আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > প্রাণ > উদ্ভিদ > লতা > লাল শাপলা বাংলাদেশের জলজ আলংকারিক ফুল

লাল শাপলা বাংলাদেশের জলজ আলংকারিক ফুল

লাল শাপলা বা রক্ত কমল (বৈজ্ঞানিক নাম: Nymphaea rubra) শাপলা পরিবারের একটি জলজ উদ্ভিদ। এটি বাংলার প্রজাতি। পাতা এবং বোঁটা লালচে সবুজ। ফুল ডাবল, ১০-২০ সেমি চওড়া, অনেকগুলি পাপড়ি এবং পাপড়ির রঙ লাল। লাল শাপলা রাতে ফোটে। গোলাকার ফলে অনেকগুলো ছোট ছোট বীজ হয়। বীজ খাওয়া যায়। গোঁড়ার চারা থেকে চাষ করা হয়।

আলংকারিক ফুল গাছ: লাল শাপলা

বৈজ্ঞানিক নাম: Nymphaea rubra Roxb. ex Andrews.

সমনাম: Nymphaea pubescens auct. non Willd. (1798).

বাংলা ও স্থানীয় নাম: লাল শাপলা।

ইংরেজি নাম: Indian red water-lily.

জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস

জগৎ/রাজ্য: Plantae – Plants

শ্রেণীহীন: Angiosperms

বর্গ:  Nymphaeales

পরিবার: Nymphaeaceae

গণ: Nymphaea

প্রজাতি:  Nymphaea rubra Roxb. ex Andrews, Bot. Rep. 8: 104. t. 503(1808).

বর্ণনা: লাল শাপলা বহুবর্ষজীবী জলজ বীরুৎ, রাইজোম সচরাচর কালাকৃতির, খাড়া। পাতা সরল, লম্বা বৃন্তবিশিষ্ট, ছত্রাকার, ফলক বৃক্কাকার থেকে বর্তুলাকার, ১৫-৫০ X ১৩-৪৮ সেমি, কিনারা তরঙ্গিত থেকে দন্তুর এবং কিছুটা কুঞ্চিত, প্রাথমিক অবস্থায় উপর এবং নিচ উভয়পৃষ্ঠ গাঢ় লাল বর্ণের থাকে, পরবর্তীতে কিনারাসহ উপরের পৃষ্ঠ সবুজাভ হয়ে যায়, উপরের পৃষ্ঠ মসৃণ, নিচের পৃষ্ঠ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাদা রােমবিশিষ্ট।

লাল শাপলার পুষ্প আড়াআড়িভাবে সাধারণত ৫-১৫ সেমি, রক্ত লাল বর্ণের । বৃত্যংশ ৪টি, সচরাচর ডিম্বাকারভল্লাকার, উপবৃত্তাকার-দীর্ঘায়ত, অগ্রভাগ প্রায় তীক্ষ অথবা স্থূলা, ২.৫-৮.০ X ১.০-৩.২ সেমি, বাইরের পৃষ্ঠ অণুরােমাবৃত, সবুজ এবং ৫-৯টি সুস্পষ্ট ও সাদা শিরাবিশিষ্ট, ভেতরের গাত্র লাল। পাপড়ি ১৬-২৫টি, বাইরেরগুলাে ২-৭ X ১.০-২.৮ সেমি, রৈখিকাকারউল্টাভল্লাকার, অগ্রভাগ স্কুলা থেকে প্রায় তীক্ষ। পুংকেশর ৫৫-৮০টি, ভেতরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পুংকেশরের পুংদন্ডগুলাের পাদদেশের কাছাকাছি গাঢ় বেগুনি বর্ণের একটি ব্যান্ড বর্তমান। গর্ভাশয় ১৭-২৭ প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট, গর্ভমুণ্ডীয় উপাঙ্গ ০.৫-১.০ সেমি লম্বা, দীর্ঘায়ত, ভেতরের দিকে বাঁকা, রক্ত লাল। ফুল ও ফল ধারণ ঘটে সারা বৎসর; আগষ্ট-জানুয়ারী মাসে প্রচুর পরিমাণে।

আরো পড়ুন:  লতা পারুল বা রসুন লতা উষ্ণমন্ডলীয় অঞ্চলের আলংকারিক উদ্যান উদ্ভিদ

ক্রোমোেসােম সংখ্যা: 2n = ৭০ (Fedorov, 1969). 

আবাসস্থল ও চাষাবাদ: বদ্ধ এবং মিঠা পানির জলাধার, পুকুর এবং হ্রদে ভালো জন্মে।  অনেকেই লাল ও শাদা শাপলা চাষ করে থাকেন। শাপলা চাষ খুবই সহজ একটা কাজ।

চাষ পদ্ধতি: শাপলা লাগানোর আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো মাটি নির্বাচন। প্রাকৃতিক ভাবে এরা পুকুর-খাল-জলাশয়ের তলদেশের মাটি থেকে জৈব পদার্থ নিয়ে বেঁচে থাকে। সেখানকার ইকো সিস্টেমও ভিন্ন। তাই মাটি সংগ্রহের ক্ষেত্রে উর্বর লাল মাটি, বেলে দোয়াশ মাটি, দোরাশা মাটি (বেলে ও এঁটেল মাটির মিশ্রণ) সংগ্রহ করতে হবে। মাটি সংগ্রহের পরের ধাপ হচ্ছে শাপলা লাগানোর পাত্র নির্বাচন করা। আপনি যদি চারিতে শাপলা রাখতে চান তাহলে একটি মিডিয়াম থেকে বড় গাছের জন্য ১০-১৫ লিটার এর প্লাস্টিকের গামলা সংগ্রহ করতে হবে। চারা বা ছোট গাছের জন্য ৫-৮ লিটার এর প্লাস্টিকের গামলা যথেষ্ট। পরে গাছ বড় হলে গামলা পরিবর্তন করে বড় গামলায় দিতে হবে। আর যদি কেউ সরাসরি প্লাস্টিকের গামলা বা বালতিতে শাপলা লাগাতে চান তাহলে চেষ্টা করবেন বাজারে পাওয়া যায় এরকম সবচেয়ে বড় সাইজের বালতি বা গামলা সংগ্রহ করতে। প্লাস্টিকের গামলা বা বালতি সংগ্রহ করার পর তাতে প্রায় ৫-৮ ইঞ্চি পরিমান মাটি দিয়ে পূরণ করতে হবে। যারা চারিতে গাছ রাখতে চান তারা গামলার প্রায় পুরোটাই মাটি দিয়ে পুরন করতে পারেন নতুবা অল্প কিছু অংশ খালি রাখতে পারেন। আর যারা বালতি বা গামলাতে গাছ লাগাবেন তারা সর্বনিম্ন ৪ ইঞ্চি এবং সর্বোচ্চ ৬ ইঞ্চি পরিমাণ মাটি দিয়ে তারপর গাছ লাগাতে পারেন। যেহেতু আমাদের দেশে যে শাপলাগুলো পাওয়া যায় বা ইন্ডিয়া-থাইল্যান্ড থেকে যে শাপলা গাছ আনা হয় তার প্রায় সবই ট্রপিক্যাল। ট্রপিক্যাল শাপলা লাগাতে হয় পাত্রের মাঝখানে। পরবর্তী ধাপ হচ্ছে যারা চারিতে শাপলা রাখতে চান তারা শাপলা রাখার জন্য উপযুক্ত একটি চারি সংগ্রহ করবেন। সেক্ষেত্রে চারির উচ্চতা কমপক্ষে ১৫ ইঞ্চি থেকে সর্বোচ্চ ৩৬ ইঞ্চি এবং পাশে সর্বনিম্ন ২৪ ইঞ্চি থে ৩৬ ইঞ্চি হলে ভাল হয়। এই চারির উচ্চতা প্রায় ১৮ ইঞ্চহি এবং পাশে প্রায় ৩৬ ইঞ্চি। চারি সংগ্রহ করা থাকলে তা পুরোপুরিভাবে পানিতে আগেই পুরন করে গামলাতে বোনা শাপলা গাছে ধীরে ধীরে পানিতে ডুবিয়ে দেবেন। শাপলা যেহেতু পানিতে জন্মায়, ফলে পানিতে মশা জন্মাবে। মশার বংশ বিস্তার রোধ করতে পানিতে বিদেশী গাপ্পী, মলি, প্লাটি বা দেশী খলিশা মাছ রাখলে ভাল। এখানে একটি থাই শাপলা গাছের রিপটিং করা হয়েছে।[২]

আরো পড়ুন:  জিনিয়া শীতকালীন মৌসুমের বাগান ও টবে চাষযোগ্য পরিচিত আলংকারিক ফুল

বিস্তৃতি: ভারত, শ্রীলংকা, মায়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, লাওস, ক্যাম্বােডিয়া, ফিলিপাইন এবং ভিয়েতনাম। বাংলাদেশে অন্য দুটি প্রজাতি লাল ও নীল থেকে এই প্রজাতিটি একটু কম পাওয়া যায়।

টীকা: লাল শাপলার আদিনিবাস বঙ্গদেশ বলে দাবি করা হয়। প্রাকৃতিক অবস্থায় বেড়ে ওঠা প্রজাতিতে কখনও ফল ধরে না কারণ ইহা বাধ্যতামূলক অসঙ্গজনি প্রজাতির বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে। ইহার প্রাপ্তিস্থান শুধুমাত্র স্থায়ী পুকুর, হ্রদ, প্রভৃতিতে সীমাবদ্ধ (Mitra, 1990).

অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব: ইহার পুষ্পবৃন্তিকা সবজি হিসেবে খাওয়া হয় কিন্তু সাদা শাপলা অপেক্ষা কম পরিমানে।

জাতিতাত্বিক ব্যবহার: পুষ্প পাইলস এবং রক্ত আমাশয় চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। বংশ বিস্তার ও বক্রধাবক এবং অঙ্গজ মুকুলের মাধ্যমে।

অন্যান্য তথ্য:বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৯ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) লাল শাপলা প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের আপাতত কোন হুমকি নেই, অর্থাৎ এটি আশংকা মুক্ত (lc). বাংলাদেশে এটির বর্তমান অবস্থায় যথেষ্ট বিরাজমান। বাংলাদেশে লাল শাপলা সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটি বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়ােজন নেই।

আলোকচিত্রের ইতিহাস: লাল শাপলা ফুলের আলোকচিত্রটি তুলেছেন Anton Ardyanto, সিসি-বাই-এসএ-৪.

তথ্যসূত্র:

১. এম এ হাসান (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”  আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ৩২৭-৩২৮। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

২. রাকিবুল হাসান, ফেসবুকের লেখা।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

One thought on “লাল শাপলা বাংলাদেশের জলজ আলংকারিক ফুল

  1. লেখাটির সামান্য অংশে আমার লেখা থেকে নেয়া তথ্য ছিলো। ধন্যবাদ আমার courtesy দেবার জন্য।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page