মিষ্টি কুমড়া-এর ভেষজ গুণাগুণের বিবরণ

বর্ষজীবী লতানে উদ্ভিদ। কাণ্ড, পাতা, পত্রদণ্ড, পুষ্প-পুষ্পদণ্ড সবই রোমশ। পাতা খসখসে, পাঁচটি অগভীর খাঁজ কাটা, কিনারা অসমানভাবে কাটা-কাটা। পাতার আকার বৃক্কাকৃতি অথবা হৃৎপিণ্ডাকৃতি। গাছ মাচায় হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মাটিতেই হয়। বৎসরে দু’বার এর চাষ হয়ে থাকে। একবার শীতে আর একবার বর্ষায় কাঁচা কুমড়ো অধিক পাওয়া যায়। পাকা কুমড়ো সারা বছর ধ’রেই বিক্রয় হয়।

ফুল হলদে, বেশ বড় বড়, স্ত্রী ও পুরুষ ভেদে দু’ প্রকার। ফল অর্থাৎ কুমড়ো গোল, লম্বা, গোল-চ্যাপ্টা প্রভৃতি নানা আকারের, কোন কোন ফলের গায়ে অগভীর খাঁজকাটা; কাঁচার গাঢ় বা হালকা সবুজ বা সাদা রঙের; পাকলে লালচে, খয়েরী হলুদ, সাদা, সাদাটে-বাদামী প্রভৃতি রঙের এবং উপরের ছাল বা খোসা ছাড়ালে ভেতরের রঙ হলদে বা লালচে দেখা যায়।

ফলে অনেক বীজ, সেগুলি আবার সাদা, খয়েরী অথবা ব্রোঞ্জ রঙের। বীজের ভেতর সুস্বাদু শাঁস থাকে, চ্যাপ্টা ও ধূসর বর্ণের। কুমড়োর নরম ডগা ও পাতা, পুরুষ পুষ্প (এঁড়ে ফুল), কাঁচা ও পাকা কুমড়ো, কুমড়োর বীজ, বীজের শাঁস প্রভৃতি খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়। মিষ্টি কুমড়োর বোটানিক্যাল নাম Cucurbita maxima Duchesue, ফ্যামিলী Cucurbitaceae. ঔষধার্থে ব্যবহার্য অংশ : সমগ্র গাছ, ফুল, ফল ও বীজ ।

গুণাগুণ

ভারতীয় মনীষীগণ মিঠে কুমড়োকে নিয়ে কম নাড়াচাড়া করেননি। গবেষণা করেছেন অনেক। কুমড়ো ও কুমড়োর বীজ নিয়ে তাঁদের সমীক্ষাটা এখানে জানাই। মিঠে কুমড়ো স্বাদে মধুর, স্বভাবে শীতল, রুচিকর, তৃপ্তিপ্রদ, গুরু, কফকর, কোষ্ঠপরিষ্কারক, শ্রম ও ভ্রমনাশক; তাছাড়া এটি ক্ষয়, দাহ, তৃষ্ণা, মূত্ররোধ, রক্তবিকার প্রভৃতি প্রশমিত করে। কাঁচা কুমড়ো (মাঝারি বয়সের) স্বাদে কম মধুর হলেও অধিক রুচিকর, বলকারক এবং বীর্যবর্ধক। কুমড়োর বীজ বা বীজের শাঁস স্বাদে মধুর, স্বভাবে শীতল, রুচিপ্রদ, বলকর, বীর্যবর্ধক, মূত্রকারক, ক্রিমিঘ্ন (round worm) এবং কামোত্তেজক। নব্যের সমীক্ষায় দেখা যায় যে, কুমড়োতে প্রোটিন, ফ্যাট, কার্বহাইড্রেটস্, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, ভিটামিন-এ, বি, সি প্রভৃতি বিদ্যমান ।

আরো পড়ুন:  মালতী বা মালতী লতার পাঁচটি ভেষজ গুণাগুণ

মিষ্টি কুমড়া-এর ভেষজ ব্যবহার

কুমড়োর বিভিন্ন অংশকে কিভাবে রোগ-প্রতিকারে লাগানো যেতে পারে, সেটাই এখন বলা হচ্ছে ।

১. অরুচিতে: নানা কারণে রুচির বিকার ঘটতে পারে, সেটার ক্ষেত্রটি বিরাট হলেও এখানের ক্ষেত্র হচ্ছে খাদ্যে অরুচি। কোনকিছু খেতে ইচ্ছে করে না, দাস্ত যে খুব একটা অপরিষ্কার তাও নয়, মাঝে-মধ্যে ক্ষিধেও লাগে, এ ধরনের অবস্থাটা স্বাভাবিক অবস্থাতে সাধারণত আসে শীতের শেষে এবং বর্ষার পরে। এছাড়া অন্য সময়েও হতে পারে। আবার কোন কোন রোগের ফলেও খাদ্যে অরুচি আসে, রোগভোগের পরও বহু ক্ষেত্রে দেখা দেয়। এক্ষেত্রে অবস্থাভেদে নিম্নলিখিত যোগগুলির যে কোন একটি ব্যবহার করলে উপকার পাবেন। সেগুলি হলো-

(ক) কুমড়ো গাছের কচি ডগা ও পাতার ঝোল তৈরি ক’রে দু’বেলা ভাত অথবা রুটির সঙ্গে খেতে হবে। এই ঝোল তৈরির জন্য আন্দাজ ফুট খানিক লম্বা পাতা সমেত ডগা নেওয়া উচিত। খাওয়ার সময় ঝোলটা খাবেন এবং ডাঁটা ও পাতা চিবিয়ে রসটা খেয়ে ছিবড়ে ফেলে দেবেন। অবশ্য খুব নরম হলে খাওয়াও যায়। রোগাম্ভিক দুর্বলতাজনিত রুচিতে বিশেষভাবে ব্যবহার্য। এই ঝোলের সঙ্গে অন্য সবজি যেমন আলু, বেগুন, গাজর, টমেটো প্রভৃতি দিতে পারেন, তবে সেগুলো খাওয়া চলবে না। কেবল ওগুলোর ঝোলটা খেলেই হবে।

(খ) কাঁচা কুমড়ো ছাল না ছাড়িয়ে ডুমো ডুমো করে কেটে তাতে অল্প আলু মিশিয়ে ফোড়ন সহযোগে তরকারি বানিয়ে খেতে হবে ভাত বা রুটির সঙ্গে। কুমড়ো ১০০-১৫০ গ্রাম, আলু ৫০ গ্রাম আন্দাজ একজন পূর্ণবয়স্কের মাত্রা হওয়া উচিত। তবে একটু-আধটু ক্ষমবেশি হলে ক্ষতি নেই। গরমের দিন হলে এর সঙ্গে অল্প একটু তেতো নিম, উচ্ছে বা গলতা মিশিয়ে নিলে ভাল। এটা আবার অনেকে সহ্য করতে পারেন না, তাঁরা এমনি খাবেন অথবা অল্প একটু চিনি মিশিয়ে নেবেন। গরমের দিন ছাড়া অন্য সময়ে প্রয়োজনে ভাগ চিনি মিশিয়ে অথবা পছন্দ না হলে এমনিতে পাক করলে চলবে। ঋতুর শেষে স্বাভাবিক ভাবে যে অরুচিতে অনেকে কষ্ট পান, সেইসঙ্গে অপরিষ্কার দাস্ত, তাঁরা এটির ব্যবহারে সুফল পাবেন। কাঁচা না পেলে পাকা ব্যবহার্য, তখন কিন্তু ছাল ছাড়িয়ে নেবেন।

আরো পড়ুন:  জালি বেত বাংলাদেশের ঝোপ ঝাড়ে জন্মানো লতা

(গ) কুমড়োর বীজ ছাড়িয়ে শাঁসগুলোকে নিয়ে তাতে পরিমাণমতো লবণ মিশিয়ে অল্প তেলে যেমন- সরষে/ বাদাম/নারকোল অথবা লবণ না মিশিয়ে ঘিয়ে ভেজে ভালভাবে মুখ ঢাকা পাত্রে রেখে দিতে হবে, যাতে চিমসে না হয়ে যায়। এবার ঐ ভাজা প্রত্যহ ৮।১০ গ্রাম ক’রে দু’বেলা ভাত বা রুটির সঙ্গে খাবেন অথবা খালি মুখে খাওয়ার পর চা-পানও করতে পারেন। যেক্ষেত্রে অরুচিটা আসে আলতু-ফালতু খাওয়ার ফলে, কিংবা মদ্যাদি নেশার কারণে, অথবা মন-ভর্তি করে ভোগ-বাসনা চরিতার্থ করার পর, সেক্ষেত্রে তো এটি অমৃত সমান।

(ঘ) কুমড়ো ফুল দু’টি নিয়ে বেসন সহযোগে ভেজে (যেকোন ভোজ্য তেল দিয়ে) গরম গরম খেতে হবে ভাত কিংবা রুটির সঙ্গে প্রথম পাতে এবেলা ওবেলা দু’বেলা কয়েকদিন খেলেই রুচি ফিরে আসবে। তবে যাঁদের তেল-ঘি প্রভৃতি অধিক গ্রহণ নিষিদ্ধ, তাঁরা এটি না খেলেই পারেন।

২. কোষ্ঠবদ্ধতায় : ছোটবেলা থেকেই শাক-সবজি খাওয়ার প্রবণতা যাঁর নেই, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোষ্ঠবদ্ধতাও মাথা চাড়া দিতে থাকে। এর ফলস্বরূপ সারা জীবন দুর্ভোগ ভোগ করতে হয়। তখন কাঁচা অথবা পাকা কুমড়োর তরকারি উপরিউক্ত পদ্ধতিতে তৈরী ক’রে দু’একদিন অন্তর খাবেন। অবশ্যই ভাল থাকবেন ।

৩. শুক্রাল্পতায় : যেভাবেই হোক, তা সে সাদা-কালো-পাঁচমেশালি যেটাই হোক না; যেমন অনেকে মনে করে এখন বয়স আছে, ইচ্ছা জাগে, মিথুনদণ্ডের সামর্থ্যও কম নেই, অথচ ক্ষরণ হয় না বলেই অশান্তিরও শেষ নেই। এক্ষেত্রে কুমড়ো বীজের শাঁস ঘিয়ে ভেজে ৮। ১০ গ্রাম মাত্রায় দিনে দু’বার ক’রে খেতে হবে। চায়ের প্রাক্কালে অথবা ভাত রুটির সঙ্গে খেতে পারেন ।

৪. কামোত্তেজনা হ্রাসে: একার অথবা উভয়েরই, দিন যায় রাত্রি আসে, ভোগের জমাটি আসর ভাঙ্গে, আবার বসে, দেয়া-নেয়ার এক-একটি পর্ব শেষ হয়, অথচ সাধ আর মেটে না, ফলে উত্তেজনাও ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। অসহায়ত্ববোধের পূর্বেই উপরিউক্ত পদ্ধতিতে কুমড়োর বীজের শাঁস ভেজে খাওয়া আরম্ভ করুন ।

আরো পড়ুন:  কুম্ভি এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ

আর একটা কথা—দীর্ঘদিন ধরে ভোগ-বাসনা চরিতার্থ করতে করতে যৌবনের শেষাশেষি অবস্থাতে একটা অনীহা উভয়েরই আসতে পারে, তখন এই যোগটি ব্যবহারের সাথে সাথে উভয়কেই মাঝে মাঝে ধৈর্যের সম্মুখীন হতে হবে, তার ফলে মনের মধ্যে নতুন ক’রে উন্মাদনার সৃষ্টি হতে থাকবে । এক্ষেত্রে যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন ।

৫. অপুষ্টিতে: যে বয়সেই হোক না কেন, এক্ষেত্রে বয়সানুপাতে ২ থেকে ১০ গ্রাম কুমড়ো বীজের শাঁস জলে বেটে তাতে সিকি থেকে এক কাপ পর্যন্ত গরম দুধ ও পরিমাণমত চিনি মিশিয়ে সরবতের মতো ক’রে দিনে একবার, প্রয়োজনে ২ বার কিছুদিন খেলে উপকার বুঝতে পারবেন।

৬. বার্ধক্যকে ঠেকিয়ে রাখতে : বয়সটা প্রৌঢ়ের কোঠায় পৌঁছলেই কুমড়োর তরকারি এবং ওর ফুল ও বীজের শাঁস ভেজে মাঝে মাঝে খেতে থাকুন।

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্র:

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, সপ্তম মুদ্রণ ১৪২৬, পৃষ্ঠা, ৮৮-৯২।

Leave a Comment

error: Content is protected !!