নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও সমালোচক

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক, সমালোচক, গবেষক, সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ। তিনি উপন্যাস রচনা করে অনেক খ্যাতি অর্জন করেন। ছোটগল্প রচনার ক্ষেত্রেও বেশ পারদর্শিতা পরিচয় দিয়েছেন। এছাড়া কিশোরদের জন্য রচিত জনপ্রিয় কৌতুক চরিত্র টেনিদা নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের অনবদ্য সৃষ্টি। চলচ্চিত্রের জন্য অনেক চিত্রনাট্যও লিখেছেন তিনি।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়:

কথাশিল্পী নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়র প্রকৃত নাম তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। ১৯১৮ সালের ০৪ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের বালিয়াডাঙ্গিতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতৃভূমি বরিশালের বাসুদেবপুরের নলচিরায়। ছেলেবেলায় তাঁর ডাক নাম ‘নাড়’। সুনন্দ’ তাঁর ছদ্মনাম। বাবা প্রমথনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন পুলিশের দারোগা। মা বিন্ধ্যবাসিনী দেবী। বাবা-মায়ের অষ্টম সন্তান তিনি। তাঁর দুই অগ্রজ শিশু বয়সেই মারা যায়। বাকি আট ভাইবোন হলেন সতীরানী, নিখিলনাথ, ননীবালা, পুঁটুরানী, শেখরনাথ, তারকনাথ (নারায়ণ), বীণা ও কমলা।

১৯২৫ সালে মাত্র ৮ বছর বয়সে মা হারা হন। বাবার চাকুরি চলে যায় ১৯২৬ সালে। ১৯৩৮ এ বাবা প্রমথনাথ গঙ্গোপাধ্যায় মারা যান। ০৯ মে ১৯৪০ তারিখে রেণু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈবাহিকসূত্রে আবদ্ধ হন। রেণুর বাবা গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায় আর মা কুমুদিনী। পারিবারিক সম্পর্কে কুমুদিনী ছিলেন সীতারাণীর ননদ। বিয়ের পরের বছর নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় কন্যা সন্তানের বাবা হন; কন্যার নাম বাসবী গঙ্গোপাধ্যায়। ১৯৪৫ এ আশাদেবী সান্যালকে বিয়ে করেন। ১৯৪৯-এর ১৩ জানুয়ারি আশাদেবীর গর্ভে একমাত্র পুত্র অরিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম।

শিক্ষাজীবন:

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় দিনাজপুর মিউনিসিপ্যাল এম.ই. স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু। প্রবেশিকা পর্যন্ত দিনাজপুর জেলা স্কুলে অধ্যয়ন। ১৯৩৩ সালে দিনাজপুর জেলা স্কুল থেকে বাংলায় ৮৪ শতাংশ নম্বরসহ প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এ বছরই আই.এ পড়বার জন্য ভর্তি হন ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজে। এখানেই তার সঙ্গে পরিচয় ও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে অচ্যুত গোস্বামী ও নরেন্দ্রনাথ মিত্রের।

১৯৩৫ সালে আই. এ. পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে ব্যর্থ হন। রেভুলেশনারি সাসপেক্ট হিসেবে অন্তরীণ ছিলেন এক বছর। ১৯৩৬ সালে নন-কলেজিয়েট ছাত্র হিসেবে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে আই.এ. পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৩৮ সালে ব্রজমোহন কলেজ থেকে ডিস্ট্রিংশনসহ বি.এ. পাশ করেন বিকল্প বাংলা ও ঐচ্ছিক বাংলা বিষয়ে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে। ১৯৩৮ সালেই এম.এ পড়বার জন্য কলকাতা গমন করেন। নরেন্দ্রনাথ মিত্রসহ শোভাবাজার স্ট্রীটের একটি মেসে থাকতেন। কিছুদিন পরে তিনি আমহার্স্ট স্ট্রিটে অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বাড়িতে ওঠেন। ১৯৪০-এ এম.এ. পরীক্ষা দেয়া সম্ভব হয় না। ১৯৪১-এ এম.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে।

আরো পড়ুন:  ধনঞ্জয় রায় উত্তরবঙ্গ বিশ্লেষক একজন জনপ্রিয় লেখক

শৈশব-কৈশোর-যৌবন:

বাবার কর্মসূত্রে শৈশব-কৈশোর এবং প্রথম যৌবন কেটেছে বরিশাল, ফরিদপু ও দিনাজপুরে। শৈশব-কৈশোরেই অর্থাৎ যখন তিনি দিনাজপুর এম.ই স্কুলের ছাত্র তখনই ‘গুরুদক্ষিণা নাটক, চিত্র-বৈচিত্র্য নামে কাগজ, সুধীন ঘোষকে সহপাঠী, শরৎ বন্দ্যোপাধ্যায়কে উৎসাহদাতারূপে পাওয়া উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ১৯৩০ সালে । বয়স যখন বারো এবং তিনি অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র তখন তার ‘গুরুদক্ষিণা’ নাটকটি অভিনীত হয়। যদিও নাটকটি রচনা করেন তারও বেশ আগে ১৯২৫ সালে। শৈশবে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। নিজের স্বীকারোক্তিতে দেশ পত্রিকায় তিনি জানান।

..সেদিনের বালক মনে তখন একটিমাত্র সংকল্পই আগুনের অক্ষরে লেখা হয়ে গিয়েছিল। যদি কলম ধরতে হয়, তবে তা দেশের জন্য; যদি লিখতে হয় তবে তা স্বাধীনতার সংগ্রামকে এগিয়ে দেবার জন্য’। যুগান্তর দলের গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৩০ এর অব্যবহিত পরেই। যৌবনে যখন ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে ছাত্র তখন অচ্যুৎ গোস্বামী ও নরেন্দ্রনাথ মিত্রকে পান সহপাঠীরূপে। সদ্য যৌবন পিতার মৃত্যুর পর তাকে অর্থোপার্জন করতে হয়েছে লেখালেখি করে এমনকি টিউশনি করেও। বাবার সাহচর্যে শৈশব-কৈশোর কেটেছে বিশ্বসাহিত্যের বই আর পত্র-পত্রিকা পড়ে। যৌবনে তার উত্তরণের কালে নরেন্দ্রনাথ মিত্র তার বন্ধু এবং বীতংস’ গল্পের জন্য আশির্বাদপুষ্ট হন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের

কর্মজীবন:

১৯৪২ সালে জলপাইগুড়ি আনন্দচন্দ্র কলেজের প্রথম অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। প্রথম পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস তিমিরতীর্থ; বিখ্যাত উপন্যাস উপনিবেশ ১ম খণ্ড, ২য় খণ্ড; গল্প ‘বীতংস’, ‘নক্রচরিত’, ‘হাড়’, ‘পুষ্করা’, ‘দুঃশাসন’ এ কলেজের অধ্যাপনাকালেই প্রকাশিত হয়। ১৯৪৫ সালের ০৭ কিংবা ০৯ জুলাই কলকাতা সিটি কলেজের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে প্রথমত খণ্ডকালীন এবং কয়েকমাসের মধ্যেই পূর্ণকালীন অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এখানে অধ্যাপনাকালেই তার কালজয়ী প্রবন্ধগ্রন্থ সাহিত্য ও সাহিত্যিক এবং সাহিত্যে ছোটগল্প প্রকাশিত হয়। ১৯৬০ সালে এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি. ফিল ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। রিডার হিসাবে যোগদান করেন। জীবনের শেষ পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন এখানেই।

আরো পড়ুন:  শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দক্ষিণ এশিয়ার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক

পুরস্কার-সম্মাননা:

এম.এ. পরীক্ষায় অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য ১৯৪১ সালে ব্রহ্মময়ী স্বর্ণপদক করেন। এ পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯৬৪ সালে সাহিত্যিক হিসেবে আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬৮ সালে সাপ্তাহিক বসত। পত্রিকা থেকে সম্বর্ধিত হন ।

সাহিত্যচর্চা:

৭ম-৮ম শ্রেণিতে পাঠকালে ‘গুরুদক্ষিণা’ নাটক লেখেন ১৯২৫ সালে এবং ১৯৩০ সালে তা মঞ্চস্থ হয়। হাতে লিখে ‘চিত্র-বৈচিত্র্য’ নামে পত্রিকা প্রকাশ করেন যার সম্পাদক, প্রকাশক ও পাঠক তিনি নিজেই। প্রথম প্রকাশিত রচনা কবিতা। ‘ডাক’ শীর্ষক সে কবিতাটি ‘মাস পয়লা’ পত্রিকায় ছাপা হয় ফেব্রুয়ারি-মার্চ ১৯২৯ সংখ্যায় যখন তিনি দিনাজপুর জেলা স্কুলের ৭ম শ্রেণির ছাত্র। বারো আনা পুরস্কারও পেয়েছিলেন। দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রথম কবিতা ‘নমস্কার’ ৩ মার্চ ১৯৩৪ তারিখে এবং দ্বিতীয় কবিতা ‘চারণ’ প্রকাশিত হয় ১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪-এ। তার প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘নিশীথের মায়া’ ছাপা হয় ‘দেশ’ পত্রিকায় ২৫ শ্রাবণ ১৩৪২-এ। ১৯৩৬ এ বিচিত্রা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় কবিতা ‘আমি একা বাতায়নে’ এবং নীড় ও দিগন্ত প্রথম উপন্যাস।

১৯৩৮-এ নরেন্দ্রনাথ মিত্র, বিষ্ণুপদ ভট্টাচার্য ও নিজের কবিতা নিয়ে প্রকাশ করেন ‘জোনাকী’ নামক কাব্যগ্রন্থ। ১৯৩৮-এ ‘বিভীষিকার মুখে, ১৯৩৯-এ ‘মরণের মুখোমুখি’ এবং ১৯৪০-এ ‘ঘূর্ণিপাকে লাল নিশান’ রোমাঞ্চকর কাহিনী রচনা করেন অর্থ উপার্জন উদ্দেশ্যে। অতঃপর জীবনের বাকি ৩০ বছর নিরলস সাহিত্যচর্চায় নিমগ্ন থাকেন। ৩৫ বছরের সাহিত্যচর্চায় তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাসমূহ নিম্নরূপ :

গল্পগ্রন্থ:

বীতংস  (১৩৫২), ভাঙাবন্দর ১৩৫২, দুঃশাসন ১৩৫২, জন্মান্তর ১৯৪৬,  শ্বেতকমল উর্বশী, গল্পসংগ্রহ, শুভক্ষণ, রাতের মুকুল, ভোগবতী, কালাবদর, স্বনির্বাচিত গল্প, গন্ধরাজ, ভাটয়ালী,  শ্রেষ্ঠ গল্প, রূপমতী, সাপের মাথার মনি, একজিবিশন, শীলাবতী, ছায়াতরী, বনজ্যোৎস্না,  ঘণ্টাদার কালুকাকা, লক্ষ্মীর পা, আলেয়ার রাত।

উপন্যাস:

উপনিবেশ -১, উপনিবেশ -২, উপনিবেশ -৩, সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী, মন্দ্রামুখর, মহানন্দা, স্বর্ণসীতা, ট্রফি, লালমাটি, কৃষ্ণপক্ষ, বৈতালিক, শিলালিপি, অসিধারা, ভাটিয়ালী, পদসঞ্চার, আমাবস্যার গান, আলোকপর্ণা

নাটক:

আরো পড়ুন:  সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী শ্রেণিসংগ্রামের লড়াইয়ের পথের পথিকদের আলোকবর্তিকা

রাম মোহন, ভাড়াটে চাই, আগুন্তক, পরের উপকার করিও না, ভীম বধ, বারো ভূতে।

কিশোর উপন্যাস ও ছোটগল্প:

টেনিদা ও সিন্ধুঘোটক, চারমূর্তি, চারমূর্তির অভিযান, ঝাউবাংলোর রহস্য, অন্ধকারের আগন্তুক, পঞ্চাননের হাতি, রাঘবের জয়যাত্রা, জয়ধ্বজের জয়রথ, অব্যর্থ লক্ষভেদ।

মৃত্যু :

১৯৭০ এর ৬ নভেম্বর তারিখে সেরিব্রাল স্ট্রোক হয়ে পি.জি. হাসপাতালে তার জীবনাবসান ঘটে।

তথ্যসূত্র:

১. ভাষাপ্রকাশ নির্বাচিত শ্রেষ্ট গল্পমালা , বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রেষ্ট গল্প; ভাষাপ্রকাশ, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ  ফেব্রুয়ারি, ২০১৬; পৃ: ২০৩-২০৬।

Leave a Comment

error: Content is protected !!