কিষেনজি দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের মুক্তি সংগ্রামের এক মহান নেতা ও শিক্ষক

মাল্লোজুলা কোটেশ্বর রাও বা কিষেনজি (ইংরেজি: Kishenji, ২৬ নভেম্বর, ১৯৫৪ – ২৪ নভেম্বর, ২০১১) ভারতের সাম্যবাদী আন্দোলনের উজ্জ্বল নক্ষত্র, ভারতের জনগণের সেবক, কৃষক শ্রমিকের সহায়, বিশ্বের নিপীড়িত ও শোষিত মানুষের শিক্ষক। সাধারণভাবে তিনি পরিচিত তাঁর কিষেনজি  ছদ্মনামে। তিনি ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)র একজন পলিটব্যুরো এবং পার্টির কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের সদস্য, এবং ছিলেন পার্টির সামরিক নেতা। তাকে “ভারতে মাওবাদের মুখ”রূপে দেখা হতো।

তার জন্ম ১৯৫৬ সালে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের করিমনগর জেলায়। ১৯৮০ সালে এক স্কুল শিক্ষক কন্দাপালি সিথামাইয়াহ’র নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় “পিপলস্ ওয়ার গ্রুপ” (PWG) এবং এটি গঠনের সময় অন্যতম সহযোগী ছিলেন কিষেনজী। এই সংগঠনটিই পরে ২০০৪ সালে মাওবাদী কমিউনিস্ট সেন্টার অফ ইন্ডিয়া’র সাথে একীভুত হয়ে গঠন করে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)।

তিনি সারা জীবন ভারতে সন্ত্রাসবাদী, গণহত্যাকারী ও গণশত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেছেন। তিনি ভারতের জনগণের কতিপয় শত্রু সংগঠন যেমন কংগ্রেস, বিজেপি, তৃণমূল কংগ্রেস ও সিপিএমের বিরুদ্ধে বহুমুখী সংগ্রাম পরিচালনা করেন। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে তিনি প্রচারমাধ্যমের কাছে ৮ পৃষ্ঠার লিখিত বিবৃতি ফ্যাক্স করেন এবং সেই লেখায় তিনি জ্যোতি বসুকে পশ্চিমবঙ্গের জংগল অধ্যুষিত জেলাগুলোতে “অনুন্নয়ন” এবং তার “ফলশ্রুতিতে অশান্তি”র জন্য দায়ী করেন। এমনকি তিনি বসু বাবুর সাম্যবাদ সম্পর্কিত বোধ নিয়েও প্রশ্ন করেন। তিনি লেখেন,

প্রধান অপরাধীটি হলো জ্যোতি বসু। সে সারা দেশের সাম্যবাদী আন্দোলনের এক নঞর্থক আদর্শ। আর এজন্যই বুর্জোয়া আর জমিদারদের কাছে সে এত প্রিয়। … … এজন্যই দেশের পুরো শাসকগোষ্ঠী তার অসুস্থতায় তার সাথে সাক্ষাত করতে হুমড়ি খায়। 

তিনি পশ্চিমবঙ্গে একটি মুক্ত এলাকা প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছি শিরোনামের এক সাক্ষাতকারে এক চরম ও পরম সত্য উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি সেখানে বলেন ভারত যে অন্ধকার গর্তে ঢুকছে “তার জন্য মনমোহন সিং, পি চিদাম্বরম ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মতো লোকরাই দায়ী”। 

আরো পড়ুন:  নিকোলাই বুখারিন রুশ বিপ্লবের একজন প্রখ্যাত রাজনৈতিক তাত্ত্বিক

ভারতের জনগণের শত্রু, গণহত্যাকারী, সন্ত্রাসী ও যুদ্ধাপরাধী সংগঠন হচ্ছে জাতীয় কংগ্রেস। মনমোহন সিং এবং পি চিদাম্বরম হচ্ছে বর্বর নরপিশাচ যারা পুরো ভারতকে শ্মশানে পরিণত করেছে। তারা দশ বছরে ভারতের অন্তত ৪০ কোটি মানুষকে হত্যা করে। সেই সময় ভারতের অবৈধ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলো চিদাম্বরম আর সন্ত্রাসী মনমোহন সিং ছিলো প্রধানমন্ত্রী। তাদের মন্ত্রিত্বকালীন সময়ে ভারতে প্রতি বছর অভাবে শহুরে বস্তির ৫ বছরের নিচের ২০ লাখ শিশু মারা যেত।[৩] গণহত্যাকারী সন্ত্রাসী যুদ্ধাপরাধী পি চিদাম্বরমকে কিষেনজি সন্ত্রাসী ‘যৌথ বাহিনী প্রত্যাহার করে নিতে বলেছিলেন’ যা পি চিদাম্বরমরা কখনোই শোনেনি।

বর্বর গণহত্যাকারী খুনি জাতীয় কংগ্রেসের বিরুদ্ধে জনগণের নেতা কিষেনজি সারা জীবন লড়াই চালিয়েছিলেন। কিষেনজী এক ঐতিহাসিক বিপ্লবীর নাম, যিনি ভারতের শ্রেণিসংগ্রামকে উঠিয়ে দিয়েছিলেন হিমালয়ের চূড়ায়। ২৪ নভেম্বর ২০১১ তারিখ, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বুড়িশোল জঙ্গলে ঠাণ্ডা মাথায় তাঁকে হত্যা করে ভারতীয় ফ্যাসিস্ট দস্যুরা। এই মহান নেতাকে নিয়ে কবি ও গীতিকার কবীর সুমন[৪] লিখেছিলেন গান,  

“কোটেশ্বর রাও রাও রাও
শাহাদাত বৃথা যায় না একটাও।।
ওরা মারবেই যাকে পাবে ওরা সামনে
ওরা ধরবেই যাকে পাবে ওরা একলা
ওরা পারবেই কিছু ক্ষয় ক্ষতি ঘটাতে
ওরা পারবেই মিছেকথা গুলো রটাতে।”

প্রলেতারিয় একনায়কত্বের কথা শুনলেই বাংলাদেশে যে-সময় ভুয়া-কমিউনিস্টদের হাঁটু কাঁপতে থাকত সেই সময় কিষেনজীর শহীদি আত্মদান গণমানুষের মুক্তির সকল লড়াই-সংগ্রামে এক চিরঞ্জীব মাইলফলক হয়ে রয়েছে।

তথ্যসূত্র ও টিকাঃ   

১. জ্যোতি বসু (১৯১৪-২০১০) ভারতের ফ্যাসিবাদী ডানপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল গণহত্যাকারী রাজনীতিক। সে সারা জীবন স্বৈরতন্ত্রী কংগ্রেসকে ভারতের রাষ্ট্র ক্ষমতায় রাখার জন্য প্রাণপাত করে এবং ভারতের রাজনীতিতে কমিউনিস্ট ও শ্রমিকবিরোধী ভূমিকা পালন করে।

২. HT Correspondent, Kolkata, Hindustan Times, Jan 10, 2010,  “Kishenji slams Basu”, https://www.hindustantimes.com/kolkata/kishenji-slams-basu/story-CW8kqUZZwBCGw2vhio9idI.html, HT Media Limited.

৩. Gethin Chamberlain, The Guardian, 4 Oct 2009, “Two million slum children die every year as India booms.” https://www.theguardian.com/world/2009/oct/04/india-slums-children-death-rate.

আরো পড়ুন:  কমরেড হো চি মিন ভিয়েতনামের জাতিয়তাবাদী সাম্যবাদী বিপ্লবী নেতা

৪. কবীর সুমন (জন্ম ১৬ই মার্চ, ১৯৪৯ -) একজন ভারতীয় বাঙালি গায়ক, গীতিকার, অভিনেতা, বেতার সাংবাদিক, গদ্যকার ও সংসদ সদস্য।

রচনাকাল: ২৩ নভেম্বর ২০১৩।

Leave a Comment

error: Content is protected !!