খোকা রায় ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী যুগান্তর দলের সদস্য, সাম্যবাদী নেতা এবং বাঙালি বিপ্লবী

কমরেড খোকা রায় ( মার্চ, ১৯০৭ – ৯ ডিসেম্বর, ১৯৯২) ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী যুগান্তর দলের সদস্য, সাম্যবাদী নেতা এবং বাঙালি বিপ্লবী। খোকা রায়ের জন্ম ১৯০৭ সালের মার্চ মাসে মময়নসিংহে। নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় কংগ্রেসের কর্মি হিসেবে তাঁর রাজনীতিতে হাতেখড়ি এবং ১৯২১ সালে তিনি অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। এই সময়েই মাত্র ১৫ বছর বয়সে সশস্ত্র বিপ্লবী দল যুগান্তর দলে যোগাদান করে এই দলের আন্ডার গ্রাউন্ড বিভাগে একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করেন।

কমরেড খোকা রায় ছাত্র জীবন শুরু করেন স্থানীয় সিটি কলেজিয়েট স্কুলে। তারপর মময়নসিংহের আনন্দমোহন কলেজ থেকে ১৯২৮ সালে স্নাতক ডিগ্রী নিয়ে ১৯২৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৩০ সালে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা ইউনিটের সম্পাদক নিযুক্ত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে জড়িত থাকেন এবং এক পর্যায়ে জগন্নাথ হল থকে বহিষ্কৃত হন। পরবর্তীতে ১৯৩০ সালেই মময়নসিংহে ফিরে এসে বিপুল উদ্যমে বিপ্লবী কার্যক্রম চালাতে থাকেন। ঐ বছরের ৩০ নভেম্বর গ্রেফতার হয়ে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং এক পর্যায়ে আন্দামান সেলুলার জেলে তাঁকে নির্বাসন দেয়া হয়। এই জেলে থাকা অবস্থায় মার্কস ও লেনিনের বই পড়ে তিনি মনেপ্রাণে একজন কমিউনিস্ট হয়ে উঠেন।

১৯৩৮ সালে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে মময়নসিংহে এসে সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং ঐ বছরেই ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির মময়নসিংহ জেলা কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হন। সেই সময়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির কাজকর্ম দৃঢ়তার সাথে চালিয়ে যান। নীতি ও আদর্শনিষ্ঠ কমরেড খোকা রায় সততার সাথে পার্টির দায়িত্ব পালন করে সেই কঠিন সময়ে মময়নসিংহে কমিউনিস্ট পার্টিকে একটি শক্ত অবস্থানের উপর দাঁড় করান। এজন্য অনেকবার তাঁকে আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে।

১৯৪১ সালের ২১ জুলাই সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর নাৎসী জার্মানির বর্বরোচিত আক্রমণের ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নও জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল এবং নাৎসী জার্মানিকে পরাজিত করার জন্য সমগ্র দুনিয়ার কাছে আবেদন করল। এতদিন যে যুদ্ধ ছিল সাম্রাজ্যবাদী শক্তির যুদ্ধ তাকে পরিণত করা হলো জনযুদ্ধে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ১৯৪২ সালে কমিউনিস্ট পার্টি বৈধ হওয়ার পর ১৯৪৩ সালে অনুষ্ঠিত বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির ২য় সম্মেলনে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির সদস্য ও পরে সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন।[১]

আরো পড়ুন:  সিপিবির জাতীয়তাবাদ অভিমুখি বিচ্যুতিটি হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণির সংগে বিশ্বাসঘাতকতা

১৯৪৩ সালের জুলাই মাসে কমিউনিস্ট পার্টির একজন সার্বক্ষণিক কর্মি কমরেড জুঁইফুলকে খোকা রায় বিয়ে করেন। ১৯৪৭ সালে সাম্প্রদায়িকতার জিগির তুলে ভারতীয় উপমহাদেশকে দুই ভাগে ভাগ করা হলে তিনি স্বেচ্ছায় ঢাকায় চলে আসেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত আত্মগোপনে থেকে পার্টির কাজকর্ম চালিয়ে যান। কমরেড খোকা রায় “সংগ্রামের তিন দশক” নামে একটি মূল্যবান গ্রন্থও রচনা করেছেন।

পাকিস্তান আমলে ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির কাজের ক্ষেত্র কিছুটা বৃদ্ধি পায়। এসময় দলীয় বক্তব্য প্রচারের জন্য একটি মুখপত্র বের করার চেষ্টা করেন নেতৃবৃন্দ। ‘জনতা’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার ডিক্লারেশনও পাওয়া যায়। সেই পত্রিকা প্রকাশের দায়িত্ব ছিল খোকা রায়, বারীণ দত্ত, কেজি মোস্তফা, আলী আকসাদ ও জহির রায়হানের উপর। কিন্তু এই পত্রিকাটি বের হবার সাথে সাথেই পাকিস্তান সরকার তা বাজেয়াপ্ত করে দেয়। তখন খোকা রায় ও বারীণ দত্ত মিলে ‘যুগের দাবি’ ও ‘মার্কসপন্থী’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন। এর কিছুদিন পর পাকিস্তান সরকার ৯২ (ক) ধারা জারি করে। ফলে ১৯৫৪ সালের ৪ জুলাই আবার পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এর তিন সপ্তাহ পর পশ্চিম পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হয়ে যায়। খোকা রায় আবার আন্ডাগ্রাউন্ডে চলে যেতে বাধ্য হন।[২]

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে খোকা রায় পার্টির অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সাথে ভারতে চলে যান। সেখানে গিয়ে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করে মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করেন। পার্টির উদ্যোগে তখন নিজস্ব ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন যৌথ গেরিলা বাহিনী গঠন করা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরিতে এসময় খোকা রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। সে সময় ভারতের কোচিনে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেস হচ্ছিল। সেই কংগ্রেসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সেখানে কমরেড মণি সিংহ, খোকা রায়, বারীণ দত্ত প্রমুখ নেতৃবৃন্দ মুক্তিযুদ্ধের চরিত্র বিষয়ে আলোচনা করেন এবং এব্যাপারে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে সমর্থ হন।

আরো পড়ুন:  খাকসার ছিলো জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ ও প্রাণীর সেবাকারী আন্দোলন

দেশ স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। খোকা রায়সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ দেশ পুনর্গঠনে অবদান রাখেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালে ঘাতকরা সপরিবারে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির আবার অবনতি হতে থাকে। এসময় খোকা রায় সহ পার্টির নেতৃবৃন্দ আত্মগোপনে চলে যান। তাঁর শরীরও খারাপ হতে থাকে। এরপর ১৯৭৬ সালে তিনি কলকাতায় চলে যান। সেখানেই ১৯৯২ সালের ৯ ডিসেম্বর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তথ্যসূত্র:

১. জয়শ্রী গাঙ্গুলি, কমরেড খোকা রায় স্মরণে, সাপ্তাহিক একতা, তারিখহীন, http://www.weeklyekota.net/?page=details&serial=567

২. চন্দন সাহা রায়, খোকা রায়, গুণীজন.অর্গ, তারিখহীন, http://www.gunijan.org.bd/GjProfDetails_action.php?GjProfId=309

Leave a Comment

error: Content is protected !!