আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জীবনী > হেগেল ছিলেন জার্মান দর্শনে ভাববাদের একজন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র

হেগেল ছিলেন জার্মান দর্শনে ভাববাদের একজন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র

হেগেল বা জর্জ উইলহেলম ফ্রিডরিখ হেগেল বা গেওর্গ ভিলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেল (ইংরেজি: Georg Wilhelm Friedrich Hegel; ২৭ আগস্ট ১৭৭০-১৪ নভেম্বর ১৮৩১ খ্রি.) ছিলেন একজন জার্মান দার্শনিক এবং জার্মান ভাববাদের এক্জন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তার মধ্যে জার্মান ভাববাদী দর্শনের চরম প্রকাশ ঘটে। ভাবের বাস্তব তত্ত্বের জন্য অনেকে তাঁর দর্শনকে ‘বাস্তব ভাববাদ বলেও আখ্যায়িত করেন। হেগেল কাণ্টের দর্শনের সমালোচনার ভিত্তিতে নিজের দার্শনিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করেন। এতে কাণ্টের নিকট হেগেলের ঋণ প্রমাণিত হয়।

কাণ্টের অভিমতের উল্লেখ ব্যতীত হেগেলের চিন্তার বিকাশ বুঝা সম্ভব নয়। নিম্নোক্ত তিনটি ক্ষেত্রে কাণ্ট ও হেগেলের দর্শনের পারস্পরিক পার্থক্য নির্দিষ্ট করা যায়:

(১) কাণ্ট তাঁর দর্শন দ্বারা এই কথা প্রকাশ করার চেষ্টা করেন যে, মানুষের কাছে দৃশ্য বা জ্ঞেয় জগৎ মানুষের বুদ্ধিকে অতিক্রম করে যেতে পারে না। বুদ্ধির সূত্র হচ্ছে মানুষের কাছে জ্ঞানের একমাত্র সূত্র। বুদ্ধির মাধ্যমে জগৎ মানুষের কাছে যেভাবে উপস্থিত হয় মানুষ জগৎকে সেইভাবে উপলব্ধি করতে বাধ্য হয়। কিন্তু এই জ্ঞেয় বা দৃশ্য জগৎই একমাত্র জগৎ নয়। বুদ্ধির অগম্য এবং মানুষের অজ্ঞেয় আর একটা জগৎ আছে – যাকে বলা যায় আসল জগৎ বা সত্তার সত্তা। হেগেল কাণ্টের বুদ্ধির সূত্র স্বীকার করে বলেন: বুদ্ধি দ্বারাই আমরা জগৎ বা সত্যকে জানি। বস্তুত বুদ্ধি বা প্রজ্ঞাই মানুষের জ্ঞানের একমাত্র মাধ্যম। বুদ্ধি অগম্য এবং মানুষের অজ্ঞেয় আসল জগৎ বলে কিছু আছে এরূপ কথা মানুষ বলতে পারে না। মানুষ জ্ঞেয় জগৎই একমাত্র জগৎ।

(২) কাণ্ট বুদ্ধিকে বোধ এবং প্রজ্ঞা বলে দুভাগে ভাগ করে বোধকে আংশিক অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যাতা এবং প্রজ্ঞাকে চরম সত্য উপলব্ধির মাধ্যম হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। হেগেল বলেন, বুদ্ধির মধ্যে ক্ষমতার তারতম্য করা গেলেও সমগ্র, বুদ্ধিদত্ত যে সত্য তার মধ্যে কোনো বিভাগ করা চলে না। সত্যের কোনো ভাগ নেই: সত্য সমগ্র, সমগ্রই সত্য।

আরো পড়ুন:  এনাক্সিমেণ্ডার ছিলেন একজন গ্রিক বস্তুবাদী দার্শনিক

(৩) কাণ্ট মানুষের জ্ঞানের সীমা জ্ঞেয় বা দৃশ্যজগতে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। হেগেল বলেন, আমাদের জ্ঞানের জগৎকে আমরা দৃশ্য জগৎ বা মায়া বলি কারণ আমরা এই জগতের প্রকাশের সামগ্রিকতকে উপলব্ধি করতে পারি নে। দৃশ্য জগতের প্রকাশের কারণ যখন আমরা উপলব্ধি করতে সক্ষম হই, তখন আর দৃশ্য জগৎ আংশিক বা মায়া বলে বোধ হয় না। তখন আমরা বুঝতে পারি, এটাই একমাত্র জগৎ।

(৪) নীতির ক্ষেত্রে কাণ্ট এমন এক মহৎ বা আদর্শের কল্পনা করেছেন যে আদর্শ কখনো বাস্তবায়িত হতে না পারলেও মানুষ তাকে একমাত্র বাস্তব বলে ভাবতে বাধ্য। হেগেল বলেন, আমরা আদর্শের বিকাশের পর্যায়গুলি বুঝতে সক্ষম বলেই কোনো আদর্শ আমাদের কাছে অন্যায় ও অবাস্তব বলে বোধ হয়। আদর্শের বিকাশের পর্যায়কে সম্যকভাবে উপলব্ধি করলে বাস্তব-অবাস্তবের বিরোধ দেখা দিতে পারে না।

(৫) কাণ্ট জ্ঞানের সূত্রকে বিকাশের সম্ভাবনাহীন অনড় স্থির সূত্র বলে মনে করেছেন। কাণ্টের কাছে জ্ঞান-সূত্রের উৎস মানুষের কাছে অজ্ঞেয়। অজ্ঞাত কোনো শক্তি মানুষের জন্য অপরিহার্য এই জ্ঞানসূত্রগুলি নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। হেগেল মনে করেন, জ্ঞানের সূত্রগুলি অপরিহার্য বটে। কিন্তু এগুলি বিকাশের সম্ভাবনাহীন, অনড় বা এর উৎস অজ্ঞেয় নয়। হেগেলের মতে দর্শনের অন্যতম প্রধান কাজ হচ্ছে জ্ঞানের ক্ষেত্রে ব্যবহার করি সেগুলি আমরা কেনইবা ব্যবহার করি এবং সূত্রগুলি কীভাবে মানুষের জীবনে বিকশিত হয়েছে।

কাণ্টের সঙ্গে নিজের দর্শনের এই পার্থক্য ব্যাখ্যা করে হেগেল ভাবের বিকাশের দ্বন্দ্বমূলক তত্ত্ব তৈরি করেন। দ্বন্দ্বই হচ্ছে ভাব বা অস্তিত্বের বিকাশের মূল কারণ। অস্তিত্বের মধ্যে নিরন্তর ‘হাঁ’ এবং ‘না’-এর দ্বন্দ্ব চলছে। বিকাশের এই তত্ত্বের ব্যাখ্যায় হেগেল ‘পরিমাণ থেকে গুণের’ তত্ত্বও উপস্থিত করেন। অস্তিত্বের মধ্যে পরিবর্তন পরিমাণগতভাবে বৃদ্ধি পেতে পেতে বিশেষ পর্যায় নূতন গুণের উদ্ভব ঘটায়।

সমাজের ইতিহাস ও বিজ্ঞানের বিকাশকে অগ্রসর সচেতন চিন্তার দ্বারা উপলব্ধি করে হেগেল এই তত্ত্ব তৈরি করেন। কিন্তু হেগেল কাণ্টের সমালোচনা করলেও তিনি ভাববাদকে অতিক্রম করতে পারেন নি। জগৎ বা সত্যের ক্ষেত্রে জ্ঞেয় এবং অজ্ঞেয়-র দ্বৈত রূপ হেগেল অস্বীকার করলেও হেগেলের নিকটও মূল হচ্ছে ভাব; বস্তু নয়। যা কিছু জ্ঞেয় বা দৃশ্য সর্বই হচ্ছে ভাবের প্রকাশ ও বিকাশ। এ ছাড়া ভাবের চরম বিকাশ জার্মান রাষ্ট্রযন্ত্রে ঘটেছে বলে হেগেলের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা পরবর্তীকালে স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের আদর্শগত হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হতে পেরেছে। বস্তুত হেগেল-দর্শন থেকে উত্তরকালে দুটি পরস্পর-বিরোধী ধারার বিকাশ ঘটেছে: এর একটি হচ্ছে মার্কসবাদ বা দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ; অপরটি হচ্ছে নবভাববাদ ও স্বৈরতান্ত্রিক রাজনৈতিক মতবাদ।

আরো পড়ুন:  মেনসিয়াস ছিলেন কনফুসিয়াসের অন্যতম অনুসারী যাকে দ্বিতীয় ঋষি বলা হয়

তথ্যসূত্র:
১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ১৯১-১৯২।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page