আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জীবনী > নবারুণ ভট্টাচার্য বিপ্লবী কবি, সাহিত্যিক, লেখক, গল্পকার ও চিন্তাবিদ

নবারুণ ভট্টাচার্য বিপ্লবী কবি, সাহিত্যিক, লেখক, গল্পকার ও চিন্তাবিদ

নবারুণ ভট্টাচার্য

নবারুণ ভট্টাচার্য (Nabarun Bhattacharya, ২৩ জুন ১৯৪৮ – ৩১ জুলাই ২০১৪) ছিলেন বিশ শতকের বিপ্লবী কবি, সাহিত্যিক, লেখক, গল্পকার এবং বাঙালি চিন্তাবিদ। বিপ্লবী চিন্তা লালনকারী এই কবি তার কবিতায় লিখেছেন পুঁজিবাদী রাষ্ট্রকাঠামোর তীব্র সমালোচনা। তিনি কার্ল মার্কসের ছাত্র হিসেবে রাষ্ট্রের বীভৎস রূপের সমালোচনা করেছেন, লিখেছেন রাষ্ট্র হচ্ছে সশস্ত্র সৈন্যবাহিনী, অন্যান্য আধা সামরিক বাহিনী, কারাগার ছাড়াও অন্যান্য সশস্ত্র ও নিরস্ত্র প্রতিষ্ঠানের দ্বারা ক্ষমতাহীন শ্রেণিকে দমন। রাষ্ট্র হচ্ছে শ্রেণি দমনের হাতিয়ার।

নবারুণ ভট্টাচার্য ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একজন বিপ্লবী সাম্যবাদী ধারার কবি ও কথাসাহিত্যিক। ১৯৪৮ সালের ২৩ জুন তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে জন্মগ্রহণ করেন। নবারুণ ছিলেন বিখ্যাত নাট্যকার ও অভিনেতা বিজন ভট্টাচার্য এবং সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর একমাত্র সন্তান। তার স্কুল জীবন শুরু হয় কলকাতার বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে। লেখাপড়া করেছেন প্রথমে আশুতোষ কলেজে ভূতত্ত্ব নিয়ে এবং পরে সিটি কলেজে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে।

নবারুণের নিজস্ব ধারাটি তৈরি হয়েছিল তার কবি, গল্পকার এবং ঔপন্যাসিক পরিচয়ের সমন্বয়ে। নাটক করেছেন কলকাতার মঞ্চে। মার্কসবাদী লেনিনবাদী মাওবাদী বিপ্লবী সশস্ত্র রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী নবারুণ দীর্ঘদিন কাজ করেছেন ‘সোভিয়েত দেশ’ পত্রিকায়। ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’র মতো কবিতার পঙক্তি কিংবা ‘হার্টবার্ট’, ‘কাঙাল মালসাট’এর মতো তির্যক উপন্যাস গড়ে তুলেছে নবারুণের সাম্যবাদী ভাবমূর্তি। ব্যক্তিগত জীবনেও এই মানুষটি ছিলেন সাধারণ কৃষক ও শ্রমিকের মতোই।

নবারুণ ভট্টাচার্য এবং তার কবিতার বিষয়

নবারুণ বাস্তববাদী কবি। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি বা সিপিএমের বর্বরতার তিনি ছিলেন তীব্র সমালোচক। কলকাতার বুর্জোয়াপন্থী পদলেহক কবিদেরকে ব্যঙ্গ করে তিনি লিখেছেন তারা মানুষ নয়, তারা এমিবা হয়ে গেছে। যখন মহান শ্রমিক ও কৃষকগণ মার ইন্দিরার বন্দুকের গুলিতে মারা যাচ্ছেন, তখন পদলেহকেরা রবী বাবুর গান গাইছেন হরেক ঢংয়ে।

একদিকে চাষীরা মার খাচ্ছে,
অন্যদিকে উনারা দাঁত কেলাচ্ছে,
কবিতা পাঠ করছে,
বানচোদগুলো মানুষ না অ্যামিবা।

গরিবদের নিয়ে কাজ করে যাওয়া এই মানুষটি তাই এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না কাব্যগ্রন্থের কালবেলা কবিতায় বলতে পারেন,

যুবকেরা গেছে উৎসবে
যুবতীরা গেছে বিশিষ্ট ভোজে
গরিবের হায় কী হবে?

এইসব চামচা কবিদের সম্পর্কে তার কবিতায় তাদেরকে গরু হিসেবে সম্বোধন করে তিনি দেখাচ্ছেন, এসব গরু কেবল হাম্বা হাম্বা করতে জানে। এই পুঁজির চামচা কবিগুলোর মতন এমন বেশুমার নির্লজ্জ বেহায়া কবি আর কোথায় পাওয়া যায়?

‘আমি একটি ইতরের দেশে থাকি
যেখানে অবশ অক্ষরমালা চিবোতে চিবোতে
কবিরা গরু হয়ে যায়
উল্টোটাও যে হয় না এমনও বলা যায় না।’

সশস্ত্র সংগ্রামকে প্রকাশ্যে সমর্থন করতে তার পা কেঁপে ওঠতো না। তাই তিনি বলতে পারেন, ‘একটা কথার ফুলকি উড়ে শুকনো ঘাসে পড়বে কবে, সারা শহর উথাল পাথাল, ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে’। রাতের সার্কাস কাব্য গ্রন্থে তিনি লিখেছেন,

“ছন্দেতে নয়, ক্ষমতা দখল চেয়ে
স্বপ্নের কুড়ি মাইনের মত ফাটছে
প্রশ্নবোধক সাতটি তারারা চেয়ে
কারা এত রাতে রাইফেল কাঁধে হাটছে!”

নবারুণ ভট্টাচার্য এবং তার উপন্যাসের বিষয়

নবারুণ ভট্টাচার্যের উপন্যাসের মূল বিষয় জীবনঘনিষ্ঠতা ও জনসংগ্রাম। তার লেখা বাজারের সংগে সম্পর্কহীন। রাজনৈতিক সত্যতাকে তিনি উপন্যাস ও গল্পে তুলে এনেছেন। তিনি লিখেছেন  “ঐতিহাসিক-বাজনৈতিক রদবদলেব যে বিচিত্র ও ট্রাজিক সময়ের আমি সাক্ষী তার অনুরণন আমার আখ্যানে রয়েছে- কখনও আমি অংশীদার এবং সব সমযেই ভিক্টিম। তৃতীয় বিশ্বের একজন লেখক হিসেবে সেটাই আমার উপলব্ধি। বিচ্ছিন্নতাব কষ্টকর একাকীত্ব থেকে কোনো একটা অন্বয়ে আমার যাওয়ার চেষ্টা আশা করি পাঠকের চোখ এড়াবে না। অমানবিকতা ও তৎসংশ্লিষ্ট আবশ্যিক যে বুজরুকিব সার্কাসের মধ্যে আমবা রয়েছি তার সঙ্গে কোনোরকম আপোষ অসম্ভব।”[১] এটাই হচ্ছে লেখক হিসেবে নবারুণের সম্মিলিত ঘোষণা।

আরো পড়ুন:  প্রেমেন্দ্র মিত্র আধুনিক বাঙালি কবি ছোটগল্পকার, ঔপন্যাসিক এবং চিত্রপরিচালক

নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘হারবার্ট’ উপন্যাসটি ১৯৩২ সালে প্রকাশিত হলে চারদিকে ভীষণ হইচই পড়ে যায়। সাহিত্য অঙ্গণ থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিষ্ঠিত অঙ্গন নড়াচড়া করে বসে। এই উপন্যাসের জন্য এই বছরই সাহিত্য অকাদেমি সম্মানও পান তিনি। এছাড়াও তিনি পেয়েছেন নরসিংহ দাস এবং বঙ্কিম পুরস্কার। পরবর্তী সময়ে এই উপন্যাস নিয়ে একই নামে চলচ্চিত্র বানিয়েছেন পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায়।

নবারুণ ভট্টাচার্যের রচনার মধ্যে লুব্ধক, হালালঝান্ডা ও অন্যান্য, মহাজনের আয়না, ফ্যাতাড়ু, রাতের সার্কার্স এবং আনাড়ির নারীজ্ঞান উল্লেখযোগ্য। তিনি ২০১৪ সালের ৩১ জুলাই আন্ত্রিক ক্যান্সারের চিকিৎসাধীন অবস্থায় কলকাতায় ঠাকুরপুকুর ক্যান্সার হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

তথ্যসূত্র

১. নবারুণ ভট্টাচার্য, ভূমিকা, উপন্যাস সমগ্র, দেজ পাবলিশিং, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ মাঘ ১৩৭২, পৃষ্ঠা ৮।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page