জর্জ সোরেল মার্কসবাদ ও বিপ্লবী সিন্ডিক্যালবাদের তাত্ত্বিক নেতা

জর্জ ইউজিন সোরেল, ইংরেজিতে: Georges Eugène Sorel, (২ নভেম্বর, ১৮৪৭ – ২৯ আগস্ট, ১৯২২) ছিলেন ফরাসি দার্শনিক এবং বিপ্লবী সিন্ডিক্যালিজমের তাত্ত্বিক। “রিফ্লেকশনস অন ভায়োলেন্স” পুস্তকের জন্য তিনি খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর ওপর কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩) ও অঁরি বর্গসাঁ’র (১৮৫৯-১৯৪১) প্রভাব ছিল। মুসোলিনি তাঁর লেখায় প্রভাবিত হয়েছিলেন।[১] তাঁর চিন্তায় প্রুধোঁ (১৮০৯-১৮৬৫), বাকুনিন (১৮১৪-১৮৭৬) প্রভৃতি নৈরাজ্যবাদী দার্শনিকদের চিন্তার ছায়াপাত ঘটে।

জর্জ সোরেল

কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন এবং একটি চাকরিও লাভ করেছিলেন। কিন্তু ১৮৯২ সালে তিনি তাঁর চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে দার্শনিক চিন্তায় আত্মনিয়োগ করেন। সামাজিক বিকাশ বা প্রগতির তত্ত্বকে তিনি নাকচ করে সমাজের কাল্পনিক ব্যাখ্যাদানের চেষ্টা করেন। রাজনৈতিক মতামতে তাঁর কোনো স্থিরতা ছিল না। ১৯০২ সালে তিনি সিন্ডিক্যালিজমের সমর্থক হয়ে পড়েন। পরে সেই পথও পরিত্যাগ করেন।

তিনি মধ্য বয়সে মার্কসবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন। মার্কসবাদকে বিজ্ঞান বলে তিনিই প্রথম উল্লেখযোগ্যভাবে তুলে ধরেন। পরে অবশ্য বিজ্ঞান শব্দটির পরিবর্তে তত্ত্ব শব্দটিই তিনি বেশি ব্যবহার করেন। তিনি বলেন বুর্জোয়া সমাজ এক নৈতিক ধ্বংসের মধ্যে নিমজ্জিত। শ্রমিকদেরও আরো নীতিনিষ্ঠ হবার প্রয়োজন বলে তার মত। মার্কসবাদ শ্রমিকদের ভেতর ভয়ংকর প্রেরণা জাগাতে পারে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। সশস্ত্র সংঘর্ষের ভেতর দিয়ে এক নৈতিক সমাজ গড়ে উঠবে এই আস্থা প্রকাশ করেন তাঁর বই “রিফ্লেকশনস অন ভায়োলেন্স”-এ।[২] তিনি বলশেভিক বিপ্লবের সমর্থক ছিলেন। তিনি তাঁর বইয়ে ‘সাধারণ ধর্মঘট’কে সমাজতন্ত্র আসছে এই মিথের আকারে দেখেছেন এবং ধর্মঘটকে আন্দোলনের একটি বিশেষ পদ্ধতির পরিবর্তে মূল লক্ষ্য হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন।

তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফরাসি দক্ষিণপন্থিদের সংগে একাত্মতা ঘোষণা করেন। আবার যুদ্ধের পরে সাম্যবাদফ্যাসিবাদ উভয়কে সমর্থনের কথা বলেন। জার্মান ফ্যাসিবাদ সোরেলের রচনা থেকে ‘কর্পোরেট স্টেট’-এর তত্ত্ব গ্রহণ করে এবং জনতার আবেগ উদ্দীপিত করার জন্য জাতিগত বীরত্বের কল্পকথার আশ্রয় যে ফ্যাসিবাদ ও নাজিবাদ গ্রহণ করে তার উৎস সোরেলের চিন্তা।[৩]   

আরো পড়ুন:  সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির ঊনবিংশ কংগ্রেসে প্রদত্ত ভাষণ

সোরেল রাজনৈতিক অভিজাততন্ত্র প্রত্যাখ্যান করেন কারণ মধ্যবিত্তদের সব সাংগঠনিক স্তরসমূহের পদ দখলের ঝোঁক থাকে, সেইসব মানুষের জন্য সংগঠনগুলোতে ভদ্রলোকের ক্লাবে পরিণত করে তাদের জন্য যারা তত্ত্ব কথা বলতে এবং সংবাদপত্রে দীর্ঘ নিবন্ধ লিখতে পছন্দ করে। এই বিষয়টি সোরেল তাঁর “রিফ্লেকশনস অন ভায়োলেন্স” গ্রন্থে উল্লেখ করেন, এবং এই বিষয়টি পরবর্তীতে রবার্ট মিশেলস এবং তার মতবাদ ‘গোষ্ঠীতন্ত্রের লৌহ আইন’ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।[৪]

তথ্যসূত্র:

১. ফকরুল চৌধুরী সম্পাদিত, গ্রামসি পরিচয় ও তৎপরতা; সংবেদ, ঢাকা; ফেব্রুয়ারি, ২০১২; পৃষ্ঠা-১৩৬।

২. সমীরণ মজুমদার, মার্কসবাদ বাস্তবে ও মননে, স্বপ্রকাশ, কলকাতা; ১ বৈশাখ, ১৪০২; পৃষ্ঠা-১৬১-১৬২।

৩. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা-৩৫৮-৩৫৯।

৪. Michels, Robert (1915). “Democracy and the Iron Law of Oligarchy.” In: Political Parties. New York: Hearst’s International Library Co., pp. 377–392.

রচনাকাল ৪ মে, ২০১৪

Leave a Comment

error: Content is protected !!