বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক প্রতিবেশে কচ্ছপ প্রজাতিগুলোর প্রায় সবগুলোই বর্তমানে চরম বিপন্ন এবং বিলুপ্তির পথে রয়েছে। আমাদের দেশে কচ্ছপ, কাইট্টা ও কাছিম মিলিয়ে সর্বমোট প্রায় ৩০টি প্রজাতি রয়েছে। তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জলাভূমি ও বনাঞ্চলের আশপাশের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে এই কচ্ছপগুলোর অস্তিত্ব এখন তীব্র হুমকির মুখে পড়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রজাতির কচ্ছপ, কাইট্টা ও কাছিম টিকে থাকলেও এদের বেশির ভাগ প্রজাতিই মহাবিপন্ন ও বিপন্ন প্রাণীর আন্তর্জাতিক লাল তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। কচ্ছপ, কাইট্টা ও কাছিম মূলত পানিতে পচা বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর দেহাবশেষ খেয়ে পানিদূষণ থেকে আমাদের রক্ষা করে থাকে। এর ফলে দেশের জীববৈচিত্র্য এবং সর্বোপরি জলজ পরিবেশ-প্রতিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাচ্ছে। অন্যথায় সামগ্রিক অর্থেই গোটা পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
আন্তর্জাতিক আইনে সব প্রজাতির কচ্ছপ, কাইট্টা ও কাছিম বিপণন, শিকার ও ব্যবসায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমনকি বাংলাদেশের বিদ্যমান বন্যপ্রাণী আইনেও সব প্রজাতির কচ্ছপ, কাইট্টা ও কাছিম ধরা আইনত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ একশ্রেণীর অর্থলোভী মানুষ প্রতিনিয়ত এই প্রকৃতিবান্ধব ও পরিবেশ রক্ষাকারী প্রাণীগুলো নিধন করে চলেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে গণ-সচেতনতার অভাবে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় এখনো কাছিম শিকার অব্যাহত রয়েছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সাধারণ মানুষের মধ্যে গণসচেতনতা সৃষ্টির জন্য মূলধারার মিডিয়াকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
ইদানিং দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বনবিভাগের কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসন বিপুল পরিমাণ কচ্ছপ উদ্ধার করে পুনরায় তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও নদীতে অবমুক্ত করছেন—যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত শুভ লক্ষণ। বাংলাদেশ বন বিভাগ, বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট এবং বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঐতিহাসিক উদ্ধার ও অবমুক্তকরণ কার্যক্রমের একটি সুনির্দিষ্ট বছরভিত্তিক ডাটাবেস নিচে ক্রমানুসারে তুলে ধরা হলো:
কচ্ছপ ও কাছিম উদ্ধার অভিযানের বছরভিত্তিক অফিশিয়াল টাইমলাইন ও ডাটাবেস
২০১০ সাল: বিমানবন্দরে বড় উদ্ধার অভিযান
- ২৩ মে, ২০১০: শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে নিয়ে আসা ৪৬০টি বিরল প্রজাতির কচ্ছপ এক সফল অভিযানে উদ্ধার করে যৌথ প্রশাসন ও বন বিভাগ।
২০১১ সাল: পুরান ঢাকা ও বিভিন্ন জেলায় ধারাবাহিক সফল অভিযান
- ২০ জুন, ২০১১: পটুয়াখালী জেলা থেকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ২৯টি বিপন্ন কচ্ছপ উদ্ধার করা হয়।
- ২৬ অক্টোবর, ২০১১: ঢাকার পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার এলাকায় গোপন সূত্রের ভিত্তিতে আগারগাঁও বন বিভাগ কোতোয়ালি থানা পুলিশের সহযোগিতায় একটি বড় অভিযান পরিচালনা করে। ঢাকা বন্যপ্রাণী বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো: সাহাবুদ্দিন এবং আগারগাঁও বন ভবনের বন সংরক্ষক ড. তপন কুমার দে-র নেতৃত্বে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট এই অভিযানে সরাসরি অংশ নেয়। বাজার থেকে ৬১টি বিভিন্ন প্রজাতির কাছিম উদ্ধার করা হয়, যার বেশিরভাগই ছিল সুন্ধি জাতের কাছিম। উদ্ধারকৃত এই কাছিমগুলো পরবর্তীতে গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের উন্মুক্ত জলাশয়ে অবমুক্ত করা হয়েছিল।[১]
- নভেম্বর ২০১১: বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও গবেষক ড. মনিরুল খান প্রথমবার বাংলাদেশে ‘পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিম’ (Amyda cartilaginea) প্রজাতিটির উপস্থিতি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন।
- ০৮ ডিসেম্বর, ২০১১: খুলনা অঞ্চল থেকে বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের একটি বিশেষ দল চোরা শিকারিদের হাত থেকে ১০৩টি কচ্ছপ সফলভাবে উদ্ধার করে।
২০১২ সাল: ঐতিহ্যবাহী কচ্ছপ মেলা বন্ধ ও সীমান্ত-বিমানবন্দরে বড় রেকর্ড
- ২৬ মার্চ, ২০১২: যশোরের বেনাপোল সীমান্ত এলাকা থেকে ভারতে পাচারের সময় ২০০টি কচ্ছপ উদ্ধার করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
- ১৩ এপ্রিল, ২০১২: বিপন্ন প্রাণী রক্ষার অংশ হিসেবে বরিশালের আগৈলঝাড়ার পয়সারহাট নদীর পাড়ের ত্রিমুখী বাজারে প্রায় দুইশ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী ‘কচ্ছপ মেলা’ শুক্রবার রাতে বন্ধ করে দেয় বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন। যদিও হিন্দু অধ্যুষিত এই এলাকায় বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিনে মেয়ের জামাই, নাতি-নাতনীসহ আত্মীয়-সংক্রান্ত রেওয়াজ অনুযায়ী কচ্ছপের মাংস দিয়ে আপ্যায়ন করার একটি দীর্ঘ ইতিহাস ছিল। আশেপাশের কোদালধোয়া, আন্ধারমানিক, বাটরা, বাহাদুরপুর, বাকাল, জলিরপাড়, পয়সারহাট, বড়মগরাসহ কোটালীপাড়া উপজেলার রামশীল, ভেন্নাবাড়ি, কদমবাড়ী, বান্ধাবাড়ি ও মাদারীপুর জেলার কালকিনি থেকেও অনেকে কচ্ছপ কিনতে আসতেন এ মেলায়। পরিবেশ রক্ষার্থে আগৈলঝাড়া ও কোটালীপাড়া বন বিভাগ আগে থেকেই মাইকিং করলেও ব্যবসায়ীরা তা অমান্য করে পসরা সাজিয়ে বসে। পরে খুলনা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. জামাল হোসেন, কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান, গৌরনদী বন বিভাগের কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন তালুকদার, আগৈলঝাড়া বন বিভাগের কর্মকর্তা কেবিএম ফেরদৌস, কোটালীপাড়া বন বিভাগের কর্মকর্তা বিবেকানন্দ মল্লিক ও রামশীল ইউপি চেয়ারম্যান খোকন বালার উপস্থিতিতে অভিযান চালিয়ে মেলা ভেঙে বিপুল পরিমাণ কচ্ছপ উদ্ধার করে নদীতে ছেড়ে দেওয়া হয়। কর্মকর্তা জামাল হোসেন জানান, ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের তৃতীয় তফসিলের চতুর্থ ধারায় কচ্ছপ ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ করে বিভিন্ন দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে এবং সেই অনুসারেই এই ঐতিহ্যবাহী মেলা বন্ধ করা হয়।[২]
- ১৬ এপ্রিল, ২০১২: শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৪০৬টি বিরল প্রজাতির কচ্ছপ উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে ১৮ এপ্রিল বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক ড. তপন কুমার দে-র উদ্যোগে সড়ক পথে গাড়িযোগে কক্সবাজারের ডুলাহাজরা সাফারি পার্কে পাঠানো হয়। অবমুক্ত করার সময় জীবিত অবস্থায় ২৮৪টি কচ্ছপ পাওয়া যায় এবং ৪টি কচ্ছপ মারা যায়।
- ২৬ এপ্রিল, ২০১২: ভারত থেকে বাংলাদেশে পাচার করে আনা ১৫৫টি কচ্ছপ যশোরের বেনাপোল সীমান্ত এলাকা থেকে বিজিবি ও বন বিভাগ যৌথ অভিযানের মাধ্যমে আটক করে। পরে বেনাপোল থেকে কচ্ছপের চালানটি কাভার্ড ভ্যানে করে যশোর শহরের জুমজুম এলাকায় একটি কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয়ে নেওয়া হলে সেখানে কার্টন তিনটি আটক করা হয়। আটক কাছিমগুলোর মধ্যে ৮৭টি শিলা ও ৬৮টি কালিকাইট্টা প্রজাতির ছিল, যাদের মূল আবাসস্থল গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার পাহাড়ি এলাকা। পরে কচ্ছপগুলো ঢাকার আগারগাঁওয়ে বন ভবনে নিয়ে আসা হয়।[৩]
২০১৩ সালের উদ্ধার কার্যক্রম
- ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় আন্তর্জাতিক চোরাচালান বিরোধী অভিযানে বিপুল পরিমাণ বিরল ইন্ডিয়ান স্টার টরটয়েজ এবং সুন্ধি কাছিম উদ্ধার করা হয়। বন্যপ্রাণী পাচার রোধে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের যৌথ উদ্যোগে এই অভিযান চালানো হয়েছিল। এই সময় দক্ষিণ ভারত থেকে পাচার হয়ে আসা কচ্ছপের চালানটি আটক করে যৌথ বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট।
২০১৪ সাল: রাজশাহী, তাড়াশ ও আত্রাইয়ে পাচারকারী সিন্ডিকেট দমন
- ০৮ জানুয়ারি, ২০১৪: বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, রাজশাহী-এর উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাজশাহী মহানগরীর নিউমার্কেট এলাকা থেকে মোট ১২টি কচ্ছপ উদ্ধার করে। এর মধ্যে ৬টি ছিল বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির দেশি কড়িকাইট্টা (Assam Roofed Turtle, বৈজ্ঞানিক নাম: Pangshura tecta) এবং বাকি ৬টি ছিল বিদেশি প্রজাতির কচ্ছপ।
- ১৩ জানুয়ারি, ২০১৪: সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার উত্তর সীমান্তবর্তী রানীরহাট বাজারে ক্রেতা সেজে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের টহল দল অভিযান চালিয়ে ৭০টি কচ্ছপসহ ৩ জন বড় পাচারকারীকে আটক করে। তাড়াশ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা শরীফ রায়হান কবির ও রাজশাহী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোল্যা রেজাউল করিমের উপস্থিতিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে ধৃত পাচারকারী সিন্ডিকেটের নেতা বগুড়ার শেরপুরের নিশি সিং ও সুনীল রায় এবং তাড়াশের ধীরেন্দ্রনাথকে ১ বছর করে কারাদণ্ড প্রদান করেন। উদ্ধারকৃত ৭০টি কচ্ছপ পরবর্তীতে বন বিভাগীয় কর্মকর্তা রেজাউল আলমকে সাথে নিয়ে চলনবিলে অবমুক্ত করা হয়।[৪]
- ১৫ জানুয়ারি, ২০১৪: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ধারকৃত বন্যপ্রাণী প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে একটি ‘ভ্রাম্যমাণ বন্যপ্রাণী প্রদর্শনী’ আয়োজন করা হয়। এ বিষয়ে প্রাণী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক গাজী আসমত ২১ জানুয়ারি তাঁর ফেসবুক পোস্টে একটি যৌক্তিক সমালোচনা করে লেখেন— “ভ্রাম্যমাণ বন্যপ্রাণী প্রদর্শনী’-র উদ্দেশ্য স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বন্যপ্রাণী ও পরিবেশের প্রতি দরদ দেখানো যদি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তাহলে প্রদর্শনী বনভবনে হওয়া উচিত নয়কি?”
- ১৮ জানুয়ারি, ২০১৪: পূর্বে উদ্ধারকৃত কিছু কচ্ছপকে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, রাজশাহী কর্তৃক নাটোরের জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে নাটোর জেলা পরিষদ লেক এবং শ্যামনগর মৎস্য অভয়ারণ্যে অবমুক্ত করা হয়।
- ১৯ জানুয়ারি, ২০১৪: বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, রাজশাহী কর্তৃক নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলায় অভিযান চালিয়ে কচ্ছপ ও কুইচ্চা ব্যবসায়ী, শিকারী ও পাচারকারী চারজনকে আটক করা হয়। মোবাইল কোর্টের বিজ্ঞ বিচারক সেদিনই আসামিদের দুজনকে দশদিন করে কারাদণ্ড ও অপর দুজনকে অর্থদণ্ড প্রদান করেন।[৫]
- ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৪: ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিদেশে পাচারের সময় ৫১০টি কচ্ছপ উদ্ধার করে শুল্ক কর্তৃপক্ষ। পরে তা বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। উদ্ধারকৃত এই কচ্ছপের আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল প্রায় সোয়া ১০ লাখ টাকা। বন বিভাগের অপরাধ দমন ইউনিটের পরিদর্শক অসীম মল্লিক প্রথম আলোকে বলেন, কালো চিত্রা প্রজাতির এসব কচ্ছপ দুটি ব্যাগের মধ্যে ভরে পাচার করা হচ্ছিল।[৬]
- একই বছর (২০১৪): বান্দরবানের আলীকদম থেকে একসময় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত ভাবা ‘আরাকান বন কচ্ছপ’ (Arakan Forest Turtle) উদ্ধার করে বন বিভাগ এবং ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স (CCA) এর কৃত্রিম প্রজনন প্রক্রিয়া শুরু করে।
২০১৫ সাল: বেনাপোল সীমান্তে বড় আর্থিক মূল্যের চালান জব্দ
- ০৪ মে, ২০১৫: যশোরের বেনাপোল সীমান্তের কাছ থেকে ৩৬১টি বিরল প্রজাতির কচ্ছপ উদ্ধার করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, উদ্ধারকৃত এই কচ্ছপগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল প্রায় ১৯ লাখ টাকা। বিজিবি-২৩ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুর রহিম জানান, ভারত থেকে কচ্ছপ পাচার করা হচ্ছে এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সীমান্ত রক্ষীরা ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে এগুলো জব্দ করেন। তবে বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে পাচারকারীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় বলে জানান এই অধিনায়ক। পরবর্তীতে জব্দকৃত কচ্ছপগুলো খুলনা বিভাগীয় বন কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়।[৭]
- অক্টোবর ২০১৫: বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে খুলনায় বন বিভাগের প্রায় এক একর জায়গায় দেশের প্রথম ‘বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র’ চালু হয়, যেখানে কচ্ছপসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর আধুনিক সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
২০১৬ সালের কচ্ছপ ও কাছিম সংক্রান্ত ডাটাবেস
- ফেব্রুয়ারি ২০১৬ (সুন্দরবনের ইতিহাসে প্রথম স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটারযুক্ত কচ্ছপ অবমুক্তকরণ): যুক্তরাষ্ট্রের ‘টার্টেল সারভাইভাল অ্যালায়েন্স’ (TSA), অস্ট্রিয়ার ‘ভিয়েনা জু’ (Vienna Zoo) এবং বাংলাদেশের ‘প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন’-এর অর্থায়নে পূর্ব সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজননকেন্দ্রে একটি যুগান্তকারী গবেষণা শুরু হয়। ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে মহাবিপন্ন ‘বাটাগুর বাসকা’ (Northern River Terrapin) কচ্ছপের বিচরণক্ষেত্র, জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস ট্র্যাক করার জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ তারিখে দুটি বড় বাটাগুর বাসকা কচ্ছপের পিঠে অত্যাধুনিক জিপিএস স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার স্থাপন করে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় অবমুক্ত করা হয়। (এই কচ্ছপগুলোর পিঠের অ্যান্টেনায় প্রাতিষ্ঠানিক কোড হিসেবে লেখা ছিল: PROJECT-BATAGURBASKA, VIENNA-ZOO, BANGLADESH-2016, SIRTRACK)।
- এপ্রিল ২০১৬ (কক্সবাজার উপকূলে সামুদ্রিক কচ্ছপ উদ্ধার ও ডিম সংরক্ষণ): দৈনিক প্রথম আলোর এক বিশেষ মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে বন্যপ্রাণী রক্ষক সোনা মিয়ার উদ্বৃতি দিয়ে জানানো হয় যে, ২০১৬ সালের এপ্রিল মাস নাগাদ কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চলে পাচারকারীদের হাত থেকে ৩৫টিরও বেশি বিপন্ন কাছিম এবং অসংখ্য বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়। এর পাশাপাশি পূর্ববর্তী বছরে (২০১৫) সৈকতে ডিম পাড়তে আসা কুকুরের আক্রমণে আহত ৮টি সামুদ্রিক মা-কাছিমকে উদ্ধার করে তাদের ৪৪৩টি ডিম কৃত্রিমভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল, যার হ্যাচিং বা বাচ্চা ফোটার প্রক্রিয়াটি ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে সফলভাবে সম্পন্ন করে বাচ্চাগুলোকে সাগরে অবমুক্ত করা হয়।
- মে ২০১৬ (গাজীপুর ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে প্রজনন গবেষণা শুরু): গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে বাটাগুর বাসকা প্রকল্পের অধীনে মে ২০১৬ থেকে কচ্ছপের প্রজনন জীববিদ্যার (Breeding Biology) ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদী নিবিড় গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের তত্ত্বাবধানে ৪টি প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী এবং ৩টি পুরুষ কাছিম নিয়ে এই প্রজনন জোড় (Breeding Pair) গঠন করে কচ্ছপের বংশবৃদ্ধির হার বাড়ানোর প্রাতিষ্ঠানিক কাজ শুরু করা হয়েছিল।
২০১৭ সালের কচ্ছপ ও কাছিম সংরক্ষণ সংক্রান্ত ঐতিহাসিক ডাটাবেস
- ১৫ জানুয়ারি, ২০১৭: বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর দপদপিয়া সেতুর নিচ থেকে কোস্ট গার্ড ও বন বিভাগ যৌথ অভিযান চালিয়ে বস্তাবন্দি অবস্থায় প্রায় ৫০ কেজি ওজনের একটি বিশালাকার বিলুপ্তপ্রায় কচ্ছপ উদ্ধার করে পুনরায় নদীতে অবমুক্ত করে।
- ফেব্রুয়ারি ২০১৭ (পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স’ (CCA)-এর কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র স্থাপন): বিজ্ঞানীরা ২০১১ সালের আগে বাংলাদেশে কচ্ছপ প্রজাতিটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে ধারণা করেছিলেন [১.২.৪]। কিন্তু ২০১১ সালে চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টসের প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটি খোলস পাওয়ার পর নতুন আশা জাগে। প্রজাতিটির বংশবৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৭ সালে ‘ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স’ (CCA), বাংলাদেশ বন বিভাগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘টার্টেল সারভাইভাল অ্যালায়েন্স’ (TSA) যৌথভাবে একটি বিশেষ কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র (Captive-Breeding Center) স্থাপন করে। গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের এই কচ্ছপ সংরক্ষণ কেন্দ্রে (TCC) দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এশিয়ান জায়ান্ট টরটয়েজ (Asian Giant Tortoise) এবং মহাবিপন্ন আরাকান বন কচ্ছপের (Arakan Forest Turtle) প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক প্রজনন কলোনি তৈরি করা হয়।
- ৭ এপ্রিল, ২০১৭ (রাজাপুরের ত্রিমুখীতে কচ্ছপের মেলা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন): ২০১২ সালে বন বিভাগের হস্তক্ষেপে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী কচ্ছপ মেলা আইনগতভাবে বন্ধ করা হলেও, স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও সচেতনতার অভাবে গোপনে এই কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা করে। এই প্রেক্ষিতে ৭ এপ্রিল, ২০১৭ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় “রাজাপুরের ত্রিমুখীতে কচ্ছপের মেলা” শিরোনামে একটি বিশেষ অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যেখানে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কচ্ছপ কেনাবেচার তৎপরতা এবং বন্যপ্রাণী আইনের কঠোর প্রয়োগের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়।
- ২৫ জুলাই, ২০১৭ (বাগেরহাটে বিলুপ্তপ্রায় ধুম তরুণাস্থি কাছিম উদ্ধার): খুলনা বিভাগীয় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের একটি দল বাগেরহাট অঞ্চলের একটি স্থানীয় লোকালয় থেকে অত্যন্ত বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির একটি ‘ধুম তরুণাস্থি কাছিম’ (Asiatic Softshell Turtle) উদ্ধার করে। বন্যপ্রাণী পরিদর্শক রাজু আহম্মেদ সংবাদমাধ্যমকে জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে কাছিমটি জব্দ করা হয় এবং বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের নির্দেশনা অনুযায়ী এটিকে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য রাখা হয়।
২০১৮ সালের কচ্ছপ ও কাছিম সংরক্ষণ সংক্রান্ত ঐতিহাসিক ডাটাবেস

১২ জানুয়ারি, ২০১৮ তারিখে খুলনার জিরো পয়েন্টে বৃহত্তম আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের আস্তানায় হানা দিয়ে সুন্দি কাছিম উদ্ধার।
- ১২ জানুয়ারি, ২০১৮ (খুলনার জিরো পয়েন্টে বৃহত্তম আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের আস্তানায় হানা): বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, খুলনার বন্যপ্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ইউনিটের সদস্যরা র্যাব-৬ এর সহায়তায় এক সফল যৌথ অভিযান পরিচালনা করে। ওই দিন রাত আনুমানিক ৯:২০ মিনিটে খুলনার জিরো পয়েন্টের কাছ থেকে একটি পিকআপ ভ্যান তল্লাশি করে প্লাস্টিকের বড় ড্রাম ও বস্তা থেকে ৪৯৪টি সুন্ধি কাছিম (Indian Flapshell Turtle, বৈজ্ঞানিক নাম: Lissemys punctata) উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত কাছিমগুলোর মোট ওজন ছিল প্রায় ৪ মণ, যার মধ্যে সর্বনিম্ন আধ কেজি থেকে সর্বোচ্চ ৫ কেজি ওজনের কাছিম ছিল। এই ঘটনায় বরিশালের আগৈলঝাড়ার বাসিন্দা প্রদীপ কুমার বাড়ৈ (৪৫), শুভদেব রায় (৩০) এবং মো: মাসুম মোল্লা (৪৩)-কে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তারা কাছিমগুলো বরিশালের আগৈলঝাড়ার উত্তম কুমারের কাছ থেকে সংগ্রহ করে সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটার গৌরাঙ্গের কাছে নিয়ে যাচ্ছিল, যা পরে ভারতে পাচার করার পরিকল্পনা ছিল। আসামিদের বিরুদ্ধে ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনের তফসিল-২ অনুযায়ী নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয় এবং কাছিমগুলোকে সাময়িকভাবে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার কেন্দ্রে রেখে পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে অবমুক্ত করা হয়।[৮]
- ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ (পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারে র্যাবের মোবাইল কোর্ট ও ৬ মণ কচ্ছপ জব্দ): র্যাব-১০ এবং বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের যৌথ সহযোগিতায় পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারে একটি বিশাল টাস্কফোর্স অভিযান পরিচালিত হয়। র্যাব সদর দপ্তরের তৎকালীন বিখ্যাত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম এই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। বিপন্ন প্রজাতির কচ্ছপ ধরে শাঁখারীবাজারে প্রকাশ্য বিক্রির অপরাধে দীপক নন্দী (৫৫), পনির চন্দ্র দাস (৪০) ও ময়না রানী দাস নামের ৩ জন বড় ব্যবসায়ীকে আটক করে ৯ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অভিযানস্থল থেকে প্রায় ৬ মণ বিপন্ন প্রজাতির কচ্ছপ উদ্ধার করা হয়। প্রেস বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়, এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে নরসিংদী এবং মুন্সীগঞ্জ এলাকা থেকে কচ্ছপ শিকার করে শাঁখারীবাজারে এনে বিক্রি করছিল। দণ্ডপ্রাপ্ত পনির চন্দ্র দাসকে এর আগেও একই অপরাধে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, সে চার মাস কারাবাস করে জামিনে বের হয়ে আবারও একই অপরাধে জড়ায়। উদ্ধারকৃত কচ্ছপগুলো পরে জাতীয় উদ্যানে অবমুক্ত করা হয়।[৯]
- ১৬ মার্চ, ২০১৮ (ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাসে তল্লাশি ও ৯০টি কাছিম উদ্ধার): মাগুরা রামনগর হাইওয়ে পুলিশের ইনচার্জ সাফুর আলীর নেতৃত্বে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে একটি সফল অভিযান চালানো হয়। ভোররাতে মাগুরার রামনগর এলাকায় চট্টগ্রাম থেকে সাতক্ষীরাগামী ‘সৌদিয়া পরিবহন’-এর একটি যাত্রীবাহী বাসে তল্লাশি চালিয়ে দুটি বস্তা থেকে ৯০টি বিপন্ন সুন্ধি কাছিম উদ্ধার করা হয়। যশোরের কেশবপুর উপজেলার মধ্যগ্রামের শমসের রহমানের ছেলে লুৎফর রহমান কচ্ছপগুলো ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাচ্ছিল। এই ঘটনায় তার নামে মাগুরা সদর থানায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে মামলা করা হয়। পরবর্তীতে মাগুরা জেলা বন সংরক্ষণ কর্মকর্তা রকিবুল ইসলামের উপস্থিতিতে সকাল ১১টার দিকে কচ্ছপগুলো কামারখালীর গড়াই নদীতে অবমুক্ত করা হয়।[১০]
- ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ (নেত্রকোনায় নাগরিক সচেতনতার এক অনন্য নজির): নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের পাশের ঘোষের বাজারে (মগড়া নদীর তীর) বিক্রি হওয়ার সময় প্রকৃতিপ্রেমী লেখক ও সাহিত্যিক অনুপ সাদি স্থানীয় নাগরিকদের সহায়তায় একটি বিপন্ন সুন্ধি কাছিম উদ্ধার করেন। ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্ববর্তী চরম ব্যস্ততার কারণে সে মুহূর্তে প্রশাসনের বড় কোনো সহায়তা বা আইনি মামলা নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ সকাল ১১টার দিকে জারিয়া-জাঞ্জাইলের পার্শ্ববর্তী কংস নদীতে কাছিমটি অবমুক্ত করা হয়। অবমুক্তকালে কবি দোলন প্রভা, রাজনীতিবিদ সজীব সরকার রতন, সমাজকর্মী শিউলি আকতার সাজিয়া এবং নেত্রকোনা সরকারি মহিলা কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহীনুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন, যিনি এটিকে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এক সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।[১১]
২০১৯ সালের কচ্ছপ ও কাছিম সংক্রান্ত অফিশিয়াল ডাটাবেস
- ২১ জানুয়ারি, ২০১৯ (সুন্দরবনে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জিপিএস ট্র্যাকারযুক্ত কচ্ছপ উদ্ধার): সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের করমজল বাটাগুর বাসকা প্রজেক্টের অধীনস্থ একটি মহাবিপন্ন বাটাগুর বাসকা কচ্ছপ জেলেদের জালে আটকে স্থানীয় বাজারে বিক্রির সময় উদ্ধার করা হয়। কচ্ছপটির পিঠে অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট জিপিএস ট্র্যাকিং ট্রান্সমিটার বসানো দেখে জেলেরা এটিকে কোনো সাধারণ কচ্ছপ মনে করেনি। পরে খবর পেয়ে বাটাগুর বাসকা প্রজেক্টের ম্যানেজার আ. রব সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের সদস্যদের নিয়ে বাজারে অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি বিক্রেতা আবুল হোসেনকে ১ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে কচ্ছপটি উদ্ধার করেন। রেকর্ড অনুযায়ী, এই কচ্ছপটি ২ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে সুন্দরবনের ৪৩ নম্বর কম্পার্টমেন্টের কালিরচর এলাকায় বঙ্গোপসাগরের মোহনায় গবেষণার উদ্দেশ্যে অবমুক্ত করা হয়েছিল। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা জু, টিএসএ আমেরিকা ও বাংলাদেশ বন বিভাগের যৌথ ব্যবস্থাপনায় এই ট্র্যাকিং কার্যক্রম সফলভাবে মনিটর করা হচ্ছিল।
- অক্টোবর-নভেম্বর ২০১৯ (গাজীপুর প্রজনন কেন্দ্রে দেশের ইতিহাসের প্রথম কৃত্রিম প্রজনন ও ৪৬টি বাচ্চার জন্ম): বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরের একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবস্থিত টার্টল কনজারভেশন সেন্টারে (TCC) এক ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। একসময় বাংলাদেশ থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম কচ্ছপ প্রজাতি এশিয়ান জায়ান্ট টরটয়েজ (Asian Giant Tortoise) প্রথমবারের মতো কৃত্রিম প্রজননে সফল হয়। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট এবং ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স (CCA)-এর যৌথ তত্ত্বাবধানে প্রজনন কেন্দ্রে থাকা ‘ক্যাসানোভা’ (বয়স ১৫ বছর) এবং ‘বিগ বয়’ (বয়স প্রায় ৫০-১০০ বছর) নামের দুটি পুরুষ কচ্ছপ ৪টি স্ত্রী কচ্ছপের সাথে প্রজনন করে। যার ফলে ১২ অক্টোবর, ২০১৯ তারিখে প্রজনন কেন্দ্রটিতে প্রথমবারের মতো একসাথে ৪৬টি এশিয়ান জায়ান্ট টরটয়েজের বাচ্চার জন্ম হয়। ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশনিস্ট শাহরিয়ার সিজার রহমান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এএফপি (AFP)-কে জানান, এই ঐতিহাসিক হস্তক্ষেপ না করা হলে প্রজাতিটি বাংলাদেশ থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যেত।
- ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ (আরিখে বাঘিয়া নদীতে ৬০টি সুন্ধি কাছিম অবমুক্তকরণ): খুলনার বটিয়াঘাটা থানার মামলা নং-০৪ এর ভিত্তিতে বিজ্ঞ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, খুলনা-এর আদেশে এবং বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তার অনুমতিক্রমে উক্ত ৬০টি সুন্ধি কচ্ছপ অবমুক্ত করা হয়। ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ বেলা ২:১০ মিনিটে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া উপজেলার টুঙ্গীপাড়া পৌরসভার সামনে বাঘিয়া নদীতে কাছিমগুলোকে অবমুক্ত করা হয়। সেই সময় টুঙ্গীপাড়া পৌরসভার তৎকালীন মেয়র শেখ আহম্মেদ হোসেন মির্জাসহ পৌরসভার কর্মকর্তাবৃন্দ ও স্থানীয় লোকজন উপস্থিত ছিলেন।[১২]
২০২০ সালের কচ্ছপ ও কাছিম সংক্রান্ত অফিশিয়াল ডাটাবেস
- ১৪ মে, ২০২০ (ঠাকুরগাঁওয়ে শতবর্ষী ও মহাবিপন্ন বোস্তামী কাছিম উদ্ধার ও মৃত্যু): ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের তামলাই পুকুর পাড় থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রায় ৩০ কেজি ওজনের একটি বিশালাকার বিরল কাছিম উদ্ধার করেন। পুকুর মালিক আবু রায়হান জানান, পুকুরটি অত্যন্ত পুরোনো হওয়ায় কচ্ছপটির বয়স প্রায় ১০০ বছরের বেশি হবে। খবর পেয়ে পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রেজাউল করিম রাতেই সেটি উদ্ধার করে দিনাজপুর বন বিভাগ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন। পরবর্তীতে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা কচ্ছপটির ছবি ও গঠন দেখে এটিকে আন্তর্জাতিকভাবে “মহাবিপন্ন” ঘোষিত বোস্তামী কাছিম (Black Softshell Turtle, বৈজ্ঞানিক নাম: Nilssonia nigricans) হিসেবে নিশ্চিত করেন। বৃহস্পতিবার ১৪ মে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে দিনাজপুর রামসাগর চিড়িয়াখানায় কচ্ছপটির মৃত্যু হয়। জানা যায় পুকুরটিতে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল এবং উক্ত কারণে কচ্ছপটি মারা যায়।
- ২৩ মে, ২০২০ (মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ৩টি সুন্ধি কাছিম উদ্ধার): মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার নতুন বাজার এলাকা থেকে বন্যপ্রাণী চোরাচালান বিরোধী নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে ৩টি বিপন্ন প্রজাতির সুন্ধি কাছিম উদ্ধার করে বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ। উদ্ধারকৃত কাছিমগুলোকে পরবর্তীতে শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের জানকিছড়া বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর অবমুক্ত করা হয়।
- ১২ জুলাই, ২০২০ (কক্সবাজার উপকূলে প্লাস্টিক ট্র্যাজেডি ও অলিভ রিডলি কচ্ছপের গণ-উদ্ধার): আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম Al Jazeera-র এক বিশেষ পরিবেশগত প্রতিবেদনে জানানো হয় যে, কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে উখিয়া পর্যন্ত দীর্ঘ সমুদ্র সৈকতে প্লাস্টিক বর্জ্যের (ছেঁড়া মাছ ধরার জাল, প্লাস্টিকের বোতল ও রশি) সাথে আটকা পড়ে কমপক্ষে ২০টি মা সামুদ্রিক কচ্ছপ (Olive Ridley Turtle) মারা যায় এবং বহু কচ্ছপ মারাত্মক আহত হয়। এই ঘটনার পর স্থানীয় শত শত প্রকৃতিপ্রেমী যুবক, পরিবেশবাদী ভলান্টিয়ার এবং বন বিভাগের কোস্টাল ফরেস্ট ডিভিশন সৈকতে এক বিশাল উদ্ধার অভিযান শুরু করে। তারা জাল কেটে জ্যান্ত মা-কাছিমগুলোকে সফলভাবে উদ্ধার করে পুনরায় বঙ্গোপসাগরে অবমুক্ত করেন এবং মৃত কচ্ছপগুলোকে সৈকতের বালিয়াড়িতে পুঁতে ফেলা হয়।
২০২১ সাল: কচ্ছপ প্রজনন কেন্দ্র ও অন্যান্য উদ্ধার কার্যক্রম
- ১২ জানুয়ারি ২০২১ ৫৩টি সুন্দি কাছিম উদ্ধার: বুধবার বিকেলে বিশ্ব ঐতিহ্য ষাটগম্বুজ মসজিদসংলগ্ন বাগেরহাটের ঐতিহাসিক ঘোড়াদিঘিতে অবমুক্ত করা হয় উদ্ধার ৫৩টি কচ্ছপ। এর আগে গত ১২ জানুয়ারি মঙ্গলবার দুপুরে খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলা বাজারের এক মুরগি ব্যবসায়ীর দোকান থেকে ক্রেতা সেজে কচ্ছপগুলো উদ্ধার করে বন বিভাগের বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট (ডব্লিউসিসিইউ)। সুন্দি নামের স্বাদুপানির এই কচ্ছপগুলো বাজারে তোলা হয়েছিল বিক্রির জন্য। কেটে বিক্রিও হচ্ছিল গোপনে। খবর পেয়ে জীবিত ৫৩টি কচ্ছপ উদ্ধার করে বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট। উদ্ধার করা সুন্দি কচ্ছপগুলো আজ বুধবার ফিরিয়ে দেওয়া হলো প্রাকৃতিক পরিবেশে।
- মে ২০২১: গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের কচ্ছপ সংরক্ষণ কেন্দ্রে (TCC) বিপন্ন ও বিলুপ্তপ্রায় কাছিম প্রজাতির কৃত্রিম বংশবৃদ্ধির হার ত্বরান্বিত করতে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধাসহ প্রজনন কেন্দ্রটি সফলভাবে সম্প্রসারিত ও চালু করা হয়।
- সেপ্টেম্বর ২০২১ (নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে বিশাল পাচার আস্তানায় হানা ও ৪২৫টি কাছিম উদ্ধার): গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার একটি প্রত্যন্ত লোকালয়ের বাড়িতে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট এবং স্থানীয় জেলা প্রশাসন যৌথভাবে একটি বিশাল সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে। আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের জন্য একটি বাড়ির গোপন কুঠুরিতে অবৈধভাবে মজুত করে রাখা ৪২৫টি বিপন্ন প্রজাতির মিঠাপানির কাছিম উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত কাছিমগুলোর মধ্যে মূলত সুন্ধি কাছিম (Lissemys punctata), দেশি কড়িকাইট্টা এবং ময়ূরী কাছিম ছিল, যা বন্যপ্রাণী আইন ২০১২ অনুযায়ী সম্পূর্ণ সংরক্ষিত। অভিযানের সময় দুর্ভাগ্যবশত প্রায় ১০০টি কাছিম প্লাস্টিকের বস্তার ভেতর শ্বাসরোধ হয়ে মারা গেলেও, জীবিত ৩২৫টি কাছিমকে বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে এনে প্রাথমিক চিকিৎসার পর নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের উপযুক্ত উন্মুক্ত জলাশয় ও নদীতে অবমুক্ত করা হয়।
- ডিসেম্বর ২০২১ (পার্বত্য চট্টগ্রামে এশিয়ার বৃহত্তম ‘এশিয়ান জায়ান্ট টরটয়েজ’ বন্য পরিবেশে অবমুক্তকরণ): বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব নজির স্থাপন করে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট (WCCU), ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স (CCA) এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা টার্টল সারভাইভাল অ্যালায়েন্স (TSA)। একসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এশিয়ার বৃহত্তম কচ্ছপ প্রজাতি এশিয়ান জায়ান্ট টরটয়েজ (Asian Giant Tortoise, বৈজ্ঞানিক নাম: Manouria emys)-এর ১০টি বাচ্ছাকে সফলভাবে বন্য পরিবেশে অবমুক্ত করা হয়। এই কচ্ছপগুলোর বাবা-মাকে পূর্ববর্তী বছরগুলোতে স্থানীয় জুমচাষী ও শিকারীদের হাত থেকে জবাই হওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে উদ্ধার করে গাজীপুরের প্রজনন কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছিল। প্রজনন কেন্দ্রে নিবিড় পরিচর্যায় বড় হওয়ার পর ২০ ডিসেম্বর, ২০২১ তারিখে তাদের আদি বাসস্থান পার্বত্য চট্টগ্রামের মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্টের একটি ম্রো (Mro) আদিবাসী সম্প্রদায়-নিয়ন্ত্রিত সুরক্ষিত বনে অবমুক্ত করা হয়। অবমুক্তকৃত প্রতিটি কচ্ছপের পিঠে অত্যাধুনিক রেডিও ট্রান্সমিটার (Radio Transmitter) যুক্ত করা হয় এবং বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী ও ম্রো সম্প্রদায়ের ভলান্টিয়ারদের নিয়ে গঠিত একটি দল এদের নিয়মিত ট্র্যাকিং বা মনিটরিং শুরু করে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর রিপোর্ট অনুযায়ী, এই পাইলট প্রজেক্টটি পরবর্তীতে শতভাগ চোরাচালানমুক্ত এবং ৭০% সারভাইভাল রেট বা বেঁচে থাকার হার নিশ্চিত করে এক অনন্য ইতিহাস গড়ে।
২০২২ সালের কচ্ছপ ও কাছিম সংক্রান্ত অফিশিয়াল ডাটাবেস
- ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ (ইনকিউবেটরে জন্ম নেওয়া ৫৩টি মহাবিপন্ন বোস্তামী কাছিম অবমুক্তকরণ): চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী পুকুর এবং এর আশপাশের প্রজননস্থল সংকুচিত হয়ে পড়ায় মহাবিপন্ন বোস্তামী কাছিম (Black Softshell Turtle, বৈজ্ঞানিক নাম: Nilssonia nigricans) চরম হুমকির মুখে পড়ে। এই প্রজাতিটি রক্ষায় বেসরকারি সংস্থা ‘ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স’ (CCA) এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় একটি কৃত্রিম ইনকিউবেশন প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়। তারা ১,১৫৫টি ডিম সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে বৈজ্ঞানিক উপায়ে মোট ৩১১টি বোস্তামী কাছিমের বাচ্চা ফুটাতে সক্ষম হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ তারিখে ইনকিউবেটরে জন্ম নেওয়া প্রথম ব্যাচের ৫৩টি সুস্থ বোস্তামী কাছিমের ছানা চট্টগ্রাম নগরের ঐতিহাসিক বায়েজিদ বোস্তামী পুকুরে আনুষ্ঠানিকভাবে অবমুক্ত করা হয়। প্রাণিবিজ্ঞানীরা জানান, এই কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতিটি বাংলাদেশে বোস্তামী কাছিমকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচানোর ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক।
- ২১ নভেম্বর, ২০২২ (পটুয়াখালীতে সুন্ধি কাছিম উদ্ধার ও মুচলেকা): পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের নেয়ামতপুর গ্রাম থেকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কলাপাড়া উপজেলা বন বিভাগ একটি সফল ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে। বন্যপ্রাণী শিকারিদের আস্তানা থেকে বিপুল পরিমাণ বিপন্ন সুন্ধি কাছিম (Indian Flapshell Turtle) বা স্থানীয় নাম ‘চিতি কাছিম’ উদ্ধার করা হয়। কলাপাড়া উপজেলা বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মনিরুল হক মনির নেতৃত্বে উদ্ধারকৃত কাছিমগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে বন বিভাগের সুরক্ষিত পুকুরের মিষ্টি পানিতে অবমুক্ত করা হয়। একই সাথে ভবিষ্যতে আর কখনো কচ্ছপ বা বন্যপ্রাণী শিকার না করার শর্তে আটককৃত দুই শিকারির কাছ থেকে লিখিত মুচলেকা রেখে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা এবং গবেষক জোহরা মিলা এই অভিযানের পর জানান, বাসস্থান ধ্বংস ও ক্রমাগত শিকারের কারণে দেশের নদী-নালা ও বিল থেকে এই সুন্ধি কাছিম দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে, যা রক্ষায় কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
২০২৩ সালের কচ্ছপ ও কাছিম সংক্রান্ত অফিশিয়াল ডাটাবেস
- ১. মে ২০২৩: উপকূলীয় দ্বীপাঞ্চলে রেকর্ড ব্রেকিং ডিম পাড়ার ঘটনা: বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ সেলের অফিশিয়াল পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের প্রজনন মৌসুমের শেষভাগ অর্থাৎ মে মাস নাগাদ সেন্ট মার্টিন দ্বীপের পশ্চিম সৈকত, দক্ষিণপাড়া, ছেঁড়াদ্বীপ এবং কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া ও সোনাদিয়া দ্বীপের বালিয়াড়িতে সামুদ্রিক অলিভ রিডলি কচ্ছপের আগমন পূর্ববর্তী এক দশকের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দেয়। ২০২৩ সালের মে মাস পর্যন্ত কেবল সেন্ট মার্টিন এবং সোনাদিয়া দ্বীপের সৈকত থেকেই পরিবেশকর্মী ও বন বিভাগের ভলান্টিয়াররা হাজার হাজার অলিভ রিডলি কচ্ছপের ডিম সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। স্থানীয় জেলেরা জানান, এর আগে কখনো উপকূলের এত কাছাকাছি একসাথে এত বিপুল পরিমাণ মা-কাছিমকে ডিম পাড়তে আসতে দেখা যায়নি।
২. সাফল্যের মূল চাবিকাঠি: ব্যাপক সচেতনতামূলক ও সুরক্ষামূলক কার্যক্রম: এই অভাবনীয় রেকর্ডের পেছনে ছিল বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী সংস্থাগুলোর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদী কিছু বিশেষ মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম:
লাইট পলিউশন বা আলোক দূষণ নিয়ন্ত্রণ: কচ্ছপ মূলত রাতের অন্ধকারে ডিম পাড়তে সৈকতে আসে। মে ২০২৩-এর প্রজনন মৌসুমে সেন্ট মার্টিন ও কক্সবাজারের সৈকত সংলগ্ন হোটেল-মোটেল এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের রাতের বেলা তীব্র আলো বা ফ্লাশলাইট ব্যবহার না করার জন্য কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। আলোর বিভ্রান্তি না থাকায় মা-কাছিমগুলো নির্বিঘ্নে সৈকতে উঠে আসে। কুকুর ও শিকারিদের হাত থেকে সুরক্ষা: অতীতে কচ্ছপের ডিমের একটি বড় অংশ শিয়াল, কুকুর এবং ডিম চোরদের পেটে যেত। মে ২০২৩-এ বন বিভাগ স্থানীয় কোস্টাল কম্যুনিটির যুবকদের নিয়ে বিশেষ “কচ্ছপ গার্ড স্কোয়াড” গঠন করে। তারা প্রতি রাতে সৈকতে পাহারা দিয়ে মা-কাছিমদের নিরাপদ ডিম পাড়ার পরিবেশ নিশ্চিত করেন। মাছ ধরার জালে সুরক্ষা: সমুদ্রের কাছিমগুলো যেন ডিম পাড়তে আসার সময় ট্রলার বা জেলেদের জালে আটকে মারা না যায়, সে জন্য সেন্ট মার্টিনের চারপাশের সুরক্ষিত সামুদ্রিক অঞ্চলে মে মাসে বিশেষ টহল জোরালো করা হয়।
৩. বন বিভাগের হ্যাচারিতে ডিম সংরক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক পরিচর্যা: সৈকতের উন্মুক্ত বালিয়াড়িতে ডিমগুলো রেখে দিলে তা নষ্ট বা চুরি হওয়ার ঝুঁকি থাকায়, মা-কাছিমগুলো ডিম পেড়ে সাগরে ফিরে যাওয়ার পরপরই বন বিভাগের বিশেষজ্ঞ দল অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ডিমগুলো উদ্ধার করে। সংগৃহীত এই রেকর্ড সংখ্যক ডিম তাৎক্ষণিকভাবে সেন্ট মার্টিন ও সোনাদিয়া দ্বীপে অবস্থিত বন বিভাগের নিজস্ব কচ্ছপ কনজারভেশন হ্যাচারি (Turtle Hatchery)-র বৈজ্ঞানিক ইনকিউবেশন সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে বালুর তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ডিমগুলোর শতভাগ প্রাকৃতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়। পরবর্তীতে মে মাসের শেষভাগ এবং জুনের শুরুতে এই হ্যাচারিগুলো থেকে একে একে হাজার হাজার সুস্থ কচ্ছপের বাচ্চার জন্ম হয় এবং বন বিভাগ স্থানীয় প্রশাসন, পর্যটক ও পরিবেশবাদীদের উপস্থিতিতে অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে সদ্যজাত কচ্ছপছানাগুলোকে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশিতে অবমুক্ত করে। - ২৫ নভেম্বর, ২০২৩ (চাঁদপুরে ৭২ কেজি ওজনের বিশাল আকৃতির কচ্ছপ উদ্ধার): চাঁদপুর সদর উপজেলার বালিয়া এলাকার একটি ত্রিপুরা পল্লী থেকে পুলিশ ও বন বিভাগ যৌথ অভিযান চালিয়ে প্রায় ৭২ কেজি ওজনের একটি বিশাল আকৃতির বিরল কচ্ছপ উদ্ধার করে। ত্রিপুরা পল্লীর জনগোষ্ঠীর সভাপতি কর্ণরাজ ত্রিপুরা জানান, তাদের সম্প্রদায়ের কয়েকজন জেলে মেঘনা নদী থেকে কচ্ছপটি সংগ্রহ করেছিলেন। খবর পেয়ে চাঁদপুর সদর মডেল থানার ততকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মুহসীন আলম এবং চাঁদপুর বন বিভাগের কর্মকর্তা বিল্লাল হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশ ও বন কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে কচ্ছপটি উদ্ধার করেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তাদের জীবনে এত বড় কচ্ছপ তারা কখনো দেখেননি [১.২.৮]। দীর্ঘক্ষণ পানি থেকে ডাঙায় থাকায় কাছিমটি কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, তাই উদ্ধারের পর সেটিকে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য চাঁদপুর জেলা বন বিভাগের হেফাজতে নেওয়া হয়।
- ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৩ (ভোলার মনপুরায় ৬০ কেজি ওজনের সামুদ্রিক কচ্ছপ উদ্ধার ও অবমুক্তকরণ): ভোলার মনপুরা দ্বীপের বিচ্ছিন্ন ‘ভাসনভাঙ্গা বালুরচর’ নামক এলাকা সংলগ্ন মেঘনা নদী থেকে বন বিভাগ ৬০ কেজি ওজনের একটি বিশালাকার জলপাই রঙের সামুদ্রিক কচ্ছপ (Olive Ridley Turtle) উদ্ধার করে। মেঘনা নদীতে মাছ শিকারের সময় বালুচরে বড় আকৃতির এই কচ্ছপটি আটকে থাকতে দেখে স্থানীয় জেলেরা তাৎক্ষণিকভাবে মুঠোফোনে বন বিভাগকে খবর দেয়। খবর পেয়ে মনপুরা বন বিভাগের পচা কোড়ালিয়া বিটের বিট কর্মকর্তা আব্বাস আলীর নেতৃত্বে বনপ্রহরীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে কচ্ছপটিকে জীবিত উদ্ধার করে বিট কার্যালয়ে নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে মনপুরা বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা রাশেদুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে নিয়ে মনপুরার ‘দখিনা হাওয়া সমুদ্র সৈকত’ সংলগ্ন মেঘনা নদীর মোহনায় কচ্ছপটিকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় অবমুক্ত করা হয়।
২০২৪ সালের কচ্ছপ ও কাছিম সংক্রান্ত অফিশিয়াল ডাটাবেস
- ৪ এপ্রিল, ২০২৪ (চট্টগ্রামে অ্যাকোয়ারিয়ামের দোকানে হানা ও ১৩৮টি বিপন্ন কচ্ছপ উদ্ধার): চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের একটি বিশেষ দল মহানগরীর কোতোয়ালী থানার স্টেশন রোড এলাকায় এক ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে স্টেশন রোডের ‘বিসমিল্লাহ ফিশ অ্যান্ড বার্ডস সেন্টার’ থেকে ১১০টি এবং ‘রেশমা অ্যাকুয়ারিয়াম অ্যান্ড বার্ডস সেন্টার’ থেকে ২৮টিসহ মোট ১৩৮টি বিপন্ন প্রজাতির কচ্ছপ উদ্ধার করা হয়। চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম চৌধুরী জানান, উদ্ধারকৃত কচ্ছপগুলোর বৈজ্ঞানিক নাম Pangshura tecta, যা স্থানীয়ভাবে ‘কড়ি কাইট্টা’ (Indian Roofed Turtle) নামে পরিচিত। আইন অনুযায়ী এই কচ্ছপ ধরা, বিক্রি বা নিজের কাছে রাখা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়ায় দোকানগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং কচ্ছপগুলোকে নিরাপদ প্রাকৃতিক জলাশয়ে অবমুক্ত করা হয়।
- ০৯ ডিসেম্বর, ২০২৪ (চাঁদপুরে দেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ কচ্ছপ পাচার আস্তানায় হানা ও ১,০০০টি কাছিম জব্দ): বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট (WCCU) চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলার একটি পরিত্যক্ত গুদামে এক ঐতিহাসিক সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে। মাছের ব্যবসার আড়ালে নরসিংদী, কুমিল্লা ও চাঁদপুর অঞ্চলের নদী-নালা থেকে অবৈধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জড়ো করা প্রায় ১,০০০টি বিপন্ন প্রজাতির মিঠাপানির কাছিম (যার মোট ওজন ছিল প্রায় ২৮০ কেজি) উদ্ধার করা হয়। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিদর্শক অসীম মল্লিক গণমাধ্যমকে জানান, “এটি বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের ইতিহাসের একক বৃহত্তম কচ্ছপ উদ্ধারের ঘটনা”। উদ্ধারকৃত কাছিমগুলোর মধ্যে মূলত ৩টি বিপন্ন প্রজাতি ছিল— সুন্ধি কাছিম (Lissemys punctata), দেশি কড়িকাইট্টা (Pangshura tecta) এবং ময়ূরী কাছিম (Morenia petersi)। কচ্ছপগুলো বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচারের জন্য এই গুদামে মজুত করা হয়েছিল। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালক সানাউল্লাহ পাটোয়ারী এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে উদ্ধারকৃত ১,০০০টি কাছিমকে বন বিভাগের বিশেষ তত্ত্বাবধানে এনে প্রাকৃতিক উন্মুক্ত জলাশয়ে অবমুক্ত করা হয়।
- ১৮ ও ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৪ (কচ্ছপ সংরক্ষণে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম ঐতিহাসিক ‘রি-ওয়াইল্ডিং’ বা বন্য পরিবেশে প্রত্যাবর্তন): বছরের শেষভাগে এসে বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও যুগান্তকারী মাইলফলক স্পর্শ করে বাংলাদেশ বন বিভাগ, টার্টল সারভাইভাল অ্যালায়েন্স (TSA) এবং ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স (CCA)। বৈশ্বিক অংশীদারদের সহায়তায় কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রে জন্ম নেওয়া দুটি অত্যন্ত সংকটাপন্ন কচ্ছপ প্রজাতিকে তাদের আদি বন্য আবাসে পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়া হয় (Rewilding)।
- ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৪: মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রে বড় হওয়া ৬টি অলংকৃত কচ্ছপ (Elongated Tortoise, বৈজ্ঞানিক নাম: Indotestudo elongata) বনের উন্মুক্ত পরিবেশে অবমুক্ত করা হয়। কম্বোডিয়ার পর বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় দেশ হিসেবে এই প্রজাতির কচ্ছপের সফল ‘রি-ওয়াইল্ডিং’ প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করে।
- ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৪: পার্বত্য চট্টগ্রামের মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্টে এশিয়ার বৃহত্তম কচ্ছপ প্রজাতি ১০টি এশিয়ান জায়ান্ট টরটয়েজ (Asian Giant Tortoise, বৈজ্ঞানিক নাম: Manouria emys) অবমুক্ত করা হয়।
- বন্য পরিবেশে অবমুক্ত করার পূর্বে এই ১৬টি কচ্ছপকে বনের ভেতরে বড় আকৃতির নরম খাঁচায় (Soft Release Pen) রেখে ৬ মাস বন্য আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা করা হয় এবং এদের পিঠে ট্র্যাকিং ডিভাইস যুক্ত করা হয়। এই কার্যক্রমে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং মেন্নি পাড়া গ্রামের ম্রো (Mro) আদিবাসী সম্প্রদায় সরাসরি ভলান্টিয়ার হিসেবে পাহারা ও মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পালন করে।
২০২৫ সালের কচ্ছপ ও কাছিম সংক্রান্ত অফিশিয়াল ডাটাবেস
- জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ২০২৫ (কক্সবাজার উপকূলে অলিভ রিডলি কচ্ছপের ট্র্যাজেডি ও উদ্ধার কার্যক্রম): বছরের শুরুতেই কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া, রামুর হিমছড়ি এবং কক্সবাজার পৌরসভার নাজিরারটেক সমুদ্র সৈকতে একটি বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটে। প্রজনন মৌসুমে ডিম পাড়তে আসার সময় সাগরে অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ কারেন্ট জাল এবং প্লাস্টিক বর্জ্যের সাথে জড়িয়ে যাওয়ার কারণে টানা কয়েকদিনে সৈকতে ৮৪টিরও বেশি মা সামুদ্রিক কচ্ছপ (Olive Ridley Turtle) মৃত অবস্থায় ভেসে আসে। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট (BORI) এবং কোস্টাল ফরেস্ট ডিভিশনের গবেষক ও ভলান্টিয়াররা উপকূল জুড়ে একটি জরুরি অনুসন্ধান ও উদ্ধার স্কোয়াড গঠন করেন। তারা সাগরে ভাসমান জাল থেকে এবং উপকূলে আটকে পড়া অসংখ্য জীবিত মা-কাছিমকে সফলভাবে উদ্ধার করেন। উদ্ধারকৃত কচ্ছপগুলোর ডিম সংগ্রহ করে স্থানীয় কোস্টাল কম্যুনিটি-managed বিশেষ হ্যাচারিতে কৃত্রিম সুরক্ষায় ইনকিউবেশন করা হয় এবং পরবর্তীতে বাচ্চা ফুটিয়ে সফলভাবে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশিতে অবমুক্ত করা হয়।
- ২২ মার্চ, ২০২৫ (কাপ্তাইয়ে উদ্ধার হওয়া ১২ কেজি ওজনের বিশাল কাছিম কর্ণফুলী নদীতে অবমুক্তকরণ): রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার একটি স্থানীয় পাহাড়ি এলাকা থেকে শিকারিদের হাত থেকে প্রায় ১২ কেজি ওজনের একটি বিশালাকার মিঠাপানির বিরল কাছিম উদ্ধার করে বন বিভাগ। সময় সংবাদ (Somoy TV) এবং বন বিভাগের আঞ্চলিক কার্যালয়ের রিপোর্ট অনুযায়ী, উদ্ধারকৃত কাছিমটি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনানুযায়ী সম্পূর্ণ সুরক্ষিত এবং বিপন্ন প্রজাতির ছিল। কাপ্তাই বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে কাছিমটির শারীরিক পরীক্ষা শেষে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় কাপ্তাইয়ের কাপ্তাই হ্রদ সংলগ্ন কর্ণফুলী নদীতে অবমুক্ত করা হয়।
- ২০ মে, ২০২৫: বন বিভাগের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট (WCCU) নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার জমিদারহাট এলাকা থেকে বিভিন্ন বিপন্ন প্রজাতির মোট ৭৩টি কচ্ছপ উদ্ধার করেছে। অভিযান চলাকালীন তারা এই বিপন্ন কচ্ছপ চোরাচালানের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে এক সন্দেহভাজন পাচারকারীকেও আটক করে। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের (WCCU) বন্যপ্রাণী পরিদর্শক আব্দুল্লাহ আস সাদিক বলেন, “উদ্ধারকৃত কচ্ছপগুলোর মধ্যে ২৫টি দেশি কড়িকাইট্টা (Indian Roofed Turtle), ৪২টি সুন্ধি কাছিম (Indian Flapshell Turtle) এবং ৬টি হলুদ কাছিম (Yellow-bellied Turtle) রয়েছে, যাদের সম্মিলিত ওজন আনুমানিক ৮০ কেজি।”
- ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ (নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে বিশাল পাচার আস্তানায় হানা ও ৪২৫টি বিপন্ন কাছিম জব্দ): বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট (WCCU) এবং উপকূলীয় বন বিভাগ, নোয়াখালী যৌথভাবে দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় একটি ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনী পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের লোকনাথ মন্দির সংলগ্ন (মণ্ডলপাড়া) একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে হানা দেওয়া হয়। আসন্ন দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের জন্য অবৈধভাবে বস্তাবন্দি করে মজুত করে রাখা ৪২৫টি বিপন্ন প্রজাতির কচ্ছপ (স্থানীয়ভাবে কড়ি কাইট্টা ও সুন্ধি কাছিম) উদ্ধার করা হয়। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের বন্যপ্রাণী পরিদর্শক অসীম মল্লিক এবং উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা আবু ইউসুফ টিবিএস (TBS) ও প্রথম আলোকে জানান, পাচারকারীরা অভিযানের আগেই পালিয়ে যায়। উদ্ধারকৃত কচ্ছপগুলোর মধ্যে ৩২৫টি জীবিত এবং ১০০টি মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ১৩ সেপ্টেম্বর শনিবার দুপুরে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের নির্দেশনায় জীবিত ৩২৫টি কাছিমকে নোয়াখালীর বন বিভাগের নিজস্ব সুরক্ষিত জলাশয় এবং দেশের বিভিন্ন উপযুক্ত উন্মুক্ত নদী-নালায় অবমুক্ত করা হয়।
- ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে ৯২৫ কচ্ছপ উদ্ধার: ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মালয়েশিয়ায় পাচার হতে যাওয়া ৯২৫টি কচ্ছপ উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ বন বিভাগের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট। মঙ্গলবার ৩০ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে ৬টায় বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনাল এলাকা থেকে কচ্ছপগুলো জব্দ করা হয়। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে মালয়েশিয়াগামী যাত্রী মোহাম্মদ শওকত আলী ভূঁইয়ার লাগেজ স্ক্যানিং করার সময় সেখানে কচ্ছপসদৃশ বস্তু শনাক্ত হয়। এরপর বিমানবন্দর নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ তাকে ডাক দিলে তিনি ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত পালিয়ে যান। এ ঘটনায় সন্দেহ সৃষ্টি হলে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বন্যপ্রাণী ইউনিটকে খবর দেয়। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট বন্যপ্রাণী পরিদর্শক আব্দুল্লাহ আস সাদিক জানান, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও বন্যপ্রাণী ইউনিট যৌথভাবে লাগেজগুলো পরীক্ষা করে। এতে একটি সবুজ রঙের লাগেজ থেকে ১৪৫টি স্টার টরটয়েজ (Star Tortoise) এবং একটি নীল রঙের লাগেজ থেকে ৭৮০টি কড়িকাইট্টা (Indian Roofed Turtle) উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত কচ্ছপগুলোর ওজন ৫৮ কেজি।
২০২৬ সালের কচ্ছপ ও কাছিম সংক্রান্ত অফিশিয়াল ডাটাবেস
- ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (কুষ্টিয়ার বিনোদন পার্ক থেকে ঘড়িয়াল ও ৩টি বিপন্ন কাছিম উদ্ধার): কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামে অবস্থিত ‘ইউটিউব ভিলেজ পার্ক’ নামক একটি বেসরকারি বিনোদন কেন্দ্রে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট ও জগতি বন বিভাগ যৌথভাবে একটি বড় ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে। পার্কের ভেতরে একটি কৃত্রিম চৌবাচ্চায় অবৈধভাবে বাণিজ্যিক প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে আটকে রাখা আড়াই ফুট দীর্ঘ একটি মহাবিপন্ন ঘড়িয়াল এবং ৩টি বিপন্ন প্রজাতির কাছিম উদ্ধার করা হয়। কুষ্টিয়ার জগতি বন বিভাগের ডেপুটি রেঞ্জার (ভারপ্রাপ্ত) আবু বকর সিদ্দিক দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, কচ্ছপ ও ঘড়িয়ালগুলোকে পাচারকারী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের হাত থেকে উদ্ধার করে নিরাপদ উন্মুক্ত প্রাকৃতিক জলাশয়ে অবমুক্ত করা হয়েছে।
- মে ২০২৬ (কক্সবাজার ও কুতুবদিয়া দ্বীপে ১৪৯টি এবং কুয়াকাটা সৈকতে ১৬৩টি কচ্ছপের বাচ্চার ঐতিহাসিক অবমুক্তকরণ): চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলে কচ্ছপ প্রজনন ও হ্যাচারি ব্যবস্থাপনায় একটি বিশাল আন্তর্জাতিক সাফল্য অর্জিত হয়।
- মে ২০২৬ (কক্সবাজার): আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ডফিশ’ পরিচালিত ‘ইকোফিশ ২’ (ECOFISH II) প্রজেক্টের অধীনে কক্সবাজারের কুতুবদিয়া দ্বীপে স্থানীয় কম্যুনিটি ও ব্লু-গার্ড ভলান্টিয়ারদের দ্বারা পরিচালিত হ্যাচারিতে সংরক্ষিত ৪টি বাসা থেকে ৪৬৭টি অলিভ রিডলি কচ্ছপের ডিমের মধ্যে ১৪৯টি কচ্ছপছানা সফলভাবে জন্ম নেয় এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা অক্সফাম অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সাগরে অবমুক্ত করা হয়।
- ১৯ মে, ২০২৬ (কুয়াকাটা): পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে ‘কোডেক’ (CODEC) পরিচালিত ‘Community-Led Turtle Conservation Project’-এর কর্মীরা সৈকতের বিশেষ হ্যাচারিতে কৃত্রিম ইনকিউবেশন শেষে একবারে ১৬৩টি অলিভ রিডলি সামুদ্রিক কচ্ছপের ছানা সুস্থ অবস্থায় বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশিতে অবমুক্ত করেন।
- ২১ মে, ২০২৬ (মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ৩টি বিপন্ন সুন্ধি কাছিম উদ্ধার ও লাউয়াছড়ায় অবমুক্তকরণ): মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিখ্যাত ‘নতুন বাজার’ এলাকায় বন্যপ্রাণী পাচারকারী চক্রের আস্তানায় হানা দেয় বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ। সেখান থেকে পাচারের উদ্দেশ্যে খাঁচাবন্দি করে রাখা ৩টি বিপন্ন প্রজাতির সুন্ধি কাছিম (Spotted Flapshell Turtle, বৈজ্ঞানিক নাম: Lissemys punctata) উদ্ধার করা হয়। বন্যপ্রাণী পরিদর্শকদের উপস্থিতিতে কাছিমগুলোকে শ্রীমঙ্গলের জানকিছড়া বন্যপ্রাণী কেন্দ্র থেকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের বন্য জলাশয়ে সম্পূর্ণ অবমুক্ত করা হয়।
- ০৯ জুন, ২০২৬ (কক্সবাজারের চকরিয়ায় অনলাইনভিত্তিক আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচারচক্রের আস্তানায় হানা ও ১২টি কচ্ছপ জব্দ): কক্সবাজারের চকরিয়া বনাঞ্চল ও চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য সংলগ্ন এলাকায় চকরিয়া বন বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একটি বিশাল যৌথ টাস্কফোর্স অভিযান পরিচালনা করে। চোরাচালানের উদ্দেশ্যে একটি বাড়িতে বন্যপ্রাণী মজুত রাখার গোপন তথ্যের ভিত্তিতে হানা দিয়ে একটি মহাবিপন্ন চশমাপড়া হনুমান এবং ১২টি বিরল প্রজাতির কচ্ছপ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের অন্যতম মূল হোতা হাদিসুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। বন বিভাগের চুনতি রেঞ্জের কর্মকর্তা আনিসুজ্জামান শেখ এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS) জানায়, এই চক্রটির মূল সমন্বয়ক ছিল হাদিসুরের স্ত্রী ‘খুশি’, যে অনলাইনের মাধ্যমে কচ্ছপ ও বন্যপ্রাণী কেনাবেচার আন্তর্জাতিক চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করত। আসামিদের বিরুদ্ধে নতুন সংশোধিত বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ অনুযায়ী চকরিয়া আদালতে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।
- ১৩ জুন, ২০২৬ (সুন্দরবনের খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদ থেকে ১০ কেজি ওজনের রঙিন নকশার বিরল কচ্ছপ উদ্ধার): চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে সুন্দরবন সংলগ্ন সাতক্ষীরা রেঞ্জে দুটি ভিন্ন ঘটনা ঘটে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন গাবুরা ইউনিয়নের খোলপেটুয়া নদী এবং কপোতাক্ষ নদে মাছ ধরার সময় স্থানীয় জেলেদের জালে ১০ কেজি ওজনের একটি বিশালাকার এবং রঙিন নকশার অত্যন্ত বিরল কচ্ছপ ধরা পড়ে। গাবুরার স্থানীয় সচেতন যুবক এবং কমিউনিটি পেট্রোলিং গ্রুপ (CPG)-এর সদস্যরা জেলের কাছ থেকে কচ্ছপটি উদ্ধার করে বন বিভাগের কলাগাছিয়া স্টেশনে হস্তান্তর করেন। সুন্দরবনের কলাগাছিয়া ফাঁড়ির স্টেশন কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম এবং দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (TBS) নিশ্চিত করেন যে, কচ্ছপটির খোলসের গঠন ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য অন্য কচ্ছপের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। পরবর্তীতে কচ্ছপটিকে সুন্দরবনের গহিন সুরক্ষিত নদীতে অবমুক্ত করা হয়।
- ২২ জুন, ২০২৬ (চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় অটোরিকশা থেকে বস্তাবন্দি মহাবিপন্ন হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ উদ্ধার): মাত্র কয়েকদিন আগে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সের সামনে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভেতর থেকে একটি রহস্যময় গন্ধযুক্ত বস্তা উদ্ধার করেন স্থানীয় জনতা। বস্তাটি খুলতেই তার ভেতর থেকে একটি বিশালাকার মহাবিপন্ন হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ (Elongated Tortoise) বেরিয়ে আসে। খবর পেয়ে লোহাগাড়ার বড়দুয়ারা বিট কাম চেক স্টেশনের বন কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে কচ্ছপটি নিজেদের হেফাজতে নেন। আরটিভি (Rtv) ও প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়, পাচারকারীরা ধরা পড়ার ভয়ে কচ্ছপটি অটোরিকশায় ফেলে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে কচ্ছপটিকে তার আদি প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংলগ্ন সুরক্ষিত চুনতি অভয়ারণ্যের গহিন ব বনে অবমুক্ত করা হয়।
উত্তরবঙ্গে কচ্ছপ সংরক্ষণে আমাদের ভবিষ্যৎ করণীয়
আমাদের বনভূমি ও জলাভূমিগুলোতে বন্যপ্রাণী ও কচ্ছপ বেঁচে থাকলে পর্যটন খাতে যে আয় হতো, তা ওই প্রাণী হত্যা করে পাওয়া মাংসের দামের চেয়ে লক্ষ গুণ বেশি। একজন ফটোগ্রাফার একটি পাখির ফটো তুলতে গিয়ে কোনো এলাকায় দুদিনে ২০০০ টাকা খরচ করেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল করে।
কচ্ছপ রক্ষায় কেবল আইন করলেই হবে না, বরং উদ্ধারকৃত কচ্ছপগুলো তাদের আবাসস্থলে সঠিকভাবে বেঁচে থাকছে কিনা তার নিয়মিত মনিটরিং দরকার। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে কচ্ছপ সংরক্ষণের জন্য অন্তত দশটি পুকুর এবং কয়েকটি নদীর ও বিলের কিছু অংশকে সরকারিভাবে ‘কচ্ছপের নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ ঘোষণা করা এখন সময়ের দাবি।
আরো পড়ুন
- বাংলাদেশে কচ্ছপ ও কাছিম সংরক্ষণ: বন বিভাগের উদ্ধার অভিযানের পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেস (২০১০-২০২৬)
- পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিম: বাংলাদেশে মহাবিপন্ন এই প্রজাতির অজানা তথ্য
- গঙ্গা তরুণাস্থি কাছিম: খালুয়া কাছিমের বৈশিষ্ট্য, হিংস্র স্বভাব ও প্রজননচক্র
- ত্রি-খিলা স্থল কাইট্টা (Melanochelys tricarinata) পরিচিতি, প্রজনন ও বিস্তার
- হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ: মহাবিপন্ন লম্বা কচ্ছপের বৈশিষ্ট্য, স্বভাব ও বিস্তৃতি
- ক্যান্টরের জাতা তরুণাস্থি কাছিম: উপমহাদেশের বৃহত্তম কাছিমের বৈশিষ্ট্য ও স্বভাব
- পেলোচেলিস (Pelochelys) কাছিম গণের বৈশিষ্ট্য ও প্রজাতি পরিচিতি
- সুন্দি তরুণাস্থি কাছিম (Lissemys punctata): পরিচিতি, বাসস্থান ও ডিম পাড়ার অদ্ভুত তথ্য
- মুকুটি নদ-কাইট্টা: নদীর কালী কাছিমের বৈশিষ্ট্য, স্বভাব ও বিস্তৃতি
- মেলানোক্লিস (Melanochelys) কচ্ছপ গণের বৈশিষ্ট্য ও প্রজাতি পরিচিতি
- বাণিজ্যিক কচ্ছপ চাষ পদ্ধতি: চীনা নরম খোলস কচ্ছপ চাষের আধুনিক গাইড
- পরিবেশ রক্ষায় কচ্ছপের ভূমিকা এবং বাংলাদেশে কচ্ছপ বিলুপ্তির কারণ
- বাংলাদেশে প্রাপ্ত ২৯ প্রজাতির কচ্ছপ, কাইট্টা ও কাছিমের সম্পূর্ণ তালিকা
- বাটাগুড় বা বোদো কাইট্টা: মহাবিপন্ন কাছিমের বৈশিষ্ট্য ও প্রজননের সফল ইতিহাস
- বাংলাদেশের সরীসৃপ হচ্ছে কচ্ছপ ও সাপসহ অন্যান্য প্রজাতির বিস্তারিত আলোচনা
- বাংলাদেশের উভচর জলজ ও স্থলজ উভয় পরিবেশে বসবাসকারী ৪১ প্রজাতির প্রাণী
তথ্যসূত্র ও টিকা
১. সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, ২৭ অক্টোবর, ২০১১, শাঁখারীবাজার থেকে বিভিন্ন প্রজাতির ৬১টি কচ্ছপ উদ্ধার, http://archive.prothom-alo.com/detail/news/197042.
২. নিজস্ব প্রতিবেদক, আগৈলঝাড়ায় দুইশ বছরের পুরনো কচ্ছপ মেলা বন্ধ” এপ্রিল ১৩, ২০১২, ইউআরএল: http://www.bdnews24.com/bangla/details.php?id=191248&cid=2
৩. নিজস্ব প্রতিবেদক, “ফলের কার্টনে ১৫৫টি কচ্ছপ” দৈনিক প্রথম আলো, ২৮ এপ্রিল ২০১২, সারাদেশ, ইউআরএল: http://archive.prothom-alo.com/detail/date/2012-04-28/news/253659.
৪. অনুপ সাদি, ১৫ জানুয়ারি ২০১৪, প্রাণকাকলি ব্লগ, ঢাকা, পুনঃপ্রকাশ রোদ্দুরে.কম, ২৭ মার্চ ২০১৮, ”সিরাজগঞ্জের তাড়াশ থেকে ৭০টি কচ্ছপ উদ্ধার, ৩ জনের কারাদণ্ড”, ইউআরএল: https://www.roddure.com/animal/tortoise-rescue-at-sirajganj/
৫. অনুপ সাদি, ২১ জানুয়ারি ২০১৪, প্রাণকাকলি ব্লগ, ঢাকা, পুনঃপ্রকাশ রোদ্দুরে.কম, ২৭ মার্চ ২০১৮, ”বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলা থেকে কচ্ছপ উদ্ধার, দুই জনের কারাদণ্ড”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/animal/tortoise-rescue-at-naogaon/
৬. নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক প্রথম আলো, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৪, অপরাধ: শাহজালালে ৫১০ দামি কচ্ছপ উদ্ধার, ইউআরএল: https://www.prothomalo.com/bangladesh/crime/শাহজালালে-৫১০-দামি-কচ্ছপ-উদ্ধার
৭. Our Correspondent, Benapole, Jessore, ৫ মে, ২০১৫; দৈনিক ডেইলি স্টার, “361 smuggled tortoises seized”, ইউআরএল: https://www.thedailystar.net/country/news/361-smuggled-tortoises-seized-80660
৮. অনুপ সাদি, ১৩ জানুয়ারি ২০১৮, রোদ্দুরে.কম, “খুলনার জিরো পয়েন্ট থেকে ৪৯৪টি সুন্দি কাছিম উদ্ধার”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/animal/flapshell-turtle-rescue-in-khulna/
৯. অনুপ সাদি, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, রোদ্দুরে.কম, “কচ্ছপ বিক্রির দায়ে রাজধানীতে ৩ জনের ৯ মাসের কারাদণ্ড”, ইউআরএল: https://www.roddure.com/animal/9-months-jail-for-selling-tortoise/
১০. অনুপ সাদি, ১৭ মার্চ ২০১৮, রোদ্দুরে.কম, “৯০টি কচ্ছপ গড়াই নদীতে অবমুক্ত”, ইউআরএল: https://www.roddure.com/news/90-turtle-released/
১১. অনুপ সাদি, ৭ জানুয়ারি ২০১৯, “নেত্রকোনার জারিয়া জাঞ্জাইলের পার্শ্ববর্তী কংস নদীতে সুন্দি কাছিম অবমুক্ত”, ইউআরএল: https://www.roddure.com/news/lissemys-punctata-at-kangsha-river/
১২. অনুপ সাদি, রোদ্দুরে.কম, “৬০টি সুন্দি কাছিম গোপালগঞ্জ জেলার বাঘিয়া নদীতে অবমুক্ত”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/news/60-indian-flap-shelled-turtle/
সম্পাদনা ও প্রকাশনার ইতিহাস: এই ঐতিহাসিক ডাটাবেসটি প্রথম ১৪ এপ্রিল, ২০১২ তারিখে ‘প্রাণকাকলি ব্লগে’ গবেষণা ও রচনা করা শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৭ জুন, ২০১৭ তারিখে এটি ‘রোদ্দুরে.কম’-এ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম প্রকাশ করা হয়। আজ ২৭ জুন, ২০২৬ তারিখে প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এটিকে সম্পূর্ণ নতুন তথ্য ও উপাত্ত সহকারে পূর্ণাঙ্গভাবে আপডেট করা হলো।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও চিন্তাবিদ। তাঁর প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১৭টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। তিনি ১৬ জুন, ১৯৭৭ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।