আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জীবনী > মাও সেতুং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং বিশ্ববিপ্লবের মহানায়ক

মাও সেতুং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং বিশ্ববিপ্লবের মহানায়ক

মাও সেতুং বা মাও জেদং (ইংরেজি: Mao Tse-Tung; ২৬ ডিসেম্বর ১৮৯৩ – ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭৬ খ্রি.) মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, চীনা বিপ্লবী, রাজনৈতিক নেতা, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং চীন ভূখন্ডের প্রায় শতাব্দীকালের সামাজিক রাজনীতিক মুক্তি ও বিপ্লবের নায়ক। জাপানি দখলদার শক্তি এবং বিদেশী সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদার কুওমিনটাং নেতা চিয়াং কাইশেকের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে জাতীয় স্বাধীনতা এবং সামাজিক বিপ্লবের জন্য চীনের অগণিত এবং অনুন্নত কৃষকদের সংঘবদ্ধ করার কৌশলী হিসেবে মাও সেতুং এক সময় সমগ্র পৃথিবীতে সংগ্রামী মানুষের অনুপ্রেরণাদায়ক উপকথায় পরিণত হয়েছিলেন।

মাও সেতুং ১৯৪৯ সালে সমাজতান্ত্রিক চিনের প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৭৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি চিনের কমিউনিস্ট পার্টি এবং নয়া-গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক চিন পরিচালনা করেন। তাকে মানবের লিখিত ইতিহাসে এক অসামান্য মহত্তম রাজনৈতিক নেতা ছিলেন বলে বিবেচনা করা হয়। তিনি চিনা কমুনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাকালিন সদস্য।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

চীনের একাংশে শিল্পের বেশ কিছুটা বিকাশ ঊনবিংশ শতাব্দীতে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম পঁচিশ বছরের মধ্যেই ঘটেছিল। কিন্তু চীনের সামাজিক বিপ্লব শিল্পের কেন্দ্র শহরসমূহ এবং তার শিল্পশ্রমিকদের শক্তির ভিত্তিতে ঘটে নি। শ্রমিক শ্রেণী বিপ্লবী শ্রেণী হিসেবে সংঘটিত হয়েছে এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে। কিন্তু মাও সেতুং বিপ্লবের প্রতিষ্ঠিত পরিক্রমার পরিবর্তে গ্রামাঞ্চলে গরীব কৃষকদের সংগঠিত করে জাপানি ও কুওমিনটাং বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা কৌশলে লড়াই এর মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে এক শক্তিশালী সৈন্যদল গঠন করেন। প্রধানত এই সশস্ত্র কৃষক বাহিনীকে নেতৃত্বদান করে মাও সেতুং এবং চীনের কমউনিস্ট পার্টি কুওমিনটাং এর সামাজিক ও সামরিক শক্তিকে সুদীর্ঘ সংগ্রামে পরাজিত করে ১৯৪৯ সনে সমগ্র চীন দখল করেন। কুওমিনটাং দলের নেতা এবং চীন সরকারের প্রধান চিয়াং কাইশেক তাঁর পৃষ্ঠপোষক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্যে ফরমোজা দ্বীপে আশ্রয় নিতে সক্ষম হন।[১]

১৯২৭ সালের হুনান বিদ্রোহ থেকে চীনে সশস্ত্র সংগ্রামের শুরু। সংগ্রামের প্রাথমিক পর্যায়ে ১৯৩৪ সালে কুওমিনটাং বাহিনীর সর্বাত্মক আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য মাও সে তুং তার কৃষক বাহিনী নিয়ে যুদ্ধ করতে করতে দুর্গম পথে তিন হাজার মাইল অতিক্রম করে চীনের পশ্চিমাঞ্চল ইয়েনানে গিয়ে উপস্থিত হন। চীনের ইতিহাসে এই যাত্রা ‘লং মার্চ’ বা ‘দীর্ঘ যাত্রা’ নামে খ্যাতিলাভ করে। মাও সেতুং এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রায় ত্রিশ বছরের সংগ্রাম শেষে চীনে কমিউনিস্ট সরকারের প্রতিষ্ঠা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পরিধি ও শক্তি বিরাটভাবে বৃদ্ধি করে। সোভিয়েত রাশিয়ার সক্রিয় সাহায্যে চীনের শিল্প ও কৃষিতে বিশেষ উন্নতি সাধিত হয়। পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক মিত্রসুলভ ছিল।

মার্কসবাদের বিকাশে মাও সেতুংয়ের অবদান

মাও সেতুং মার্কসবাদের বিকাশে বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তার চিন্তাধারা পৃথিবীর মার্কসবাদী ধারায় অসামান্য সংযোজন। তিনি নয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক গঠনকার্য, রণনীতি ও রণকৌশল, তত্ত্ব ও অনুশীলন, দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, যুক্ত সরকার, গণলাইন ও জনমত, দুই লাইনের সংগ্রাম, পার্টি, জ্ঞানতত্ত্ব, সাংস্কৃতিক বিপ্লব ইত্যাদি ক্ষেত্রে মৌলিক অবদান রেখেছেন।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদে তার তাত্ত্বিক অবদান, সমর কৌশল, চিন্তাধারা ও কর্মনীতি এবং তার কমিউনিজমের নীতি এখন একত্রে মাওবাদ নামে পরিচিত। অন্য মার্কসবাদী নেতার সাথে পার্থক্যে মাওবাদের প্রধান অবদান হলও এমনটি যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে বিশ্বজুড়ে অনেকগুলো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আবির্ভাব হলেও পুঁজিবাদের সাথে সমাজতন্ত্রের মতাদর্শগত সংগ্রাম চলে, কিন্তু আত্মগত (ইংরেজি: Subjective) দিক থেকে প্রধান দ্বন্দ্ব থেকে যায় নিপীড়িত তৃতীয় বিশ্বের জনগণের সাথে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের। জাতিগুলি মুক্ত হতে চায়, দেশগুলো স্বাধীন হতে চায় আর জনগণ চাই বিপ্লব_ এটাই এ-যুগের প্রবণতা।[২]

আরো পড়ুন:  গণচীনের হারিয়ে যাওয়া লাল রং এবং বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী চীন

মার্কসবাদের তিনটি অংশ যথা দর্শন, রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ক্ষেত্রে মাও সেতুং-এর অবদানকে কমরেড পুস্প কমল দহল প্রচণ্ড (জন্ম ১১.১২.১৯৫৪) মাওবাদ প্রসঙ্গে নামক ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে লিখিত এক প্রবন্ধে সংক্ষেপে উল্লেখ করেছিলেন। সেই প্রবন্ধের মূল কথা হলো দর্শনের ক্ষেত্রে মাও সেতুং-এর অবদান হচ্ছে তিনি দ্বন্দ্বে বিপরীতের একত্ব ও সংগ্রাম, জ্ঞানতত্ত্বে নির্ভুল চিন্তাধারার উৎস, সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে এক দুইয়ে বিভাজনের নিয়ম, সমাজের নিম্নস্তরের সাথে উপরিকাঠামোর দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক এবং তত্ত্ব ও অনুশীলনে দ্বান্দ্বিক সমন্বয়কে সর্বহারাশ্রেণির জন্য অস্ত্র হিসেবে তুলে দিয়েছেন। রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রের ক্ষেত্রে মাও সেতুং-এর অবদান হচ্ছে নয়া উপনিবেশবাদী আমলাতান্ত্রিক পুঁজির ধরন, সমাজতান্ত্রিক সমাজে জনগণের স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক কর্মসূচির বাস্তবায়ন এবং নয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লবের অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথকে নির্দেশ করেন। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ক্ষেত্রে মাও সেতুং-এর অবদান হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত জাতিগুলোর জন্য নয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মতবাদ, মার্কসবাদী সামরিক বিজ্ঞানে গণযুদ্ধ, সমাজতান্ত্রিক সমাজে শ্রেণিসংগ্রামকে প্রয়োগ করতে সাংস্কৃতিক  বিপ্লব এবং সাম্রাজ্যবাদকে কাগুজে বাঘ হিসেবে মূল্যায়নের তত্ত্বসমূহ উপস্থাপন করেছেন।[৩]

দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের ক্ষেত্রে মাও সেতুং মৌলিক অবদান রাখেন। মাও সেতুং সারা জীবন একটা নিয়ম বলতেন, সেটি হলো ‘বিপরীতের একত্ব’। মাও অন্যান্য নিয়মগুলো মানতেন না; যেমন Talks to the people গ্রন্থের ২২৬ পৃষ্ঠায় তিনি বলেছেন ‘এঙ্গেলস তিনটি প্রকারের কথা বলেছেন। কিন্তু আমার কাছে ব্যাপারটা হচ্ছে আমি এই প্রকারগুলোর দুটোতে বিশ্বাস করি না।’ এছাড়াও  মাও সেতুং ১৯৬৫ সনে হ্যাংচৌ-এ ভাষণে বলেন, 

“এটা বলা হতো যে দ্বান্দ্বিকতার তিনটি প্রধান নিয়ম আছে, তার পর স্তালিন বললেন চারটি। আমার মতে একটি মাত্র মূল নিয়ম আছে এবং তা হচ্ছে দ্বন্দ্বের নিয়ম। গুণ ও পরিমাণ, ইতিবাচক ও নেতিবাচক, বাহ্যিক চেহারা ও সারমর্ম, সারবস্তু ও রূপ, প্রয়োজনীয়তা ও স্বাধীনতা, সম্ভাবনা ও বাস্তবতা….. সবই হচ্ছে বিপরীতের একত্বের দৃষ্টান্ত।”[৪] 

তিনি জ্ঞানতত্ত্বের মূল্যবান অগ্রগতি সাধন করেন। তিনি অভিজ্ঞতাবাদের সাথে মার্কসবাদের পার্থক্যরেখা টেনেছেন। মতান্ধতাবাদিদের বিরুদ্ধে তিনি লড়াই চালান এবং বস্তুবাদি জ্ঞানতত্ত্বকে বিকশিত করেন। মানুষের সমস্ত জ্ঞানই অনুশীলন থেকে এবং অনুশীলনের জন্য; এই বস্তুবাদি জ্ঞানতত্ত্বকে তিনি পার্টির সমস্ত ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক কর্মে কাজে লাগান। জ্ঞানের পর্যায়, জ্ঞানের অসীমতা, জ্ঞানে আপেক্ষিকতা ও অনাপেক্ষিকতা সম্পর্কে তিনি জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করেছেন। দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ সংক্রান্ত তার আবিষ্কার আমাদেরকে দ্বন্দ্ব বুঝতে ও দ্বন্দ্ব বুঝে সমস্যা সমাধানে সহযোগিতা করে।[৫] মানুষের সামাজিক অনুশীলনই যে জ্ঞানের সত্যতার মাপকাঠি তা মাও সেতুং নানভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। মানুষের নির্ভুল চিন্তাধারার উৎস সম্পর্কে তিনি বলেছেন,

“মানুষের নির্ভুল চিন্তাধারা কোথা থেকে আসে? সেগুলো কি আকাশ থেকে পড়ে?_ না। সেগুলো কি নিজের মনের মধ্যে সহজাত?_না। মানুষের নির্ভুল চিন্তাধারা কেবলমাত্র সামাজিক অনুশীলন থেকেই আসে, সমাজের উৎপাদন  সংগ্রাম, শ্রেণি সংগ্রাম ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা_ এই তিনটা অনুশীলন থেকেই আসে।”[৬]

গণলাইন

মাও সেতুং হলেন গণলাইন ও জনমতকে গুরুত্ব দিয়ে এ বিষয়ে মত প্রদান করেছেন। মাও সেতুং চিনের অভিজ্ঞতা থেকে বারবার কেবল শ্রমিক শ্রেণি নয়, বৃহত্তর জনগণের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন এবং ঘোষণা করেন যে জনগণের ভেতর থেকে শুরু করে, আবার জনগণের মধ্যে ফিরে যাওয়াই বিপ্লবীদের প্রধান কাজ। এই জনগণের ভূমিকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে গিয়ে এমনকি কমিউনিস্ট পার্টিকে সমালোচনা করার জন্যও জনগণকে আহ্বান জানান যা তার সদরদপ্তরে কামান দাগো স্লোগানে উঠে এসেছিল। তিনি এমন একজন মানুষ যিনি সর্বদাই জনগণের কাছে থাকা এবং জনগণের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণকে গুরুত্ব দিয়েছেন। জনগণের চাওয়াকে না বুঝলে মাওয়ের অন্ধ অনুকরণই ঘটবে। নির্দিষ্ট দেশে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে বুঝে তদনুযায়ী কর্মসূচি গ্রহণ ও তার বহুল প্রচারের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়াশীল শাসক গোষ্ঠীকে উৎখাত করাই মাওয়ের গণলাইন। তিনি বলেছেন, “একটি রাজনৈতিক ক্ষমতাকে উৎখাত করতে হলে সর্বপ্রথমে দরকার হচ্ছে জনমত সৃষ্টি করা, মতাদর্শগত ক্ষেত্রে কাজ করা। এটা বিপ্লবী শ্রেণি ও প্রতিবিপ্লবী শ্রেণি উভয়ের জন্যই সত্য।”[৭]

আরো পড়ুন:  কামাল আতাতুর্ক ছিলেন আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা

চীন-সোভিয়েত মহাবিতর্ক

ষাটের দশক থেকে বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে চীন ও সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃবৃন্দের মধ্যে মতবিরোধ প্রকাশ পেতে থাকে। এই মতবিরোধের ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন অভিযোগ তোলে যে মাও সেতুং চীনকে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের পথে নিয়ে যাচ্ছেন। অপর দিকে চীনের নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথ পরিত্যাগ করে সংশোধনবাদী নীতি অনুসরণ করছে এবং সামাজিক সাম্রাজ্যবাদে পতিত হয়েছে। চীন ও সোভিয়েতের মতবিরোধের প্রভাব আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনেও বিস্তারিত হয়েছে। ফলে অনেক দেশের কমিউনিস্ট পার্টির পূর্বেকার ঐক্য ভেঙ্গে গেছে। একাধিক কমিউনিস্ট পার্টির উদ্ভব ঘটেছে।[৮]

তিনি ক্রুশ্চেভের ভুয়া-সাম্যবাদ ও সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে তীব্র মতাদর্শিক সংগ্রাম পরিচালনা করেন। তিনি উল্লেখ করেছেন কমিউনিস্ট পার্টির ভেতর পুঁজিবাদের পথিকেরা থাকে। ফলে ক্রমাগত দুই লাইনের সংগ্রাম না-চালালে কমিউনিস্ট পার্টিও বুর্জোয়া পার্টিতে পরিণত হয় এই সাবধানতা তিনি বারবার অবলম্বন করেন। দুই লাইনের সংগ্রাম চলবে সমাজতান্ত্রিক সমাজেও। এই সমাজেরও প্রধান চালিকাশক্তি হবে শ্রেণিসংগ্রাম, গোটা সমাজতান্ত্রিক পর্যায়ে যতক্ষণ না সাম্যবাদী সমাজ গড়ে উঠছে।[৯] তিনি পার্টির ভেতরে সংশোধনবাদি অ-সর্বহারা চিন্তার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য পার্টির অভ্যন্তরে দুই লাইনের লড়াই চালান। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পটভূমিতে দুই লাইনের সংগ্রামকে তিনি সামরিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন।[১০] 

তিনি সংশোধনবাদিদের ও শ্রেণি-সমন্বয়বাদিদের মুখে ছাই দিয়ে বিপ্লব সফল করেছিলেন। তার বিপ্লব সংক্রান্ত চিন্তা মুলত তিনটি বিপ্লব যথা নয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, সাম্যবাদী বিপ্লবকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। তবে তিনি বিপ্লবকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই সফল করার মার্কসবাদী-লেনিনবাদি তত্ত্বকে আঁকড়ে থেকে সফল হয়েছিলেন। যেসব সুবিধাবাদি ও সংশোধনবাদিরা বিদ্রোহ, সর্বহারার একনায়কত্ব ও পার্টির অস্ত্র ধারনের বিরোধিতা করে মুলত শ্রেণি-সমন্বয়ের লাইনকে অনুসরণ করে তাদের বিপক্ষে তীব্র মতাদর্শিক লড়াই চালান। তাই তিনি বলতে পারেন,

“বিপ্লব কোনো ভোজসভা নয়,বা প্রবন্ধ রচনা কিংবা চিত্র অংকন অথবা সূচিকর্মও এটা নয়। এটি এতো সুমার্জিত, এতো ধীর-স্থির ও সুশীল, এতো নম্র, এতো দয়ালু, বিনীত, সংযত ও উদার হতে পারে না। বিপ্লব হচ্ছে একটি অভ্যুত্থান- উগ্রপন্থী প্রয়োগের কাজ, যার দ্বারা এক শোষিত শ্রেণি, অন্য শোষক শ্রেণিকে উত্‍খাত করে।”[১১]

সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি

মাও সেতুং মনে করেন, সমাজতান্ত্রিক সমাজের অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে কোনো পৃথক অর্থনীতি নয়_ এটা বুর্জোয়া অর্থনীতিই; যা কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক শক্তি ও পরিকল্পিত অর্থনীতির পরিচালনায় সাম্যবাদী সমাজের দিকে এগিয়ে চলে। মুদ্রা, পণ্য, বৈষম্য, শোষণ, ব্যক্তিগত সম্পত্তি, বৈষয়িক উৎসাহ, কায়িক ও মানসিক শক্তির বৈষম্য প্রভৃতি সমস্ত পুঁজিবাদী বৈশিষ্ট্যই সমাজতন্ত্রে থেকে যায়। ক্রমশ সাম্যবাদী চরিত্রের দিকে দিকমুখের পরিবর্তনেই সমাজতন্ত্রকে সনাক্ত করা যায়। ধারাবাহিকভাবে সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বিপ্লবের দুই চাকার উপরে ভর দিয়ে এগোতে পারলেই সাম্যবাদের দিকে পৃথিবী এগোতে পারবে।[১২] 

আরো পড়ুন:  নয়া গণতন্ত্র মাও সেতুংয়ের চিন্তাভিত্তিক তত্ত্ব ও প্রয়োগের মতবাদ

১৯৫০ সালের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে মাও সেতুং বলেছিলেন “নারীরা আমাদের অর্ধেক আকাশ”। তিনি এবং মাদাম চিয়াং চিং নারীমুক্তির জন্য সারা জীবন ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করে গেছেন। তিনি লিখেছিলেন,

“একটা মহান সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের জন্য উৎপাদন কাজে যোগদান করতে ব্যাপক নারী-সাধারণকে জাগ্রত করার গুরুত্বটা বিরাট। উৎপাদনে পুরুষ ও নারীর সমান শ্রমের জন্য সমান বেতন দিতে হবে। কেবলমাত্র সমগ্র সমাজের সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নারী-পুরুষের মধ্যে সত্যিকারের সমানাধিকার হাসিল করা যায়।”[১৩] 

মাও সেতুং-এর চিন শুরু থেকেই জাতীয়তাবাদি নীতি গ্রহণ করে এগোয়। ১৯৬২ সালে নেহেরুই প্রথম চিন আক্রমণ করে। ফলে চিন-ভারত যুদ্ধ শুরু হয়। সেই সময় চিন ভারতের বিশাল অংশ দখল করার পর পশ্চাদপসরণ করে যে ঘটনাকে সার্ত্রে বলেছিলেন মানবেতিহাসের কোনোকালে এমন ঘটনা ঘটেনি যে বিজয়ী দল দখলকৃত অংশ ছেড়ে যায়।

মাও সেতুং-এর মৃত্যুর পর চিনের সংশোধনবাদিরা ক্ষমতা দখল করে। দেং জিয়াও পিং প্রেসিডেন্ট হলে চিনের লাল রং পালটে যায়। এখনও চিনে প্রতিক্রিয়াশীল সংশোধনবাদিরাই ক্ষমতায় রয়েছে।[১৪]

তথ্যসূত্র:
১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ২৭৫।
২. সমীরণ মজুমদার; মার্কসবাদ বাস্তবে ও মননে; স্বপ্রকাশ, কলকাতা; ১৪০২, ১ বৈশাখ; পৃষ্ঠা-১১৫-১১৬
৩. পুস্প কমল দহল প্রচণ্ড, মাওবাদ প্রসঙ্গে; PROBLEMS & PROSPECTS OF REVOLUTION IN NEPAL
৪. মাও সেতুং, ১৯৬৫; হ্যাংচৌ-এ ভাষণ। (১৯৬৫)
৫. এ বিষয়ে আরো পড়ুন, আনোয়ার কবির, মাও সেতুং চিন্তাধারার স্বপক্ষে, নবদিগন্ত প্রকাশনী, ঢাকা; জুন, ১৯৮৪
৬. মাও সেতুং, মানুষের নির্ভুল চিন্তাধারা কোথা থেকে আসে; মে, ১৯৬৩
৭. ৮ম কেন্দ্রিয় কমিটির ১০ম প্লেনারি অধিবেশনে, নবম পার্টি কংগ্রেসের দলিলে উদ্ধৃত (১৯৬২)
৮. সরদার ফজলুল করিম; পূর্বোক্ত পৃষ্ঠা ২৭৫
৯. সমীরণ মজুমদার; মার্কসবাদ বাস্তবে ও মননে; স্বপ্রকাশ, কলকাতা; ১৪০২, ১ বৈশাখ; পৃষ্ঠা-১১৫-১১৬
১০. এ বিষয়ে আরো পড়ুন, সমীরণ মজুমদারের গ্রন্থ, চিনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব, র্যামন পাবলিশার্স, ঢাকা; ফেব্রুয়ারি, ২০১০
১১. হুনান কৃষক আন্দোলনের তদন্ত রিপোর্ট (মার্চ, ১৯২৭)
১২. সমীরণ মজুমদার; পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা-১১৫-১১৬
১৩. ৯ মাও সেতুং, ‘নারীরা শ্রম-ফ্রন্টের পথে যাত্রা করেছেন’-এর ভূমিকালিপি (১৯৫৫)
১৪. এই প্রবন্ধের সমস্ত কালো হরফ আমার।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page