ইঞ্চি লতা বা জেব্রা লতা (Inch Plant) কী? ইনডোর প্ল্যান্টের সৌন্দর্য এবং এর ক্ষতিকর আগ্রাসী রূপ!

গৃহসজ্জা এবং বাগানের সৌন্দর্য বর্ধনে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি উদ্ভিদের নাম ইঞ্চি লতা বা জেব্রা লতা (Inch Plant)। উদ্ভিদবিজ্ঞানের পরিভাষায় এটি মূলত ‘কমেলিনাসি’ (Commelinaceae) পরিবারের একটি সদস্য, যার বৈজ্ঞানিক নাম হলো Tradescantia zebrina। দৃষ্টিনন্দন ও দ্রুত বর্ধনশীল এই লতানো উদ্ভিদটি মূলত মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা এবং কলম্বিয়ার স্থানীয় প্রজাতি। তবে সময়ের সাথে সাথে এর অভিযোজন ক্ষমতার কারণে এটি এখন এশিয়া, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দ্বীপপুঞ্জেও প্রাকৃতিকভাবে বিপুল পরিমাণে জন্মাচ্ছে।

ইঞ্চি লতার রাজকীয় নামকরণ ও পরিচিতি

উদ্ভিদ জগতে ইঞ্চি লতা তার আকর্ষণীয় পাতার রঙ এবং বিচিত্র সব নামের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। বাংলায় এটিকে সাধারণত ‘ইঞ্চি লতা’ বা পাতার ডোরার কাটা দাগের জন্য ‘জেব্রা লতা’ বলা হয়ে থাকে। ইংরেজি ভাষায় এর লতানো ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার স্বভাবের কারণে একে ‘Inch Plant’ বা ‘Wandering Jew’ (ভ্রাম্যমাণ ইহুদী) নামে ডাকা হয়। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় এর দ্বিপদ নাম হলো Tradescantia zebrina এবং এর একটি সুপরিচিত সমনাম বা সিনোনিম হলো Zebrina pendula

ইঞ্চি লতার জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস (Scientific Classification)

বৈজ্ঞানিক বিষয়ের নামবিবরণ / তথ্য
বাংলা নামইঞ্চি লতা, জেব্রা লতা, ভ্রাম্যমাণ ইহুদী
ইংরেজি নামInch plant, Wandering jew
দ্বিপদ নাম (Binomial Name)Tradescantia zebrina
সমনাম (Synonym)Zebrina pendula
জগৎ/রাজ্য (Kingdom)Plantae (উদ্ভিদ জগৎ)
শ্রেণীবিভাগ (Clade)Angiosperms, Monocots, Commelinids
বর্গ (Order)Commelinales
পরিবার (Family)Commelinaceae
গণ (Genus)Tradescantia
প্রজাতি (Species)Tradescantia zebrina

ইঞ্চি লতার অনন্য পাতার গঠন ও রঙের বৈচিত্র্য

ইঞ্চি লতা বা জেব্রা লতা মূলত তার অসাধারণ পাতার সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। এই বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় উদ্ভিদটির পাতাগুলো কিছুটা মাংসল ও রসালো প্রকৃতির হয়ে থাকে। এর পাতার উপরিভাগে কেন্দ্রীয় অক্ষের সমান্তরালে একটি চমৎকার জেব্রা-নকশা ফুটে ওঠে। সাধারণত নতুন পাতাগুলো বেগুনি রঙের এবং পুরোনো পাতাগুলো নীলাভ-সবুজ রঙের দেখায়, যার বাইরের কিনারায় দুটি চওড়া রুপালি রঙের আকর্ষণীয় ডোরা বা স্ট্রাইপ থাকে। পাতার নিচের পৃষ্ঠটি সম্পূর্ণ একরঙা এবং গভীর ম্যাজেন্টা বা বেগুনি রঙের হয়ে থাকে। পাতাগুলো বেশিরভাগই ডিম্বাকার, যা লম্বায় ৪ থেকে ১০ সেন্টিমিটার এবং চওড়ায় ১.৫ থেকে ৩ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। এই পাতাগুলোর ডগার দিকটা সূচালো এবং গোড়ার দিকটা গোলাকার থাকে। তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, এই গাছটি যদি দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র ও সরাসরি সূর্যালোকের সংস্পর্শে থাকে, তবে পাতার এই ডোরারকাটা বৈচিত্র্য ম্লান হয়ে যায় এবং পুরো পাতাটি গাঢ় বেগুনি রঙ ধারণ করে।

কাণ্ড, মূলের বিস্তার ও ফুলের বৈশিষ্ট্য

ইঞ্চি লতা মাটির বুক ঘেঁষে নিচু হয়ে ঘন আচ্ছাদন বা কলোনি তৈরি করে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর কাণ্ডগুলো মসৃণ কিংবা হালকা রোমশ হতে পারে এবং এর পাতার খোলগুলো পাতলা ও স্বচ্ছ হয়। এই লতানো উদ্ভিদটির বংশবৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার ক্ষমতা দারুণ। এর কাণ্ডের প্রতিটি পর্বসন্ধিতে (Nodes) মূল গজানোর বিশেষ পথ থাকে। অনুকূল পরিবেশে পানি বা পর্যাপ্ত আর্দ্র মাটির সংস্পর্শে আসামাত্রই মাত্র এক দিনের মধ্যে এখান থেকে নতুন মূল গজিয়ে ওঠে। অন্যান্য ট্রেডেসক্যান্টিয়া প্রজাতির মতোই এই উদ্ভিদেও তিন পাপড়িবিশিষ্ট ছোট ও দৃষ্টিনন্দন ফুল ফোটে, যার রঙ সাধারণত গোলাপি থেকে উজ্জ্বল লালচে হয়ে থাকে এবং এর প্রজনন অঙ্গটি সাদা রঙের হয়। তবে অন্যান্য সমগোত্রীয় উদ্ভিদের চেয়ে ইঞ্চি লতার মূল পার্থক্য হলো—এটি নতুন কুঁড়ির মাধ্যমে চারদিকে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে, যার সংযোগস্থলটি পাতার উপর থেকে না হয়ে ঠিক পাতার নিচ থেকে শুরু হয়।

ইনডোর প্ল্যান্ট হিসেবে ইঞ্চি লতা: ঝুলানো টবের সৌন্দর্য ও বংশবিস্তার

অন্দরমহল বা বারান্দার সৌন্দর্য বাড়াতে ইঞ্চি লতা অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ইনডোর প্ল্যান্ট [roddure.com]। এই গাছটি ঝুলানো টবে বা হ্যাঙ্গিং বাস্কেটে (Hanging Basket) রাখার জন্য সবচেয়ে আদর্শ [roddure.com]। যখন লতাগুলো টব বেয়ে নিচের দিকে ঝুলতে থাকে, তখন এর পাতার নিচের পৃষ্ঠের চমৎকার ও দৃষ্টিনন্দন মেরুন বা ম্যাজেন্টা রঙটি খুব সুন্দরভাবে দৃশ্যমান হয়, যা ঘরের আবহ নিমেষেই বদলে দেয়। তবে এটি খুব দ্রুত বাড়ে বলে গাছের সুন্দর আকৃতি ধরে রাখতে নিয়মিত ডালপালা ছেঁটে বা ট্রিমিং (Trimming) করে রাখা প্রয়োজন।

ইঞ্চি লতার বেঁচে থাকা এবং বংশবিস্তারের ক্ষমতা অবিশ্বাস্য রকমের তীব্র। এর বংশবৃদ্ধির জন্য কোনো বীজের প্রয়োজন হয় না; মাত্র এক ইঞ্চির একটি ছোট কাণ্ড বা ডাঁটা থেকেও অনায়াসে নতুন গাছ গজিয়ে উঠতে পারে। এর ডাঁটা ছেঁটে যদি বাগানের কোনো কোণায় যেনতেনভাবে বা অবহেলাতেও ফেলে রাখা হয়, তবে সিঙ্গাপুর ডেইজি (Singapore Daisy) গাছের মতোই এটি মাটি থেকে রস নিয়ে নিজে নিজেই দ্রুত শিকড় গজিয়ে নতুন কলোনি তৈরি করে ফেলে।

আলংকারিক ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে আগ্রাসী রূপ

ইঞ্চি লতা বা জেব্রা লতা মূলত বাসাবাড়ির সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে একটি দৃষ্টিনন্দন আলংকারিক উদ্ভিদ (Ornamental Plant) হিসেবে শোভা পায় [roddure.com]। চমৎকার রঙের কারণে অনেকে এটিকে বাগানের ফাঁকা মাটিকে ঢেকে দেওয়ার জন্য ‘ভূমির আচ্ছাদন’ (Ground Cover) হিসেবেও ব্যবহার করেন। কিন্তু বাহ্যিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ করলেও এই লতার একটি অন্ধকার দিক রয়েছে। বাগান মালিকরা যদি এটিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ না করেন, তবে এটি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এক স্বৈরাচারী ও আগ্রাসী আগাছায় রূপান্তরিত হয়। অবহেলায় ছড়িয়ে পড়লে এটি তার আসেপাশের ছোটখাটো দেশীয় উদ্ভিদের বৃদ্ধি চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়।

ত্বক অ্যালার্জি ও আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধের ইতিহাস

কেবল বাগানের ক্ষতি করাই নয়, ইঞ্চি লতা মানুষের জন্য সরাসরি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই গাছের কাণ্ড এবং পাতা ভাঙলে এক ধরণের স্বচ্ছ তরল বা কষ নিঃসৃত হয়, যা মানবত্বকের সংস্পর্শে এলে মারাত্মক চুলকানি ও অ্যালার্জির (Dermatitis) সৃষ্টি করে। এই কারণে বাগানের সুরক্ষায় গ্লাভস (Gloves) ছাড়া এই গাছ নাড়াচাড়া না করাই উত্তম, এবং ভুলবশত হাত লেগে গেলে দ্রুত সাবান দিয়ে ভালোমতো ধুয়ে ফেলা উচিত। এই লতাটির অতি-আগ্রাসী আচরণের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে এটি অত্যন্ত কঠোর চোখে দেখা হয়। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকা (South Africa) এবং ইকুয়েডরের বিখ্যাত গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে (Galápagos Islands) এটিকে উচ্চ ঝুঁকির ‘আগ্রাসী উদ্ভিদ’ হিসেবে সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে এবং সেখানে এর নতুন করে রোপণ বা বিস্তার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের মূল্যায়ন ও সংরক্ষণ অবস্থা

আন্তর্জাতিকভাবে ইঞ্চি লতাকে বা জেব্রা লতাকে অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকির আগ্রাসী উদ্ভিদ মনে করা হলেও, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ’-এর ১১ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) এই প্রজাতিটি সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। জ্ঞানকোষের তথ্য অনুযায়ী, আমাদের দেশে এই উদ্ভিদটির কারণে বর্তমানে প্রাকৃতিকভাবে কোনো বড় ধরণের বা জরুরি সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা যায়নি। এই কারণে বাংলাদেশে প্রজাতিটিকে সম্পূর্ণ ‘আশঙ্কামুক্ত’ (Least Concern) হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

যেহেতু এটি প্রাকৃতিকভাবে বিপন্ন বা হুমকির সম্মুখীন নয়, তাই বাংলাদেশে ইঞ্চি লতা সংরক্ষণের জন্য আলাদাভাবে সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। তবে এর অতি-দ্রুত বংশবিস্তার এবং অন্যান্য দেশে এর আগ্রাসী আচরণের পূর্ব-অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে এই প্রজাতিটি সম্পর্কে জ্ঞানকোষে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেখানে স্পষ্টভাবে প্রস্তাব করা হয়েছে যে—কেবলমাত্র ঘরের বা বাগানের বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য একটি আলঙ্কারিক লতা হিসেবে ইহার অতিরিক্ত বা কৃত্রিম বংশবিস্তার অপ্রয়োজনীয়ভাবে উৎসাহিত করার কোনো প্রয়োজন নেই।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও আপডেট তথ্য

  • মূল প্রকাশ: এই তথ্যবহুল ও সচেতনতামূলক নিবন্ধটি সর্বপ্রথম ‘রোদ্দুরে.কম’-এ ৮ মে ২০১৮ তারিখে পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয়েছিল।
  • সর্বশেষ সংস্করণ: পাঠকদের কাছে সম্পূর্ণ নির্ভুল ও সমসাময়িক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে এই উদ্ভিদের ক্ষতিকর ও আগ্রাসী দিকগুলো বিবেচনা করে আজ ০৬ জুন ২০২৬ তারিখে পুরো নিবন্ধটি সম্পূর্ণ পরিমার্জন ও আপডেট করা হয়েছে।
  • এম কে আলম, (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”  আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ১১তম খণ্ড, ১ম সংস্করণ; ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ১৬৮-১৬৯। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

Leave a Comment

error: Content is protected !!