রজনীকান্ত সেন আধুনিক গানের প্রখ্যাত বাঙালি গীতিকার

রজনীকান্ত সেন (২৬ জুলাই, ১৮৬৫ – ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯১০) প্রখ্যাত কবি, গীতিকার এবং সুরকার হিসেবে বাঙালি শিক্ষা-সংস্কৃতিতে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর জন্ম ১৮৬৫ সালের ২৬ জুলাই বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি উপজেলার ভাঙাবাড়ি গ্রামে এক ধর্মনিষ্ঠ পরিবারে। তাঁর পিতা গুরুপ্রসাদ সেন ছিলেন গীতকার। ‘পদচিন্তামণি’ নামে এক কীর্তনের বই এবং ‘অভয়াবিহার’ আরেক গানের বই লেখেন তিনি।

রজনীকান্ত রাজশাহীতে বিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করেন। তখন তার চেয়ে উচ্চতর শ্রেণীর সহধ্যায়ী তারকেশ্বর চক্রবর্তীর কাছে প্রাথমিক সংগীতজ্ঞান অর্জন করেন। তিনি স্বভাবে ছিলেন আত্মমগ্ন ও শান্ত। ১৮৮৩ সালে কুচবিহারে জেনকিন্স স্কুল থেকে এন্ট্রান্স, রাজশাহী কলেজ থেকে এফ. এ., কলকাতার সিটি কলেজ থেকে বি. এ. এবং কলকাতা আইন কলেজ থেকে বি. এল. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

১৮৯১ সাল থেকে রাজশাহীতে আইনব্যবসা শুরু করেন। অল্পকালব্যাপী মুনসেফ ছিলেন নাটোর ও নওগাঁয় । কিন্তু আইন ব্যবসায় তার স্বভাবের সঙ্গে খাপ খায়নি। কবিতা ও গান রচনায় তিনি অধিকতর স্বস্তি পেতেন। গান রচনা বা সংগীতশিক্ষায় রজনীকান্ত প্রথাবদ্ধ অনুশীলন বা শাস্ত্রীয় দীক্ষা পাননি। কিন্তু সংগীত ছিল তার স্বভাবের অন্তর্গত, স্বতঃস্ফূর্ত ও সাবলীল। পনেরো বছর বয়সে কালীসংগীত রচনার মধ্যে দিয়ে তার স্ফুরণ ঘটে। রাজশাহী বসবাসকালে ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র বাড়িতে আসরে গান গাওয়ার সূত্রে গান রচনা শুরু করেন। নিজে ছিলেন সুকণ্ঠ গায়ক। অচিরে তার গান রাজশাহীর বিদ্বজ্জনকে মুগ্ধ করে। তার গানের সংখ্যাও বেড়ে চলে। ঐ আসরে দ্বিজেন্দ্রলালের হাসির গান তার স্বকণ্ঠে শুনে রজনীকান্ত হাসির গান রচনাতেও উদ্বুদ্ধ হন। ফলে তার সৃজননৈপুণ্যে যুক্ত হয় এক নতুন মাত্রা।

রজনীকান্তের গানের বাণী বা রূপবন্ধে কোনো উচ্চকিত মৌলিকতা নেই অথচ উচ্চারণের গাঢ়তায় ও বিশ্বাসের স্পন্দে তার গান সবস্তরের বাঙালী শ্রোতার ভালো লাগে। দেশাত্মবোধ, ভক্তিরস ও হাসির গান তাঁর রচনা এই ত্রিস্তরে আবদ্ধ। সহজ সরল আবেদনময় তাঁর গান নির্মাণের চারুত্বে জনপ্রিয় এবং ‘কান্তগীতি’ নামে প্রসিদ্ধ। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় লেখা তার। গান ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই’ সারাদেশকে মাতিয়ে দেয় তার গভীরতা ও অন্তঃসঞ্চারী আবেগে।

আরো পড়ুন:  সজনীকান্ত দাস আধুনিক বাংলা সাহিত্যের গদ্যলেখক

গীতাত্মপ্রাণ এই গায়ক সকলের অনুরোধে অকাতরে গান গাইতে ভালোবাসতেন। গায়নের সেই অতিকৃতি তার গলায় কর্কট রোগের সূচনা করে। অশেষ যন্ত্রণা ভোগের শেষে ১৯১০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে তার মৃত্যু ঘটে। যন্ত্রণাদীর্ণ শারীরিক দুঃসহ কষ্টেও তার ঈশ্বর বিশ্বাস টলে নি। কণ্ঠ রোগক্ষতে জর্জর তবু ভক্তি বিশ্বাসের গান লিখে গেছেন। তাঁর গীত-সংকলন : ‘বাণী’, ‘কল্যাণী’, ‘অভয়া’, ‘কান্তবাণী।

তথ্যসূত্র:

১. সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪, পৃষ্ঠা, ১৭৮-১৭৯।

Leave a Comment

error: Content is protected !!