে ক্ষত স্থান বা খোস-পাঁচড়ায় প্রলেপ দিলে দ্রুত আরাম পাওয়া যায়।
3. গিঁটে-বাতের ব্যথায়: এর শিকড় বা পাতার রস ব্যথার স্থানে মালিশ করলে বাতের তীব্র ব্যথা উপশম হয়।

১. শিরোরোগ নিরাময়ে: দুই কানের পাশ দিয়ে যে শিরাগুলো বুক পর্যন্ত নেমে গেছে, সেগুলোতে তীব্র যন্ত্রণা হওয়া শিরোরোগের একটি লক্ষণ। বিশেষ করে বায়ুপ্রধান শিরোরোগের ক্ষেত্রে সারাদিন মাথায় টিপটিপ ব্যথা অনুভূত হয় এবং সকাল ও সন্ধ্যায় এই যন্ত্রণার তীব্রতা বেড়ে যায়। অনেক সময় এর ফলে মুখের একপাশে বা পুরো মুখে লালচে অথচ কালচে ছোপ দেখা দিতে পারে। এই জটিল শিরোরোগ বা দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা দূর করতে কুঁচফলের নস্যি গ্রহণ করলে অত্যন্ত কার্যকর ফলাফল পাওয়া যায় এবং রোগটি সেরে যায়।

২. বমিভাব দূর করতে: অনেক সময় তেল বা ঘিয়ে ভাজা গুরুপাক খাবার খাওয়ার ফলে পেটে অস্বস্তি ও বমি-বমি ভাব দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে কুঁচের মূল ৩ থেকে ৪ গ্রাম পরিমাণ ভালো করে বেটে নিয়ে এক কাপ ঈষদুষ্ণ গরম পানিতে মিশিয়ে খেলে দ্রুত বমি হয়ে যায়। এর ফলে পেটের ভারমুক্ত হয় এবং অস্বস্তি দূর হয়ে শরীরে শান্তি ফিরে আসে।

৩. পেটে শূলবেদনা নিরাময়ে: বায়ু, পিত্ত কিংবা শ্লেষ্মা—যে কারণেই পেটে শূলবেদনা বা তীব্র যন্ত্রণা হোক না কেন, কুঁচ পাতা এক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী। কুঁচের পাতা ভালো করে থেঁতলে নিয়ে তার থেকে ১০-১২ ফোঁটা রস আধা কাপ পানির সঙ্গে মিশিয়ে খেলে দ্রুত শূলব্যথা উপশম হয়। এছাড়া বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে কুঁচের পাতা বেটে পেটের ওপর প্রলেপ দিলেও ব্যথায় দ্রুত আরাম পাওয়া যায়।

৪. মাথায় টাক পড়া রোধে: বংশগত কারণে নয়, বরং দীর্ঘদিন কোনো রোগে ভোগা বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণে যদি হঠাৎ মাথায় টাক পড়তে শুরু করে, তবে সাদা কুঁচ এক্ষেত্রে দারুণ কাজ করে। সাদা কুঁচের বীজ মিহি করে বেটে নিয়মিত মাথার টাক পড়া স্থানে প্রলেপ দিলে পুনরায় চুল গজাতে সাহায্য করে এবং আশাব্যঞ্জক উপকার পাওয়া যায়।

৫. ফুসকুড়ি ও চুলকানি সারাতে: শরীরে ছোট ছোট ফুসকুড়ি এবং সেই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী চুলকানি থাকলে, যা সাধারণ চিকিৎসায় সহজে সারে না, সেক্ষেত্রে কুঁচ ফল অত্যন্ত কার্যকর। কুঁচ ফল ভালো করে বেটে তিল তেলের সাথে মিশিয়ে জ্বাল দিয়ে তেল তৈরি করে নিতে হয়। এই তেল আক্রান্ত স্থানে নিয়মিত ব্যবহার করলে জেদি ফুসকুড়ি ও চুলকানি দ্রুত সেরে যায়।

৬. শ্লেষ্মাজনিত শিরঃপীড়ায় কুঁচের ব্যবহার: ধুলাবালি, ধোঁয়া, রোদ কিংবা অজীর্ণজনিত কারণে শ্লেষ্মা বা বাত-শ্লেষ্ম বেড়ে গিয়ে মাথা ভারী হয়ে থাকলে সাদা কুঁচের ফল চূর্ণ নস্যি হিসেবে ব্যবহার করলে দারুণ উপকার পাওয়া যায়। এই নস্যি গ্রহণ করলে মাথার ভারী ভাব কমে এবং বায়ু চলাচল স্বাভাবিক হয়। তবে এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন; কুঁচ চূর্ণ শ্লৈষ্মিক ঝিল্লীকে (mucous membrane) অত্যন্ত উত্তেজিত করে, তাই খুব সামান্য পরিমাণে নস্যি নেওয়া উচিত। এই ঘরোয়া প্রতিষেধকটি ব্যবহারের জন্য সকাল বেলা উপযুক্ত সময়।

কুঁচের ওষুধি গুণাগুণ নিয়ে যেমন বিস্তর গবেষণা হয়েছে, তেমনি এর বিভিন্ন অংশে থাকা রাসায়নিক উপাদানগুলোও নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কুঁচের চূর্ণ করা শিকড়ে প্রেকল, এবরল, গ্লাইসিরিজিন ছাড়াও এব্রাসিন ও প্রিকাসিন নামক দুটি বিশেষ অ্যালকালয়েড বিদ্যমান। কুঁচের পাতা স্বাদে মিষ্টি এবং এতে গ্লাইসিরিজিন, পিনিটল ও স্যাটুরেটেড অ্যালকোহল পাওয়া যায়। অন্যদিকে, বীজের প্রধান বিষাক্ত উপাদান হলো এব্রিন; এছাড়া বীজে অ্যালকালয়েড-এব্রিন, হাইপাফোরিন, কোলিন, ট্রাইগোনেলিন ও প্রিকাটোরিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।[১]

আরো পড়ুন:

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

📚 তথ্যসূত্র ও টিকা (References & Notes)

১. ড. সামসুদ্দিন আহমদ: ওষুধি উদ্ভিদ (পরিচিতি, উপযোগিতা ও ব্যবহার),  দিব্যপ্রকাশ, বাংলাবাজার, ঢাকা, জানুয়ারি ২০১২, পৃষ্ঠা, ৩১-৩৩।

২.  এ টি এম নাদেরুজ্জামান (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”  আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ ৮ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ১-২। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

৩. প্রকাশ ও পরিমার্জন সংক্রান্ত নোট: এই তথ্যবহুল নিবন্ধটি সর্বপ্রথম ১৩ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে জনপ্রিয় ওয়েব পোর্টাল ‘রোদ্দুরে.কম’-এ প্রকাশিত হয়েছিল। কন্টেন্টের গুণগত মান, বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা এবং আধুনিকতা বজায় রাখতে আজ ০৮ আগস্ট ২০২৬ তারিখে সম্পূর্ণ নিবন্ধটি নতুন তথ্যসহ পরিমার্জন, আধুনিকীকরণ এবং আপডেট করা হলো।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Len Worthington

1 thought on “কুঁচ গাছ (Abrus precatorius): পরিচিতি, ঔষধি গুণাগুণ ও মারাত্মক বিষক্রিয়া”

  1. গাছটির সাথে পরিচিত হয়ে ভাল লাগলো। আগে এর গুনাগুণ জানতাম না।

    Reply

Leave a Comment

error: Content is protected !!