পরেশ ধর বিশ শতকের মহান গণসংগীত শিল্পী গীতিকার

পরেশ ধর (ইংরেজি: Paresh Dhar, ৯ আগস্ট, ১৯১৮ – ৬ এপ্রিল, ২০০২) বাংলা ভাষার বিশ শতকের কবি, গণসংগীত গীতিকার, গীতিনাট্যকার, লেখক, বংশীবাদক, যাত্রাপালা রচয়িতা, রাজনীতিক এবং একজন মাওবাদী চিন্তক। তিনি পশ্চিমবঙ্গ গণ-সংস্কৃতি পরিষদ ও বিপ্লবী লেখক শিল্পী বুদ্ধিজীবী সংঘের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং এম.সি.সি.-র (মাওইস্ট কমিউনিস্ট সেন্টার) রাজনীতির নিকটবর্তী চিন্তার মানুষ ছিলেন। নকশালবাড়ী আন্দোলন তাঁকে নাড়া দিয়েছিল। তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক চেতনা, স্পষ্ট রূপ নিয়েছিল সত্তরের দশকে।

১৯৪৬ সালের শেষ দিকে, এক বন্ধুর সাথে গণনাট্য সংঘের একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে সলিল চৌধুরী প্রমুখদের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে পরেশ ধর নিজেই গণনাট্য সংঘে যোগ দেন। মতাদর্শের ফারাকের জন্য ১৯৫০ সালে তিনি গণনাট্য সংঘ ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। সে সময়ের গণনাট্য সংঘের প্রচলিত গণসঙ্গীতের কথা, সুর ও উপস্থাপনার পদ্ধতির সঙ্গে তাঁর মতের মিল হচ্ছিল না।[১]

সলিল চৌধুরীর গানে অনুপ্রাণিত হয়ে এবং ভারতীয় গণনাট্য সংঘে জড়িয়ে পড়ার ফলে প্রেমের গান থেকে চলে আসেন গণসংগীত রচনার পথে। তিনি ভাবনা, বিশ্বাস ও গান রচনায় প্রগতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন। এইচ.এম.ভি.-তে কিছুকাল প্রশিক্ষক ছিলেন। একটিমাত্র চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেছেন। তিনি উদয়শংকরের দলেও ছিলেন বংশীবাদক এবং আকাশবাণীতে দীর্ঘদিন বাঁশি বাজিয়েছেন।

পরেশ ধর জন্মেছিলেন ১৯১৮ সালের ৯ আগস্ট কলকাতার গরানহাটায়। পিতা যামিনীকান্ত ধর ও মাতা তুলসীরানি দেবী। ঠাকুরদা রজনীকান্ত ধরের আদি নিবাস ছিল অবিভক্ত বাংলার ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের অন্তর্গত কাননীসার গ্রামে। পরিবারের রীতি মেনেই ১৯৪৪ সালে কলকাতার নিমতলার এক বনেদী পরিবারের কন্যার সাথে তাঁর বিয়ে হয়। কলকাতার গরানহাটার ওরিয়েন্টাল সেমিনারি স্কুল পাশ করে স্কটিশচার্চ কলেজে স্নাতকে শিক্ষালাভ করেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পান। তিনি কর্মজীবনে যাদবপুর বিদ্যাপীঠের ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। পরে শিল্প-সাহিত্যচর্চায় পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন।[১]

শৈশবের বাড়ীতে সঙ্গীতের পরিবেশ ছিল। পিতা ভাল তবলা বাজাতেন। তিনি ঢাকার বিখ্যাত তবলাবাদক প্রসন্ন ওস্তাদের ছাত্র ছিলেন। কাকা ভাল সরোদ বাজাতেন। তিনি বিখ্যাত সরোদ-বাদক আলাউদ্দীন খাঁ সাহেবের ছাত্র ছিলেন। কাকার সরোদ শিক্ষার দিনগুলিতে তিনিও গিয়ে কাকার সঙ্গীত-শিক্ষার ঘরে বসে থাকতেন এবং সেই সুর তিনি বাঁশীতে তুলবার চেষ্টা করতেন। এভাবেই তাঁর বাঁশী শেখা হয়। রাগ-রাগিনী শেখেন জোড়াবাগানের রামকানাই ভট্টাচার্যের কাছে। বাঁশি বাজানো শেখার পরই তাঁর গানের জগতে প্রবেশ।  কলেজে পড়তে পড়তেই তিনি আকাশবাণী কলকাতা থেকে বাঁশী বাজানোর অনুষ্ঠান পেতে শুরু করেন।

আরো পড়ুন:  বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা

তাঁর রচিত গানের সংখ্যা প্রায় চারশত যেগুলোর মধ্যে প্রায় দুশত গণসংগীত। প্রকাশিত গানের সংকলন হচ্ছে ‘একগুচ্ছ গণসংগীত’ ৩ খণ্ডে এবং দুটি কবিতাগ্রন্থ হচ্ছে ‘আমি যে রোজ দেখি আমার মাকে’ ও ‘অসংখ্য বাসুদেবের পদধ্বনি’। সব কটি বইই উত্তর ২৪ পরগণার, দণ্ডীরহাটের (বসিরহাট), চিন্তাধারা প্রকাশনী থেকে ১৯৮০র দশকে প্রকাশ করা হয়েছিল। এছাড়া তাঁর লেখা যাত্রাপালা  ‘তাজমহলের কান্না’তে তাঁরই সঙ্গীত পরিচালনায়, বিখ্যাত নাট্যাকার শান্তিগোপাল অভিনয় করেছিলেন। তাঁর তিনটি গীতিনাট্য হচ্ছে ‘দুর্ভিক্ষের পাঁচালী’, ‘শান্তি তরজা’ এবং ‘ভোট রঙ্গ’।

পরেশ ধরের রচিত গানে কণ্ঠ দিয়েছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, বেচু দত্ত, বাণী ঘোষাল ও সুপ্রীতি ঘোষ। এছাড়া ক্যালকাটা ইউথ কয়ার গেয়েছে ‘প্রাণে প্রাণ মিল করে দাও’ এবং গণবিষাণ গেয়েছে ‘এমন রাত্রি নেই যা প্রভাত হয় না’। তাঁর গান সরকারের রোষানলেও পড়ে। সরকারী আকাশবাণী বেতার  কর্তৃপক্ষের আপত্তিতে, গ্রামোফোন কোম্পানি, “কারখানা কলে” গানটির সব রেকর্ড ভেঙে ফেলে, গানটির বিক্রী বন্ধ করে দেয়। তাঁর ‘শান্ত নদীটি পটে আঁকা ছবিটি’ ও ‘ঝিকিমিকি জল নদী টলোমল’ গান দুটি হেমন্ত মুখোপাধ্যায় নিজে পছন্দ করে রেকর্ড করেছিলেন, যা জনপ্রিয় বাংলা গানের তালিকায় স্থান পেয়েছে একথা আজ নির্দ্বিধায় বলা যায়। এছাড়াও হেমন্ত গেয়েছেন ‘ফুলের মতো ফুটলো’ এবং ‘জোয়ারের গান’।

বেচু দত্ত গেয়েছিলেন ‘কারখানা কলে খাটি দলে দলে’, ‘ওরে ও মাঝি রাঙা স্বপন দেশে যাব’, ‘ওরে ও নতুন দিনের পাখী’ ও ‘ঘুম ভেঙে যায়’। ‘জাগো জাগো বসুমাতা জাগো সাড়া দিয়া’ গেয়েছিলেন বাণী ঘোষাল। আর ‘নির্ঝরিণী ঝর্ঝরিয়ে’ গেয়েছেন সুপ্রীতি ঘোষ। তাঁর আরো দুটি জনপ্রিয় গান হচ্ছে ‘মোদের গানের অঙ্গনে যদি মানুষ না পায় ঠাই’ এবং ‘তুমি পায়ে যখন আলতা পর’।

তথ্যসূত্র:

১. সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত, আধুনিক বাংলা গান; প্যাপিরাস, কলকাতা; ১ বৈশাখ, ১৩৯৪।

আরো পড়ুন:  বিনয় রায় রাজনৈতিক কর্মী এবং আধুনিক বাংলা গানের গীতিকার

২. ‘সমাজতন্ত্র কোন সংকটে পড়েনি’, পরেশ ধরের সঙ্গে একটি সাক্ষাত্কারের পুনর্মুদ্রণ, “সাংস্কৃতিক  সময়” পত্রিকা, সম্পাদক অশোক চট্টোপাধ্যায়, এপ্রিল ২০০২।

৩.  শ্যামল গুহ, পরেশ ধরের সন্ধানে, ২০০২।

৪. নামহীন, মিলনসাগর ওয়েবসাইট, তারিখহীন, http://www.milansagar.com/kobi/paresh_dhar/kobi-pareshdhar.html.

রচনাকাল এপ্রিল ৮, ২০১৪

তাঁর গানগুলি শোনার জন্য নিচের লিংকগুলোতে ক্লিক করে ডাউনলোড করতে পারবেন:

১. শান্ত নদীটি পটে আঁকা ছবিটি

২. ঝিকিমিকি জল নদী টলোমল

৩. কারখানা কলে খাটি দলে দলে

৪. ওরে ও মাঝি রাঙা স্বপন দেশে যাব

৫. ওরে ও নতুন দিনের পাখী

৬. ঘুম ভেঙে যায়

৭. প্রাণে প্রাণ মিল করে দাও

৮. এমন রাত্রি নেই যা প্রভাত হয় না

Leave a Comment

error: Content is protected !!