স্যামুয়েল আলেক্সান্ডার ছিলেন আধুনিক ব্রিটিশ নয়া বাস্তববাদী দার্শনিক

স্যামুয়েল আলেক্সাণ্ডার (Samuel Alexander; ১৮৫৮-১৯৩৮) আধুনিককালের ব্রিটিশ দর্শনিকদের মধ্যে ‘নিওরিয়ালিস্ট’ বা নয়া বাস্তববাদী বলে পরিচিত। নয়া বাস্তববাদ প্রকৃত পক্ষে বস্তুবাদী দর্শনও নয়। ভাববাদের সে প্রকারবিশেষ। বিশ্বজগৎ সম্পর্কে স্যামুয়েল আলেক্সাণ্ডারের দার্শনিক অভিমতের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, তিনি স্থান এবং কালকে ভাব কিংবা জ্ঞানসূত্র না বলে মহাবিশ্বের মূল বস্তু মনে করেছেন। মহাবিশ্বের এই মৌলিক বস্তু অর্থ্যাৎ স্থান এবং কালকে তিনি আবার গতি হিসাবে চিন্তা করেছেন।

স্যামুয়েল আলেক্সাণ্ডারের অভিমতটি মোটামুটি এরূপ যে, স্থান-কালের গতি কিংবা স্থানকালরূপ গতি থেকে অচিন্তনীয় জটিল পরিক্রমায় বস্তু, জীবন, মন, মূল্যবোধ, বিধাতার বাহক এবং বিধাতা-সমস্ত সত্তারই উদ্ভব হয়েছে। অচিন্তনীয় অধিকতর সত্তার উদ্ভব এই পরিক্রমায় হচ্ছে এবং হবে। বিশ্বপুঞ্জের এই ব্যাখ্যায় বিবর্তনবাদের স্বীকৃতি পাওয়া যায়। তবে একে বিশিষ্ট করার জন্য স্যামুয়েল আলেক্সাণ্ডার তাঁর বিবর্তনবাদকে ‘বিকাশমান বিবর্তন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। নবতর সৃষ্টির আন্তপ্রেরণায় এই বিকাশমান বিবর্তন প্রবাহমান।

স্যামুয়েল আলেক্সাণ্ডারের ইংরেজি ভাষায় লিখিত বিখ্যাত গ্রন্থের নাম হচ্ছে ‘স্পেস, টাইম এণ্ড ডিটি’ অর্থ্যাৎ স্থান, কাল এবং বিধাতা। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গিফোর্ড বক্তৃতাবলী হিসাবে প্রদত্ত এবং ১৯২০ সালে পুস্তকারের প্রকাশিত এই অভিমতের মাধ্যমে আলেকজাণ্ডার সুসংবদ্ধ আকারে তাঁর দর্শন প্রকাশ করার চেষ্টা করেন। উক্ত গ্রন্থে তিনি তাঁর পদ্ধতিকে অভিজ্ঞতালব্ধ পরাবিদ্যা আখ্যা দেন। অভিজ্ঞতালব্ধ পরাবিদ্যা বা এমপিরিক্যাল মেটাফিজিক্স বলতে তিনি বিজ্ঞানের সামগ্রিকতাকে যেমন বুঝাতে চান, তেমনি বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত বিজ্ঞান যে-সত্যে পৌছাতে পারে না, বিজ্ঞানোর্ধ্ব সেই সত্যের কথাও তিনি এর মারফত প্রকাশ করতে চেয়েছেন।

স্যামুয়েল আলেক্সাণ্ডারের মতে মন এক দিক থেকে যেমন দেহ এবং দেহাভ্যস্তরের স্নায়ুমণ্ডলীর অতিরিক্ত কোনো সত্তা নয়, তেমনি অপরদিকে এ সত্তা বিকাশমান বিবর্তনের এক নতুন উদ্ভব। স্যামুয়েল আলেকজাণ্ডার তাঁর দর্শনে বিজ্ঞান এবং ধর্মের সমন্বয় ঘটাবার চেষ্টা করেছেন। বস্তুবাদী দার্শনিকগণ মনে করেন যে, ধর্মের সঙ্গে বিজ্ঞানের সমন্বয় সাধনের চেষ্টায় আলেকজাণ্ডারের দর্শন আধুনিক বিজ্ঞান-বিরোধী অভিমতে পর্যবসিত হয়েছে। উপরোক্ত দার্শনিকের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘আর্ট এ্যাণ্ড দি ম্যাটেরিয়াল’ (১৯২৫) এবং ‘বিউটি এ্যাণ্ড আদার ফরমস অব ভ্যালু’ (১৯৩৩)।

আরো পড়ুন:  এনসেলম ছিলেন ইংল্যাণ্ডের ধর্মতাত্ত্বিক এবং দার্শনিক

তথ্যসূত্র:

১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; ৫ম মুদ্রণ জানুয়ারি, ২০১২; পৃষ্ঠা ৩৯-৪০।

Leave a Comment

error: Content is protected !!