তিতাকুঞ্জ লতা গ্রীষ্মাঞ্চলে জন্মানো ভেষজ উদ্ভিদ

হিন্দী ভাষাভাষী অঞ্চলে এই ছাগলবেঁটে গাছটির নাম নাচিকনী, বাংলায় কোথাও তিকুঙ্গী, কোথাও-বা নাকচিকনী নামে পরিচিত। আর একটি বাংলা-সংস্কৃত ঘেঁষা নাম হলো মধুমালতী। লতানো বৃক্ষারোহী লতা। ফুলের বাহারের জন্য কোথাও কোথাও লাগানো হয়। ফুলের আকৃতিকে কেন্দ্র করে নাচিকনী নামকরণ বলেই ধারণা। ফুল ও ফল তেতো বলে তিৎকুঙ্গী নাম। নাকচিকনী নামে আর একটি ক্ষুপজাতীয় বর্ষজীবী উদ্ভিদ পাওয়া যায়, যার সংস্কৃত নাম ছিক্কনী, বাংলা নাম মেচেতা বা হাচুতি, বোটানিক্যাল নাম Centipeda orbicularis, সেটি কিন্তু এটি নয়। পৃথক গাছ।

ভারতের গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলের প্রায় সর্বত্র, দক্ষিণ বঙ্গের কোথাও কোথাও জঙ্গলে কিংবা বেড়ার ধারে জন্মে। এই লতা গাছটি লম্বায় ৩০ থেকে ৩৫ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে দেখা যায়। পাতা শক্ত কাণ্ডের উভয় দিকে থাকে। পাতা ৩ -৬ ইঞ্চি লম্বা, ২–৪ ইঞ্চি চওড়া, অগ্রভাগ সরু, গোড়ার দিকটা গোলাকার কিংবা হৃৎপিণ্ডাকৃতি, ৪ । ৫ জোড়া শিরাবিশিষ্ট। লতাটির ত্বক মসৃণ ও ধূসর রঙের। পাতার কোল থেকে পুষ্পদণ্ড বেরোয়, লম্বায় ২। ৩ ইঞ্চি, নরম, তার মাথায় ছাতার মতো অনেকগুলি ফুল ফোটে। ফুলের বর্ণ উজ্জ্বল হরিদ্রাভ-সবুজ, মাটির দিকে ঝুলে থাকে। গ্রীষ্মকালে ফুল ও শীতকালে ফল হয়।

একই বৃত্তে দু’টি ফল, পরস্পর বিপরীত দিকে থাকে, লম্বায় ৩-৪ ইঞ্চি, চওড়া ১– দেড় ইঞ্চি, মসৃণ, অগ্রভাগ ভোঁতা, দেখতে ছাগলের দু’টি বাঁটেরই মতন। বীজ হরিদ্রাভ খয়েরী, মসৃণ, উজ্জ্বল । পূর্বেই বলা হয়েছে যে, এই লতাগাছটির বর্তমানে বোটানিক্যাল নাম Wattakaka volubilis. বোম্বাই অঞ্চলে এই লতাটিকে দড়ির মতো ব্যবহার করে নানা প্রকার দ্রব্যাদির আঁটি বাঁধা হয়ে থাকে। ছোটনাগপুরের ব্রাহ্মণগণ এর আঁশ পবিত্র সুতো হিসেবে গ্রহণ করেন, কখনো কখনো পৈতার মতও ব্যবহৃত হয় ।

তিতাকুঞ্জ লতা পাতা, ফুল, কাঁচা অথবা পাকা ফল লোকে খায়। সিদ্ধ করার পর জল ফেলে দিলে তেতো কমে যায়। ফুলগুলি বাজারে বিক্রি হয়, লোকে খাওয়ার জন্য কেনে।

আরো পড়ুন:  খুবানি শোভাবর্ধক ও উপকারী বৃক্ষ

তিতাকুঞ্জ লতা-এর গুণাগুণ

পাতার প্রলেপ ফোড়া ও ক্ষতে ব্যবহৃত হয়। এর দ্বারা পয উৎপাদন ও নিঃসরণ উভয় ক্রিয়া হয়ে থাকে। শিকড় ও কচি /নরম ডালপালা বমনকারক, শোথা, কফনিঃসারক ও ঘর্মকারক। ফলের উপরকার অংশ গবাদি পশুর ক্ষত ও অর্বুদে ব্যবহৃত

Wattakaka volubilis (Linn. f.) Stapl. (ছাগল বাঁটি) হয়। সম্পূর্ণ গাছের সুরাসার প্রস্তুত করে (alcoholic extracts of plant) ব্যবহারে দেখা গেছে যে, তা Central nervous system-এর উপর কাজ করে। ইঁদুরের উপর পরীক্ষা ক’রে দেখা গেছে যে, এটির ক্যানসার দমন ক্ষমতাও আছে। গাছটির রস হাঁচিকারক। শিকড়ে সামান্য পরিমাণ উপক্ষার ও গ্লুকোসাইড পাওয়া যায়, যা ইন্দুর ও ব্যাঙের উপর পরীক্ষা ক’রে দেখা গেছে যে, এটি সামান্য বিষাক্ত ও শিরার মধ্যে ইনজেকশন করলে রক্তের চাপ কমিয়ে দেয় এবং কিছুটা উত্তেজকও ।

সমগ্র গাছ, ফুল, শিকড় প্রভৃতিতে নানা প্রকার উপক্ষার ও গ্লুকোসাইডস্ পাওয়া যায়। এসবগুলিকে নানাভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা চলছে প্রতিনিয়ত ।

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্র:

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, সপ্তম মুদ্রণ ১৪২৬, পৃষ্ঠা, ২৭৪-২৭৬।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম:  Dinesh Valke

Leave a Comment

error: Content is protected !!