লাইবনিজ ছিলেন সপ্তদশ শতকের জার্মান বাস্তব-ভাববাদী দার্শনিক

লাইবনিজ (ইংরেজি: Gottfried Wilhelm (von) Leibniz; ১ জুলাই ১৬৪৬ – ১৪ নভেম্বর ১৭১৬ খ্রি.) ছিলেন সপ্তদশ শতকের বিখ্যাত জার্মান বাস্তব-ভাববাদী দার্শনিক। কিন্তু জ্ঞানের ক্ষেত্রে তিনি কেবলমাত্র দার্শনিক ছিলেন না। তাঁর জ্ঞানচর্চা ও গবেষণা ছিল বহুমুখী। অন্কশাস্ত্রে তাঁকে ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাস তত্ত্বের একজন আবিষ্কর্তা বলে স্বীকার করা হয়। পদার্থবিদ্যায় তিনি ‘শক্তি সঞ্চয়’ বিধান আবিষ্কার না করলেও তার পূর্বাভাস দান করেন। তা ছাড়া তিনি ভূতত্ত্ববিদ, প্রাণিবিজ্ঞানী এবং ঐতিহাসিকও ছিলেন। কেবল তাত্ত্বিক নয়, সমাজজীবনেও লাইবনিজ একজন নিরলস সংগঠক ছিলেন। ঐতিহ্যবাহী বার্লিন বিজ্ঞান একাডেমীর তিনি মূল পরিকল্পনাকারী এবং তার প্রথম সভাপতি।

সপ্তদশ শতকের দার্শনিক তত্ত্বসমূহের মধ্যে লাইবনিজের দার্শনিক তত্ত্ব ছিল সর্বাধিক যুক্তিনির্ভর সূক্ষ্মতত্ত্ব। বিশ্বসংসারের রহস্য ব্যাখ্যা করার জন্য তিনি তাঁর মোনাডালিজ গ্রন্থে ‘মোনাড’ তত্ত্ব উপস্থিত করেন। তাঁর মতে বিশ্বের গঠনগত মৌলিক সত্ত্বা হচ্ছে অসংখ্য মোনাড। মোনাড দিয়েই বিশ্ব, কিন্তু মোনাড বস্তু নয়। মোনাড অবিভাজ্য অ-বস্তু সত্তা। মোনাড প্রত্যক্ষদর্শী এবং আত্মক্রিয়। মোনাডে মোনাডে বিশ্ব গঠিত। কিন্তু লাইবনিজের মতে এক মোনাডের সঙ্গে অপর মোনাডের কোনো কার্যকারণগত সম্পর্কের অস্তিত্ব নাই। তথাপি এক মোনাডের সঙ্গে অপর মোনাড সম্পর্কিত সব মোনাড নিয়ে গঠিত হয়েছে একটি সুসংহত বিশ্ব। বিশ্বের এ সুসঙ্গতি পূর্বনির্দিষ্ট। এ যেন সর্বশ্রেষ্ঠ মোনাড বা বিধাতার মধ্যে যে সঙ্গতি বিদ্যমান তারই প্রতিচ্ছায়া পড়েছে প্রতিটি মোনাডে।

সত্তার এই তত্ত্বের পরিপূরক হিসাবে লাইবনিজ তাঁর জ্ঞানতত্ত্ব রচনা করেন। বস্তুর অস্তিত্ব এবং পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যাখ্যার জন্য তিনি যথোপযুক্ত যুক্তির বিধান, ‘ল অব সাফিশিয়েন্ট রিজন’ তৈরি করেন। তাঁর মতে বিশ্বজগতের ব্যাখ্যার জন্য আবশ্যক হচ্ছে বস্তুর সঙ্গে বস্তুর সম্পর্ক আবিষ্কার করা। যে বস্তু যেখানে যেমন আছে তার সে অবস্থান অবশ্যই আকস্মিক বা কারণহীন নয়। সে যেখানে যেমন আছে সেখানে তেমনভাবে থাকার কারণ আছে। পারস্পরিক সম্পর্কই হচ্ছে সে কারণ। কাজেই বিশ্বজগতে কোনো বস্তু বা ঘটনাকে অনুপযুক্ত বা অযৌক্তিক বলে বিবেচনা করার উপায় নেই। বস্তু বা ঘটনামাত্রই যুক্তিগত। যুক্তিতেই তার অবস্থান। কাজেই বলা যায় যে, প্রত্যেকটি বস্তুই যুক্তিগ্রাহ্য এবং প্রত্যেকটি যুক্তিগ্রাহ্য বিষয় বা বস্তুই যথার্থ।

আরো পড়ুন:  জর্জ বার্কলে ছিলেন খ্রিষ্টান ধর্মযাজক এবং অন্যতম ইংরেজ ভাববাদী

অভিজ্ঞতাবাদী লক বলেছিলেন, মন শুরুতে দাগশূণ্য একটি শ্লেট বৈ আর কিছু নয়। এবং যার অস্তিত্ব বাস্তব অভিজ্ঞতায় নেই, তার ভাব মনের মধ্যেও জন্মাতে পারে না। জ্ঞানের এ তত্ত্বকে লাইবনিজ অস্বীকার করেছেন। তাঁর মতে বুদ্ধি অভিজ্ঞতা থেকে যা কিছুই গ্রহণ করুক না কেন, মানুষ বুদ্ধিকে অভিজ্ঞতা থেকে গ্রহণ করতে পারে না। মানুষের বুদ্ধি তার অভিজ্ঞতাপূর্ব শক্তি। অভিজ্ঞতা মানুষের মনে জ্ঞানের সার্বিক সূত্রের জন্ম দিতে পারে না। জ্ঞানের সার্বিক সূত্রগুলির সাহায্যেই মন অভিজ্ঞতাকে অনুধাবন করে।

লাইবনিজের এই জ্ঞানতত্ত্ব ভাববাদী বুদ্ধিবাদ বলে পরিচিত। বার্টান্ড রাসেল লাইবনিজকে আঙ্কিক যুক্তিশাস্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা বলে বিবেচনা করেছেন। সপ্তদশ শতকের জার্মানীর সমাজ জীবনের পটভূমিতে বিচার করলে লাইবনিজের দর্শনে সমাজের সুসঙ্গত বিকাশের অগ্রগতির প্রতিবন্ধক শক্তি জার্মান ধনতন্ত্র এবং সামন্তবাদের পারস্পরিক আপসের প্রতিফলন দেখা যায়।

তথ্যসূত্র:
১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ২৬২।

Leave a Comment

error: Content is protected !!