আরজ আলী মাতুব্বর ছিলেন বাংলার এক অসামান্য লোক দার্শনিক এবং জ্ঞানী ব্যক্তি

আরজ আলী মাতুব্বর (ইংরেজি: Aroj Ali Matubbar; ১৭ ডিসেম্বর, ১৯০০ – ১৫ মার্চ ১৯৮৫) ছিলেন বাংলার এক অসামান্য লোক দার্শনিক এবং জ্ঞানী ব্যক্তি। শ্রমজীবি কৃষকের জমিতে জাত, আত্মপ্রচার বিমুখ, ঋষিপ্রতিম চিন্তাবিদ ও দার্শনিক। তিনি বাংলাদেশের বরিশাল শহরের ৭-৮ কি.মি. দূরের একটি দরিদ্র কৃষক পরিবারে আরজ আলী মাতুব্বরের জন্ম। তাঁর নিজের কথায় ‘লামচারী গ্রামের বাড়িতে বাংলা ১৩০৭ সনের ৩ পৌষ আমার জন্ম হয়।’ ‘কৃষকের সারল্যে এবং স্মিতমুখে অনুচ্চ শব্দে এবং মিতবাক্যে তিনি কথা বলতেন। চলাচলে, বসনে ভূষণে এবং আলাপচারিতায় আরজ আলী মাতুব্বর ছিলেন অতুলনীয় এবং অনুপ্রেরণাদায়ক এক ব্যক্তিত্ব।”

সাধারণ অর্থে কোনো বিদ্যাপীঠে তার পড়ালেখা করার সুযোগ হয় নি। কিন্তু জ্ঞান আহরণ, গ্রন্থপাঠ এবং শিক্ষায় তিনি ছিলেন একটি আদর্শ চরিত্র। ‘স্বশিক্ষিত’ কথাটির একটি অসাধারণ বাস্তব দৃষ্টান্ত ছিলেন তিনি। যৌবনে মায়ের মৃত্যুর পর আরজ আলী মাতুব্বর সমাজের অনুশাসনের কারণে মায়ের কোনো আলোকচিত্র গ্রহণ এবং তাঁকে রক্ষা করতে না পারার কারণে তিনি মর্মাহত হন এবং সমাজের এমন অনুশাসনকে অবৈজ্ঞানিক এবং অমানবিক বলে অভিহিত করেন। তাঁর মন সমাজের প্রচলিত ধর্মীয় আচার আচরণ ও বিধি নিষেধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। আরজ আলী মাতুব্বর নিজের হাতে জমি কর্ষণ এবং অন্যান্য কাজ সম্পাদন করতেন। জীবিকার জন্য তিনি পরবর্তীতে জমি জমার মাপজোঁকের কঠিন বিষয়ও নিজের চেষ্টায় আয়ত্ত করে একজন ‘আমিনের’ বৃত্তি গ্রহণ করেন। তিনি প্রতিবেশিীদের নিকট একজন প্রাজ্ঞ এবং নির্ভরযোগ্য জমিজমা জরিপকারী হিসেবে পরিচিত হন এবং এই বৃত্তি থেকে অল্পপরিমাণ যে অর্থ তিনি উপার্জন করেন তার ভিত্তিতেই তাঁর নিজের বাড়িতে স্কুল ও লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করেন।

জীবন, জগৎ, সৃষ্টিকর্তা, ন্যায়, অন্যায়, সত্য মিথ্যা, বস্তু ও জীবনের সংজ্ঞা, জীব-অজীবে পার্থক্য প্রভৃতি মৌলিক বিষয় নিয়ে আরজ আলী মাতুব্বর কৈশোরেই তার মনে জিজ্ঞাসা তুলেছেন এবং চিন্তা করেছেন। অপরের সঙ্গে কোনো উচ্চকন্ঠ তর্ক-বিতর্ক কিংবা কলহে প্রবৃত্ত না হয়ে তিনি নিজের চিন্তা নিজের ভাষায় লিপিবদ্ধ করে তাকে পুস্তকাকারে প্রকাশের চেষ্টা করেছেন। সে প্রকাশ বই এর জগতে বাহ্যিকভাবে দৃষ্টি আকর্ষণকারী না হলেও, তাঁর সকল প্রকাশিত গ্রন্থই তাঁর মৌলিক চিন্তা ও জ্ঞানের পরিচয়বাহী।

আরো পড়ুন:  ইবনে সিনা ছিলেন দার্শনিক, চিকিৎসাবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী এবং কবি

প্রতিকূল পরিবেশ এবং বৈরী রাজপুরুষরা নানাভাবে তাঁর চিন্তার জগতকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে। তাঁকে বিধর্মী, ধর্মহীন ইত্যাদি নিন্দনীয় অপবাদে আখ্যায়িত করে তাঁর সামাজিক জীবনকে বিপন্ন করার চেষ্টা করেছে। জনৈক ম্যাজিস্ট্রেট কেন তাঁকে তাঁর চিন্তার জন্য দন্ড দিয়ে কারাগারে আটক করা হবে না, তার কারণ দর্শানোর জন্য কৈফিয়ত তলব করে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করেন। এতদসত্ত্বেও চিন্তার ক্ষেত্রে আরজ আলী মাতুব্বর কখনো দমিত হয় নি। তার চিন্তার কোনো আড়ম্বরপূর্ণ প্রকাশে আরজ আলীর আগ্রহ ছিল না। কিন্তু অনুসন্ধিৎসু মানুষ যেন তার চিন্তার সাক্ষাৎ লাভ করতে পারে সেজন্য সে নিজব্যয়ে ও পরিশ্রমে একাধিক গ্রন্থ রচনা করে মুদ্রিত করেছে। তার প্রকাশিত গ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে-‘সত্যের সন্ধান’, ‘অনুমান’, ‘সৃষ্টি রহস্য’ ও ‘স্মরণিকা’।

তাঁর সত্যের সন্ধান গ্রন্থে আরজ আলী মাতুব্বর যে মৌলিক প্রশ্নগুলি উল্লেখ করে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন তার মধ্যে রয়েছে : ‘১. আমি কে? ২. প্রাণ কি অরূপ না স্বরূপ? ৩. মন ও প্রাণ কি এক? ৪. প্রাণের সহিত দেহের সম্পর্ক কি? ৫. প্রাণ চেনা যায় কি? ৬. আমি কি স্বাধীন? ৭. অশরীরী আত্মার কি জ্ঞান থাকিবে? ৮. প্রাণ কিভাবে দেহে আসা যাওয়া করে?’…………ঈশ্বর সম্পর্কিত প্রশ্নে আরজ আলী মাতুব্বর জিজ্ঞেস করেছেন ‘স্রষ্টা কি সৃষ্টি হইতে ভিন্ন?’ ঈশ্বর কি স্বেচ্ছাচারী না নিয়মতান্ত্রিক?’

কেবল দার্শনিক চিন্তায় নয়, জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাঁর অসাধারণ বোধের আর এক প্রকাশ ঘটেছে তার এরূপ কর্মে যে, তিনি জীবিত অবস্থাতেই জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মানুষের হিতার্থে তাঁর দেহের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে উইলের মাধ্যমে বরিশাল মেডিক্যাল কলেজকে দান করে গেছেন। বাংলাদেশের লোক ঐতিহ্যের স্মারক আরজ আলী মাতুব্বর ১৯৮৬ সনে তাঁর পূর্ণ কর্মজীবন সায়াহ্নে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

তথ্যসূত্র:
১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ২৮২-২৮৩।

আরো পড়ুন:  নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও সমালোচক

Leave a Comment

error: Content is protected !!