আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জীবনী > আচার্য চরক ছিলেন প্রাচীন ভারতীয় আয়ুর্বেদ চিকিৎসার অগ্রদূত

আচার্য চরক ছিলেন প্রাচীন ভারতীয় আয়ুর্বেদ চিকিৎসার অগ্রদূত

চরক

আচার্য চরক (সংস্কৃত:चरक, আনু ১০০ খ্রিস্টপূর্ব – ২০০ খ্রি.) প্রধান অবদান রেখেছিলেন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে যা দক্ষিণ এশিয়ায় গড়ে ওঠা চিকিতসা এবং জীবনযাত্রার একটি পদ্ধতি হিসেবে গণ্য। তিনি চরক সংহিতা (সংস্কৃত: चरकसंहिता) নামক চিকিতসা গ্রন্থের সংকলক বা সম্পাদক (সংস্কৃত: प्रतिसंस्कर्ता ) নামে পরিচিত। চরকের জন্ম এবং কর্মের অবস্থান জানা যায়নি, যদিও এটা বিভিন্ন জায়গায় দাবি করা হয় যে তিনি তক্ষশীলায় বা কপিস্থলে থাকতেন। তবে বৌদ্ধ বিহারের কেন্দ্র ধরলে সমস্ত হিসাবেই তা তক্ষশীলা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।[১]

চরক অবশ্য তার নামাঙ্কিত সংহিতার প্রথম এবং একমাত্র লেখক নন। তার আগে প্রাচীন চিকিৎসক আত্রেয় ও অগ্নিবেশ মুনি খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতকে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা সম্পর্কে যা লিখে গিয়েছিলেন, প্রয়োজনীয় পরিবর্তনসহ তার সুষ্ঠু সঙ্কলন করেন আচার্য চরক। তবে তাতে তার কৃতিত্ব কিছু কমে যায় না। চরক কে ছিলেন, কোথায় জন্মেছিলেন, ব্যক্তি হিসেবে কেমন ছিলেন, সে সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। ‘চরক’ শব্দের অর্থ ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসক। শোনা যায়, চরক এক মুনির পুত্র ছিলেন এবং নানা স্থানে ঘুরে ঘুরে আর্ত মানুষের চিকিৎসা করতেন তিনি।[২]

কাজ ও শাস্ত্রজ্ঞানী আচার্য চরক

‘যে চিকিৎসক জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়ে রোগীর শরীরে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হবে, রোগের চিকিৎসা কখনওই তার দ্বারা সম্ভবপর হবে না।’ এই বার্তা বিবৃত হয়েছে। প্রাচীন ভারতের যে কালজয়ী চিকিৎসা গ্রন্থে, তার নাম ‘চরকসংহিতা’। খ্রিস্টজন্মের প্রায় ৩০০ বছর আগে যা সঙ্কলন করেছিলেন আচার্য চরক। ওই গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘একজন চিকিৎসককে প্রথমেই রোগের পিছনে পরিবেশসহ কী কী কারণ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখে তারপর নিদান বাতলাতে হবে। এরই সঙ্গে মনে রাখতে হবে যে, রোগ নিয়াময়ের থেকেও রোগের প্রতিরোধ অনেক বেশি জরুরি।

আজকের চিকিৎসা বিজ্ঞানেরও মূল কথা: ‘Prevention is better than cure.’ অর্থাৎ রোগ নিরাময়ের আগে তার প্রতিরোধই বাঞ্ছনীয়। প্রায় ২৩০০ বছর আগে একই কথা বলে গিয়েছেন প্রাচীন ভারতীয় আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ আচার্য চরক। তার প্রচলিত চিকিৎসাকে বলা হয় আয়ুর্বেদ। ‘আয়ু’র অর্থ প্রাণ বা জীবন, ‘বেদ’ হলো জ্ঞান। চরক বলেছেন, প্রাণপ্রক্রিয়ার জ্ঞান অর্জন করেই এই প্রক্রিয়ায় বিঘ্নকারী রোগের যথাযথ চিকিৎসা ও নিরাময় সম্ভব। তার লেখা চরকসংহিতাকে আয়ুর্বেদের বিশ্বকোষ বলা হয়। চরকই প্রথম চিকিৎসক, যিনি পরিপাক (digestion), বিপাকক্রিয়া (metabolism) এবং দেহের রোগ-প্রতিরোধশক্তির (immunity) ধারণা দিয়ে গিয়েছেন। 

আরো পড়ুন:  কৌটিল্য ছিলেন প্রাচীন ভারতের কূট রাজনীতিজ্ঞ এবং অর্থশাস্ত্রের প্রণেতা

চরকসংহিতার মতে, বায়ু, পিত্ত, কফ— এই ত্রিদোষে দেহ চালিত হয়। আর এই তিন দোষের সাম্য যখন টলে যায়, তখনই শরীরে দেখা দেয় রোগ। উপযুক্ত চিকিৎসা এবং ওষুধ প্রয়োগে এই সাম্য ফেরানোর নামই নিরাময়। ত্রিদোষের উদ্ভব হয় কীভাবে? রক্ত, মাংস ও মজ্জা— এই তিন ধাতু থেকে। এই ত্রিধাতু গৃহীত খাদ্যের উপর ক্রিয়া করে। এক এক জনের ক্ষেত্রে এই ক্রিয়া আবার এক এক রকম। দুই ব্যক্তি একই খাদ্য একই পরিমাণে খেলেও, উৎপন্ন দোষে পার্থক্য ঘটে। তাই প্রত্যেক শরীরই আলাদা। কেউ রোগা বা দুর্বল, কেউ বা বলিষ্ঠ ও প্রাণচঞ্চল।

‘জেনেটিক্স’ অর্থাৎ জন্মতত্ত্ব সম্পর্কেও ধারণা ছিল চরকের। শিশু ছেলে বা মেয়ে হয় কেন, তার পিছনে কারণগুলি কী কী, তাও জানতেন চরক। তিনি পরিষ্কার বলেছেন, কোনও শিশু পঙ্গু বা অন্ধ হয়ে জন্মালে, তার জন্যে প্রত্যক্ষভাবে পিতা-মাতা দায়ী নয়, তার কারণ নিহিত রয়েছে পিতার শুক্র এবং মাতার ডিম্বাণুতে। এ কথা আজও সমানভাবে সত্য।

দেহে অস্থিসমূহের সংস্থান ও বিন্যাস, যার নাম ‘অ্যানাটমি’, সে সম্পর্কেও যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন চরক। তবে দেহে মোট হাড়ের সংখ্যা ৩৬০ বলে চরকসংহিতায় যা উল্লিখিত হয়েছে, সেটা ভুল। আমরা জানি মানবদেহে ছোট বড় হাড়ের মোট সংখ্যা হলো ২০৬। চরক বলেছেন, মস্তিষ্কই দেহের মূল নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র। হৃৎপিণ্ডে একটি মাত্র প্রকোষ্ঠ আছে, চরকের এই ধারণা ভুল ছিল। তবে রক্ত যে সারা দেহে বিভিন্ন নালিকা-পথে (channel) চলাচল করে, তার উল্লেখ করেছেন তিনি। কিন্তু তার ধারণা ছিল এই চ্যানেলের সংখ্যা মাত্র ১৩। চরকসংহিতায় প্রায় এক লক্ষ ওষধি উদ্ভিদের উল্লেখও রয়েছে।

তথ্যসূত্র

১. Martin Levey, Early Arabic Pharmacology: An Introduction Based on Ancient and Medieval Sources, Brill Archive (1973), p. 10
২. বিমল বসু, বিজ্ঞানে অগ্রপথিক, অঙ্কুর প্রকাশনী, ঢাকা, দ্বিতীয় মুদ্রণ মে ২০১৬, পৃষ্ঠা ২৫-২৬।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page