বিছুটি ভেষজ গুণে ভরা বর্ষজীবী লতা জাতীয় উদ্ভিদ

বিছুটি ভেষজ একটি বর্ষজীবী লতা জাতীয় উদ্ভিদ। এদের বৈজ্ঞানিক নাম Tragia involucrata. ঘন শাখা বিশিষ্ট লতার রয়েছে অনেক ঔষধি গুণাগুণ। রোমযুক্ত লতাগাছটি ভারত ও বাংলাদেশের শীতোষ্ণপ্রধান অঞ্চলের প্রায় সবখানেই পতিত জমিতে দেখা যায়। নিম্নে বিছুটি লতার ভেষজ বা লোকায়াতিক ব্যবহার উল্লেখ করা হলো।

বিছুটি বর্ষজীবী লতা জাতীয় উদ্ভিদ

বিছুটি ভেষজ লতা

১. বুক ধড়ফড়ানি: পেটে বায়ু হলে মাঝে মাঝে বুক ধড়ফড় করে, কোনো কারণে উদ্বিগ্ন বা উত্তেজিত হলে বুক কাপে প্রভৃতির ক্ষেত্রে বিছুটির কাঁচা মূল আন্দাজ ৫ গ্রাম নিয়ে ২ কাপ জলে সিদ্ধ করে ১ কাপ থাকতে নামিয়ে, ছেঁকে খেতে হবে। অনেকে ১০ গ্রাম পর্যন্ত ব্যবহারের কথা বলে থাকেন। তবে ৫ গ্রাম ব্যবহার করাই ভালো। এটাতেই ঐ অসুবিধাটা চলে যাবে।

২. রক্ত ওঠা বা পড়া: ভূতেও ঘাড় মটকায়নি, রক্তপিত্তও হয়নি; দেখা যায় হঠাৎ হঠাৎ নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে; কোনো সময়ে মুখ দিয়েও আসে, অনেক সময় চোখের কোণেও রক্ত জমে যায়। এই রকম যে ক্ষেত্র, আয়ুর্বেদ মতে এটি উর্ধ্বগত বায়ুর চাপে রক্তক্ষরণ। এক্ষেত্রে বিছুটির মূল ৫ থেকে ৬ গ্রাম, তার সঙ্গে শালপর্ণী। যার চলতি নাম শালপাণি (Desmodium Gangeticum) ৫ থেকে ৬ গ্রাম একসঙ্গে ৩ কাপ পানিতে সিদ্ধ করে, আধা কাপ থাকতে নামিয়ে, ছেঁকে সকালে অথবা বিকালের দিকে সিকি কাপ দুধ মিশিয়ে খেতে হবে। এর দ্বারা ঐ বায়ুর চাপটা কমে যাবে।

৩. কোষ্ঠবদ্ধতায়: অপরিষ্কার দাস্তজনিত, অসুখী মন, খাওয়ার রুচি নেই; তাই বলে অরুচি নয়। এই ধরনের ক্ষেত্রে বিছুটি মূলের রস ২০ থেকে ২৫ ফোঁটা ২ চা চামচ দুধ মিশিয়ে খেতে দিতে হবে। এর দ্বারা সাধারণ কোষ্ঠবদ্ধতা দূর হবে।

৪. বলাধানে: প্রৌঢ়কাল ওজনও কমছে, বলও কমে যাচ্ছে,  শারীরিক ও মানসিক দূর্বলতা, অথচ বিশেষ কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, এক্ষেত্রে বিছুটির মূল ৩ থেকে ৪ গ্রাম বেঁটে এক থেকে দেড় কাপ দুধ আর এক কাপ জল একসঙ্গে ঐ বাটা মূল মিশিয়ে জ্বালা দিতে হবে, তারপর জলটা একটা মরে গেলে, ঐ দুধ নামিয়ে একটু ঠান্ডা হলে সকালে অথবা বিকালের দিকে একবার খেলেই হবে। এটির ব্যবহারে এক সপ্তাহের মধ্যেই দেহের ও মনের বল উল্লেখযোগ্যভাবে ফিরে আসবে। অবশ্য যদি কোনো ক্ষয়জাতীয় রোগ না থাকে।

আরো পড়ুন:  ক্ষেতপাপড়া গুল্ম-এর পাঁচটি ভেষজ গুণাগুণ ও প্রয়োগ

৫. হৃদরোগে কাসি: এদের কাসি হয় কিন্তু কিছু ওঠে না, অনেকটা বায়ুজনিত কাসির মতো, এক্ষেত্রে ১ গ্রাম মূল চূর্ণ প্রতিদিন সকালে গরম জলসহ খেতে হবে।

৬.হাঁপানি: হঠাৎ ঠান্ডা লাগে; এমন কি ঠান্ডা জল খাওয়া, ঠান্ডা ঘরে বসে থাকা, যাকে বলা যায় কোনো কারণে সামান্য ঠান্ডা লাগায় যে হাঁপানি হয়, সেক্ষেত্রে বিছুটি মূল চূর্ণ ও কুড় চূর্ণ (Saussurea lappa) সমপরিমাণ মিশিয়ে তা থেকে আধ গ্রাম মাত্রায় প্রতিদিন একবার সামান্য গরম জলসহ খেতে হয়। তবে প্রাচীন বৈদ্যগণ কুড়ের পরিবর্ত ভার্গীমূল, যার এদেশে প্রচলিত নাম বামুনহাটি মূলের ছাল চূর্ণ (Clerodendrum indicum) ব্যবহার করেন। তবে ভার্গী বলে যেটি এদেশে প্রচলিত, সেটি সন্দিগ্ধ ভেষজ ।

৭. গাঁটে বাত: বিছুটির মূল ৫ গ্রাম থেকে ১০ গ্রাম পর্যন্ত ৪ কাপ জলে সিদ্ধ করে, এক কাপ থাকতে নামিয়ে ছেঁকে, প্রতিদিন হয় সকালের দিকে নতুবা বিকালের দিকে খেতে হবে। আরও ভাল হয় ঐ সঙ্গে যদি মূলটা বেটে গাঁটে প্রলেপ দেওয়া যায়।

৮. মামস বা কর্ণমূল হলে: পাশ্চাত্য মতে এটি ভাইরাস ইনফেকশন যাহোক প্রাচীন বৈদ্যগণের সহজ ঔষধ ছিল বিছুটির মূল চন্দনের মতো করে বেটে, অল্প গরম করে ঐ ক্যানের পাশে লাগাতে হবে।

রাসায়নিক গঠন

Cellulose

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ূর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্রচার্য, চিরঞ্জীব বনৌষধি‘ খন্ড ১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা, ২৩৫-২৩৭।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিপিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Dinesh Valke

Leave a Comment

error: Content is protected !!